পাচারের অর্থ ফেরাতে দীর্ঘ আইনি লড়াই, ইতোমধ্যে তিন দেশে জব্দ হয়েছে সম্পদ

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকার একাধিক দেশে আইনি ও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। এরই অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্য, আইল অব ম্যান এবং সাইপ্রাসে অভিযুক্তদের কিছু সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি সাইপ্রাসের রাজধানী নিকোশিয়ার একটি আদালত বাংলাদেশের শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের একটি বিলাসবহুল বাড়ি জব্দের নির্দেশ দিয়েছে। ব্যাংক জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নিয়ে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগের তদন্তের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) বিভিন্ন দেশে পাচার হওয়া অর্থের অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।

তদন্তে এখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সাইপ্রাস, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, থাইল্যান্ড, ভারতসহ অন্তত দেড় ডজন দেশ ও অঞ্চলে অর্থ পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব দেশের সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযুক্তদের সম্পদ জব্দের অনুরোধও পাঠানো হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, তিনটি দেশে ইতোমধ্যে কিছু সম্পদ জব্দ করা হলেও অন্য দেশগুলোতে স্থানীয় আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাই সব দেশে একই গতিতে সম্পদ জব্দ সম্ভব নয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রথম ধাপে এস আলম গ্রুপ, আরামিট গ্রুপ, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা ও ওরিয়ন গ্রুপের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে বিদেশে জব্দ হওয়া সম্পদ এখনই দেশে ফেরানো যাবে না। সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে সম্পদগুলো বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, পাচার হওয়া অর্থের মাত্র এক শতাংশ পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয় এবং সে প্রক্রিয়ায় সাত থেকে বিশ বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীরের মতে, বিদেশি আদালতে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অর্থ তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে বিনিয়োগ হিসেবে গন্তব্য দেশে প্রবেশ করেছে।

এদিকে সরকার জানিয়েছে, পাচারের অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ‘নো উইন, নো ফি’ ভিত্তিতে চুক্তি করা হয়েছে। অর্থাৎ, অর্থ উদ্ধার করতে পারলেই কেবল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো পারিশ্রমিক পাবে। পাশাপাশি পাচারের অর্থের প্রধান গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পাচার হওয়া অর্থ জনগণের সম্পদ। তাই আইনগত ও কূটনৈতিক সব ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে এসব অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে জনকল্যাণে ব্যয় করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, অন্তত একটি মামলায় সফলভাবে অর্থ ফিরিয়ে আনা গেলে সেটি ভবিষ্যতে অর্থ পাচার রোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top