এক সময়ের ক্রিকেট পরাশক্তি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ওয়ানডে বিশ্বকাপের প্রথম দুটি আসরের শিরোপা জিতেছে দলটি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কথা উঠলেই চোখে ভাসে অতীতের ভিভ রিচার্ড, গ্যারি সোবার্স, ব্রায়ান লারা কিংবা আজকের ক্রিস গেইলের কথা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের এই তারকারা প্রত্যোকেই একেকটি আলাদা স্বাধীন দেশের নাগরিক। ক্রিস গেইল জ্যামাইকান, ব্রায়ান লারার দেশ ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো আবার গ্যারি সোবার্স বার্বাডোজের সন্তান। ওয়েস্ট ইন্ডিজ নামে তো কোন দেশই নেই বিশ্ব মানচিত্রে।
তাহলে ক্রিকেট বিশ্বে এই দলটি এলো কোথা থেকে? সেসব নিয়ে আলোচনা করবো-
বাংলাদেশ বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ
২০২২ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ দলের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে! সেবার লঞ্চে (তাদের ভাষায় ফেরি) সেন্ট লুসিয়া থেকে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে ডমিনিকা যাওয়ার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। এই দুটি দেশ মূলত উত্তর আটলান্টিকের দুটো দ্বীপ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলটিই আসলে এমন আলাদা কতগুলো দ্বীপ দেশ নিয়ে গঠিত।
নব্বুইয়ের দশকের আগ পর্যন্ত ক্রিকেট বিশ্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ছিলো সেরা শক্তিগুলোর একটি। সে সময় তাদের বোলাররা যেমন গতির ঝড় তুলে প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের বুকে কাপন ধরিয়ে দিত, আবার ব্যাটসম্যানরা রাজত্ব করতো ক্রিজে। ম্যালকম মার্শাল, কার্টলি অ্যামব্রোস, জোয়েল গার্নার, গর্ডন গ্রিনিজ, ক্লাইভ লয়েড এমন আরো কত কিংবদন্তীর জন্ম হয়েছে এই দলটির জার্সি পরে। এখনকার ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাদের সেই সোনালী সময়ের ছায়া হয়ে থাকলেও এক সময় ক্রিকেট বিশ্বে যারা ছিলো অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
ক্রিকেট ছাড়া আর কোন বিষয়েই এই দ্বীপগুলো এক সাথে অংশ নেয় না। এমনকি ফুটবলও খেলে তারা আলাদা দল হিসেবে। রাজনীতি, কূটনীতি সবই আলাদা দেশগুলোর।
প্রথম দুটি ওয়ানডে বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে তারা, তৃতীয় আসরে ফাইনালে ভারতের কাছে হেরে গেলেও সেটি অনেকে আপসেট হিসেবে আখ্যায়িত করেন। সাম্প্রতিক সময়ে দলটির পারফরম্যান্স খারাপ হলেও দুটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও একটি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির শিরোপা জিতেছে দলটি।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোন মহাদেশে অবস্থিত
বিশ্বের আর সব ক্রিকেট দলই নিজ নিজ দেশের হয়ে মাঠে নামে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সেখানে ব্যতিক্রম। কারণ বিশ্বে তো ওয়েস্ট ইন্ডিজ নামের কোন দেশই নেই। মানচিত্র, রাজনীতি, কূটনীতি কোথাও এই নামে কোন দেশের উপস্থিতি নেই। শুধুমাত্র ক্রিকেট মাঠেই পাওয়া যায় এই দেশটিকে। এর কারণ হচ্ছে এই দলটি কয়েকটি দেশের সমন্বয়ে গঠিত একটি ক্রিকেট দল।

কয়েকটি স্বাধীন দ্বীপ দেশ ও কয়েকটি বিভিন্ন দেশের শাসিত দ্বীপ মিলে সম্মিলিতভাবে গঠন করা হয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড। দ্বীপগুলোর অবস্থান উত্তর আমেরিকা মহাদেশে। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর ও ক্যারিবীয় সাগরে অবস্থিত দ্বীপগুলো। অঞ্চলটি ক্যারিবীয় অঞ্চল নামেও পরিচিত।
১৪৯২ সালে ইতালীয় নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে জাহাজ নিয়ে এই অঞ্চলে পৌছান। সে সময় পূর্ব এশিয়া (ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া) অঞ্চলটিকে ডাকা হতো ‘ইস্ট ইন্ডিজ’ নামে। এর সাথে মিল রেখে পশ্চিমে অবস্থিত ওই অঞ্চলটিকে ইউরোপীয়রা ডাকতে শুরু করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ নামে। ১৯৫৮ সালে এই অঞ্চলের কয়েকটি দেশ মিলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ফেডারেশন নামে একটি জোটও গঠন করেছিল।
আরো পড়ুন :
সাদিও মানে ও তার ভাঙা আইফোনের গল্প
এবি ডি ভিলিয়ার্স : মিস্টার ৩৬০ ডিগ্রি
ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে অঞ্চলটিতে ইউরোপীয় বনিকদের আনাগোনা শুরু হয়। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এসময় ফরাসি, ইংলিশ, স্প্যানিশ, ডাচ, পর্তুগিজদের মধ্যে অনেক লড়াইও হয়। ইউরোপীয়রাই এখানে দাস হিসেবে আফ্রিকানদের আনতে থাকে। তাদের মাধ্যমে চলতো ইউরোপীয়দের ব্যবসায় ও কৃষিকাজ। ধীরে ধীরে সেই আফ্রিকানরাই অঞ্চলটিতে স্থানীয় আদিবাসী কার্বিস ও ইউরোপীয় দখলদারদের চেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে ওঠে। সেই থেকেই অঞ্চলটিতে আফ্রিকান বংশোদ্ভূতরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ দেশ নয় কেন
১৮৯০ এর দশকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলটি গঠিত হয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ফেডারেশন নামক জোট থেকেই নামটি ধার করা হয়। সে সময় ওই অঞ্চলে সফর করা ইংল্যান্ড দলের বিরদ্ধে ম্যাচ খেলার জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিভিন্ন দ্বীপ থেকে খেলোয়াড় বাছাই করে একটি দল গঠন করা হয়। এরপর এই ধারণাটি পছন্দ হয় স্থানীয় কর্মকর্তাদের। সেটিই বহাল রাখেন তারা। শুরু হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ নামের ক্রিকেট দলের যাত্রা। ১৯২০ এর দশকে এই অঞ্চলে ক্রিকেট আয়োজন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে সম্মিলিতভাবে গঠিত হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড।
১৯২৬ সালে আইসিসির পূর্বসূরী সংস্থা ইমপেরিয়াল ক্রিকেট কনফারেন্সের সদস্য হিসেবে যোগ দেয় দলটি। তখন সংস্থাটির সদস্য ছিলো ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা। টেস্ট পরিবারের চতুর্থ সদস্য হিসেবে ১৯২৮ সালে প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলে দলটি। এরপর দোর্দণ্ড প্রতাপে এগিয়ে চলা।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল
২০২২ সালের জুন মাসে বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজ পর্যন্ত দলটি মোট টেস্ট খেলেছে ৫৬৫টি। ১৮১টি জয়ের বিপরীতে হার ২০৪টি ম্যচে। আর ড্র হয়েছে ১৭৯ ম্যাচ এবং একটি ম্যাচ টাই হয়েছে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ অঞ্চলের ক্রিকেট সংস্থার বর্তমান নাম ‘ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ’। যেসব দ্বীপ নিয়ে এই বোর্ড গঠিত তার মধ্যে ১০টি স্বাধীন দেশ। এগুলো হলো এন্টিগুয়া এন্ড বারবুডা, বার্বাডোজ, ডমিনিকা, গ্রেনাডা, গায়ানা, জ্যামাইকা, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট, ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো এবং সেন্ট কিটস এন্ড নেভিস। এছাড়া আছে ব্রিটিশ শাসিত দ্বীপ অ্যাঙ্গুইলা, মন্টসারেট ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস। আছে নেদারল্যান্ডস শাসিত রাজ্য সিন্ট মার্টেন ও যুক্তরাষ্ট্রের অঞ্চল ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডস।

সব মিলে ওয়েস্ট ইন্ডিজে প্রধানত ছয়টি ক্রিকেট সংস্থা আছে। এই ছয় সংস্থার ছয়টি দল ওয়েস্ট ইন্ডিজের ঘরোয়া ক্রিকেটের সর্বোচ্চ স্তরে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে। এই দলগুলো হলো- বার্বাডোজ, গায়ানা, জ্যামাইকা, ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো, লিওয়ার্ড আইল্যান্ডস ও উইনওয়ার্ডস আইল্যান্ডস।
লিওয়ার্ড আইল্যান্ডস টিম গঠিত হয়েছে এন্টিগুয়া এন্ড বারবুডা, সেন্ট কিটস, নেভিস, এবং বৃটিশ, মার্কিন ও নেদারল্যান্ড শাসিত দ্বীগুলো মিলে । আর ডমিনিকা, গ্রেনাডা, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট মিলে গঠিত হয়েছে উইনওয়ার্ডস আইল্যান্ডস টিম। ছোট ছোট দ্বীপগুলোতে জনসংখ্যা কম ও ক্রিকেট কাঠামো দুর্বল হওয়ায় কয়েকটি দ্বীপ মিলে একটি দল গড়া হয়।
তবে প্রতিটি দ্বীপেরই আলাদা ক্রিকেট সংস্থা আছে। যেমন সেন্ট কিটস ও নেভিস- এই দুটি দ্বীপ মিলে একটি স্বার্বভৌম দেশ; কিন্তু দুটি দ্বীপের ক্রিকেট সংস্থা আলাদা। দুটি সংস্থাই অবশ্য লিওয়ার্ড আইল্যান্ডস টিমের অংশ হিসেবে ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলে।
আরো পড়ুন :
খাবিব নুরমাগোমেদভ, মার্শাল আর্ট কিংবদন্তী
মানুষের পাশে রোনালদো, মানবিক রোনালদো
ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল
যেহেতু অনেকগুলো রাষ্ট্র ও অঞ্চল মিলে একটি ক্রিকেট দল বা সংস্থা, তাই ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোন জাতীয় পতাকা বা জাতীয় সঙ্গীত নেই। তবে ক্রিকেট সংস্থাটি তাদের অঞ্চলের প্রকৃতির সাথে মিল রেখে একটি পাতাকা তৈরি করেছে এবং ‘র্যালি রাউন্ড দ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজ’ নামের একটি গানকে তাদের সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের কোন আন্তর্জাতিক ম্যাচ শুরুর আগে এই গানটি বাজানো হয় এবং ক্রিকেট সংস্থার এই পতাকা প্রদর্শন করা হয়।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, ক্রিকেট ছাড়া আর কোন বিষয়েই এই দ্বীপগুলো এক সাথে অংশ নেয় না। এমনকি ফুটবলও খেলে তারা আলাদা দল হিসেবে। রাজনীতি, কূটনীতি সবই আলাদা দেশগুলোর।
আলাদা আলাদা দেশ ও সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠা ক্রিকেটারদের নিয়ে গড়া এই দলকে তাই একটি মাল্টিন্যাশনাল ক্রিকেট টিমও বলা চলে। কখনো এমনও হয় যে, দলের ১১ জন সদস্যের সবাই আলাদা দেশের নাগরিক। টেস্ট ক্রিকেটের এক ইনিংসে সর্বোচ্চ অপরাজিত ৪০০ রানের ইনিংস খেলা কিংবদন্তী ব্যাটসম্যান ব্রায়ান লারা ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগোর নাগরিক।
ক্যারিবীয় দ্বীপ দেশগুলো
দুটি প্রধান দ্বীপ ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর সাথে আরো কিছু ছোট দ্বীপ মিলে দেশটি গঠিত। রাজধানী পোর্ট অব স্পেন শহরটি অবস্থিত ত্রিনিদাদ দ্বীপে। পোর্ট অব স্পেনের কাছেই ছোট্ট শহর শান্তা ক্রুজে জন্ম ব্রায়ান লারার। লারাকে বলা হয় প্রিন্স অব পোর্ট অব স্পেন। পোর্ট অব স্পেনেই অবস্থিত ওয়েস্ট ইন্ডিজের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট ভেন্যু কুইন্স পার্ক ওভাল। ইয়ন বিশপ, কাইরন পোলার্ড, দিনেশ রামদিন, রবি রামপাল ত্রিনিদাদ এন্ড টোগাবোর নাগরিক।
আবার সাবেক অলরাউন্ডার ড্যরেন স্যামির দেশ সেন্ট লুসিয়া। যে কারণে তিনি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেছেন উইওয়ার্ড আইল্যান্ডস দলের হয়ে। সেন্ট লুসিয়ার প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে স্যামি ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে জায়গা পেয়েছেন।
টি-টোয়েন্টির ফেরিওয়ালা খ্যাত ব্যাটসম্যান ক্রিস গেইলের দেশ জ্যামাইকা। রাজধানী কিংসটনে জন্ম তার। আন্দ্রে রাসেলও একই দেশের নাগরিক। এই জ্যামাইকারই নাগরিক বিখ্যাত অ্যাথলেট উসাইন বোল্ট। বোল্ট জ্যামাইকার নাম লেখা জার্সি পরে একের পর এক পদক জিতেছেন অলিম্পিকসহ অ্যাথলেটিকসের সব প্রতিযোগিতায়; কিন্তু গেইল ও রাসেলকে খেলতে হচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পরিচয়ে।
এছাড়া কোর্টনি ওয়ালশ, মারলন স্যামুয়েলস, মাইকেল হোল্ডিং, প্যাট্রিক প্যাটারসনও জ্যামইকার নাগরিক। স্যাবাইনা পার্ক জ্যামাইকার বিখ্যাত ক্রিকেট ভেুন্য।
অন্যদের ক্লাইভ লয়েড গায়ানার, ভিভ রিচার্ডস এন্টিগুয়া এন্ড বারবুডার নাগরিক।
আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন : আহমেদ স্টোর


