বাইতুল হিকমাহ : গণিতের উদ্ভব যেখানে

বাইতুল হিকমাহ কি

মানব জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে জড়িয়ে আছে গনিত। শিশুর গুণতে শেখা, ব্যবহারিক জীবনের হিসাব-নিকাশ থেকে শুরু করে কম্পিউটারের বাইনারি কোড- সব কিছুই গনিতের অংশ। গনিতের এই বিপ্লবের সুতিকাগার ইসলামের স্বর্ণযুগের একটি লাইব্রেরি। নাম বাইতুল হিকমাহ । অনেক গবেষক অবশ্য বাগদাদের এই প্রতিষ্ঠানটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যাকাডেমিও বলে থাকেন। যেটি শুধু গনিতই নয়, পদার্থ বিদ্যা, রসায়ন, জোতির্বিদ্যা, দর্শনসহ অনেক বিষয়ের আধুনিক জ্ঞানচর্চার সূত্রপাত ঘটিয়েছে।

লাইব্রেরিটির কোন চিহ্ন এখন আর অবশিষ্ট নেই। কাজেই সেটির অবস্থান ঠিক কোথায় ছিলো কিংবা দেখতে কেমন ছিলো সেটিও বলার সুযোগ নেই। এটুকু বলা যায় যে, ইরাকের রাজধানী বাগদাদেরই কোন এক জায়গায় ছিলো সেটি। তবে মানব ইতিহাসে অমোচনীয় ছাপ রেখে গেছে লাইব্রেরিটি, যা থাকবে অনন্তকাল।

ইসলামের স্বর্ণযুগের আরো অনেক কিছুর মতো এই লাইব্রেরিটি অপরিসীম অবদান রেখেছে মানব সভ্যতায়। প্রতিষ্ঠানটি ছিলো তৎকালীন যুগের মেধা ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু। শুধু তাই নয়, পরবর্তী আরো অন্তত কয়েকশো বছর এই লাইব্রেরিটিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে জ্ঞানচর্চার অনেকগুলো ধারা। ৮ম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর অনেক মনীষী গবেষণার কাজ করেছেন এখানে। আধুনিক গনিত চর্চার আতুরঘর এই প্রতিষ্ঠানটি। যেখান থেকেই উদ্ভব হয়েছে সাধারণ শূন্য কিংবা আজকের আরবি সংখ্যাগুলোর।

গণিত চর্চায় যে দুজন মনীষীর অবদান সবচেয়ে বেশি তারা হলেন মুসা আল খারিজমী ও ফিবোনাচ্চি। দুজনেই বাইত আল হিকমার সংস্পর্শে এসেছিলেন।

বাইতুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠা করেন কে

অষ্টম শতাব্দীতে আব্বাসীয় খিলাফার পঞ্চম শাসক খলিফা হারুনুর রশিদের ব্যক্তিগত লাইব্রেরি হিসেবে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটির নাম বাইত আল হিকমাহ। ইংরেজীতে যাকে বলা হয় দ্যা হাউজ অব উইজডম। বাংলা করলে দাড়ায় জ্ঞানের ঘর। জ্ঞান চর্চার গুরুত্ব অনুধাবন করেই তিনি এটি প্রতিষ্ঠা করেন। অবশ্য এর সংগ্রহশালার বড় একটি অংশ ছিলো খলিফা আল মনসুরের সময়ের। শুরুতে খলিফা হারুনের ব্যক্তিগত লাইব্রেরি হিসেবে গড়ে উঠলেও বছর ত্রিশেক পরে তার পুত্র আল মামুনের শাসনামলে এটি সকলের জন্য খুলে দেয়া হয়। যার ফলে অল্প দিনেই মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে বাগদাদ নগরী।

এছাড়া উন্মুক্ত জ্ঞানচর্চার সন্ধান পেয়ে সারা বিশ্বের জ্ঞানপিপাসু ও বিজ্ঞানীরাও দলে দলে আসতে শুরু করেন বাগদাদে। মুসলিম ছাড়াও ইহুদি, খ্রিস্টান সবার জন্যই উন্মুক্ত করে দেয়া হয় লাইব্রেরিটি।
গবেষকরা বলছেন, সে সময় বাইত আল হিকমাহ’র সংগ্রহশালা ছিলো আজকের দিনের লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরি কিংবা প্যারিসের বাইবলিয়োথেক ন্যাশনাল এর মতো। আরবি, ফারসি, গ্রিকসহ সমকালীন অনেক ভাষার দুর্লভ অনেক বই বা পান্ডুলিপি ছিলো সেখানে।

তিনি লিখেছেন, এই নয়টি সংখ্যা, এর সাথে শূন্য প্রতীক এবং এগুলো দিয়ে লেখা যে কোন সংখ্যা জানতে হবে।…শত শত বছর ধরে মুসলিম বিজ্ঞানীদের গবেষণার ফল থেকেই ফিবোনাচ্চি খুঁজে পেয়েছিলেন গনিতের এই রূপটি।

অর্থাৎ ওই সময়ে বিশ্বের কলা, বিজ্ঞান, গণিত, জ্যেতির্বিজ্ঞান, ঔষধশাস্ত্র, রসায়ন, ভুগোল, দর্শন, শিল্পকলা ও সাহিত্য চর্চার এটি ছিলো অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক প্রতিষ্ঠান। অপরসায়ন কিংবা জোতিষশাস্ত্রের মতো অপ্রচলিত বিষয়গুলোর চর্চাও ছিলো এই লাইব্রেরিকে কেন্দ্র করে।

ওই যুগে এত বিশাল একটি প্রতিষ্ঠানের কথা কল্পনা করা কঠিন; কিন্তু বাস্তবতা ছিলো সেটাই। এবং এটিও সত্যি যে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমেই একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল এবং গণিতের গতিপথই বদলে দিয়েছিল মুসলিমদের প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরিটি।

বাইতুল হিকমাহ

১২৫৮ সালে মঙ্গলরা বাগদাদ দখল করার পর লাইব্রেরিটি ধ্বংস করে ফেলেছিল। কথিত আছে যে, সে সময় তারা এত পরিমাণ পাণ্ডুলিপি তাইগ্রিস বা দজলা নদীতে ফেলেছিল যে, কালির রঙে নদীর পানিই কালো হয়ে গিয়েছিল। তবে লাইব্রেরি ধ্বংস হলেও এর গবেষণা বা যে জ্ঞান এখান থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল তা ধ্বংস হয়নি। পৃথিবী যতদিন থাকবে ততদিন সেটি আলোকিত করে যাবে মানব সভ্যতাকে। এখান থেকে উদ্ভাবিত গাণিতিক ভাষাই পরবর্তীতে মুসলিম বিশ্ব, ইউরোপসহ পুরো বিশ্বেই গৃহীত হয়েছিল।

ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব সারে’র পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক জিম আল খলিলি বলেন, লাইব্রেরিটি কবে, কোথায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেটি নিখুঁতভাবে জানা আমাদের কাছে জরুরি নয়। তার চেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে এখান থেকে উদ্ভাবিত বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলো এবং সেগুলো কিভাবে বিকশিত হয়েছিল সেটি জানা।

বাগদাদের এই লাইব্রেরিটি কিভাবে গণিতের সুতিকাগার সেটি জানতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সেই সময়কার ইতিহাসের পাতায়। গণিত চর্চায় যে দুজন মনীষীর অবদান সবচেয়ে বেশি তারা হলেন মুসা আল খারিজমী ও ফিবোনাচ্চি। দুজনেই বাইত আল হিকমার সংস্পর্শে এসেছিলেন। ইউরোপীয় রেনেসার আগ পর্যন্ত ইউরোপের গণিত চর্চার প্রতিশব্দ হয়েছিল একটি নাম : লিওনার্দো দ্য পিসা, মৃত্যুর পর যিনি পরিচিত হয়েছেন ফিবোনাচ্চি নামে।

ফিবোনাচ্চি সংখ্যা

১১৭০ সালে পিসা নগরীতে জন্ম নেয়া এই ইতালীয় গণিতবিদ প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন আফ্রিকার উত্তর উপকূলের বুগিয়া নামের একটি বাণিজ্যিক ছিটমহলে। বয়স যখন বিশের কোঠায়, ফিবোনাচ্চি তখন মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণ করেছিলেন। সেখান থেকে ভারত ও পারস্য হয়ে ইতালিতে ফিরে ১২০২ সালে তিনি প্রকাশ করেন লিবার আবাচি বা বুক অব অ্যাবাকাস নামের গ্রন্থটি। যার মাধ্যমে ইন্দো-আরবি সংখ্যা পদ্ধতির বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পায় পশ্চিমা বিশ্ব। এর আগে মাত্র হতে গোনা কয়েকজন পশ্চিমা পন্ডিত এ বিষয়ে জানতেন। ইউরোপীয়রা তখনো রোমান সংখ্যা পদ্ধতি ব্যবহার করতো, যা ছিলো অত্যন্ত জটিল।

এটি শুধু কোন বইয়ের সংগ্রহশালা ছিলো না। এটি ছিলো জ্ঞান চর্চার বড় একটি প্রতিষ্ঠান।

ফিবোনাচ্চির বইয়ে সংখ্যা পদ্ধতির গানিতিক প্রয়োগ দেখানো হয়, যার মাধ্যমে ব্যবহারিক জীবনে অংকের চর্চা শুরু হয়। মুনাফার পরিমান বের করা, মুদ্রা বিনিময়, সুদের হার নির্ধারণের শুরু হয় সংখ্যা পদ্ধতির ব্যবহার। আজকে শিশুরা স্কুলে যে সংখ্যাগুলো শিখছে সেগুলোর কথা উল্লেখ করে ফিবোনাচ্চি তার বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে লিখেছেন, যারা গণনার শৈল্পিক রুপ, এর সুক্ষ দিক ও উদ্ভাবনী বিষয়গুলো শিখতে চায় তাদের অবশ্যই হাতে আঙুল গুণে হিসাব করা শিখতে হবে। তিনি লিখেছেন, এই নয়টি সংখ্যা, এর সাথে শূন্য প্রতীক এবং এগুলো দিয়ে লেখা যে কোন সংখ্যা জানতে হবে।

ফিবোনাচ্চির এই কাজটির পরই গণিত জিনিসটি সবার ব্যবহারের জন্য যোগ্য হয়ে ওঠে; কিন্তু এগুলো শুধু যে একজন গনিতবিদ হিসেবে তার সৃজনশীলতা ছিলো তা নয়। তিনি মূলত ছিলেন জ্ঞানের একটি ধারার উত্তরাধিকারী। শত শত বছর ধরে মুসলিম বিজ্ঞানীদের গবেষণার ফল থেকেই ফিবোনাচ্চি খুঁজে পেয়েছিলেন গনিতের এই রূপটি।

আল খারিজমি

তাদের হিসাব পদ্ধতি, দশমিকের ব্যবহার, বীজগণিত এগুলোই ছিলো ফিবোনাচ্চির জ্ঞানের উৎস। বিশেষ করে তার বইটি অনেকাংশেই নির্ভর ছিলো নবম শতাব্দীর মুসলিম গণিতবীদ মুসা আল খারিজমির তৈরি করা অ্যালগরিদমের ওপর। মুসা আল খরিজমী তার বইয়ে প্রথম দ্বিঘাত সমীকরণ সমাধানের উপায় দেখিয়েছেন। আর বীজগণিতের জনক হিসেবে পরিচিত আল খারিজমি ৮২১ সালে সেই ঐতিহাসিক লাইব্রেরি বাইত আল হিকমা’র প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। এটিই ছিলো তার যাবতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবনের অন্যতম উৎস।

ইউনিভার্সিটি অব সারে’র অধ্যাপক জিম আল খলিলি বলেন, আল খারিজমিই প্রথম মুসলিম বিশ্বকে দশমিক সংখ্যা চিনিয়েছেন, আর লিওনার্দো ডি পিসার মতো অন্যরা সেটি নিয়ে গেছে ইউরোপ পর্যন্ত।

গনিতে ফিবোনাচ্চির বিশাল অবদান নিশ্চতভাবেই তাই মুসা আল খারিজমির গবেষণার উত্তরাধিকার। এই দুই গবেষক চার শত বছরের আগে-পরে পৃথিবীতে এলেও তাই দুজনেই সংযুক্ত ছিলেন বাইত আল হিকমার সাথে। একজন ইসলামের স্বর্ণযুগের এই লাইব্রেরিতে গবেষণা করে গণিতের অনেক কিছুর সূত্রপাত করেছেন, অন্য জন সেগুলোকে শুধু সারা বিশ্বে ছড়িয়েই দেননি বরং এগুলোর ওপর ভিত্তি করে দাড় করিয়েছেন আধুনিক গণিত শাস্ত্রকে।

তবে ঐতিহাসিক এই প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে অনেক কিছুই অজানা থাকায়, এর অবদান সম্পর্কে দলিল দস্তাবেজের ঘাটতি থাকায়, অনেক ঐতিহাসিকই এটিকে যথাযথ কৃতিত্ব দিতে চান না।

বিশেষজ্ঞরা কী বলেন

আল খলিলি বলেন, অনেকেই এমন দাবি করতে চান যে, হাউজ অব উইজডম সম্পর্কে যতটা ভাবা হয় এর কৃতিত্ব ততটা ছিলো না; কিন্তু আল খারিজমির মতো গবেষকদের সাথে প্রতিষ্ঠানটির সম্পর্ক এবং গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা কিংবা ভুগোল শাস্ত্রে তার অবদান- আমার কাছে জোরালো প্রমাণ হিসেবে প্রতীয়মান হয় যে, এটি শুধু কোন বইয়ের সংগ্রহশালা ছিলো না। এটি ছিলো জ্ঞান চর্চার বড় একটি প্রতিষ্ঠান।

ওপেন ইউনিভার্সিটি ব্রিটেনের হিস্টোরি অব ম্যাথমেটিকসের প্রফেসর জুন ব্যারো গ্রিন বলেন, হাউজ অব উইজডমের মৌলিক গুরুত্ব অনেক। এখানের আরব পন্ডিতরা গ্রিক আইডিয়াগুলোকে স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ করতেন। যেটি আমাদের গণিত শিক্ষার ভিত্তি তৈরি করেছে।

এই কিংবদন্তী গ্রন্থাগারটি যেমন আমাদের অতীত থেকে সংখ্যার ধারণা পেতে সাহায্য করেছে, তেমনি বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনেরও কেন্দ্র ছিলো এটি। বর্তমানে আমরা যে দশমিক সংখ্যা ব্যবহার করি তার বহু আগে ছিলো রোমান সংখ্যা কিংবা মেসোপটোমিয়ানদের সংখ্যা পদ্ধতি। তারও আগে মানুষ টালি পদ্ধতিতে হিসাব রাখতো।

কিংবা তারো আগে ছবি একে সংখ্যা বোঝাতো। যেগুলো ছিলো জটিল থেকে জটিলতর। যেমন একটা সময় দুটি ভেড়া বোঝাতে চাইলে মানুষ পাশাপাশি দুটি ভেড়ার ছবি আকতো; কিন্তু যদি বিশটি ভেড়া বোঝাতে হতো- তখন সেটি ছিলো খুবই কঠিন।

এই জায়গা থেকে মানব সভ্যতাকে উদ্ধার করেছে আধুনিক গনিত, আর এর আতুরঘর বাগদাদের এই লাইব্রেরি। একই সাথে প্রতিষ্ঠানটি জ্ঞানের আরো অনেক শাখাকে আলোকিত করেছে। তাই প্রতিষ্ঠানটি পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেলেও মানব সভ্যতায় সেটির অবদান ভুলবে না মানুষ।

আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন : আহমেদ স্টোর

১ thought on “বাইতুল হিকমাহ : গণিতের উদ্ভব যেখানে”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top