Hizbullah image

হিজবুল্লাহ : ইসরাইলের আতঙ্ক

ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের সাথে ইসরাইলের সংঘর্ষের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে হিজবুল্লাহ। লেবাননভিত্তিক এই সংগঠনটি একই সাথে সামরিক ও রাজনৈতিক তৎপরতা চালায়। লেবাননের রাজনীতিতে হিজবুল্লাহর প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে অন্যায্য প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ। তবে সামরিক দিক থেকে সংগঠনটি বেশ শক্তিশালী। লেবাননে ইসরাইলি সামরিক আগ্রাসনের প্রতিরোধে লক্ষ্যেই হিজবুল্লাহর জন্ম হয়েছিলো। সে হিসেবে উদ্দেশ্যগত ঐক্য রয়েছে হামাস ও হিজবুল্লাহর মাঝে। ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের সামরিক অভিযানের পর হিজবুল্লাহ নর্দার্ন ফ্রন্টে ইসরাইলের সাথে যুদ্ধ শুরু করতে পারে এমন আলোচনাও রয়েছে।

হিজবুল্লাহ নামের অর্থ কী

হিজবুল্লাহ আরবি শব্দ, যার অর্থ আল্লাহর দল। ১৯৮২ সালে লেবাননের এই গোষ্ঠিটি গঠিত হয়। এটি একই সাথে একটি রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠন। ১৯৮২ সালে ইসরাইলি বাহিনী লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় বিরাট অংশ ভূখ- দখল করে নেয়ার পর সেই ভূখ- উদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে হিজবুল্লাহ গঠিত হয়।

Lebanon map
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইল সীমান্তে প্রতিরোধ যুদ্ধে লিপ্ত হিজবুল্লাহ

ওই সময় লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসনের পর ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় দেশটিতে একটি সশস্ত্র গ্রুপ গড়ে ওঠে। সেই গ্রুপটি থেকেই পরবর্তীতে হিজবুল্লাহর জন্ম হয়। শিয়া মিলিশিয়াদের নিয়ে গঠিত গ্রুপটি সারা বিশ্বের শিয়া মুসলিমদের কাছ থেকে সমর্থন পেতে শুরু করেন। এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের অন্যতম প্রধান শত্রুতে পরিণত হয়। তবে হিজবুল্লাহ সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা ও সমর্থন পায় ইরানের কাছ থেকে।

হিজবুল্লাহ সামরিক শক্তি

সংগঠনটির সামরিক শাখার সদস্য সংখ্যা কত তা নিয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। ২০২১ সালে এর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ দাবি করেন, হিজবুল্লাহর ১ লাখ যোদ্ধা আছে। গ্রুপটি পারসিশন গাইডেড রকেট তৈরি করেছে এবং দাবি করছে, তারা ইসরাইলের যে কোন প্রান্তে হামলা চালাতে পারে। ভূমধ্যসাগরে থাকা ইসরাইলি জাহাজকেও তারা টার্গেট বানাতে পারে বলে দাবি করেন এর কর্মকর্তারা।

তাদের কাছে উন্নত সামরিক ড্রোন রয়েছে বলেও মনে করা হয়। প্রায়ই ইসরাইলের আকাশে হিজবুল্লাহর ড্রোন প্রবেশ করার খবর আসে মিডিয়ায়। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, সাম্প্রতি বছরগুলোতে ইরান কোটি কোটি ডলার দিয়ে সহযোগিতা করছে হিজবুল্লাহকে। রকেট ও অন্যান্য প্রযুক্তি এবং যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ইরানের বিপ্লবী গার্ড হিজবুল্লাহকে সহযোগিতা করে বলে পশ্চিমার অভিযোগ করে আসছে।

Hasan Nasrullah
হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ

হিজবুল্লাহ কোন দেশের সংগঠন

লেবাননের এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর যোদ্ধারা ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে ইসরাইলি নাগকিরদের ওপর হামলার অভিযোগও আছে তাদের বিরুদ্ধে। তবে দীর্ঘ ২০ বছর পর দক্ষিণ লেবানন থেকে যে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার করা হয়, সেটি ছিলো হিজবুল্লাহর দীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধের ফসল। এবং এই গ্রুপটি একমাত্র আরব শক্তি যারা ইসরাইলকে পিছু হটাতে পেরেছে। ওই সময় মধ্যপ্রাচ্য ও আরব বিশ^জুড়ে হিজবুল্লার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।

বিভিন্ন সময় ইসরাইলের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে সংগঠনটির যোদ্ধারা। ২০০৬ সালে ইসরাইলের অভ্যন্তরে একটি সামরিক অভিযান চালিয়েছিলো হিজবুল্লাহ। ওই অভিযানে তারা ২ ইসরাইলে সৈন্যকে বন্দী করে নিয়ে যায় লেবাননে। এরপর ইসরাইলও পাল্টা হামলা শুরু করে।

ওই দফায় ৩৪ দিন যুদ্ধ হয়েছে দুই পক্ষের মাঝে। যেটি জুলাই যুদ্ধ নামে পরিচিত। ওই যুদ্ধে সামরিকভাবে কোন পক্ষই জয় লাভ করতে পারেনি। তবে লেবাননে ১ হাজার ১০০ জন নিহত হয়েছিলো। অন্য দিকে ইসরাইলে নিহত হয়েছে ১৬৫ জন। তবে হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ একাধিকার দাবি করেছেন যে, ২০০৬ সালের ওই যুদ্ধে জয়ী হয়েছে তাদের যোদ্ধারা।

হিজবুল্লাহ ও হামাস

১৯৬৭ সালের যুদ্ধে গোলান উপত্যকা ও ফিলিস্তিনের যেসব উপত্যকা ইসরাইল দখল করেছে, নিয়মিত তাতে বসতি স্থাপন করে চলছে ইহুদিবাদী দেশটি। হামাস প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইসরাইলের কাছ থেকে ভূখ- উদ্ধার ও অবৈধ বসতি স্থাপন থামাতে লড়াই করে যাচ্ছে। হিজবুল্লাহও একই উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর হিজবুল্লাহ তাদের যে নীতিমালা প্রকাশ করেছে তাতে সংগঠনটির আদর্শ ও উদ্দেশ্য তুলে ধরা হয়েছে। এর মূলে রয়েছে ইসরাইলকে পরাজিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের মাটি থেকে পশ্চিমা ঔপনিবেশবাদকে উৎখাত করা।

সাংগঠনিকভাবে হিজবুল্লাহ ও হামাস আলাদা হলেও দুই সংগঠনের উদ্দেশ্য একই। উভয়েই ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধের জন্য গড়ে উঠেছে। দুটি সংগঠনের কার্যক্রম আলাদা হলে তাদের মধ্যে একটি বোঝাপড়া রয়েছে বলে মনে করা হয়। ২০০৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের সামরিক অভিযানের পর হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতাদের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।

হামাসের এবারের অভিযানের শুরু থেকেই ইসরাইলের সাথে হিজবুল্লাহ দ্বিতীয় আরেকটি ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু করতে পারে বলে গুঞ্জন চলছে। সেটি হলে ইসরাইলকে একই সাথে দেশের দুই প্রান্তে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। যদি হিজবুল্লাহ পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে নামে সেটি ইসরাইলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হতে পারে। কারণ এই গোষ্ঠির কাছে বিভিন্ন ধরণের আধুনিক প্রযুক্তি সম্বলিত অস্ত্র রয়েছে বলে মনে করা হয়। ইরানের কাছ থেকে তারা সরাসরি সহযোগিতা পেয়ে থাকে।

হিজবুল্লাহর প্রধান কে

১৯৯২ সাল থেকে হিজবুল্লাহর নেতৃত্বে আছে হাসান নাসরুল্লাহ। লেবাননের রাজনীতিতে তিনি খুবই প্রভাবশালী একজন নেতা। নাসরুল্লাহর জনপ্রিয়তাও ব্যাপক। রাজনীতি ও সমরনীতি উভয় দিকেই তার ব্যাপক দক্ষত রয়েছে বলে মনে করা হয়। ইসরাইলের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর যত সফলতা সেগুলোর পেছনে নাসরুল্লাহর দূরদর্শীতাকে প্রধান কারণ বলেও মনে করেন অনেকে। ৬৩ বছর বয়সী এই নেতা শুরুতে হিজবুল্লাহর সামরিক ইউনিটের সদস্য হিসেবে জীবন শুরু করলেও পরে হয়ে উঠেছেন রাজনীতিবিদ। লেবাননের রাজনীতিতে হিজবুল্লাহর আজকে যে প্রভাব তার পেছনেও এই নেতার অবদান সবচেয়ে বেশি।

ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দেশটিতে বিশাল শিয়া জনগোষ্ঠির সমর্থন পাচ্ছে হিজবুল্লাহ। তবে লেবাননে রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলার অভিযোগ আছে হিজবুøাহর বিরুদ্ধে। সংগঠনটির কারণে লেবাননের রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়ে আছে বলেও অভিযোগ অনেক পুরনো। সমালোচকরা বলেন, রাষ্ট্রীয় আইনকানুনের বদলে তাদের নিজস্ব আইনকানুন মানার প্রতিই আগ্রহ বেশি। অনেক সময় রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণেও প্রভাব খাটায় গ্রুপটি।

হিজবুল্লাহকে নিয়ে বিতর্ক

২০০৫ সালে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরির বোমা হামলায় মৃত্যুর ঘটনায় হিজবুল্লাহ সংশ্লিষ্ট একটি গ্রুপকে দায়ী করেছে জাতিসঙ্ঘের তদন্ত কমিশন। যদিও হিজবুল্লাহ সেই অভিযোগ প্রত্যাখান করেছে। রফিক হারিরি লেবাননের সুন্নীপন্থী প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন।

লেবাননের সম্প্রদায়ভিত্তিক রাজনেতিক কাঠামোতে শিয়াদের প্রতিনিধিত্ব করে যে কয়েকটি রাজনৈতিক দল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হিজবুল্লাহ। দেশটির বর্তমান পার্লামেন্টে হিজবুল্লাহর বড় প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। মন্ত্রীসভায় তাদের মন্ত্রীও আছে। তবে হিজবুল্লাহর বিরোধীরা বলছে, এই সংগঠনটি লেবাননকে রাজনৈতিকভাবে অস্থির করে রেখেছে। তারা এমনও বলছে, হিজবুল্লাহ হয়তো লেবাননকে আরেকটি যুদ্ধের মধ্যে টেনে নিতে চাইছে।

ইসরাইল বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত থাকার কারণে হিজবুল্লাহ শুরু থেকেই পশ্চিমা চাপের মধ্যে রয়েছে। বেশ কিছু দেশ হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক পশ্চিমা দেশের কালো তালিকায় নাম উঠেছে হিজবুল্লাহর। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে পরিচিত উপসাগরীয় কয়েকটি দেশও সংগঠনটিকে একই চোখে দেখে। তাদের মধ্যে সৌদি আরবও রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন হিজবুল্লাহর সামরিক শাখাকে সন্ত্রাসী তালিকাভূক্ত করলেও রাজনৈতিক শাখাকে করেনি।

১৫-১০-২০২৩

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top