এবি ডি ভিলিয়ার্স stats

ডি ভিলিয়ার্স : মি. ৩৬০ ডিগ্রি

ক্রিকেটের এক বিস্ময়কর প্রতিভা এবি ডি ভিলিয়ার্স । ভক্তরা যাকে ভালোবেসে নাম দিয়েছিল মিস্টার থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি, কেউ বা ডাকতো সুপারম্যান। আবার সব ফরম্যাটে সমান তালে খেলতে পারার কারণে অনেকে বলতেন মিস্টার পারফেক্ট। কখনো তিনি ব্যাট হাতে বোলারদের জন্য আতঙ্ক, আবার কখনো দলের প্রয়োজনে হয়ে উঠতেন নির্ভরতার প্রতীক। এবি ডি ভিলিয়ার্স এমনই। মানুষ হিসেবেও অমায়িক। দক্ষিণ আফ্রিকার এই ব্যাটিং জিনিয়াসের ক্যারিয়ার ও জীবনের নানা দিক সম্পর্কে জানাবো এই লেখায়।

ডি ভিলিয়ার্স

শহীদ আফ্রিদির ৩৭ বলে সেঞ্চুরির রেকর্ডটি টিকে ছিলো ১৭ বছর। ১৯৯৬ সালে গড়া ওয়ানডে ম্যাচে সবচেয়ে কম বলে সেঞ্চুরির সেই রেকর্ড ২০১৪ সালের প্রথম দিন ভাঙেন নিউজিল্যান্ডের কোরি অ্যান্ডারসন। তিনি সেঞ্চুরি করেছিলেন ৩৬ বলে। তবে দুর্ভাগ্য কেরির। রেকর্ডটি তার দখলে ছিলো মাত্র এক বছর।

দিনটি ছিলো ২০১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি। জোহানেসবার্গের ওয়ান্ডারার্স স্টেডিয়ামে সেদিন গোলাপি রঙের জার্সি পরে নেমেছিলো দক্ষিণ আফ্রিকা দল। তবে গোলাপি নয়, রীতিমতো চোখে সর্ষে ফুলের হলুদ দেখেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা। উদ্বোধনী জুটিতে হাশিম আমলা আর রাইলি রুশো ২৪৭ রান তোলার কারণে ডি ভিলিয়ার্স ক্রিজে নেমে তরবারি চালানোর লাইসেন্স পেয়েছিলেন।

বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যান কে- এই তর্কের অবসান আজকেই হল। পুরো বিশ্ব দেখেছে এবি-ই সেরা। এ ব্যপারে আর কোন প্রশ্ন থাকতে পারে না: বিরাট কোহলি

৩৯তম ওভারে মাঠে নেমে ১৬ বলে হাফ সেঞ্চুরি, আর ৩১ বলে পূর্ণ করেন সেঞ্চুরি। সনথ জয়সুরিয়ার ১৭ বলে হাফ সেঞ্চুরি আর কোরি এন্ডারসনের ৩৬ বলে সেঞ্চুরির রেকর্ড দুটোই এক ইনিংসে ভেঙে দেন ডি ভিলিয়ার্স।

ইনিংসের শেষ ওভারে যখন আউট হয়েছেন ততক্ষণে নামের পাশে ৪৪ বলে ১৪৯ রান লেখা হয়ে গেছে। ৯টি চারের পাশাপাশি ছক্কা মেরেছেন ১৬টি। টর্নেডো, তাণ্ডব কিংবা অন্য কোন বিশেষণেই স্পষ্ট করে বোঝানো যায় না ডি ভিলিয়ার্সের সেদিনের ব্যাটিংকে। সব মিলে সেই ম্যাচে ৫০ ওভারে ২ উইকেট হারিয়ে ৪৩৯ রান করেছিলো স্বাগতিকরা।

এবি ডি ভিলিয়ার্স রেকর্ড

এবি ডি ভিলিয়ার্সের ব্যাটে এমন তাণ্ডব অনেকবারই দেখেছে বিশ্ববাসী। ওই ইসিংসের পরের মাসেই সিডনিতে ২০১৫ বিশ্বকাপের ম্যাচে আবারো ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সামনে পেয়ে জ্বলে ওঠেন তিনি। মাত্র ৬৬ বলে খেলেন অপরাজিত ১৬২ রানের ঝলমলে এক ইনিংস। ইনিংসের শেষ বল পর্যন্ত ক্যারিবীয় বোলারদের নাকের পানি, চোখের পানি এক করে ছেড়েছেন।

তার সম্পর্কে অনেক ভুল তথ্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে গেছে যেমন, সাতারে জাতীয় স্বর্নপদক পেয়েছেন, ব্যাডমিন্টন ও হকিতে বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে খেলেছেন এমন…..

এমন সব বলে চার-ছক্কা মেরেছেন যা কেউ কোনদিন কল্পনাও করেনি। সেই ম্যাচের পরই ভিলিয়ার্সের নাম হয়ে যায় মিস্টার থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি। যেকোন অবস্থায় যে কোন দিক দিয়ে বল সীমানার বাইরে পাঠাতে পারেন বলেই ভালোবেসে এমন নাম দিয়েছে ভক্তরা। অফ স্ট্যাম্পের অনেক বাইরের বল, ব্লক হোলের বল কিংবা মাথার কয়েক ফুট ওপর দিয়ে যাওয়া বাউন্সারও লাফ দিয়ে বাউন্ডারিতে পাঠাতে পারতেন তিনি।

যেকোন অবস্থায় যে কোন দিক দিয়ে বল সীমানার বাইরে পাঠাতে পারেন

তবে এত কিছুর পরও, ক্রিকেট পণ্ডিতদের কাছে এবি ডি ভিলিয়ার্সের সেরা ইনিংসগুলোর একটি হলো ২০১২ সালে অ্যাডিলেড টেস্টের ৩৩ রানের ইনিংসটি। শুনলে অনেকেই অবাক হবে। এত বড় বড় মারদাঙ্গা ইনিংস যিনি খেলেছেন তার ৩৩ রানের একটি ইনিংস কেন বিখ্যাত হবে? তাও আবার টেস্ট ক্রিকেটে!

আরো পড়ুন :

ইউরোপের ফুটবলে বাংলাদেশী হামজা

খাবিব : মার্শাল আর্ট কিংবদন্তী

আলোচিত সেই ইনিংস

তবে ওই ইনিংসের গল্পটা ছিলো অন্যরকম। অ্যাডিলেডে মাইকেল ক্লার্কের স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া ৪৩০ রানের টার্গেট দেয় দক্ষিণ আফ্রিকাকে। টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে এত বড় টার্গেট তাড়া করে ম্যাচ জেতার ইতিহাস নেই। দক্ষিণ আফ্রিকা তাই ঝুঁকি না নিয়ে, বাকি ১৫০ ওভার ব্যাট করে ম্যাচ ড্র করার দিকে মনোযোগ দেয়; কিন্তু ২১ ওভারে দলীয় ৪৫ রান তুলতেই তারা হারিয়ে ফেলে টপ অর্ডারের ৪ উইকেট। নিশ্চিত পরাজয় যখন চোখ রাঙাচ্ছে তখন ক্রিজে আসেন ডি ভিলিয়ার্স। ম্যাচ বাঁচাতে হলে খেলতে হবে আরো ১২৫ ওভার, হাতে আছে ৬ উইকেট। পণ করেছিলেন- যে করেই হোক ম্যাচ ড্র করবেন। মাটি কামড়ে পড়ে থাকলেন ক্রিজে। ৩৩ রান করেছেন ২২০টি বল খেলে।

বলের চেয়ে যিনি রান বেশি করেন সেই ভিলিয়ার্সের নামের পাশে এমন ইনিংস দেখলে আশ্চর্য লাগাটাই স্বাভাবিক। দলের প্রয়োজনেই নিজের খেলার ধরণ ভুলে গিয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাট করেছেন। যার কারণে ম্যাচটা ড্র করতে পেরেছিলো দক্ষিণ আফ্রিকা।

আর এখানেই তিনি ক্রিস গেইল কিংবা শহীদ আফ্রিদির মতো হার্ডহিটারের চেয়ে এগিয়ে। ওই ম্যাচের কয়েক দিন পরই পার্থে সিরিজের পরের টেস্টেই মহাকাব্যিক ১৬৯ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচ ও সিরিজ দুটোই জিতিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকাকে।

এবি ডি ভিলিয়ার্স আইপিএল

ডি ভিলিয়ার্স এমনই। যার কাছে দলের প্রয়োজনটাই ছিল সবচেয়ে বড় কথা। ২০১০ সালে আবুধাবি টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২৭৮ রানে অপরাজিত থাকা অবস্থায় ইনিংস ঘোষণা করেছেন। ইচ্ছে করলেই দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে প্রথম ট্রিপল সেঞ্চুরি করার জন্য আরো কিছুক্ষণ ব্যাট করতে পারতেন; কিন্তু তার কাছে দলের প্রয়োজনটাই বড় মনে হয়েছে।

রবার্ট ডি ভিলিয়ার্স
কোহলিও সেরা ব্যাটসম্যান মানতেন ভিলিয়ার্সকে

টি-টোয়েন্টিতেও তার তাণ্ডব দেখেছে বিশ্ববাসী। আইপিএলে অনেক বছর ধরেই খেলছেন। সিপিএল, বিগব্যাশেও নিয়মিত দেখা যায় তাকে। যে কোন বোলারের কাছে সেখানে তিনি সাক্ষাৎ আতঙ্ক। আইপিএলে তিনটি সেঞ্চুরি আর ৪০টি হাফ সেঞ্চুরি আছে। ২০১৬ আসরে অবিশ্বাস্য এক ইনিংস খেলে দলকে জেতানোর পর রয়েল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালুরুর অধিনায়ক বিরাট কোহলি বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয় বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যান কে- এই তর্কের অবসান আজকেই হল। পুরো বিশ্ব দেখেছে এবি-ই সেরা। এ ব্যপারে আর কোন প্রশ্ন থাকতে পারেনা।’

আরো পড়ুন:

ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোন দেশ নয়, তাহলে কী?

সাদিও মানে ও তার ভাঙা আইফোনের গল্প

২০০৪ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষ টেস্ট ম্যাচ দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার জার্সিতে আন্তর্জাতিক অভিষেক হয় অসাধারণ প্রতিভাবান এই ক্রিকেটারের। সেঞ্চুরিয়নে সেই সিরিজের শেষ টেস্টের দুই ইনিংসে ৯২ ও ১০৯ রান করে নিজের সামর্থের প্রমাণ দেন। পারফরমেন্সের জোরেই ১১ বছরে টানা ৯৮টি টেস্ট খেলে গড়েন বিশ্ব রেকর্ড। ২০১৫ সালে সন্ত্রানসম্ভবা স্ত্রীর পাশে থাকার জন্য বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ থেকে ছুটি নেন। নইলে অভিষেকের পর টানা একশো টেস্ট খেলার রেকর্ডটাও হতো তার। টেস্টের ৭৯তম ইনিংসে এসে প্রথম শূন্য রানে আউট হয়েছিলেন তিনি।

এবি ডি ভিলিয়ার্সের খবর

এবি ডি ভিলিয়ার্স এমন একজন ব্যাটসম্যান যার কোন দুর্বল দিক নেই। তার অভিধানে নেই অফ ফর্ম নামক কোন শব্দ। যখনই মাঠে নামেন দলের জন্য অবদান রাখেন। উইকেট কিপিং করেছেন অনেক দিন। দলের প্রয়োজনে টুকটাক বোলিংও করেছেন। আবার ফিল্ডার হিসেবেও দক্ষিণ আফ্রিকা দলে জন্টি রোডসের যোগ্য উত্তরসুরী ছিলেন তিনি।

২০১০, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে আইসিসির বর্ষসেরা ওয়ানডে ক্রিকেটার নির্বাচিত হয়েছেন। তবে ২০১৫ সালের পর ইনজুরি তার ক্যারিয়ারের অনেক মূল্যবান সময় কেড়ে নিয়েছে। ইনজুরির কারণে বিরক্ত হয়েই প্রথমে অধিনায়কত্ব ছেড়েছেন, এরপর বিদায় বলেছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকেই। টেস্টে ২১টি আর ওয়ানডেতে ২৫টি সেঞ্চুরিই বলে দেয়, ধারাবাহিকভাবে খেলে যেতে পারলে কোথায় গিয়ে থামতেন তিনি। ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা দলের ভরাডুবির পর আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরা নিয়ে আলোচনা হলেও সেটি আর শেষ পর্যন্ত হয়নি।

২০২১ সালের নভেম্বরে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন এই সুপারস্টার।

অমায়িক এক মানুষ

মাঠে ব্যাট হাতে বোলারদের সাথে যেমন আচরণই করুন না কেন, মাঠের বাইরে এবি ডি ভিলিয়ার্স- খুবই অমায়িক ও বন্ধুবাৎসল এক মানুষ। ২০১৫ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে হেরে দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে এক ভক্ত একটি প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাড়ায় যাতে লেখা ছিলো- আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছি, আমাকে আলিঙ্গন করো ভিলিয়ার্স।

এবি ডি ভিলিয়ার্স ফিল্ডিংয়েও ছিলেন সেরা

বিমানবন্দরে প্রচণ্ড ভীড়ের মাঝেও নিরাপত্তা প্রোটকল ভেঙে সেই ভগ্ন হৃদয়ের ভক্তকে সান্ত¡না দিতে তার কাছে যান ডি ভিলিয়ার্স। করোনা মহামারীসহ বিভিন্ন সময় দাতব্য কাজে তহবিল সংগ্রহের জন্য নিজের ক্রীড়া সামগ্রী নিলামে তুলেছেন এই ক্রিকেটার। ইউনিসেফসহ বিভিন্ন সংস্থার হয়েও কাজ করেছেন মানুষের কল্যাণে।

১৯৮৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় জন্ম নেয়া এই ক্রিকেটার ব্যক্তিগত জীবনে দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক। ভিলিয়ার্সের বাবা ছিলেন চিকিৎসক ও পেশাদার রাগবি খেলোয়াড়। নিজেও ছোট বেলায় রাগবি, টেনিস, সাতারসহ অনেক খেলাধুলায় দক্ষ ছিলেন। ভালো গান গাইতে পারেন, বাজারে অডিও অ্যালবামও আছে তার।

তবে তার সম্পর্কে অনেক ভুল তথ্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে গেছে যেমন, সাতারে জাতীয় স্বর্নপদক পেয়েছেন, ব্যাডমিন্টন ও হকিতে বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে খেলেছেন এমন আরো কিছু তথ্য। বলা হয়, ফুটবলও খেলেছেন জাতীয় পর্যায়ে। তবে নিজের আত্মজীবনীতে এসব তথ্যকে ভুল হিসেবে উল্লেখ করেছেন এই ক্রিকেটার।

আয়োজন শেষ করবো একটি মজার তথ্য দিয়ে। ডি ভিলিয়ার্সের জন্ম তারিখ ফেব্রুয়ারির ১৭, প্রথম শ্রেণি ম্যাচে অভিষেক অক্টোবরের ১৭ তারিখে আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ডিসেম্বরের ১৭ তারিখে। যে কারণেই হয়তো নিজের জার্সি নম্বর হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ১৭ সংখ্যাটিকে।

আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন :  আহমেদ স্টোর

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top