বিশ্বের সবচেয়ে দামী বস্তু কী? এই প্রশ্ন করলে বেশিরভাগ মানুষের যে জিনিসটির কথা মনে পড়ে তার নাম হীরা। যদিও বাস্তবে হীরার চেয়ে দামী অনেক ধাতু বিশ্বে আছে, তবু হীরা মানুষের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। হীরা সৌন্দর্যের প্রতীক। কারো গুণ বোঝাতে হীরের টুকরা উপমা হরহামেশাই দেয়া হয়, আবার উজ্জলতা বোঝাতেও তুলনা করা হয় হীরার সাথে। অলঙ্কার হিসেবে হীরার ব্যবহারের কারণেই এটি মানুষের এত প্রিয় হয়ে উঠেছে। আগের দিনে রাজা বাদশাহদের মুকুটেও শোভা পেত এই দামী বস্তুটি।
হীরা কী, কেন এটি এত দামী, আর দুর্লভবস্তুটি কোথায় পাওয়া যায় সেসব বিস্তারিত জানাবো এই লেখায়-
১ ক্যারেট হীরার দাম কত
গহনা তৈরির ক্ষেত্রে যে কোন নারীর কাছে প্রথম পছন্দ অবশ্যই হীরা। এর কারণ হীরার সৌন্দর্য আর এর দাম। দামী হওয়ার কারণে এটি বিলাসী পণ্য হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। যার ফলে সমাজের ধনীদের ব্যবহার্য শৌখিন পণ্য হয়ে উঠেছে হীরা। কথায় বলে শখের তোলা ৮০ টাকা। যবে থেকে অলংকার হিসেবে মানুষ হীরার ব্যবহার শিখেছে, তখন থেকেই এটির কদর বেড়ে গেছে বিশ্বে।
আজকের দিনে সুন্দর নকশার ক্রিস্টাল ক্লিয়ার হীরা বসানো একটি আংটি কিনতেই বেড়িয়ে যাবে কয়েক হাজার মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের বাজারে ১ ক্যারেট হীরার দাম ৮০ হাজার টাকার উপরে। তবে উন্নত দেশগুলোতে আরো অনেক ভালো মানের হীরা বিক্রি হয়। যার দাম প্রচুর।
প্রতিদিন বিশ্বে কোটি কোটি ডলারের হীরা বেচাকেনা হয়। আর বাজারে বিক্রির উপযোগী করে তুলতে খনি থেকে উত্তোলনসহ এর পেছনে থাকে ব্যাপক কর্মতৎপরতা। বহু মানুষের মেধা আর শ্রমের ফলে জিনিসটি শপিং মলের শোকেসে জায়গা করে নেয়। আবার শক্ত ধাতু হওয়ার কারণে এটি শিল্প কারখানায়ও বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়।
হীরার দাম নির্ণয় করা হয় চারটি বিষয়ের মাধ্যমে- হীরার রং কেমন, কতটা স্বচ্ছ, কিভাবে কাটা হয়েছে এবং সেটি কত ক্যারেট ওজনের
কোন গ্রহে হীরার সৃষ্টি হয় অথবা হীরার কোথায় পাওয়া যায়
হীরা মূলত একটি ভূগর্ভস্ত প্রাকৃতিক ধাতু। মাটির অনেক নিচে বহু বছরের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয় এই মূল্যবান পদার্থটি। বিজ্ঞানের ভাষায় হীরা কার্বনের কঠিন রূপ। ভূগর্ভে অত্যধিক তাপ, চাপ ও একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় দীর্ঘদিন থাকার ফলে হীরা তৈরি হয়। পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে ১০০ মাইলেরও বেশি গভীরে, ১৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও ৪৫ থেকে ৯০ কিলোবার চাপে কার্বন পরমাণু থেকে হীরায় রূপান্তরিত হয়। আর হীরা তৈরি হওয়ার পর বিশেষ ধরণের অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে সেগুলো ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি উঠে আসে।
কার্বন হীরায় রূপান্তরিত হতে ১ থেকে তিন বিলিয়ন বছর সময় লাগে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। কাজেই বিশ্বে এখন হীরা পাওয়া যাচ্ছে তা সৃষ্টির আদিকাল থেকে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে। মনে করা হয়, পৃথিবী গঠন সময়ে এর অভ্যন্তরে আটকে পড়া কার্বন উচ্চ তাপ ও চাপে ধীরে ধীরে হীরায় পরিণত হয়েছে।
ঠিক কবে মানুষ প্রথম হীরার সন্ধান পেয়েছে তা নিয়ে বিতর্ক আছে। বেশিরভাগ ইতিহাসবিদের মতে খ্রিস্টপূর্ব ২ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ অব্দের মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বপ্রথম হীরার সন্ধান পাওয়া যায়। কয়েক শতাব্দী ধরে হীরা লেনেদেনের মুদ্রা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছ বলে জানা যায়। যে কারণে ভারত থেকে সিল্ক রুটের বনিকদের মাধ্যমে এটি পৌছায় ইউরোপীয়দের কাছে।
এফ গ্রেডের হীরাকে ধরা হয় নিখুঁত ও সেরা হিসেবে
অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভারতের বাইরেও বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় হীরার সন্ধান পেতে শুরু করে মানুষ। ব্রাজিল, রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় হীরার খনি আবিষ্কৃত হয়। তবে এই শিল্পে বিপ্লব শুরু হয় ১৮৬০ ও ৭০ এর দশকে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনেকগুলো হীরার খনি আবিষ্কারের পর। গড়ে ওঠে একের পর এক মাইনিং কোম্পানি। দক্ষিণ আফ্রিকার হীরাই সারা বিশ্বে এই ধাতুর ব্যবহার বৃদ্ধিতে ভুমিকা রাখে।
আসল হীরা চেনার উপায় কি
হীরার গুণগত মান নির্ণয় করা হয় কালার, ক্লারিটি, কাট ও ক্যারেট ওয়েট- এই চারটি বিষয়ের মাধ্যমে। অর্থাৎ হীরার রং কেমন, হীরা কতটা স্বচ্ছ, কিভাবে কাটা হয়েছে এবং সেটি কত ক্যারেট ওজনের। এক ক্যারেট সমান ২০০ মিলিগ্রাম বা ০ দশমিক ২ গ্রাম। খনি থেকে প্রাপ্ত হীরাগুলোর আকার, রং ও স্বচ্ছতায় ভিন্নতা থাকে। তাই হীরাকে নির্দিষ্ট কোনো দামের গণ্ডিতে ফেলা সম্ভব নয়। আকৃতি, রং ও স্বচ্ছতার মাত্রা অনুযায়ী হীরাকে অনেকগুলো গ্রেডে ভাগ করা হয়।

স্বচ্ছতার ভিত্তিতে আইএফ বা এফ গ্রেডের হীরাকে ধরা হয় নিখুঁত ও সেরা হিসেবে। এসব হীরার পুরোটাই খাঁটি কার্বন পরমাণুর স্বচ্ছ স্ফটিক। এতে কোন কালো দাগ থাকে না। রংয়ের দিক থেকে হীরায় হলুদের উপস্থিতি যত বেশি থাকবে, সেটির দাম তত কম হবে। এক্ষেত্রে ডি থেকে জেড পর্যন্ত গ্রেডিং করা হয়েছে। আকৃতির দিক থেকে রাউন্ড, ওভাল, হার্ট, কুশন প্রভৃতি ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে হীরার দাম নির্ধারিত হয়। আবার কিছু হীরা আছে দুষ্প্রাপ্য, যেগুলোর দামও আকাশচুম্বী- যেমন রুবি বা লাল হীরা, আরো আছে নীল ও সবুজ হীরা।
খনি থেকে হীরা উত্তোলন প্রক্রিয়াও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ভূগর্ভে সৃষ্ট হীরা যে পদ্ধতিতে ভুপৃষ্ঠের কাছাকাছি চলে আসে সেটিকে কিম্বারলাইট পাইপ হিসেবে অভিহীত করা হয়। এই পাইপের নিচে পৌছানোর জন্য বিস্ফোরণের মাধ্যমে পাথর গুড়িয়ে দেয়া হয়। এরপর শুরু হয় খনন যা পিট-মাইনিং নামে পরিচিত। শত শত মন পাথর ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয় কারখানায়। ক্রাশিং মেশিনে পাথরগুলো গুড়ো করে আলাদা করা হয় হীরা। এরপরই শুরু হয় পলিশিং ও কাটিং। আর মাটির অনেক নিচে যে হীরা পাওয়া যায় সেগুলো তুলে আনার প্রক্রিয়াটি আন্ডারগ্রাউন্ড মাইনিং নামে পরিচিত। সমুদ্রের তলদেশে থেকেও হীরা উত্তোলন করা হয়।
কোহিনুর হীরা
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হীরার খনিটির নাম আইখান। রাশিয়া পূর্বাঞ্চলীয় ইয়াকুতিয়া অঞ্চলের এই খনিটিতে প্রায় ৩৫ বছর পিট মাইনিং চালানোর পর ২০০৫ সাল থেকে শুরু হয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ড মাইনিং। প্রতি বছর গড়ে ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন ক্যারেট হীরা উত্তোলন করা হয় এই খনি থেকে। রাশিয়ায় আরো কয়েকটি বড় হীরার খনি রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকাসহ আফ্রিকা মহাদেশের বেশ কয়েকটি দেশে হীরার খনি রয়েছে।
মুকুট বা অলঙ্কারে ব্যবহৃত হীরা যতটা চকচকে দেখায়, এগুলো শুরুতে সেভাবে থাকে না। খনি থেকে উত্তোলনের পর এটিকে অনেকগুলো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই চকচকে রূপ দেয়া হয়। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো পলিশিং ও কাটিং। যেহেতু খনিতে পাওয়া প্রতিটি হীরার আকার-আকৃতি ভিন্ন, তাই হীরার পলিশিং কোনো অটোমেটিক মেশিনে করা সম্ভব নয়। এজন্য কোম্পানিগুলোকে নির্ভর করতে হয় দক্ষ কারিগরদের উপর। যারা হাতের সুনিপুন দক্ষতায় প্রতিটি হীরাকে করে তোলেন আকর্ষণীয়। এই কারিকরদের বলা হয় জেম-কাটার। হীরার কাটিং ও পলিশিং অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও সময়স্বাপেক্ষ হওয়ারকারণে জেমকাটারদের মজুরিও তুলনামূলক বেশি।

অলঙ্কার হিসেবে হীরার ব্যবহার বৃদ্ধির পেছনে ভুমিকা রয়েছে আর্নেস্ট ওপেনহাইমার নামে এক জার্মান নাগরিকের। ১৯৪০ এর দশকে তিনি মানুষের মাঝে হীরার ব্যাপারে আগ্রহ সৃষ্টির জন্য ক্যাম্পেইন শুরু করেন। এর জন্য শুরুতে বিয়ের পাত্র-পাত্রীদের টার্গেট করা হয়। বিভিন্ন কৌশলে বাগদান অনুষ্ঠানে ডায়মন্ডের আংটির প্রচলন ছড়িয়ে দেয়া হয়। এজন্য অনেকগুলো আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন নির্মাণ করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৫০ এর দশকে আরেক বিখ্যাত কোম্পানি ডি বিয়ারস হলিউড তারকাদের হীরার গহনা পরতে উদ্বুদ্ধ করে। আর তাদের ব্যবহৃত গহনাগুলো নিয়ে চালানো হয় ব্যাপক প্রচারণা। এরপর ভক্তরা শুরু করে প্রিয় তারকাদের অনুসরণ। এভাইে ছড়িয়ে পড়ে হীরার গহনার প্রচলন।
হীরার দাম
শুরুর দিকে হীরার মার্কেটে ডি বিয়ার’স কোম্পানি মনোপলি ব্যবসায় চালালেও বর্তমানে জাতিসঙ্ঘের হস্তক্ষেপ রয়েছে এই ব্যবসার ওপর। যে কারণে হীরার বাজারে অনেকগুলো কোম্পানি কাজ করছে এবং ভারসাম্যপূর্ণ বাজার রয়েছে। বর্তমানে হীরার বাজারে বিখ্যাত একটি ব্র্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের টিফানি এন্ড কোং। এছাড়া আছে হ্যারি উইনস্টন, কার্টিয়ের, চোপার্ড প্রভৃতি। বিশ্বে প্রতি বছর গড়ে ১৫ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের হীরা বেচাকেনা হয়।
একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি কোনো সময়ে দক্ষিণ ভারতে ১৮৬ ক্যারেটের বিশ্ববিখ্যাত কোহিনূর হীরার সন্ধান মিলেছিল। যদিও পরবর্তীতে এটির ওজন কমে গেছে অদক্ষ কারিগরদের হাতে পড়ে। ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে মুঘল, ইরানি, আফগানসহ অনেক শাসক গোষ্ঠির হাত ঘুরে কোহিনুর চলে গেছে ব্রিটিশদের কাছে।
যেটি আছে টাওয়ার অব লন্ডনে। কহিনুরের সাথে দরিয়া-ই নুর নামের আরেকটি অত্যন্তদামী হিরা পাওয়া গিয়েছিলো ভারতবর্ষে। ব্রিটিশরা নিজেদের কাছে রেখে দিলেও কোহিনুর মূলত ভারতীয় উপমহাদেশেরই সম্পদ।
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন : আহমেদ স্টোর


