ভারত আফগানিস্তান ক্রিকেট

ভারত আফগানিস্তান সম্পর্ক যুগে যুগে

ইতিহাসবিদরা বলেন, ভারত আফগানিস্তান সম্পর্ক বহু প্রাচীনকাল থেকেই। আধুনিক যুগে যা কখনো আন্তরিকতার, আবার কখনো শত্রুতার। নয়া দিল্লি সব সময়ই চেয়েছে নিজেদের স্বার্থে কাবুলের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে। যে কারণে তারা দেশটিতে সোভিয়েত আগ্রসনকেও সমর্থন জানিয়েছিলো। আফগানিস্তানের দিক থেকে ভারতের প্রতি যে টান বা দূরত্ব সেটি নির্ভর করেছে শাসকদের নীতির ওপর। কেউ ভারতকে আলিঙ্গন করেছেন আবার কেউ বৈরীতা উপহার দিয়েছেন। দেশ দুটির সম্পর্কের নানান ইতিহাস ও কার্যকারণ নিয়ে এই লেখা

ভারত আফগানিস্তান সীমান্ত

সরাসরি কোন সীমান্ত সংযোগ না থাকলেও ভারত ও আফগানিস্তান পরস্পরের প্রতিবেশি রাষ্ট্র। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ক্রসরোডে অবস্থিত আফগানিস্তান। অন্যদিকে ভারতের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার প্রাণকেন্দ্রে। দেশ দুটির মাঝখানে অবস্থান পাকিস্তানের। অবশ্য একটা সময় ভারত-আফগানিস্তানের মধ্যে কয়েকশো কিলোমিটারের সীমান্ত সংযোগ ছিলো। সেটি ব্রিটিশ শাসনের যুগে।

যখন বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান মিলে ব্রিটিশ শাসিত ভারতীয় উপমহাদেশ ছিলো একটি রাষ্ট্র। ১৮৯৩ সালে ডুরান্ড লাইন চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশ ভারতের সাথে আফগানিস্তানের সীমান্ত আলাদা হয়। পরবর্তীতে সীমান্তের ভারতীয় অংশটি পড়ে পাকিস্তানের মধ্যে। ওই চুক্তির মাধ্যমে যে সীমান্ত ভাগ হয়েছিল, সেটিই আজকের পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত।

সরাসরি সীমান্ত না থাকলেও ভারত ও আফগানিস্তানের মাঝে সম্পর্ক কয়েক শতাব্দীর পুরনো। ইতিহাসের নানা অধ্যায়ে এই সম্পর্ক নানান পথে গড়িয়েছে। কখনো সু-সম্পর্ক কখনো বা প্রচণ্ড বৈরীতা। যা আজো শেষ হয়নি। ইতিহাসবিদদের মতে, ব্রোঞ্জ যুগে ইন্দাস উপত্যকায় সভ্যতার সূত্রপাতের পর থেকেই ভারত ও আফগানিস্তানের মাঝে সম্পর্ক। আফগানিস্তানে ইসলামের আগমনের আগে অঞ্চলটিতে হিন্দু ও বৌদ্ধদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিলো।

ভারত-আফগান সম্পর্কের ইতিহাস

মধ্যযুগে গজনবী, মুঘলসহ আফগানিস্তানের অনেক শাসক গোষ্ঠি ভারতে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। আবার আবদুল গফুর খানসহ একাধিক আফগান নেতা ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন। এছাড়া পশতুন জাতিগোষ্ঠির লোকরাও এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছিল।

১৯১৫ সালে ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে প্রথম প্রবাসী সরকার গঠিত হয়েছিল কাবুলে। মাওলানা বরকতুল্লাহ ও মাহেন্দ্র প্রতাপের নেতৃত্বে সেই সরকারের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন আফগানিস্তানের ততকালীন আমির।
১৯৪৭ সালে পৃথক ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পর আফগানিস্তানের সাথে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আনুষ্ঠাানিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রক্রিয়া জোরালো করে ভারত। আফগান রাজা জহির শাহের সময়ে মূলত আন্তরিকতার সূত্রপাত। ১৯৫০ সালে তারা কাবুলের সাথে ৫ বছর মেয়াদি একটি বাণিজ্য চুক্তিও করে।

ওই সময়ে পাকিস্তান-আফগান সীমান্তের দুই পাশে ভাগ হয়ে পড়া পশতুনদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদদ দিতে শুরু করে আফগানিস্তান। তখন আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নপন্থী শাসক দাউদ খান। দাউদ খানের সময়ে ভারতের সাথেও সুসম্পর্ক হয় আফগানিস্তানের। ১৯৭৮ সালে দাউদ খানের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পর কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে যে ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক ঘোষণা করা হয়েছিল, দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে তাতে সমর্থন দিয়েছিলো ভারত।

এছাড়া দেশটিতে সোভিয়েত সেনাদের উপস্থিতির সমর্থকও ছিলো ভারত। ওই সময় আফগানিস্তানের প্রচুর ত্রাণ সহায়তাও দিয়েছে নয়া দিল্লি।

তালেবান যুগে ভারত আফগাানিস্তান সম্পর্ক

সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলে থাকার সময় আফগানিস্তানের সাথে ভারতের সম্পর্ক ক্রমশই মজবুত হয়েছে। ইরানের চাবাহার বন্দর হয়ে আফগানিস্তানের সাথে পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থাও করেছে ভারত। দুই দেশের আমদানি রফতানি দ্রুত বাড়তে থাকে এ সময়ে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের পরাজয়ের পরও ভারত দেশটির বিভিন্ন পক্ষের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে চেষ্টা করেছে;

কিন্তু তালেবানের উত্থানের পর তাদের জন্য সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে মাদরাসার ছাত্রদের নিয়ে গঠিত সশস্ত্র সংগঠন তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসে ১৯৯৬ সালে। আর এর ফলে ভারত আফগানিস্তানের সাথে বন্ধুত্ব হারাতে শুরু করে।

ভারত কখনোই তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। শুরু থেকেই তিক্ততার পর বিভিন্ন ইস্যুতে নয়া দিল্লির সাথে কাবুলের সম্পর্ক ক্রমশই খারাপ হয়েছে। ১৯৯৯ সালে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে আফগানিস্তানের কান্দহারে নিয়ে যায় অস্ত্রধারীরা।

ভারত এই ঘটনায় সমর্থনের জন্য তালেবানকে দায়ী করে। দেশটিতে তালেবানবিরোধী রাজনৈতিক দল নর্দার্ন এলায়েন্সের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক ছিলো ভারত। নয়া দিল্লির অভিযোগ, ভারতের অভ্যান্তরে সন্ত্রাসী ততপরতা চালানো সশস্ত্র গোষ্ঠিগুলো আফগানিস্তানে আশ্রয় পাচ্ছে।

সাংস্কৃতিক সম্পর্ক

রাজনৈতিক অঙ্গনের ঘটনাপ্রবাহের বাইরে ভৌগলিক কারণে দুই দেশের জনগনের মাঝেও একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। উভয় দেশ একে অন্যের সংস্কৃতি ও জীবনাচরণে আকৃষ্ট হয়েছে। ভারতীয় সিনেমা যেমন আফগানদের মন জয় করেছে, আফগান কবিদের কবিতাও কদর পেয়েছে ভারতে। এছাড়া সঙ্গীত, খাদ্যাভাসসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেট দুই দেশের জনগনের মাঝে সম্পর্ক মজবুত করতে জোরালো ভুমিকা রেখেছে তাতেও কোন সন্দেহ নেই। তবে এসব ছাড়িয়ে বারবারই আলোচনায় এসেছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক। যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে জাতীয় স্বার্থ আর প্রভাব-প্রতিপত্তির কথা মাথায় রেখে।

এই খেলায় দেশ দুটি কখনো শত্রু-কখনো বন্ধু হয়েছে। আর এসবের বেশির ভাগই নির্ভর করেছে আফগানিস্তানের শাসনক্ষমতায় কারা থাকছে তার ওপর। কাবুলের কোন সরকার যেমন ভারতকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছে, আবার কারো সাথে ছিলো নয়া দিল্লির প্রচণ্ড শত্রুতা।

আফগানিস্তানের সাথে ভারতের সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টি ছিলো কৌশলগতভাবে নয়া দিল্লির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রধান কারণ ছিলো, আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানের ওপর নজর রাখা সহজ। যে কারণে পাকিস্তানের প্রতিবেশী রাষ্ট্রটিতে নিজেদের প্রভাব জোরদার করতে নয়া দিল্লি বরাবরই চেষ্টা করেছে। এজন্য সেই সোভিয়েত আগ্রাসনের আগে থেকেই তারা দেশটির সোভিয়েত পন্থীদের সাথে সুসম্পর্ক রেখেছে।

অন্যান্য বিভিন্ন গোষ্ঠি ও সরকারের সাথেও ছিলো তাদের ভালো সম্পর্ক। আফগানিস্তান থেকেই পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদে ভারত মদদ দিয়েছে বলেও বিভিন্ন সময় অভিযোগ তুলেছে পাকিস্তান। আফগানিস্তান নিয়ে ভারত-পাকিস্তান একটি অঘোষিত লড়াইও চলছে বহুদিন ধরে।

কাবুল-দিল্লী বন্ধুত্ব

আফগানিস্তানের শাসকরাও তাদের বিভিন্ন স্বার্থে ভারতকে কাছে টানতে চেয়েছেন। বিশেষ করে পশতুন বিচ্ছিন্নতাবাদী ততপরতা নিয়ে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক খারাপ হওয়ায় ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ এই নীতি দেশ দুটিকে কাছাকাছি এনেছে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, পাকিস্তানের ওপর নজরদারি কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদে মদদের চেয়েও ভারতের জন্য আফগানিস্তানে প্রভাব বজায় রাখা ছিলো তার আঞ্চলিক নেতা হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে জরুরি।

আফগানিস্তান বরাবরই গ্রেট গেমের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। পারস্যের সাথে মুঘলদের, ব্রিটিশদের সাথে রাশিয়ার এবং সর্বশেষ ভারতের সাথে পাকিস্তানের ঠাণ্ডা লড়াই চলেছে দেশটিতে। এই লড়াইয়ে জেতার জন্য ভারত বরাবরই কাবুলকে কব্জায় রাখতে চেয়েছে। আফগানিস্তান হয়ে মধ্য এশিয়ায় ভারতের বাণিজ্য প্রসারের পরিকল্পনাও ছিলো এসবের অংশ।

আরো পড়ুন : 

গান্ধী পরিবারের দাপট কমছে কেন

কিন্তু তালেবান ক্ষমতায় আসার পর ভারতের এই পরিকল্পনা বড় ধরনের ধাক্কা খায় ১৯৯৬ সালে। কট্টরপন্থী এই গ্রুপটিকে মেনে নিতে পারেনি ভারত। তালেবানও নয়া দিল্লিকে বাদ দিয়েই তার নীতি সাজিয়েছিলো। ২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে তালেবান ক্ষমতাচ্যুত হলে ভারত স্বস্তির নিঃশ^াস ফেলে। তারা এতটাই খুশি হয়েছিল যে, তালেবান পরবর্তী মার্কিন সমর্থন পুষ্ট সরকারকে সহযোগিতা করতে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে এসেছে ভারত।

নাইন ইলেভেন পরবর্তী যুগে

গত দুই দশকে আফগানিস্তানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে তারা।অবকাঠামো নির্মাণ, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ, শিক্ষা, বেসরকারি বিনিয়োগসহ সব সেক্টরেই ভারত বিনিয়োগ করেছে দেশটিতে। ২০১৭ সালে ভারত প্রথম বারের মতো যৌথ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রদর্শনীর আয়োজন করে আফগানিস্তানের সাথে। যার ফলে দুই দেশের বেসরকারি সেক্টরে অন্তত ২০০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি সম্পাদিত হয়।

নয়া দিল্লি ও কাবুলের মাঝে সরাসরি বিমানে পণ্য পরিবহন চালু হয়। এছাড়া ইরানের চাবাহার বন্দর হয়ে আফগানিস্তানের সাথে পণ্য পরিবহনেও নতুন যুগের সূচনা করে ভারত। যার মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য ছিলো মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে পৌছানো। আফগানিস্তানের পার্লামেন্ট ভবনটিও নির্মাণ করা হয়েছে ভারতীয় অর্থে। এছাড়া ভারত আফগানিস্তান মৈত্রি বাধ, ডেভলপমেন্ট পার্টনারশীপ প্রোগ্রাম, আফগান শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশি প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছিল ভারত।

মোট কথা আফগানিস্তানে ভারত মাঠে নেমেছিলো বিরাট এক মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে। ধারণা করা হয়, দেশটির উত্তোলনের অপেক্ষায় থাকা ১ ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ আহরনেও ভারত জড়িত হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিলো। কারণ বিদেশী সহযোগিতা ছাড়া এসব মূল্যবান সম্পদ মাটির নিচ থেকে তুলে আনা সম্ভব ছিলো না আফগান সরকারের জন্য।

আবার বৈরীতা

কিন্তু ২০২১ সালের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়ার পর ভারতের এই মাস্টারপ্ল্যান মাাঠে মারা যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। বাইডেেেনর ঘোষণার পরই দিশেহারা হয়ে পড়ে ভারত। এবং দেশটিতে দ্রুত আবারো তালেবান ক্ষমতায় আসার কারণে সেই আশঙ্কাই সত্যি হতে চলেছে। ভারত কখনোই মন থেকে তালেবানকে মেনে নিতে পারেনি; অবশ্য এবারে তালেবানের কাবুল দখলের পর তাদের সামনে আর কোন উপায়ও নেই।

দেশটিতে কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে নয়া দিল্লি তাই পড়েছে মহাবিপাকে। অর্থনৈতিক কারণ ছাড়াও আফগানিস্তানের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও ভারতকে ভাবতে বাধ্য করেছে। যে কারণে দোহায় ভারতীয় প্রতিনিধি দল তালেবানের সাথে বৈঠক করেছে বলেও খবর বেড়িয়েছে।

তালেবান এবার ক্ষমতায় টিকে গেলে দুই পক্ষের সম্পর্ক হয়তো কিছুটা জোড়া লাগবে। নিজেদের বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় স্বার্থে নয়া দিল্লি নমনীয় হলে খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা তৈরি না হলেও অন্তত কিছুটা ভদ্রস্ত হতে পারে সম্পর্ক। ইতোমধ্যেই ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন তালেবানের সাথে যোগাযোগের। তবে কট্টর হিন্দুত্ববাদী ভারতের সাথে তালেবানের সম্পর্ক আর যাই হোক মধুর হবে না তা বলেই দেয়া যায়।

২২-০৮-২০২১

আমাদের ফেসবুক পেজটিতে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন : আহমেদ স্টোর

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top