ক্ষেপণাস্ত্র বা মিসাইল কী
মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধের অন্যতম একটি উপকরণ। নিজের ভূখণ্ডে বসেই শত্রুর ওপর আঘাত হানার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো মিসাইল। মিসাইল বলতে বোঝায় গাইডেড রকেট অর্থাৎ যে রকেট যান্ত্রিক পদ্ধতিতে টার্গেট চিহ্নিত করে তার উদ্দেশ্যে ছুটে যেতে পারে। এতে থাকবে জেট ইঞ্জিন অথবা রকেট মোটর। যেটি গোলাবারুদকে ছুটিয়ে নিয়ে যাবে দ্রত গতিতে। একটি মিসাইলে সাধারণত চারটি অংশ থাকে- টার্গেটিং বা গাইডেড সিস্টেম, ফ্লাইট সিস্টেম অর্থাৎ যার মাধ্যমে সেটি উড়ে যাবে, আর থাকে শক্তি উৎপাদনের জন্য ইঞ্জিন এবং সর্বশেষ ওয়ারহেড বা বিস্ফোরক।
মিসাইল কে আবিষ্কার করেন
এই সমরাস্ত্র কে আবিষ্কার করেন এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া কঠিন। তবে এটি জার্মানির নাৎসী বাহিনীর আবিষ্কার বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ হিটলারের জার্মানির হাত ধরেই বিশ্ব প্রথম দেখে এই অস্ত্র, যা দিয়ে নিজের জায়গা থেকেই শত্রুর ওপর হামলা চালানো যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি প্রথম মিসাইলের ব্যবহার করে লন্ডনে হামলা চালায় । তারা একাধিক ধরণের মিসাইল ব্যবহার করে। ওই যুগেই জার্মানি গাইডেড মিসাইলও ব্যবহার করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি প্রথম গাইডেড মিসাইলব্যবহার করেছিল। হিটলারের নাৎসি বাহিনী ভি-ওয়ান নামের একটি ক্রুজ মিসাইল ও ভি-টু নামের একটি ব্যালেস্টিক মিসাইল হামলা চালায় লন্ডনে। এরপর ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে মিত্র শক্তির এলাকায় হামলা অব্যাহত রাখে জার্মানি। যুুদ্ধ শেষে জার্মানির এই প্রযুক্তি হাতে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের। অনেক বিজ্ঞানীও আটক হয়। তাদের সহায়তায় তারা শুরু করে মিসাইল তৈরির কাজ। এক পর্যায়ে তারা এটিকে আরো উন্নত করে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক মিসাইল উৎপাদনেও সফল হয়।
মিসাইল কত প্রকার
জার্মানদের উদ্ভাবিত এই অস্ত্রটির রয়েছে প্রধানত দুটি প্রকারভেদ। ব্যালেস্টিক মিসাইল ও ক্রুজ মিসাইল। কোনটির কী বৈশিষ্ট, কার কেমন ধ্বংস ক্ষমতা- তা নিয়ে এই লেখায় নিচের দিকে আরো আলোচনা করা হয়েছে। ব্যালেস্টিক মিসাইল ও ক্রুজ মিসাইলের কাজ করার পদ্ধতি আলাদা আলাদা।
আবার ব্যালেস্টিক ও ক্রুজ মিসাইলের মধ্যে আছে বিভিন্ন প্রকারভেদ। গতির ওপর ভিত্তি করে ক্রুজ মিসাইল বিভিন্ন ধরনের হতে পারে যেমন- সাবসনিক, সুপারসনিক ও হাইপারসনিক ক্রুজ মিসাইল । শব্দের চেয়ে ৫ গুণ গতিতে ছুটতে পারে হাইপারসনিক ক্রুজ মিসাইল। রাশিয়ার জিরকন, ভারতের ব্রাহ্মস হাইপারসনিক ক্রুজ মিসাইল। সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল ছুটতে পারে শব্দের চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ গতিতে। চীনের সি-ওয়ান জিরো ওয়ান সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল।
‘এখন পর্যন্ত ১৫টি দেশ ব্যালেস্টিক মিসাইল
তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।’
আর সাবসনিক ক্রুজ মিসাইল বলা হয় যেগুলো শব্দের চেয়ে কিছুটা কম গতিতে ছোটে। পাকিস্তানের বাবর, ইরানের রাদ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের টোমাহক সাবসনিক ক্রুজ মিসাইল।
এই প্রতিবেদনের ভিডিও দেখুন
ব্যালেস্টিকে মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যেও আছে বেশ কিছু প্রকারভেদ। রেঞ্জের ওপর ভিত্তি করে ব্যালেস্টিক মিসাইল চার ধরনের হয়ে থাকে। স্মল রেঞ্জ ব্যালেস্টিক মিসাইল বা এসআরবিএম যার রেঞ্জ ৩০০ থেকে ১ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত। এরপর মিডিয়াম রেঞ্জ ব্যালেস্টিক মিসাইলের পাল্লা ১ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার কিলোমিটার। ইন্টার মিডিয়াম রেঞ্জ ব্যালেস্টিক মিসাইলের পাল্লা হয় সাড়ে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত।
আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র
আর সবচেয়ে দূরপাল্লার ব্যালেস্টিক মিসাইলকে বলা হয়, আইসিবিএম বা ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল। বাংলায় যেটিকে বলা হয় আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এর পাল্লা হয় সাড়ে ৫ হাজার কিলোমিটারের বেশি।
এর সর্বোচ্চ পাল্লার কোন সীমারেখা নেই। নিজেদের প্রয়োজন ও সামর্থ অনুযায়ী এর পাল্লা তৈরি করে নির্মাতারা। মূলত বিশ্বের যে কোন প্রান্তে আঘাত হানার লক্ষ্যেই আইসিবিএম তৈরি করা হয়। শত্রুর অবস্থান যত দূরেই হোক, সেখানে পারমাণবিক বোমা ফেলতে এই মিসাইল সবচেয়ে মোক্ষম হাতিয়ার। যে কারণে উত্তর কোরিয়াও যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে আঘাত হানার হুমকি দিতে পারে।
উদাহরণ স্বরূপ রাশিয়ার আরএস-টুয়েন্টি এইট সরমাট আইসিবিএম ২৫ হাজার কিলোমিটার দূরে আঘাত হানতে পারে। এই মিসাইলটি ২৪টি পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করতে পারে। এর প্রতিটি ওয়ারহেড কয়েকশো কিলোমিটার জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে আছড়ে পড়তে পারে ভূমিতে। ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক মিসাইল তৈরি করে।
ক্রুজ মিসাইল কী
ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে ক্রুজ এর আচরণ, ধ্বংস ক্ষমতা ও পাল্লাগত পার্থক্য রয়েছে। ক্রুজ শব্দের অর্থই হচ্ছে ‘যাত্রা’ বা এই জাতীয় কিছু। যে ক্ষেপণাস্ত্র ইঞ্জিনের শক্তিতে স্বংয়ক্রিয়ভাবে ছুটে চলে। এটিকে অনেকে মনুষ্যবিহীন এয়ারক্রাফট বা ড্রোনের সাথেও তুলনা করেন। এতে ব্যবহৃত হয় জেট ইঞ্জিন।
এই মিসাইলে আগে থেকে টার্গেট ঠিক করে দেয়া হয় এবং নিজে থেকে সেই টার্গেট খুঁজে আঘাত হানে। এই মিসাইলে সাধারণত একটি গাইডেন্স সিস্টেম থাকে যেটি তাকে টার্গেট খুঁজে পেতে সহায়তা করে। স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রিত জিপিএস গাইডেন্স সিস্টেমের মাধ্যমে কাজ করে ক্রুজ মিসাইল। যে কারণে এটি ছোট টার্গেটেও আঘাত হানতে পারে নির্ভুলভাবে। আর এটি ছুটে চলে অনেকটা বিমান যে পদ্ধতিতে চলে সেভাবে। গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের জন্য এর ছোট দুটি পাখাও থাকে।
বিভিন্ন জায়গা থেকে ক্রুজ ছোড়া যায়। সাগরে জাহাজ কিংবা সাবমেরিন থেকে, আকাশে যুদ্ধ বিমান থেকে এবং ভুমি থেকে। স্থলভাগে চলন্ত টার্গেটের ওপর ক্রুজ মিসাইল ছোড়া হয় ভূমি থেকে। এগুলোকে বলা হয় ল্যান্ড অ্যাটাক ক্রুজ মিসাইল বা এলএসিএম।
অনেক কম উচ্চতা দিয়ে ছুটে চলে ক্রুজ মিসাইল। প্রতিপক্ষের রাডারকে ফাঁকি দেয়ার জন্য এটি সারফেসের খুব কাছ দিয়ে উড়ে চলে। ক্রুজ মিসাইল অনেক বেশি ওজন বহন করতে পারে। এতে সাধারণত প্রচলিত সাধারণ বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়। অবশ্য কয়েকটি দেশ পারমাণবিক ওয়ারহেড যুক্ত ক্রুজ মিসাইলও তৈরি করেছে। তবে বর্তমানে বিভিন্ন যুদ্ধে ক্রুজ প্রচুর ব্যবহার হলেও পারমাণবিক ওয়ারহেড যুক্ত ক্রুজ ব্যবহারের নজির নেই।
খুব সংক্ষেপে বলা যায় – ক্রুজ-মিসাইল টার্গেটের দিকে উড়ে যায় আর ব্যালিস্টিক মিসাইল আকাশ থেকে টার্গেটের ওপর আছড়ে পড়ে। আচরণ গত দিক সম্পর্কে এভাবে বলা যায় যে, ক্রুজ হচ্ছে একটি প্রশিক্ষিত ইগল যে শিকার খুঁজে নেয় আর ব্যালেস্টিক মিসাইল হচ্ছে অনেক দূরের টার্গেট লক্ষ্য করে ছোড়া তীর, যেটি ধনুকের শক্তিতে ছুটবে, নিজের কোন বুদ্ধিমত্তা নেই। তবে এর ধ্বংস ক্ষমতা অনেক বেশি।
ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কী
ব্যালেস্টিক মিসাইলে জিপিএস গাইডেন্স সিস্টেম না থাকায় এটি নির্ভূলভাবে টার্গেটে আঘাত হানতে পারে না। যে কারণে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয় বড় কোন জায়গা লক্ষ্য করে। যেমন কোন শহর, বা সামরিক ঘাঁটি এমন কিছু।
যাতে টার্গেটের আশপাশে আঘাত হানলেও ধ্বংস করতে পারে কাঙ্ক্ষিত বস্তু। এই মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্রকে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অস্ত্র মনে করা হয়।
অনেক দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য তৈরি হয় ব্যালেস্টিক মিসাইল। ক্রুজ মিসাইলের মতো ব্যালেস্টিক নিজস্ব বুদ্ধিমত্তায় চলে না। ব্যালেস্টিক ছোড়া হয় একটি প্রোজেক্টাইল থেকে। এই প্রজেক্টাইলটি ভূমিতে বা কোন সামরিক যানের ওপর স্থাপিত হতে পারে।
সাগরে সাবমেরিন থেকেও ব্যালেস্টিক মিসাইল ছোড়ার ব্যবস্থা আছে কয়েকটি দেশের। কামান যেভাবে গুলি ছোড়ে অনেকটা সেভাবে প্রোজেক্টাইল থেকে ছোড়া হয় ব্যালেস্টিক মিসাইল।

এগুলো একই লঞ্চার থেকে এক সাথে অনেকগুলো ছোড়া যায় না। এবং এতে খুব বেশি গাইডেড পাওয়ার থাকে না।
ব্যালেস্টিক ছোড়া হয় সোজা উপরে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের একেবারে উপরিভাগে। বায়ুমণ্ডল ছাড়িয়ে এটি উঠে যায় মহাশূন্যে তারপর অন্যান্য অংশ থেকে ওয়ারহেডটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং মধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে অসম্ভব দ্রুত গতিতে নেমে আসে ভূমিতে। এই ওয়ারহেডই হচ্ছে মিসাইলের মূল অংশ, অর্থাৎ বিস্ফোরক।
একটি বল উপরে ছোড়ার পর সেটি আবার যেভাবে মাটিতে নেমে আসে, ব্যালেস্টিক ঠিক এই পদ্ধতি অনুসরণ করে বানানো হয়েছে। এটির শক্তি যোগায় একটি রকেট ইঞ্জিন। ব্যালেস্টিক মিসাইলকে কেউ কেউ বিস্ফোরক বোঝাই স্যাটেলাইটও বলে থাকেন। কারণ পৃথিবীর কক্ষপথের একেবারে নিচের অংশে গিয়ে এটি আবার পড়তে শুরু করে পৃথিবীতে।
মিসাইলের ক্ষমতা
প্রচলিত সাধারণ বিস্ফোরক ব্যবহারের কারণে ধ্বংস ক্ষমতার দিক ব্যালেস্টিক মিসাইলের চেয়ে ক্রুজ অনেক পিছিয়ে। এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের পক্ষে এটি চিহ্নিত ও প্রতিরোধ করা সহজ। তবে ক্রুজ মিসাইলের নির্মাণ খরচ কম, যে কোন জায়গা থেকে উৎক্ষেপণ করা যায় এবং এর রয়েছে বহুমুখী ব্যবহার।
শুরুর দিকে বেশির ভাগ ক্রুজ মিসাইলের পাল্লা তিনশো কিলোমিটারের নিচে হতো। তবে ক্রমশই সেই সীমাবন্ধতা ভেঙে ক্রুজ মিসাইলের পাল্লাও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়ার মতো দেশগুলো। এখন কোন কোন ক্রুজ মিসাইল কয়েক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে আঘাত হানতে পারে।
টার্গেটে আঘাত
ব্যালেস্টিক মিসাইল ক্রুজ মিসাইলের চেয়ে অনেক দূরের লক্ষ্য বস্তুতে আঘাত হানতে পারে। ৩০ থেকে ৩৫ মিনিটের মধ্যে ১০ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে এগুলো।
বিশেষ করে আকাশ থেকে নিচে পড়ার সময় এটি অসম্ভব দ্রুত গতি পায়। দ্রুত গতির কারণে এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের পক্ষে এটি প্রতিরোধ করা অনেকটা অসম্ভব।
কোন কোন ব্যালেস্টিক প্রতি সেকেণ্ডে ৫ হাজার মাইল পর্যন্ত ছুটতে পারে। যে কারণে এটিকে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্রগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ব্যালেস্টিক কম বিস্ফোরক বহন করতে পারে, তাই এতে থাকে পারমাণবিক ওয়ারহেড। যা পরিমাণে অল্প হলেও ধ্বংস ক্ষমতা অনেকগুণ বেশি।
অনেক ব্যালেস্টিক মিসাইলে এক সাথে অনেকগুলো ওয়ারহেডও থাকে, যা একই সাথে ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারে। তবে ব্যালেস্টিক মিসাইলে সাধারণ বিস্ফোরক কিংবা রাসায়নিক বা জীবানু অস্ত্রও ব্যবহার করা যায়।
ব্যালেস্টিক মিসাইলের নিজের কোন বুদ্ধিমত্তা নেই।
তবে এর ধ্বংস ক্ষমতা অনেক বেশি
এখন পর্যন্ত ১৫টি দেশ ব্যালেস্টিক মিসাইল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। দেশগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, ইসরাইল, মিসর, সিরিয়া, ইউক্রেন ও আর্জেন্টিনা।
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন : আহমেদ স্টোর


