ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ এর কারণ নিয়ে আলোচনার আগে জেনে নেই যুদ্ধ শুরুর ঘটনাটা। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের হামলা করে রুশ বাহিনী। ওই দিন বৃহস্পতিবার রাশিয়ার স্থানীয় সময় সকাল ছয়টায়, বাংলাদেশ সময় সকাল নয়টায় ভ্লাদিমির পুতিন এক টেলিভিশন ভাষণে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন। সংক্ষিপ্ত ভাষণে পুতিন বলেন, আমি সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
তিনি বলেন, ইউক্রেনের দিক থেকে হুমকির কারণে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ইউক্রেন দখল করার কোন উদ্দেশ্য আমাদের নেই। এ ঘটনায় সকল রক্তপাতের জন্য ইউক্রেনের সরকার দায়ী হবে বলেও তিনি দাবি করেন।
ভ্লাদিমির পুতিনের ঘোষণার পরই রুশ সৈন্য বহর ঢুকে পড়ে ইউক্রেনের মাটিতে। কয়েক মাস আগে থেকেই তাদের জড়ো করা হয়েছিলো রাশিয়ার ইউক্রেন সীমান্তবর্তী ঘাঁটিগুলোতে। এছাড়া বেলারুশ ও ক্রিমিয়া থেকেও রুশ সৈন্যদের ইউক্রেনে ঢোকার খবর পাওয়া গেছে। ফলে তিন দিক থেকে আক্রমণের শিকার হয় ইউক্রেন। পুতিনের ঘোষণায় তাদের ডোনবাস এলাকায় অভিযানের নির্দেশ দেয়া হলেও পুরো দেশেই শুরু হয় যুদ্ধ। রাজধানী কিয়েভেও ঘটতে থাকে একের পর এক বিস্ফোরণ।
এর দুই দিন আগে সোমবার ডোনবাস অঞ্চলের দুটো বিচ্ছিন্নতাবাদী ভূখ- লুহানস্ক ও ডোনেটস্ক’কে স্বীকৃতি দেয় রাশিয়া। মনে করা হচ্ছিল, এই দুটো ভূখণ্ডকে ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন করাই পুতিনের আপাতত টার্গেট। এরপর তারা সেখানে সেনাবাহিনীও পাঠিয়েছে। তবে পশ্চিমা দেশগুলো কয়েক মাস আগ থেকেই পুতিনের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে সতর্ক করে আসছিলো। শেষ পর্যন্ত ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে পুতিনের ঘোষণায় সেটাই স্পষ্ট হলো।
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ এর কারণ
রাশিয়া শুরু থেকেই বলেছে, ইউক্রেনের কাছ থেকে তাদের নিরপত্তা হুমকি তৈরি হয়েছে। যে কারণে তারা দেশটিতে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। পুতিন তার যুদ্ধ শুরুর ভাষণে বলেছেন, ইউক্রেনকে নাৎসী মুক্ত করতে দেশটিতে তারা বিশেষ সামরিক অভিযান চালাচ্ছে।
এরও বহু আগ থেকে রাশিয়া ইউক্রেনকে সতর্ক করে আসছিলো তাদের জন্য হুমকি হয়ে না উঠতে। রাশিয়া বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটকে রুশ ভূখ-ের কাছে ঘাঁটি গড়তে দেবে না। মানচিত্র খেয়াল করলে আমরা দেখতে পাবো যে, রাশিয়ার একেবারে সীমান্তের কাছাকাছি জায়গায় ন্যাটোকে সম্প্রসারিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ন্যাটো কী, সেটা কাদের নিয়ে গঠিত তা জানতে এই লেখাটিতে ক্লিক করুন।

পশ্চিমা দিকে রুশ সীমান্তের কাছে লিথুনিয়া, লাটভিয়া এস্তোনিয়া ন্যাটো জোটের সদস্য। উত্তর দিকে আছে নরওয়ে, দক্ষিণে আছে তুরস্ক। অর্থাৎ তিনদিক থেকে রাশিয়াকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে ন্যাটো বাহিনী। কিন্তু রাশিয়া সেটা সহ্য করবে না সেটাই স্বাভাবিক।
এরই মধ্যে ইউক্রেনেও মার্কিন প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। দেশটিতে গোপনে যুক্তরাষ্ট্র জৈবিক অস্ত্র মজুদ করছে বলেও অভিযোগ করছে মস্কো। ইউক্রেনে মার্কিন প্রভাব বৃদ্ধির ঘটনাটিই মূলত রাশিয়াকে এই যুদ্ধে নামিয়েছে। মস্কো বলছে, পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার চারপাশে উস্কানিমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে, আর পুতিন চান ইউক্রেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে যায় এমন কোন পদক্ষেপ নেবে না।
কারণ রাশিয়া কখনোই চাইবে না তার ঘরের কাছে ন্যাটো ঘাঁটি গড়ুক। আরো বেশি অস্ত্র মজুদ করুন। এক্ষেত্রে ১৯৬২ সালে কিউবার মিসাইল সঙ্কটের কথা মনে করা যায়। ওই বছর রাশিয়া কিউবায় মিসাইল মোতায়েন করেছিলে, যা যুক্তরাষ্ট্রের একেবারে নাকের ডগায়। যুক্তরাষ্ট্র এটি ঠেকাতে যুদ্ধে নামার প্রস্তুতি নিয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত দুই পরাশক্তি যুদ্ধের একেবারে দ্বারপ্রান্তে গিয়েও ফিরে আসতে পেরেছে।
আবার ২০১৫ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্র যখন দক্ষিণ কোরিয়ায় থাড মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম মোতায়েন করতে চায়, তখন চীনও একই রকমভাবে বাধা দিয়েছিলো। অর্থাৎ কোন দেশই চায় না তার সীমান্তের কাছে শত্রুপক্ষ এসে অস্ত্র মোতায়েন করুক।
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ আপডেট
তবে রাশিয়া যতটা সহজে ইউক্রেনকে কাবু করবে বলে আশা করেছিলো, তা শেষ পর্যন্ত হয়নি। রুশ কমান্ডাররা তাদের বাহিনীর সৈন্যদের যুদ্ধ শুরুর আগে বলেছে, আমার দুই দিনেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ দখল করবো। কিন্তু সেটা হয়নি। মাসখানেকের মধ্যে তারা বুঝতে পারে, কিয়েভ দখল করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত কিয়েভ থেকে রুশ বাহিনী সরে গিয়ে ডোনবাস অঞ্চলের দিকে মনযোগ দেয়।
ডোনবাস হচ্ছে পূর্ব ইউক্রেনের একটি এলাকা, যেখানে রুশ ভাষাভাষী মানুষের বসবাস। এই মানুষদের সাথে রাশিয়ার সাথে সংস্কৃতিগত মিল রয়েছে। এই অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী বা স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠি সক্রিয় রয়েছে। ইতোমধ্যেই ডোনবাস অঞ্চলের লুহানস্ক ও ডোনেটস্ক স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। এই ভূখ- দুটির যোদ্ধাদের সরাসরি সমর্থন ও সহযোগিতা দেয় রাশিয়া।
২০১৪ সাল থেকেই ডোনবাসের অনেক এলাকা রুশ সমর্থিত এসব বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। রাশিয়া অভিযান শুরু করার পর ডোনবাসের আরো অনেক এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে ইউক্রেনের প্রতিরোধ যুদ্ধ তাদের সুবিধা করতে দিচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সহযোগিতা নিয়ে ইউক্রেন প্রচ- লড়াই করছে। যার কারণে ১০ মাস হয়ে গেলেও রাশিয়া এখনো এই যুদ্ধে জিততে পারছে না।
তারা এখন ইউক্রেনের বিদ্যুৎ স্টেশনগুলো ধ্বংস করছে। যার ফলে শুধু সাধারণ মানুষের কষ্টই বাড়ছে। কিন্তু রাশিয়া এই যুদ্ধে কবে জিতবে তার কোন ঠিক নয়। তার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতিও সঙ্কটে পড়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, রাশিয়াকে হার মেনেই ইউক্রেন থেকে বিদায় নিতে হবে। যেমনটা তারা আফগানিস্তান থেকে বিদায় নিয়েছিলো।
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন : আহমেদ স্টোর


