মরক্কো টাকার মান কত

মরক্কো এবং তাদের বিশ্বকাপ সাফল্যের রহস্য

কাতার বিশ্বকাপে প্রত্যাশার চেয়ে অনেকগুণ ভালো ফুটবল খেলেছে আরব দেশগুলো। তবে সবাইকে চমকে দিয়েছে মরক্কো । বেলজিয়াম ও ক্রোয়েশিয়াকে টপকে দেশটি প্রথম রাউন্ড শেষ করেছে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। ফুটবল নিয়ে মরক্কোর দীর্ঘ পরিকল্পনা আর তার যথাযথ বাস্তবায়নই এই ফলাফলের নেপথ্যে। কারণ দেশটির আছেন একজন ফুটবল প্রেমী বাদশাহ, আর একদল দক্ষ সংগঠক। যা দেশের সীমা ছাড়িয়ে পুরো আরব বিশ্বের ফুটবলেই আনতে পারে নতুন বিপ্লব।
মরক্কোর ফুটবলের নতুন জাগরণ সম্পর্কে জানাবো। তার আগে চলুন জেনে নেই দেশটি সম্পর্কে কিছু তথ্য।

মরক্কো কোন মহাদেশে অবস্থিত

উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের দেশ মরক্কো। আটলান্টিক মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরের মোহনায় অবস্থিত দেশটির উত্তর দিকে জিব্রাল্টার প্রণালী পার হলেই ইউরোপের দেশ স্পেন। এই পথেই সাগর পাড়ি দিয়ে মুসলিম সেনাপতি তারেক বিন জিয়াদ ইউরোপে পৌছেছিলেন ইসলামের বাণী নিয়ে। পূর্ব ও দক্ষিণে দেশটির সীমান্ত আছে আলজেরিয়া ও মৌরিতানিয়ার সাথে। দক্ষিণ দিকে অবস্থিত বিতর্কীত ওয়েস্টার্ন সাহারা অঞ্চলটি। যা নিয়ে আলজেরিয়ার সাথে মরক্কোর বিরোধ বহু বছরের পুরনো। উত্তর আটলান্টিক উপকূলের বিশাল এক অঞ্চল এই ওয়েস্টার্ন সাহারা।

২ লাখ ৬৬ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের অঞ্চলটির ৮০ শতাংশ মরক্কোর দখলে, আর অবশিষ্ট ২০ শতাংশ রয়েছে পলিসারিও ফ্রন্ট নামের একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠির দখলে। গোষ্ঠিটিকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয় আলজেরিয়া।

Morocco
মরক্কো

মরক্কোর রাজধানী

এর বাইরে চমৎকার এক দেশ মরক্কো। দেশটির রাজধানীর নাম রাবাত। ৭ লাখ ১১ হাজার বর্গ কিলোমিটারের  অথনীতি প্রধানত বাণিজ্য, পর্যটন ও কৃষি নির্ভর। দেশটির আছে সমৃদ্ধ ইতিহাস আর নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সারা দেশে দর্শণীয় স্থানের অভাব নেই। আছে অনেকগুলো সমুদ্রসৈকত, দৃষ্টিনন্দন মসজিদসহ দেখার অনেক কিছু। পাহাড়, মরুভূমি কিংবা সবুজে ভরা বনভুমি- সবই আছে সেখানে।

উমাইয়া খেলাফতের সময় দেশটিতে ইসলামের আগমন হয়। মুসলিম শাসকরাই দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলকে ঐক্যবদ্ধ করে রাষ্ট্রগঠন করে। তাদের মাধ্যমেই দেশটিতে আসে উন্নতি আর আধুনিকতার ছোয়া।

মরক্কো ধর্ম

দেশটিতে জনসংখ্যা সাড়ে তিন কোটির কিছু বেশি। যাদের ৯৯ শতাংশই মুসলিম।

মরক্কোয় রয়েছে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। বর্তমান বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মাদ ১৯৯৯ সালে তার বাবার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন। প্রায় ৪০০ বছর ধরে এই পরিবার মরক্কো শাসন করছে। তবে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে কয়েক দশক দেশটির ওপর খরবদারিত্ব করেছে ফ্রান্স।

মরক্কোর ইতিহাস

ষাটের দশকের শুরু থেকে দেশটি বিদেশী প্রভাবমুক্ত হয়। আরব বসন্তের সময় বিক্ষোভের জের ধরে বেশ কিছু পরিবর্তন আসে মরক্কোর শাসন পদ্ধতিতে। রাজার ক্ষমতা কমিয়ে পার্লামেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর হাতে বেশ কিছু ক্ষমতা দেয়া হয়। তবে এখনো বাদশাহই দেশটিতে সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর।

বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মাদ ও তার পরিবারের শাসন পদ্ধতি নিয়ে জনগনের মাঝে কিছু ক্ষোভ থাকলেও দেশটির ফুটবল উন্নয়নে বাদশাহর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। এবারের বিশ^কাপে মরক্কো যে চমক দেখিয়েছে, তার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘমেয়াদির পরিকল্পনা। বাদশাহ নিজেই যাকে পৃষ্টপোষকতা দিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন শৃঙ্খলাবদ্ধ ও পেশাদার এক ফুটবল কাঠামো।

মরক্কো দলের ডাকনাম কী?

এবারের বিশ্ব কাপের ড্র অনুষ্ঠিত হওয়ার পর কেউ ভাবেনি মরক্কো দ্বিতীয় রাউন্ডে যাবে। করণ দলটির সাথে এফ গ্রুপে সঙ্গী হয়েছিলো ক্রোয়েশিয়া ও বেলজিয়াম। ক্রোয়েশিয়া গত আসরের রানার আপ। বেলজিয়াম গত আসরে হয়েছিলো তৃতীয়; কিন্তু অ্যাটলাস লায়ন্স আবার তার গর্জনে কাপিয়েছে বিশ^। ক্রোয়েশিয়াকে পেছনে ফেলে আর বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্মকে শূন্য হাতে বাড়ি পাঠিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মরক্কো। শুধু তাই নয়, এই দুটি দল মরক্কোর জালে কোন বলই পাঠাতে পারেনি।

Hakim Ziyech
হাকিম জিয়েচ

গত এক দশকে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আলোচিত টপিকগুলোর একটি ছিলো বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্ম। তাই এবারও তাদের ফেবারিট হিসেবে রেখেছিলেন ফুটবল বোদ্ধারা; কিন্তু আফ্রিকার হারিয়ে যেতে বসা অ্যাটলাস লায়ন যে আবার গর্জন করে উঠবে সেটি সম্ভবত কেউ ভাবতে পারেনি।

মরক্কো জাতীয় ফুটবল দল

১৯৮৬ সালে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে বিশ^কাপের নকআউট পর্বে উঠেছিলো মরক্কো। এরপর তারা যেন হারিয়েই যাচ্ছিল ক্রমশ। মরক্কোর এই ফিরে আসার গল্পটার শুরু কয়েক বছর আগে। ফুটবল নিয় মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশটিতে চালু হয় বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মাদ ফুটবল অ্যাকাডেমি। এই অ্যাকাডেমির নির্মাণ ব্যয় ছিলো ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

রাজধানী রাবাতের কাছে আড়াই বর্গকিলোমিটার জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা এই একাডেমিতে বিশ্বমানের বেশ কয়েকটি মাঠ, আবাসন ব্যবস্থা, ফিটনেস সেন্টার, চিকিৎসা কেন্দ্রসহ ফুটবলারদের জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছুই তৈরি করা হয়েছে। অ্যাকাডেমিতে খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের খোলামেলা পরিবেশে বসবাসের সুযোগ দিতে তৈরি করা হয়েছে একটি গ্রাম।

ইউরোপের ফুটবল অ্যাকাডেমিগুলোর মানের কথা মাথায় রেখে গড়া হয়েছে এই অ্যাকাডেমি। এখানেই শেষ হয়, এই একাডেমির ১২টি শাখা খোলা হয়েছে মরক্কোর ১২টি অঞ্চলে। শাখাগুলো আকারে ছোট হলেও সুযোগ সুবিধা বিশ্বমানের।

পরিকল্পিত ফুটবল উন্নয়ন

এই শাখাগুলোর মাধ্যমে সারা দেশ থেকে কিশোর প্রতিভা অন্বেষন করে পাঠানো হয় কেন্দ্রিয় একাডেমিতে। সেখানে তাদের লেখাপড়া আর ফুটবল শেখা চলে এক সাথে। নারী ও পুরুষ- দুই শাখাতে একাডেমির রয়েছ পৃথক কার্যক্রম।

ফিফার মহাসচিব ফাতমা সামুরা বলেছেন, এই অ্যাকাডেমিতে এলে মনেই হয় না আফ্রিকার কোন দেশে আছি। এই একাডেমি মরক্কোর জন্য একটি রতœ। তিনি আফ্রিকার অন্য দেশগুলোকে মরক্কোর মডেল অনুসরণের পরামর্শ দেন।

এ সবের পাশাপাশি মরক্কোর ঘরোয়া ফুটবলের মানও উন্নত করা হয়েছে। একাডেমি থেকে বের হওয়া ফুটবলাদের কিনে নেয় ক্লাবগুলো। সেখানে তাদের পারফরম্যান্স দেখে বাছাই করা হয় জাতীয় দলের জন্য। ফুটবলারদের দেশের বাইরের লিগে খেলার ব্যবস্থাও করে দেয়া হয় কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায়।

এই সব কাজ তদারকি করার জন্য কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবলের সেক্রেটারি জেনারেল মরক্কোর নাগরিক মউয়ান হাজিকে পদত্যাগ করিয়ে দেশে আনা হয়। এবং তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় ফুটবলার তৈরির।

এসবের সাথে সাথে আঞ্চলিক ও জাতীয় লিগগুলোতে ফুটবলারদের পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা হয়। আরব দেশগুলোর মধ্যে মরক্কোই প্রথম মহিলা ফুটবল লিগ চালু করে। এ সবের পাশাপাশি ফুটসাল ও বিচ ফুটবলের মতো বিষয়গুলোতেও নজর দেয়া হয়। মোট কথা পুরো ফুটবল কাঠামোটাই পাল্টে যায় মরক্কোর।

আসতে থাকে ফলাফল

এরপর দেশটি একের পর এক আফ্রিকান ফুটবলের আসর আয়োজন করতে থাকে। বিভিন্ন দেশ প্রীতি ম্যাচ খেলতে আসে সেখানে। মরক্কো তার অ্যাকাডেমিতে বিভিন্ন দলকে ফ্রি ক্যাম্প করার সুযোগ দেয়। এর ফলে প্রচুর ম্যাচ খেলার সুযোগ পায় দেশটির ফুটবলাররা। আফ্রিকার যেসব দেশের ফুটবল অবকাঠামে শক্ত নয়, তাদের হোম ভেন্যু হিসেবে নিজেদের স্টেডিয়ামগুলো ব্যবহারের সুযোগ দেয় মরক্কো।

পাশাপাশি গত কয়েক বছরে আফ্রিকা অঞ্চলের অনেকগুলো ফুটবল ইভেন্টের স্বাগতিক হয়েছে দেশটি। এবং এসেছে অনেকগুলো সাফল্য। ২০১৮ ও ২০২০ সালে পরপর দুই বার আফ্রিকান ন্যাশন্স চ্যম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছে অ্যাটলাস লায়ন্সরা।

অন্য টুর্নামেন্টগুলোতেও তাদের পারফরম্যান্স প্রশংসা কুড়িয়েছে। এমনও হয়েছে যে, আফ্রিকার ক্লাব ফুটবলের ফাইনালে ওঠা দুটো ক্লাবই ছিলো মরক্কোর। এ সবের ধারবাহিকতায় দলটি কাতার বিশ্ব কাপেও জায়গা করে নিয়েছে। আর কাতারে তারা কী করেছে তা তো সবারই জানা।

অভিবাসী ফুটবলার

ফিফা বিশ্বকাপে ভালো করার জন্য মরক্কো আরেকটি কৌশল কাজে লাগিয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসী ফুটবলারদের মরক্কোর হয়ে খেলতে আগ্রহী করেছে। এবারের বিশ্বকাপ দলের সবচেয়ে বড় তারকা হাকিম জিয়েচের জন্ম ও বেড়ে ওঠা নেদারল্যান্ডে অভিবাসী হওয়া একটি মরোক্কান পরিবারে। ডাচদের হয়ে বয়সভিত্তিক ফুটবলেও খেলেছেন হাকিম; কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পিতৃভূমি মরক্কোকেই বেছে নেন চেলসির এই উইঙ্গার।

স্পেনে জন্ম নেয়া ডিফেন্ডার আশরাফ হাকিমি বেড়ে উঠেছেন রিয়াল মাদ্রিদের অ্যাকাডেমিতে। এখন খেলছেন মেসি নেইমারের সাথে পিএসজিতে। অধিনায়ক রোমাইন সাইসও জন্ম নিয়েছেন ফ্রান্সে। ক্লাব ফুটবলও খেলছেন ইউরোপে। তারা সবাই এখন বিশ্বকাপে মরক্কোর জার্সিতে মাঠে নামছেন।

এই খেলোয়াড়দের সাথে স্থানীয়ভাবে বেড়ে ওঠা একদল প্রতিভাবান ফুটবলারের সমন্বয়েই মরক্কো এবার কাতারে পা রেখেছে। আগামী বছর অনুষ্ঠেয় ফিফা মহিলা বিশ্বকাপেও সুযোগ পেয়েছে তাদের মহিলা ফুটবল দল। যা দেশটির ফুটবল উত্থানের আভাসই দিচ্ছে। আগামী দিনে তাই মরক্কো বিশ্ব ফুটবলের বড় শক্তি হয়ে ওঠলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বরং এ সবই তাদের পরিকল্পনা, বিনিয়োগ আর পরিশ্রমের ফসল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top