বিরাট কোহলি ছবি

বিরাট কোহলি : ক্যারিয়ার ও পরিসংখ্যান

বর্তমানে বিশ্ব ক্রিকেটের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন বিরাট কোহলি। ভারতীয় দলের এই সাবেক অধিনায়ক রানের পর রান করে প্রতিনিয়ত নিজেকে নিয়ে যাচ্ছে নতুন উচ্চতায়। কোহলির জন্ম ০৫ নভেম্বর, ১৯৮৮ সালে ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে। ওয়েস্ট দিল্লি ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ক্রিকেট খেলা শিখেছেন। অল্প বয়সেই প্রতিভার জানান দেন। যার ফলে তার জায়গা হয় দিল্লি অনূর্ধ-১৫ দলে। ২০০৬ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ডেব্যু হয় কোহলির। তার নেতৃত্বেই ভারত অনূর্ধ-১৯ বিশ্বকাপ জয় করে (২০০৮ সালে)। ওই টুর্নামেন্টে দারুণ পারফরর্ম করেন কোহলি। এরপর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও দারুণ করতে থাকেন। যা তার জন্য জাতীয় দলের দরজা খুলে দেয়। এই লেখায় জানাবো বিরাট কোহলি মোট সেঞ্চুরি কয়টি এবং তার সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য-

২০০৮ সালে ভারতের জাতীয় দলে অভিষেক হয় বিরাট কোহলির। ওই বছর ১৮ আগস্ট ডাম্বুলায় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে পা রাখেন এই ডানহাতি টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান। ২০১০ সালে টি-টোয়েন্টি অভিষেক আর টেস্ট অভিষেক হয় ২০১১ সালের জুন মাসে কিংসটনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে।

তার নেতৃত্বেই ভারত টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরে ওঠে এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সিরিজ জয় করে। তবে শচীনের মতোই অধিনায়কত্ব বেশিদিন করা হয়নি কোহলির। এমএস ধোনীর পর তাকে নেতৃত্ব দেয়া হলেও সেটি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।

বাবার মৃত্যু ও কোহলির বদলে যাওয়া

কোহলির ক্রিকেটার হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভুমিকা ছিলো তার বাবার। বাবাই তাকে নিয়মিত প্র্যাকটিসে উৎসাহ দিতেন। ২০০৬ সালে রঞ্জি ট্রফিরর মাধ্যমে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হলেও সেই টুর্নামেন্টে প্রথম কয়েকটা ম্যাচ মোটেই ভালো করতে পারেননি। প্রথম তিন ম্যাচে ছিলো না কোন হাফ সেঞ্চুরি। সবাই জানতো তার প্রতিভা আছে। তাই চতুর্থ ম্যাচের আগে তাকে ভালোভাবে কাউন্সেলিং করেন কোচ চেতন চৌহান। উৎসাহ দেন নিজেকে মেলে ধরতে।

কিন্তু সেই ম্যাচের মাঝখানেই ঘটে এক মর্মান্তিক ঘটনা।

কর্নাটকের বিরুদ্ধে এক পর্যায়ে দিল্লির স্কোর ছিলো ৫ উইকেটে ১৩০ রান। দিনশেষে কোহলি তখন ৪০ রানে অপরাজিত। প্রথম হাফ সেঞ্চুরির স্বপ্ন তার চোখে। সেদিন রাত ৪টার কিছু আগে কোহলির বাবার মৃত্যু হয়। ভোর রাতেই হোটেল থেকে বাড়ি ফিরে যান কোহলি। তবে বাবার লাশ বাড়িতে রেখেই সকালে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ম্যাচ খেলতে চলে আসেন।

বিরাট কোহলি পিক
বাবার মৃত্যু বদলে দিয়েছে
বিরাট কোহলিকে

দিল্লির হয়ে ব্যাট করতে নেমে সেদিন তিনি জীবনের প্রথম হাফ সেঞ্চুরিই শুধু পাননি। ৯০ রানের ইনিংস খেলে দলকে বিপর্যয় এড়াতে সাহায্য করেন। আউট হওয়ার পর দ্রুত চলে যান বাবার শেষকৃত্যে যোগ দিতে। তার আগ পর্যন্ত বাড়ির কথা না ভেবে শুধুই দলের রানের চাকা চালু রেখেছেন।

তার এই দৃঢ় মানসিকতা সেদিন টের পায় ভারতীয় ক্রিকেট। ওইদিন কোহলির ইনিংসের কারণেই দল ফলোঅন এড়াতে পেরেছিল। কোহলির সেই শক্ত মানসিকতা এখনো দেখা যাচ্ছে ক্রিকেট মাঠে। যদিও মাঠের বাইরে তিনি অত্যন্ত বন্ধুসুলভ একজন মানুষ; কিন্তু মাঠে নামলেই হয়ে যান আগ্রাসী ক্রিকেটার।

বিরাট কোহলি মোট সেঞ্চুরি কয়টি

শচীন টেন্ডকারের বিদায়ের পর ভারতীয় ক্রিকেটে দ্রুতই তার বিকল্প হয়ে ওঠেন কোহলি। শুরু থেকেই একের পর এক ম্যাচে রান করে দলের নির্ভরযোগ্য তারকা হয়ে ওঠেন। শচীনের বিকল্প পেয়ে যায় ভারত। কোহলি তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারে প্রথম সেঞ্চুরিটি করেন ১৪ নম্বর ম্যাচে এসে। কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে।

এরপর একের পর এক ইনিংসে রান করতে থাকেন। ২০১০-১১ সালের পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার দাপট বাড়তেই থাকে। ওই সময় ভারতের টেস্ট দলেও জায়গা হয় কোহলি। ২০১১ ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়ী দলেও ছিলেন কোহলি। ২০১২ সালে তার ব্যাট থেকে আসে ৫টি ওয়ানডে সেঞ্চুরি। সে বছর এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ঢাকার মাঠে খেলেন ক্যারিয়ার সেরা ১৮৩ রানের ইনিংস।

বিরাট কোহলি ছবি
ম্যাচের ফাঁকে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের সাথে আড্ডারত বিরাট কোহলি

২০২৩ এশিয়া কাপের সুপার ফোরের ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৯৪ বলে অপরাজিত ১২২ রানের ইনিংস খেলেন কোহলি (১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৩)। আর ওয়ানডে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে ১২২ বলে ১০১ রান করে ক্যারিয়ারের ৪৯ তম সেঞ্চুরি করেন কোহলি। এদিন তিনি ওয়ানডে সেঞ্চুরিতে শচীনের (৪৯ সেঞ্চুরি) রেকর্ড স্পর্শ করেন।

একই সময়ে তার হাফ সেঞ্চুরির সংখ্যা ৭০টি। এর আগে এশিয়া কাপে তিনি ওয়ানডেতে ১৩ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। এই রান করতে কোহলি খেলেছেন ২৭৮ ম্যাচ (২৬৭ ইনিংস) ।

ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রান করা ব্যাটসম্যানদের তালিকায় তিনি আছে ৫ নম্বরে। তবে আগের চারজন সবাই অবসরে গিয়েছেন। তাই কোহলির সুযোগ আছে সবাইকে ছাড়িয়ে যাওয়ার। যদিও সবচেয়ে বেশি রান করা শচীন টেন্ডুলকার তার চেয়ে অনেক এগিয়ে (১৮ হাজার ৪২৬ রান)।

বিরাট কোহলি টেস্ট সেঞ্চুরি

কোহলির টেস্ট অভিষেক হয় ২০১১ সালের জুন মাসে কিংসটনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। টেস্টেও রানের ফুলঝুড়ি ছুটিয়েছেন তিনি। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত টেস্টে ১১১ ম্যাচে ১৮৭ ইনিংস ব্যাটিং করে রান করেছেন ৮ হাজার ৬৭৬। সেঞ্চুরির সংখ্যা ২৯টি, হাফ সেঞ্চুরিও ২৯টি। সর্বোচ্চ অপরাজিত ২৫৪ রানের ইনিংসটি তিনি খেলেন ২০১৯ সালে পুনেতে সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে।

আরো পড়ুন :

বাবর আজম : ক্যারিয়ার ও পরিসংখ্যান

টেস্টে প্রথম সেঞ্চুরিটি পেতে কোহলিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৫ ইনিংস পর্যন্ত। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে এডিলেডে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১১৬ রানের ইনিংস খেলেন সেদিন।

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতেও বিরাট কোহলির একটি সেঞ্চুরি আছে। হাফ সেঞ্চুরি ৩৭টি। এছাড়া আইপিএলসহ ঘরোয়া টি-টোয়েন্টিতে সেঞ্চুরির সংখ্যা ৮টি।

সব মিলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার সেঞ্চুরির সংখ্যা ৭৯টি।

 

বিরাট কোহলি রেকর্ড

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গত এক দশকের বেশি সময় অনেকগুলো রেকর্ডের মালিক হয়েছেন বিরাট কোহলি। ওয়ানডেতে দ্রুততম ১৩ হাজার রান করেছেন কোহলি। তার এ জন্য ম্যাচ খেলতে হয়েছে ২৬৭টি। তালিকার দুইয়ে থাকার শচীনের ১৩ হাজার ওয়ানডে রান করতে লেগেছে ৩২১ ম্যাচ। রিকি পন্টিংয়ের লেগেছে ৩৪১ ও কুমার সাঙ্গাকারার লেগেছে ৩৬৩ ম্যাচ।

টেস্টে দ্রুততম ৭ হাজার রানের রেকর্ডে কোহলির অবস্থান ৭ নম্বরে (১৩৮ ম্যাচে)।

ওয়ানডেতে একটি দলের বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি করার রেকর্ডও তার। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৫১ ম্যাচ খেলে ১০টি সেঞ্চুরি করেছেন কোহলি। রেকর্ডের দ্বিতীয় অবস্থানটিও তার। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৪৩ ম্যাচ খেলে কোহলির সেঞ্চুরি ৯টি।

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ রান কোহলির, ৪০০৮ রান। সর্বোচ্চ হাফ সেঞ্চুরিও তার, ৩৮টি।

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে বেশি ৭ বার প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ হওয়ার রেকর্ড কোহলির।

এক ক্যালেন্ডার ইয়ারে (জানু-ডিসে:) দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সেঞ্চুরি ১১টি কোহলির। ২০১৮ সালে ৩৭ ম্যাচে ১১ সেঞ্চুরি করেন তিনি। তালিকার তার ওপরে শুধু শচীন। তিনি ১৯৯৮ সালে ১২টি সেঞ্চুরি করেছিলেন।

বিরাট কোহলি মোট রান কত

(সেপ্টেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত) বিরাট কোহলির মোট রান ওয়ানডেতে ১৩ হাজার এর কিছু বেশি (গড় ৫৭ প্রায়) । টেস্টে ৮ হাজারের বেশি (গড় ৪৯) এবং আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ৪০০৮ রান (গড় ৫৩ প্রায়)। এছাড়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ১০ হাজারের বেশি এবং লিস্ট এ ক্রিকেটে ১৪ হাজারের বেশি রান রয়েছে তার ক্যারিয়ারে।

বিরাট কোহলির মাসিক বেতন

ভারতীয় ক্রিকেটে টাকার ঝনঝনানি নতুন নয়। বিসিসিআই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড। তাই কোহলিদের বেতনও প্রচুর। তারা একারণে প্রচুর অর্থ উপাজর্ন করেন। বিভিন্ন ভারতীয় ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী কোহলির বার্ষিক বেতন ৭ কোটি ভারতীয় রুপি। তিনি বিসিসিআইয়ের এ প্লাস ক্যাটাগরি ভূক্ত খেলোয়াড়। এই ক্যাটাগরির সবার বার্ষিক বেতন ৭ কোটি রুপি। প্রতি মাসে যা ৫৮ লাখ রুপির বেশি হয়। বেতন ছাড়াও বিভিন্ন উপলক্ষে বোনাস পেয়ে থাকেন বিরাট কোহলি। এছাড়া ম্যান অব দ্য ম্যাচ, ম্যাচ ফি, ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট পুরস্কার থেকেও প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। (টপিক : বিরাট কোহলি মোট সেঞ্চুরি কয়টি )

ভারতীয় ক্রিকেটাররা টেস্টে ১৫ লাখ রুপি, ওয়ানডেতে ৬ লাখ রুপি ও টি-টোয়েন্টিতে ৩ লাখ রুপি ম্যাচ ফি পেয়ে থাকেন। এছাড়া আইপিএল দল রয়েল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু থেকে প্রতি মৌসুমে ১৫ কোটি রুপির বেশি পান কোহলি।

বিরাট কোহলি কত টাকার মালিক

বিরাট কোহলির সম্পদের পরিমাণও ‘বিরাট’। এপিবি আনন্দ চ্যানেলের সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি বিজ্ঞাপনে অভিনয় করার জন্য তিনি ৮ থেকে ১০ কোটি রুপি নিয়ে থাকেন। এই অর্থ শুধু এক দিনের শিডিউলের জন্য। দ্বিতীয় দিন শুটিং করতে হলে আবার একই পরিমাণ অর্থ তাকে দিতে হয়। ভিভো, লুক্সর, এইচএসবিসির মতো বড় বড় অনেকগুলো কোম্পানির সাথে তার বাণিজ্যিক চুক্তি আছে।

সোস্যাল মিডিয়ায় কোন কোম্পানির হয়ে পোস্ট দিলেও পোস্ট প্রতি কয়েক কোটি রুপি নিয়ে থাকেন। ছোট বড় কয়েকটি কোম্পানি রয়েছে নিজের মালিকানায়। এর মধ্যে ফ্যাশন হাউজ রং চালু হয় ২০১৬ সালে। শিশুদের জন্য পোশাকের একটি কোম্পানিও আছে তার। ফুটবল ক্লাব গোয়া এফসির মালিক বিরাট কোহলি। এছাড়া একটি টেনিস ও রেসলিং টিমও রয়েছে তার।

আরো পড়ুন :

বাবর আজম : ক্যারিয়ার ও পরিসংখ্যান

মুম্বাইয়ে কোহলির বাড়ির দাম ৩৪ কোটি ভারতীয় রুপি। আর গুরুগাওয়ে তার যে বাড়িটি রয়েছে সেটি কিনেছেন ৮০ কোটি রুপিতে।

সব মিলিয়ে কোহলির সম্পদের পরিমাণ কত সে তথ্য প্রকাশ করা হয় না। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার স্বার্থে কোহলি এটি মিডিয়াকে জানতে দিতে চান না। তবে পাঠক নিশ্চয়ই তার সম্পদের পরিমাণ সম্পর্কে একটি ধারণা পেয়েছেন। টপিক : বিরাট কোহলি মোট সেঞ্চুরি কয়টি

লেখকের ফেসবুক পেজে যুক্ত হতে লাইক দিন : আহমেদ

12.09.2023

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top