সাংবাদিকতার বই

সাংবাদিকতার বাঁকে বাঁকে : বুক রিভিউ

সম্প্রতি পড়লাম সাংবাদিক আযাদ আলাউদ্দীনের লেখা সাংবাদিকতার বাঁকে বাঁকে বইটি। ৮০ পৃষ্ঠার বইটি ২২টি ছোট ছোট অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। যার ফলে আলাদা আলাদা বিষয়গুলো পড়ে অনুধাবন করা সহজ। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা একটানা পড়ার চাপ নেই। চাইলে দুটো অধ্যায় পড়ে আবার বিরতি দেয়া যায়। বিরক্তি চলে আসে না। তবে সাংবাদিকতার আগ্রহী পাঠকদের বইটি এক বসাতেই শেষ করতে মন চাইবে। কারণ, এর প্রতিটি অধ্যায় সাংবাদিকতার নানা উপাদানে সমৃদ্ধ। কোনটি শেখার, কোনটি উপলব্ধি করার, কোনটি বা অন্যের মুখ থেকে আনন্দ ও বেদনার গল্প শোনার মতো উপভোগ্য। লেখক আযাদ আলাউদ্দীন দৈনিক নয়া দিগন্তের বরিশাল ব্যুরো প্রধান। এর আগেও কাজ করেছেন একাধিকি টিভি চ্যানেলে।

সাংবাদিকতার বই

সাংবাদিকতার বাঁকে বাঁকে বইটিকে আমার মনে হয় মোটা দাগে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।

প্রথমত, একজন অদম্য তরুণের বন্ধুর পথ মাড়িয়ে সাংবাদিক হয়ে ওঠার গল্প- যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা এমনকি উপজেলা শহর থেকেও ৭০-৮০ কিলোমিটার দূরের এক প্রত্যন্ত এলাকায়। এখানে পাঠক জানতে পারবেন, দৈনিক ইনকিলাবের চিঠিপত্র কলামে লেখার মাধ্যমে একজন আযাদ আলাউদ্দীনের দীর্ঘযাত্রার সূচনাপর্ব সম্পর্কে।

ধীরে ধীরে সাংবাদিকতার দিকে ঝুঁকে পড়া এবং এক পর্যায়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নেয়ার নেশায় পেয়ে বসার গল্প। বিভাগীয় শহর বরিশালে এসে সেটি আরো ডালপালা মেলতে থাকে। যাকে নানা বাধা-বিপত্তি আর অন্য সেক্টরে সোনালী ক্যারিয়ারের লোভও ফেরানো পারেনি।

সাংবাদিকতার বই pdf
সাংবাদিকতার বাঁকে বাঁকে বইয়ের সূচিপত্র

গল্পগুলো বইয়ের পাতায় উঠে এসেছে এভাবে, ‘কোন এক সন্ধ্যায় দৈনিক দক্ষিণাঞ্চল পত্রিকার অফিসে গিয়ে শাহিন ভাইকে (আখতার ফারুক শাহীন, তৎকালীন বার্তা সম্পাদক) জানালাম বিগত চার বছর যাবত ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা করেছি, এখন পেশাদার সাংবাদিকতায় যুক্ত হতে চাই। তার হাত দিয়ে যেহেতু এর আগে আমার বেশ কিছু ফিচার দৈনিক দক্ষিণাঞ্চল (বরিশাল) পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, সেহেতু তিনি আমাকে আগে থেকেই চিনতেন।

আমার ইচ্ছের কথা শুনে বললেন, সাংবাদিকতা অনেক পরিশ্রমের কাজ; কিন্তু সে অনুযায়ী পারিশ্রমিক নেই। এই পেশার ভবিষ্যত নেই।….. সাংবাদিক হওয়ার চিন্তা বাদ দাও। আমি তার কথা শুনে হতাশ হলাম। বললাম- ভাই, আমি সাংবাদিকতাই করবো। তিনি বললেন, আজকে যাও। আমি যে কথাগুলো বলেছি সেগুলো ভাবো, তারপর কালকে এসো।

পরদিন সন্ধ্যায় আমি আবার অফিসে গিয়ে শাহিন ভাইয়ের সাথে দেখা করলাম।…… এবার তিনি কয়েকজন সৎ সাংবাদিককের আর্থিক দুর্দশা ও পারিবারিক জীবনের করুণ চিত্র আমার সামনে তুলে ধরলেন, আমাকে এ পেশায় নিরুৎসাহিত করতে চাইলেন।…… বললেন আজকে চলে যাও, আরো ভালো করে ভাবো।’

স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে

এভাবেই লেখক তার সাংবাদিক হয়ে ওঠার নেশা বা জিদ বাস্তবায়নের গল্প তুলে ধরেছেন। সেই সাথে তুলে ধরেছেন কাজ শেখার আগ্রহ আর রাতদিন পরিশ্রমের কথা। যে কারণে তার ৫০০ টাকার বেতন দ্বিতীয় মাসেই ২ হাজার টাকা হয়ে গেল। সাংবাদিকতায় আগ্রহীদের জন্য এমন বাস্তব অভিজ্ঞতার গল্প শুনতে পারা দারুণ ব্যাপার। এভাবে শেখার সুযোগ সব সময় হয় না। যা এই বইয়ের পাঠকদের হতে পারে।

এরপর পর্যায়ক্রমে লেখক তুলে ধরেছেন আঞ্চলিক পত্রিকা থেকে কিভাবে স্থানীয় রেডিও, জাতীয় টিভি চ্যানেল হয়ে জাতীয় দৈনিকে চাকরি পেয়েছেন সেসব গল্প। যার প্রতিটি লাইনে উঠে এসেছে পরিশ্রম, আর পেশার প্রতি দায়বদ্ধতার কথা। নবীনদের জন্য যা অনুপ্রেরণার।

হাসি-কান্নার সাংবাদিকতা

দ্বিতীয়ত, বইটিতে আছে পেশাদার সাংবাদিকতার জগতে এসে আযাদ আলাউদ্দীনের কর্মমুখর জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা। যেমন উঠে এসেছে একজন রিপোর্টারের জীবনের নানা হাসি-আনন্দের ঘটনা প্রবাহ। তেমনি নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা। ঘুর্ণিঝড় সিডরের পর কিভাবে বিদ্যুৎ ও যানবাহন ছাড়া উপক‚লীয় এলাকায় চষে বেড়িয়ে সেই সংবাদ ঢাকায় পাঠিয়েছেন। কিভাবে বিপদগ্রস্থ মানুষের সমস্যার কথা জানিয়েছেন সারা দেশকে।

লেখকের ভাষায়, ‘প্রায় একশা কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নানা চড়াই উতরাই মাড়িয়ে সংবাদ সংগ্রহ করে আমরা যখন তালতলী থেকে আমতলী এসে পৌছলাম তখন সন্ধ্যা ৬টা। আমতলী এসে দেখি কোথাও বিদ্যুৎ নেই।…… একটি দোকানে সাংবাদিকদের ভীড়। জেনারেটর চালিয়ে কম্পিউটারে নিউজ লেখার কাজ চলছে। এরই মধ্যে কে যেন হঠাৎ করে জেনারেটরের পাওয়ার বাড়িয়ে দিলেন; কিন্তু লোড সামলাতে না পেরে বিকট শব্দে কম্পিউটারের মনিটর বিস্ফোরিত হয়ে যায়।….. পড়লাম মহা সমস্যায়।’

প্রায় মাঝরাতে পথে মাইক্রোবাসে লিফট নিয়ে পটুয়াখালী শহরে গিয়ে আবার ঢাকায় ছবি পাঠানোর গল্প মনে করিয়ে দেয় এই পেশা কতটা দায়িত্বশীলতার। যেখানে দিন-রাত এক করে পাঠকের জন্য সংবাদের মশলা জোগাড় করাই শুধু নয়, সেটাকে ছাপার উপযোগীও করে তুলতে কাজ করতে হয় একজন সংবাদ কর্মীকে।

সিডরে সব হারানো কয়েকটি পরিবার সম্পর্কে মানবিক স্টোরি ছাপিয়ে দেশ বিদেশ থেকে সেই সব অসহায়দের জন্য সহযোগিতা পাওয়া গল্প তুলে ধরেছেন লেখক। যেগুলো পড়তে পড়তে অজান্তেই পাঠকের চোখে পানি চলে আসতে পারে। আবার প্রেসক্লাবের সদস্য হতে গিয়ে সাংবাদিকতা জগতের এক অজানা সিন্ডিকেটের গল্পও জানিয়েছেন লেখক।

সাংবাদিকতা বিষয়ক আরো লেখা পড়তে ক্লিক করুন এই ওয়েবসাইটের মিডিয়া বিভাগে

চোখের জলে ভেজা ঈদ

‘চোখের জলে ভেজা ঈদ’ নামের অধ্যায়ে বর্ণনা আছে ঈদুল আযহার আগের রাতে কোকো-৪ লঞ্চ ডুবি ট্রাজেডি কাভার করার গল্প। ঈদের ছুটিতে বাড়ি গিয়েও ঈদ না করে লেখককে চলে আসতে হয়েছে নাজিরপুরের তেতুলিয়া নদীর পাড়ে। একের পর এক লাশ উদ্ধার আর স্বজন হারাদের গগনবিদারি চিৎকার নিয়ে দিগন্ত টিভিতে খবর পাঠাতে পাঠাতেই কেটে গেছে ঈদের কয়েকটি দিন। সহকর্মীরা বারবার তাগাদা দিলেও তাদের ঘটনাস্থলে ফেলে মায়ের ডাকে সারা দিতে পারেননি। পেশদারিত্বের কাছে যেখানে পরিবার, স্বজন, ঈদ আনন্দ সব কিছুই তুচ্ছ। অথচ বরিশাল ব্যুরো অফিস থেকে ঈদ পালনের ছুটি নিয়েই তিনি ভোলা গিয়েছিলেন।

এছাড়াও বিভিন্ন অধ্যায়ে উঠে এসেছে লেখকের দীর্ঘ কর্মজীবনের নানা ঘটনা ও অভিজ্ঞতার কথা। সাংবাদিকতা জগতের কয়েকজন প্রিয় মানুষকে হারানোর স্মৃতিও আছে পাতায় পাতায়। আছে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার কথা ও লিটল ম্যাগ মুক্তবুলি নিয়ে সংগ্রাম করার গল্প।

সাংবাদিকতা শিক্ষা

বইটিতে আমি মোটাদাগে যে তিনটি অধ্যায়ের কথা বলেছি, তার তৃতীয়টিতে আছে তরুণ সংবাদকর্মী বা সাংবাদিকতা বিষয়ে আগহীদের জন্য গাইডলাইন। এখানে লেখক যেমন তুলে ধরেছেন মিডিয়া জগতের কাঠামো সম্পর্কে তেমনি সংবাদ মাধ্যমের বিভিন্ন বিষয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন পাঠককে। কিভাবে একটি পত্রিকা প্রস্তুত হয়ে পাঠকের হাতে আসে সেটাও জানতে পারবেন পাঠক।

আছে ফিচার লেখার কৌশল, সাংবাদিক না হয়েও পত্রিকায় লেখালেখির উপায়, মফস্বল সাংবাদিকতা রকলাকৌশলসহ বিভিন্ন বিষয়। এই বিষয়গুলো সাংবাদিকতাকে বুঝতে, সাংবাদিকতা বা লেখালেখি শিখতে সাহায্য করবে।

মোট কথা বইটি পড়ে পাঠক একজন সাংবাদিকদের উঠে আসা, তার সংগ্রামমুখর কর্মজীবন সম্পর্কে যেমন জানবেন, তেমনি জানতে পারবেন মিডিয়া জগতের সম্পর্কে নানা তথ্য। শিখতে পারবেন সাংবাদিকতা ও লেখালেখির নানা বিষয়। তাই সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী এমন মানুষদের জন্য বইটি অবশ্য পাঠ্য হওয়া উচিত।

দু’য়েকটি বানান ভুল, দু’য়েক জায়গায় বাক্যগঠনে অসামঞ্জস্য ছাড়া বইটিতে চোখে লাগার মতো কোন ত্রুটি নেই। সম্পদনায় লেখক ও প্রকাশনী কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট শ্রম দিয়েছে বোঝা যায়। লেখকের সাংবাদিকতা জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ছবি সংযুক্ত হলে বইটি আরো সমৃদ্ধ হতো। ৮০ পৃষ্ঠার বইটি প্রকাশ করেছে দেশজ প্রকাশন। মূল্য ২৬০টাকা। পাওয়া যায় রকমারি ডটকমসহ বিভিন্ন বুকশপে।

রকমারি লিংক : সাংবাদিকতার বাঁকে বাঁকে

রিভিউ লেখকের ফেসবুক পেজে যুক্ত হতে লাইক দিন : আহমেদ বায়েজীদ

০৭-০৯-২০২৩

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top