স্কুপ নিউজ (Scoop news) গণমাধ্যম জগতে বহুল প্রচলিত একটি শব্দ। সাংবাদিকতার ভাষায় স্কুপ বলতে বোঝায়, এমন কোন এক্সক্লুসিভ নিউজ বা অন্তরালের খবর- যা কোন একজন সাংবাদিক অথবা এক সাথে কাজ করা সাংবাদিকদের কোন গ্রুপ সবার আগে প্রকাশ করে।
সাধারণ জনগনের মাঝে সাড়া পড়ে যায় এ ধরণের সংবাদে। যে কারণে বিশ্বের বড় বড় গণমাধ্যমগুলো তাদের স্টাফদের স্কুপ নিউজের সন্ধানে ব্যস্ত থাকতে উৎসাহ দেয়। এ ধরণের নিউজ সবার আগে প্রকাশ করার মাধ্যমে কোন মিডিয়া হাউজ জনগনের মাঝে সাড়া ফেলতে পারে। এতে সংবাদ মাধ্যমটির বাজার মূল্য ও ইমেজ অনেকগুণ বেড়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
স্কুপ নিউজকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। অনেকে বলেন, যখন কোন একজন সাংবাদিক তার অন্য সহকর্মী বা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় এগিয়ে থেকে কোন বড় ঘটনার খবর সংগ্রহ করেন সেটাই স্কুপ নিউজ। অর্থাৎ এই প্রতিযোগীতায় তিনি জিতে গেলেন (have “scooped” the competition)।

আবার কখনো ছোটখাট বিষয় বা পাঠকের আগ্রহ কম এমন বিষয়ও স্কুপ নিউজ হতে পারে। যেমন কোন ঘুর্নিঝড় ধেয়ে আসার খবর কোন সাংবাদিক সবার আগে পেয়ে যেতে পারেন। যেটার বাজার মূল্য তুলনামূলক কম।
যে সাংবাদিক স্কুপ নিউজ পরিবেশন করেন তিনিও খ্যাতিমান হয়ে যান কখনো কখনো। তাই তো এ ধরনের স্টোরির কাছে পৌছতেই সাংবাদিকরা স্কুপ নিউজের প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হন।
স্কুপ নিউজের সংজ্ঞা
মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতে, ১৮৭০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বীতা থেকেই স্কুপ নিউজ ধারণাটির সূত্রপাত। কে কার আগে বড় ঘটনার সংবাদ প্রকাশ করবে সেই প্রতিযোগীতা থেকেই স্কুপ নিউজ ধারণাটি মিডিয়া জগতে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়।
১৮৭৪ সালে Scoop শব্দটি অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে যুক্ত হয়। তার বিবরণে বলা হয়, যখন কোন সংবাদপত্র প্রতিযোগীদের পরাজিত করে বড় কোন ঘটনার খবর সবার আগে প্রকাশ করে। স্কুপ নিউজ নিয়ে একটি বিখ্যাত উপন্যাসও রয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম ডেইলি মেইল এর সাবেক রিপোর্টার ইভেনলিন ওয়াহ ১৯৩৮ সালে ‘স্কুপ’ নামে একটি উপন্যাস প্রকাশ করেন। যেখানে ‘দ্য বেস্ট ’ ও ‘দ্য ব্রুট’ নামের দুটি সংবাদপত্রের মধ্যে প্রতিযোগীতার গল্পের মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়। পত্রিকার নাম দুটি কাল্পনিক। তবে এমন ঘটনা মিডিয়া জগতে নিয়মিতই দেখা যায়।
স্কুপ নিউজের ধরণ
স্কুপ নিউজের অনেক ধরন থাকতে পারে। বেশির ভাগই হয়ে থাকে কোন স্ক্যান্ডাল (কেলেঙ্কারি) বা গোপন তথ্য নির্ভর। এ ধরণের ঘটনার প্রতি পাঠক বা দর্শকের খুব বেশি আগ্রহ থাকে। যেমন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্লিল ক্লিনটন ও মনিকা লিউনেস্কির কেলেঙ্কারির ঘটনা। ১৯৯৮ সালের ১৭ জানুয়ারি Drudge Report নামের একটি ওয়েবসাইট প্রথম বিষয়টি সামনে আনে। তবে তখন অনেকে বিশ্বাস করেননি। কারণ দুর্জ রিপোর্ট খুব পরিচিত কোন সংবাদমাধ্যম ছিলো না। এর ৩ দিন পর প্রভাবশালী দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট বিষয়টি নিয়ে নিউজ করে। আর তোলপাড় শুরু হয় মার্কিন প্রশাসনে।
বাংলাদেশে দৈনিক জনকণ্ঠ হুসেইন মুহাম্মাদ এরশাদের সাথে বিদিশার সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে সর্বপ্রথম নিউজ প্রকাশ করেছিলো। শিরোনাম ছিলো ‘নতুন বান্ধবী জোটালেন এরশাদ’। এটি একটি স্কুপ নিউজ।
স্কুপ নিউজ যেমন জাতীয়, আন্তর্জাতিক ইস্যুতে হতে পারে- তেমনি মফস্বলের ছোট ঘটনাও হতে পারে। হতে পারে খেলাধূলার জগতেরও। কখনো দেখা যায় সাংবাদিকরা সঠিক স্কুপ নিউজ খুজে বের করতে ব্যর্থ হয়।
একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশের সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের বিদায়ের পর কে হবেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি এটি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম কিছু সংবাদ প্রকাশ করেছে। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য কয়েকজনের নামও প্রকাশ করেছে কিছু পত্রিকা বা টিভি চ্যানেল; কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে আওয়ামী লীগ যাকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছে, তার বিষয়ে কেউ ধারণাও করতে পারেনি। সবাইকে অবাক করে দিয়ে মোহাম্মাদ সাহাবুদ্দিনকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি করা হয়।

অথচ কোন সাংবাদিক এটির ‘স্কুপ’ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আবার সাহিত্য পুরস্কারের ক্ষেত্রেও সাংবাদিকদের এমন ব্যর্থতা দেখা যায়। তারা যাদের ধারণা করেন, তার বাইরে কেউ প্রতি বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন।
স্কুপ নিউজের উৎস
স্কুপ নিউজ সংগ্রহের সবচেয়ে উৎসহ হচ্ছে গোপন সোর্স। এ জন্য সাংবাদিকদের অব্যাহত চেষ্টা থাকতে হবে। সেই সাথে থাকতে হবে বিভিন্ন সেক্টরে সোর্স তৈরি করার ক্ষমতা এবং সোর্সের সাথে সম্পর্ক মজবুত করা। সোর্স একজন সাংবাদিককে খুব গোপন কোন ঘটনার খবর তখনই জানাবেন, যখন তার সাথে ভালো সম্পর্ক থাকবে এবং তার ওপর আস্থা থাকবে। এক্ষেত্রে অনেক সময় সোর্সের পরিচয় গোপন রাখা জরুরী। তাই আস্থা থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক সময় স্কুপ নিউজ খুজে বের করতে কোন কোন সংবাদ মাধ্যম বড় টিমও নিয়োগ করে। কোন একটি ক্লু পাওয়ার পরই সংবাদ প্রকাশ করা যায় না। সেটির পেছনে কারা আছেন, সঠিক তথ্য প্রমাণ জোগাড় করে তারপর সংবাদ প্রকাশ করতে হয়। তাই অনেক সময় এ ধরণের নিউজের পেছনে বড় টিম নিয়োজিত থাকে।
আলোচিত স্কুপ নিউজ

১৯৭২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে বহুল আলোচিত ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি একটি আলোচিত স্কুপ নিউজ। যার ফলে এক পর্যায়ে ৩৭তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে পদত্যাগ করতে হয়েছিলো। সেই নিউজটি করেছিলো ওয়াশিংটন পোস্ট। নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অফিসে গোপন মাইক্রোফোন স্থাপন করার সেই খবর প্রকাশ করেছিলেন বব উডওয়ার্ড ও কার্ল বার্নস্টেইনের নেতৃত্বে কয়েকজন রিপোর্টার। ওই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছিলো। এক পর্যায়ে অনাস্থা ভোটের মুখোমুখী হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট নিক্সন।
আবার বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বিদ্রোহ করে ভারতীয় আইসিএলে খেলতে যাওয়ার (২০০৮) খবর সবার আগে প্রকাশ করেছিলো প্রথম আলো। এটিও একটি স্কুপ নিউজ। সাংবাদিক উৎপল শুভ্র নিউজটি করেছিলেন। এছাড়া আশরাফুলের ফিক্সিংয়ে জড়িত থাকার পুরো বিষয়টিও একই সাংবাদিক জাতির সামনে তুলে ধরেছিলেন।
স্কুপ নিউজের বিপদ
স্কুপ নিউজের প্রতিযোগিতা করতে নিয়ে অনেক সময় ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সবার আগে সংবাদ দিতে গিয়ে কেউ কেউ ভুল তথ্য পরিবেশন করে থাকেন। যেটি সাংবাদিক কিংবা তার মিডিয়ার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফোর্বস এর সিনিয়র কন্ট্রিবিউটর ইডি গ্রাস্টেন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে এখন সঠিক হওয়ার চেয়ে প্রথম হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এটি বিপজ্জনক।
তাই স্কুপ নিউজ পরিবেশন করার আগে অবশ্যই প্রয়োজনীয় তথ্য প্রমাণ হাতে পেতে হবে। কারণ অনেক সময় এতে আইনি ঝামেলাও হতে পারে। তাই তথ্য প্রমাণ রাখা খুবই জরুরী। আবেগের বশে স্কুপ দেয়ার নেশায় কোন ভুল করে ফেললে প্রতিষ্ঠান ও নিজের বিপদ হতে পারে।


