গণমাধ্যম

গণমাধ্যম : পরিবর্তনের হাতিয়ার

গণমাধ্যমের ভুমিকা

গণ বা মানুষের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমকেই গণমাধ্যম বলে। অর্থাৎ সাধারণের সাথে যোগাযোগ যে উপায়ে ঘটে, বা যার মাধ্যমে ঘটে সেটাই গণমাধ্যম। বিশ্ব ইতিহাসে গণমাধ্যম নানাক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভুমিকা রেখেছে। তেমন কিছু ঘটনা তুলে ধরা হলো।

মুক্তিযুদ্ধে গণমাধ্যম

মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়। লড়াই চলছে মুক্তিকামী জনতার। এরই মধ্যে ১৩ই জুন (১৯৭১) লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকায় ছাপা হলো একটি রিপোর্ট। আট কলাম জুড়ে বিশাল শিরোনামটি মাত্র এক শব্দের- ‘জেনোসাইড’, বাংলায় যার অর্থ গণহত্যা। এই একটি রিপোর্টই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গতিপথ পাল্টে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছিলো।

সরেজমিন যুদ্ধক্ষেত্র পরিদর্শনের পর পাকিস্তানি সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের সেই রিপোর্টে ফুটে উঠেছিলো পাক বাহিনীর হত্যাকাণ্ড আর যুদ্ধের বিভিষীকার কথা। করাচির গোয়ান নামে একটি ক্ষুদ্র খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোক অ্যান্থনি। তার ওই রিপোর্টের পরই ইউরোপ আমেরিকাসহ সারাবিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমর্থনে জনমত ও সরকারগুলোর সমর্থন বাড়তে থাকে। পুরো বিশ্ব জনমতকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঠেলে দিয়েছিল ওই রিপোর্ট।

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সানডে টাইমসের সম্পাদক হ্যারল্ড ইভান্সকে বলেছিলেন, মর্মস্পর্শী ওই রিপোর্ট তাঁকে এতটাই ব্যথিত করেছে যে (পূর্ব পাকিস্তানে) ভারতীয় সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র প্রস্তত করার লক্ষ্যে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও মস্কোয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের ঘটনা

ভিয়েতনাম যুদ্ধ। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিভিন্ন শহরে একযোগে আকস্মিক আক্রমণ চালায় উত্তরের পিপলস আর্মি ও ভিয়েতকং গেরিলারা। ওই যুদ্ধে দক্ষিণ ভিয়েনামের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলো মার্কিন বাহিনী। সায়গন শহরের (বর্তমানে শহটির নাম হো চি মিন সিটি) লড়াইয়ের এক পর্যায়ে মার্কিন বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন ভিয়েতকং গেরিলাদের একটি দলের নেতা নুয়েন ভ্যান লেম।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ
আলোচিত সেই ছবি

তাকে আনা হয় মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুয়েন নক লোয়ানের কাছে। আসা মাত্রই কোন বাক্য ব্যয় না করে পিস্তল তুলে রাস্তার ওপরেই ভ্যান লেমের মাথায় গুলি করেন নক লোয়ান।(ছবিতে দেখা যাচ্ছে গুলি খেয়ে লোয়ানের মুখ কুঁচকে গেছে)।

খুব কাছ থেকে দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দী করেন মার্কিন ফটো সাংবাদিক এডি অ্যাডামস। ভিয়েতনাম যুদ্ধের মোড়ই ঘুড়িয়ে দেয় সেই ছবিটি। মার্কিন জনগন তাদের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা বুঝতে পারে যুদ্ধে জয়ের সম্ভাবনা নেই, তাই এসব নিষ্ঠুরতা করছে তাদের বাহিনী। সারা দুনিয়ায় জনমত তৈরি হয় ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে। এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম ছাড়তে বাধ্য হয়।

তুরস্কের ব্যর্থ অভ্যুত্থান ও গণমাধ্যম

১৫ জুলাই, ২০১৬।

তুরস্কের সেনাবাহিনীর একটি অংশ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোয়ান তখন ভূমধ্যসাগর উপকূলীয় মারমারিস শহরে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন। অভ্যুত্থানের খবর পেয়ে এরদোগানের সাথে যোগাযোগ করে ‘সিএনএন তুর্ক’ টিভি চ্যানেল।

তুরস্ক
এরদোয়ানের সেই ভিডিও বার্তাটির পরই পাল্টে যায় দৃশ্যপট

চ্যানেলটির এক উপস্থাপককে আইফোনের ফেস টাইম অ্যাপের মাধ্যমে ছোট্ট একটি সাক্ষাৎকার দেন এরদোয়ান। মূলত এটি ছিলো তুর্কি জনগনের কাছে রাস্তায় নেমে এসে অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিহত করার আহ্বান।

এরদোয়ানের সেই ভিডিও বার্তাটি বেশ কয়েকবার সম্প্রচার করে সিএনএন তুর্ক। এরপরই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। কয়েক মিনিটের মধ্যে রাজধানী আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলের রাজপথ লোকারণ্য হয়ে যায়। খালি হাতেই ট্যাঙ্ক, কামান প্রতিহত করে সাধারণ মানুষ। অভ্যুত্থানকারী সেনাদের কাছ থেকে দেশের নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা। রক্ষা পায় তুরস্কের গণতন্ত্র। পরবর্তীতে চ্যানেলটি জানিয়েছে, গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই তারা এই কাজটি করেছে।

উপরের ঘটনাগুলো উল্লেখ করা হলো সংবাদ মাধ্যমের প্রভাব মনে করিয়ে দেয়ার জন্য। পত্রিকার রিপোর্ট, ছবি ও টেলিভিশনের ভুমিকার একটি করে উদাহরণ মাত্র। এমন আরো অনেক ঘটনা আছে আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে- যেখানে পরিস্থিতির গতিপথই পাল্টে দিয়েছে মিডিয়া।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির ঘটনা সবার জানা। ওয়াটারগেট একটি হোটেলের নাম, যেখানে ছিলো ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নির্বাচনী অফিস। নির্বাচনের আগে তাদের অফিসে আড়িপাতার যন্ত্র স্থাপনের সেই ঘটনা উৎঘাটন করেছিলেন ওয়াশিংটন পোস্টের দুই অনুসন্ধানী সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড ও কার্ল বার্নস্টেইন। এই ঘটনার প্রভাব এতটাই ছিলো যে, কেলেঙ্কারির দায় নিয়ে পদত্যাগ করতে হয়েছিলো যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭তম প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে।

আয়লান কুর্দি
ভূমধ্যসাগরের সৈকতে আয়লান কুর্দির নিথর দেহ

গণমাধ্যমের বৈশিষ্ট

আয়লান কুর্দির কথা মনে আছে!

সমুদ্র পাড়ে পড়ে থাকা সিরীয় উদ্বাস্তু শিশু আয়লান কুর্দির লাশের ছবি কাঁদিয়েছে বিশ্ববাসীকে। তুর্কি ফটোসাংবাদিক নিলুফার দেমিরের তোলা ওই একটি ছবিই বিশ্ববাসীর চোখ খুলে দিয়েছে উদ্বাস্তু সঙ্কট নিয়ে। সারাবিশ্বে জনমত জোরদার হয়েছে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়ার উদ্বস্তুদের আশ্রয় দেয়ার পক্ষে। ইউরোপীয় দেশগুলো কোটার ভিত্তিতে ভাগ করে নিয়েছে কয়েক লাখ উদ্বাস্তু।

এমনিভাবে যুগে যুগেই সংবাদমাধ্যম অসংখ্য কল্যাণকর কাজের নজির স্থাপন করেছে। দেশ গঠনে, জাতি গঠনে, বিশ্ব রাজনীতির গতিধারা ঠিক করতে সংবাদ মাধ্যমের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা। আমাদের দেশেও এমন ঘটনার বহু উদাহরণ রয়েছে।

আরো পড়ুন : সাংবাদিকতা- সংবাদ লেখার প্রাথমিক ধারণা

গণমাধ্যম কি

একটা সময় মনে করা হতো, সংবাদমাধ্যম মানুষের অবসর সময় কাটানোর সঙ্গী; কিন্তু এখন সেটি নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তুতে পরিণত হয়েছে।

আর সংবাদের প্রতি মানুষের এই আকর্ষণটির কারণে তারা অনেক ক্ষেত্রে মিডিয়ার দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। দেশপ্রেম, নৈতিকতা, সামাজিক সচেতনার মতো বিষয়গুলোতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে সংবাদ মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে রাখছে। বর্তমান বিশ্বে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য গড়ে দিতেও সংবাদ মাধ্যমের ভুমিকা অনেক জোরালো। সংবাদ মাধ্যমের আরেক নাম গণমাধ্যম। এই নামটির মধ্যেই যুক্ত আছে ‘গণ’ অর্থাৎ মানুষ শব্দটি। তাই মানুষের কল্যানে এর ভুমিকা বলে শেষ করা যাবে না।

লেখকের ফেসবুক পেজে যুক্ত হতে লাইক দিন : আহমেদ

০৩.০২. ২০১৮

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top