বিশ্বব্যবস্থার এক অপরিহার্য উপদান জ্বালানী তেল। যান্ত্রিক এই পৃথিবীর গতিশীলতা টিকে আছে তেলের ওপর। তবে শুধু জ্বালানী হিসেবেই নয়, এর রয়েছে বহুবিধ ব্যবহার। পেট্রেলিয়াম বা অপরিশোধিত তেল একটি প্রাকৃতিক উপাদান। ভূগর্ভ থেকে এটি আহরণ করতে হয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে। ব্যাপক ব্যবহারের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর রয়েছে অনেক গুরুত্ব। তবে অর্থনৈতিক গুরুত্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে পেট্রোলিয়াম বিশ্বের রাজনীতি, কূটনীতি ও সমরনীতিরও কেন্দ্রবিন্দুতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে। তেল নিয়ে যুদ্ধবিগ্রহও কম হয়নি। তেল রফতা ও তেল উৎপাদনে শীর্ষ দেশ সহ আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে জানাবো এই লেখায়
তেল উৎপাদন
পেট্রোলিয়াম বা অপরিশোধিত তেল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। অন্যান্য খনিজ সম্পদের মতোই যেটি খনন কার্যের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়। ভূগর্ভের অভ্যন্তরে হলুদাভ-কালো এই তরল সম্পদ স্রষ্টার দান। কাঠামোগত ভূতত্ত্ব ও পাললিক বেসিন বিশ্লেষণ করে ভূগর্ভে মজুদ খুজে বের করা হয়। এরপর মজুদের প্রকৃতি অনুযায়ী শুরু হয় খনন ও উত্তোলন। অপরিশোধিত তেল মূলত হাইড্রোকার্বন ও অন্যান্য কিছু জৈব যৌগের মিশ্রণ। এর মধ্যে কার্বন ও হাইড্রোজেন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তোলনের পর সেটি যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিশোধন করে বিভিন্ন উপাদান পৃথক করা হয়। এর থেকে বের হয় পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন। রঙ, প্লাস্টিক ও ঔষধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয় এমন কিছু রাসায়নিকও পাওয়া যায় এ থেকে। রাস্তা পিচ ঢালাই করতে যে উপাদানটি ব্যবহার করা হয় সেই বিটুমিনও পাওয়া যায় পেট্রেলিয়াম থেকে।
জ্বালানী হিসেবে তেলের ব্যবহার
দিনে দিনে বিশ্বে পেট্রেলিয়ামের ব্যবহার এতটাই বেড়েছে যে এটি জড়িয়ে গেছে সব সেক্টরের সাথে। যানবাহন, বিমান পরিবহন, উৎপাদন যন্ত্র, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাসহ বিশ্বের অনেক কিছুতেই প্রয়োজন পেট্রোলিয়াম। যে কারণে এই উপাদানটি ছাড়া বিশ্ব অচল। সারা বিশ্বে প্রতিদিন অন্তত ১০০ মিলিয়ন (১০ কোটি) ব্যারেল পেট্রেলিয়াম ব্যবহৃত হয়।
অতি প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে জ্বালানীর ব্যবহার করে আসছে। সময়ের সাথে সাথে এর ব্যবহার যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে তেল নিয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড। ক্রমশ মানুষ যন্ত্রের ব্যবহার উন্নত করেছে আর এর ব্যবহার বৃদ্ধি করেছে। গ্রিক দার্শনিক ও লেখক হেরোডোটাসের মতে, ৪ হাজার বছরের বেশি আগে প্রাচীন ব্যাবলিনে দেয়াল ও টাওয়ার নির্মাণের কাজে আস্ফাল্ট বা বিটুমিন ব্যবহৃত হয়েছে। আরো বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতার স্মৃতিচিহ্নে পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থের ব্যবহার পাওয়া গেছে। পারস্য সভ্যতার ইতিহাসে চিকিৎসার কাজে এই জাতীয় পদার্থের ব্যবহার ছিলো বলে জানা যায়।
তেল উত্তোলনের ইতিহাস
অন্তত ২ হাজার বছর আগে চীনে প্রথম খনিজ তেল আবিষ্কার ও উত্তোলন করা হয়েছিল বলে অনেকের ধারণা। এবং চীনারাই এটিকে প্রথম জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করেছিল। ৩৪৭ খ্রিস্টাব্দে দেশটিতে বাশের তৈরি এক ধরনের ড্রিল মেশিনের সাহায্যে তেল উত্তোলন করা হতো।

মধ্যযুগের মুসলিম বিজ্ঞানীরা পেট্রোলিয়ামের বহুবিধ ব্যবহার আবিষ্কার করেছেন। এমনকি ওই সময় বাগদাদের রাস্তা তৈরিতেও খনিজ উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা যায়। নবম শতাব্দীতে আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে তেলক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। স্পেনের মুসলিম শাসনের সময় পশ্চিম ইউরোপের লোকেরা পেট্রোলিয়ামের ব্যবহার শিখতে শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তোলন শুরু হতে থাকে। ক্রমশ খনন যন্ত্র উন্নত হতে থাকে এবং উৎপাদন ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী।
তেল উৎপাদনে শীর্ষ দেশ
বর্তমানে বিশ্বে প্রায় একশোটি দেশ তেল উৎপাদন করে। তবে প্রতিদিন গড়ে ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল উৎপাদন করতে পারে এমন দেশের সংখ্যা ১৭টি। ৫ থেকে ৯ লাখ ব্যারেল তেল উপাদন করতে পারে এমন দেশ ৯টি।
সারা বিশ্বে মোট তেল উৎপাদনের ৪৩ শতাংশই করে তিনটি দেশ। দেশ তিনটি হলো যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও রাশিয়া। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি স্টাটিস্টিকসের তথ্য মতে, ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন গড়ে এক কোটি ৮৬ লাখ ব্যারেল, সৌদি আরব প্রতিদিন ১ কোটি ৮ লাখ ব্যারেল ও রাশিয়া প্রতিদিন ১ কোটি ৫ লাখ ব্যারেল ও তেল উৎপাদন করে।
তেল উৎপাদানকারী দেশের সংখ্যা কম হওয়ার কারণেই বিশ্বে এই সম্পদের এত চাহিদা। তেল ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে এক নম্বর। দেশটি নিজেরা যা উৎপাদন করতে পারে তার চেয়েও প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেল বেশি তেল তাদের প্রয়োজন হয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিদিন এই পরিমাণ তেল বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
বৃহৎ অর্থনীতির দেশ চীনে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল ব্যবহৃত হয়, তার মাত্র ০ দশমিক ৩ শতাংশ তারা নিজেরা উৎপাদন করতে পারে। যে কারণে দেশটিকে প্রতিদিন প্রচুর তেল আমদানি করতে হয়।
তেল রফতানিতে শীর্ষে সৌদি আরব
অন্যদিকে সৌদি আরব যে পরিমান তেল প্রতিদিন ব্যবহার করে তার চেয়ে প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল তেল বেশি উৎপাদন করে। যে কারণে সৌদি আরব প্রচুর পরিমাণে তেল রফতানি করতে পারে। তেল রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব বিশ্বে এক নম্বর। দেশটি সারা বিশ্বের মোট তেল রফতানির ১৭ শতাংশ যোগান দেয়।
রাশিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাতও তেল রফতানিতে উল্লেখযোগ্য দেশ।
তেল বাণিজ্য
আমদানি রফতানির এই প্রক্রিয়ার কারণেই বিশ্বে তেল বাণিজ্য বড় আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিন বিশ্বে তেলের চাহিদা বেড়েই চলছে। যে কারণে ২০২২ সালে বিশ্বে তেল উৎপাদন প্রতিদিন ৩৪ মিলিয়ন ব্যারেল ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্বে এখন কোটি কোটি ডলারের তেল বেচাকেনা হয়। যে কারণে তেলকে তরল সোনা বা কালো সোনা নামে অভিহীত করা হয়।
এক দেশ থেকে আরেক দেশে তেল যায় পাইপলাইন কিংবা জাহাজে করে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই বাণিজ্যের সাথে জড়িত আছে কয়েক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান। তেলের দাম বাড়লে বেড়ে যায় অনেক কিছুর দাম। বিভিন্ন সময় অর্থনৈতিক মন্দার জন্যও দায়ী করা হয় তেলের বাজারে অস্থিরতাকে। এমনকি তেল নিয়ে দেশ বা কোম্পানিগুলোর বিরোধ হলেও অস্থির হয়ে ওঠে অর্থনীতি।
সৌদি আরবসহ বিশ্বে অনেক দেশের অর্থনীতির ভিত্তি তেল বাণিজ্য। এসব দেশ পরিচিত হয়ে গেছে অয়েল স্টেট নামে। আরব বিশ্বের দেশগুলোতে খনিজ তেলের রয়েছে অপরিসীম ভাণ্ডার। ভূগর্ভে তেল রিজার্ভের দিক থেকে আরব বিশ্ব সবচেয়ে এগিয়ে। সর্বোচ্চ তেল রিজার্ভ রয়েছে এমন ১০টি দেশের তালিকায় ছয়টিই এই অঞ্চলের। এগুলো হলো- সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, কুয়েত ও লিবিয়া। তেল উৎপাদনের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকায় দেশগুলো বিশ্ব ব্যবস্থায়ও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখতে পারছে। অবশ্য সবচেয়ে বেশি তেলের মজুদ রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। বৈশ্বিক তেল মজুদের ১৮ শতাংশ আছে লাতিন আমেরিকার দেশটিতে। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ আছে সৌদি আরবে।
বিশ্বে সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকো। সৌদি আরবের সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসরকারি কোম্পানির মালিকানায় পরিচালিত হয় প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্বের তেল চাহিদার ১০ শতাংশ যোগান দেয় এই প্রতিষ্ঠানটি। এরপর রয়েছে রাশিয়ার কোম্পানি রেনসফট ও কুয়েতের কেপিসি। আর বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল ক্ষেত্রটির নাম আল ঘাওয়ার অয়েল ফিল্ড। ২৮০ কিলোমিটার দৈর্ঘ ও ৪০ কিলোমিটার প্রস্থের এই তেল ক্ষেত্রটি সৌদি আরবের আল হাসা প্রদেশে। সৌদি আরবে উৎপাদিত তেলের অর্ধেকই আসে এখান থেকে।
তেলের রাজনৈতিক প্রভাব
অর্থনীতিতে তেলের গুরুত্বের কারণেই এই সম্পদটি নানা ভাবে বিশ্বকে প্রভাবিত করছে। রাজনীতি, কূটনীতি, যুদ্ধ-বিগ্রহ সব কিছুতেই রয়েছে তেলের প্রভাব। তেলকে ব্যবহার করা হয় প্রতিবাদ কিংবা দাবি আদায়ের হাতিয়ার হিসেবেও।
১৯৭৩ সালে ইসরাইলকে সমর্থন দেয়ার কারণে আরব রাষ্ট্রগুলো পশ্চিমাদের কাছে তেল বিক্রি বন্ধ করে দিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছিলো। আবার তেলের কারণে যুদ্ধবিগ্রহের নজিরও কম নয়। দেশে দেশে, রাজায় রাজায়, গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ হয়েছে এই তেল নিয়ে। ইরাক ও লিবিয়ায় পশ্চিমা আগ্রাসন শুধুমাত্র তেল সম্পদ দখলের কারণেই করা হয়েছিলো বলে মনে করা হয়। ইরাকের শাসক সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করেছিলেন একই কারণে।
বিভিন্ন দেশে বিশ্ব মোড়লদের যে প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি তার পেছনেও রয়েছে তেল সম্পদ। কারণ তেল এমন একটি সম্পদ যার অর্থনৈতিক ও বস্তুগত উভয় গুরুত্ব রয়েছে। এটি যেমন প্রতিদিনের বহুল ব্যবহৃত একটি পণ্য, তেমনি এই খাত থেকে আসে প্রচুর অর্থ। যে কারণে তেল সম্পদ রয়েছে এমন দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারে বড় শক্তিগুলোর মাঝে চলে প্রতিযোগিতা।
তেল রফতানি কারন দেশগুলোর জোট ওপেক বিশ্বের একটি প্রভাবশালী সংস্থা। এই সংস্থাটি তেলের বাজার দর নির্ধারণ ও উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার তেল উৎপাদকারী দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত হয়েছে ওপেক জোট। আর এই জোট এবং জোটের বাইরের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো মিলে করা হয়েছে ওপেক প্লাস। রাশিয়াও রয়েছে ওপেক প্লাস জোটে। এই জোট বিশ্বে তেলের উৎপাদন, বন্টন ও বাজার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নেয়।
রাশিয়ার সাথে বিরোধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিন ধরেই সৌদি আর ও আরব আমিরাতকে অনুরোধ করছে ওপেক প্লাস থেকে বেড়িয়ে আসার জন্য। যদিও তারা রাজি হচ্ছে না। টপিক : তেল উৎপাদনে শীর্ষ দেশ
লেখকের ফেসবুক পেজে যুক্ত হতে লাইক দিন : আহমেদ


