কাশ্মির এক রক্তাক্ত জনপদের নাম। ভূস্বর্গ হিসেবে খ্যাত অঞ্চলটিতে সৃষ্টিকর্তা অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দিয়ে রেখেছেন। তবে রাজনৈতিক কারণে হিমালয় অঞ্চলের এই উত্যকাটি বছরের পর বছর ধরে গুলি আর রক্তের খেলায় ডুবে থাকে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সামরিকায়নকৃত এলাকা কাশ্মির। মুসলিম প্রধান অঞ্চলটির বাসিন্দারা বছরের পর বছর ধরে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। কাশ্মীরের ইতিহাস
কাশ্মীর ইতিহাস
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে ভারত ও পাকিস্তান। ওই সময় উপমহাদেশের যেসব এলাকায় রাজশাসন চলছিলো- তাদের সুযোগ দেয়া হয় কোন দেশের সাথে যাবে তা বেছে নেয়ার। মুসলিম প্রধান কাশ্মিরের তৎকালীন শাসক ছিলেন হরি সিং। একদিকে জনসংখ্যা মুসলিম প্রধান অন্য দিকে শাসক ছিলেন হিন্দু- যে কারণে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না কোন দেশের অংশ হবে কাশ্মির। তবে ওই সময় পাকিস্তানের সাথে পরিহন ও অন্যান্য সেবা বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

উপত্যকার মুসলিমদের ওপর হামলার খবর এবং মহারাজা হরি সিংয়ের সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করার কৌশলকে ষড়যন্ত্র ভেবে ১৯৪৭ সালের পাকিস্তানের একদল উপজাতীর গোষ্ঠির লোক কাশ্মিরে অনুপ্রবেশ করে। তাদের ঠেকাতে ভারতের কাছে সামরিক সহযোগিতা চান হরি সিং। সেই যে ভারতীয় বাহিনী কাশ্মিরে প্রবেশ করে, এরপর আর বের হয়নি।
কাশ্মীর কোন দেশের কত অংশ
ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্ড ব্যাটেন কাশ্মিরকে অস্থায়ীভাবে ভারতের সাথে যুক্ত করার পক্ষে মত দেন এবং ভোটাভুটি স্থগিত করেন। ওই মাসেই কাশ্মিরের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নীতির ওপর ভারতকে কর্তৃত্ব করার সুযোগ দিয়ে নয়া দিল্লির সাথে চুক্তি করেন রাজা হরি সিং। ভারতীয় সেনারা কাশ্মিরে দুই তৃতীয়াংশ দখল করে নেয়। উত্তরে বাকি অংশটুকু থাকে পাকিস্তানের অধীনে। ১৯৫০ এর দশকের কাশ্মিরের পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলো দখল করে নেয় চীন।
ভারতীয় সেনারা কাশ্মিরে প্রবেশের পর পাকিস্তানের সাথে ভারতের দ্বন্দ্ব শুরু হয় উপত্যকাটি নিয়ে। ভারতের দাবি, হারি সিং তাদের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে অঞ্চলটিতে ভারতীয় সেনাদের উপস্থিতির বৈধতা দিয়েছেন। অন্য দিকে পাকিস্তান বলে, চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই ভারতীয় সেনারা সেখানে প্রবেশ করে এবং রাজাকে চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করে। এরপর পাকিস্তানের সাথে কাশ্মিরের যে স্থিতিঅবস্থার চুক্তি হয়েছিলো, সেটিকে উপেক্ষ করে কাশ্মিরকে নিজেদের মতো চালাতে থাকে ভারত।
কাশ্মির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে একটি গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব দেয় পাকিস্তান। কিন্তু ভারত বলে, ভারতের জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেয়ার মাধ্যমে কাশ্মিরীরা ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছে। পাকিস্তান বিষয়টিকে জাতিসঙ্ঘে নিতে চাইলে ভারত শিমলা চুক্তির দোহাই দিয়ে নিজেদের মধ্যে সমাধানের যুক্তি দেখায়। এরপর অঞ্চলটি নিয়ে সেই অবস্থাই চলতে থাকে। তবে কিছু কাশ্মিরী কোন দেশর সাথে যুক্ত না হলে নিজেরা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে মত দিতে শুরু করে। যদিও তাদের সেই স্বপ্ন নয়া দিল্লি পূরণ হতে দেয়নি। বরং ক্রমশই বাড়াতে থাকে সেনা উপস্থিতি ও আন্দোলকারীদের ওপর নিপীড়ন। ২০১৯ সালে কাশ্মিরের বিশষ মর্যাদা বাতিল করে ভারত। অঞ্চলটির রাজ্য মর্যদাও কেড়ে নিয়ে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করা হয়। ( তথ্যসূত্র বিবিসি)
কাশ্মীর ধর্ম
ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের মোট আয়তন ৪২ হাজার ২৪১ বর্গ কিলোমিটার। আর আজাদ কাশ্মির নামে পরিচিত পাকিস্তানের অংশ যে কাশ্মির তার আয়তন ১৩ হাজার ২৯৭ বর্গকিলোমিটার। আজাদ কাশ্মিরের রাজধানী মুজাফফরাবাদ। আজাদ কাশ্মির পাকিস্তানের একটি প্রদেশ।
অন্য দিকে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের রাজধানী শ্রীরনগর। কাশ্মিরের জনসংখ্যার বেশির ভাগই মুসলিম। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের ৬৯ শতাংশ জনসংখ্যা মুসলিম। ২৮ শতাংশ হিন্দু। আছে কিছু বৌদ্ধ ও শিখ। আজাদ কাশ্মিরের জনসংখ্যা প্রধানত মুসলিম। সেখানেও সামান্য কিছু অন্য ধর্মাবলম্বী রয়েছে।
কাশ্মীরের সৌন্দর্য
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার কাশ্মির। জায়গাটিকে যে কারণে ভূস্বর্গ নামে ডাকা হয়। পাহাড়, ঝড়না, সবুজে ঘেরা উপত্যকা, লেক, নদৗ সব কিছুই আছে কাশ্মিরে। এই সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। শীতে পাহাড়ি অঞ্চল বরফে ঢেকে সাদা সমুদ্রে পরিণত হয়। আঙ্গুর ও আপেল বাগান দেখলে প্রাণ জুড়িয়ে যায় ভ্রমন পিপাসুদের। পাহাড়ের কোল বেয়ে ওঠা রাস্তাগুলো তখন বিপজ্জনক হলেও পর্যটকরা সৌন্দর্য দেখতে সেখানে হাজির হন। অঞ্চলটিতে মুঘল আমলের কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনাও রয়েছে।

শীত ও গ্রীষ্মে দ্ইু রকম সৌন্দর্য থাকে কাশ্মিরে। যে কারণে সারা বছরই সেখানে পর্যটনের ভিড় লেগে থাকে। শ্রীনগরে মোঘল গার্ডেন, টিউলিপ গার্ডেন বিখ্যাত জায়গা। আছে হযরতবাল মসজিদ। মহানবী সা. এর পবিত্র চুল সংরক্ষিত আছে এখানে। যে কারণে মসজিদটির এমন নামকরণ হয়েছে। শ্রীনগর শহরটাও সৌন্দর্যে ভরপুর। ডাল লেকের বুকে ভাসমান বাজার আকর্ষণীয় একটি স্থান। বরফের সৌন্দর্য দেখার জন্য গুলমার্গ, পেহেলগাম ও সোনামার্গ যেতে হবে। মোট কথা কাশ্মিরে দর্শনীয় স্থানের অভাব নেই।
কাশ্মীর কিসের জন্য বিখ্যাত
কাশ্মির বিখ্যাত তার প্রাকৃতিকে সৌন্দর্যের জন্য। একটি অঞ্চলে এত ধরনের এরকম সৌন্দর্য বিশে^র আর কোথাও নেই। তবে কাশ্মিরী পণ্যের সুনামও রয়েছে। কাশ্মিরের রেশম, মশলা ও ফল বিখ্যাত। কাশ্মিরের শাল বাংলাদেশের মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। দারুণসব শাল তৈরি হয় সেখানে। এছাড়া কাশ্মিরের কম্বল ও জায়নামাজেরও খ্যাতি আছে।
ফেসবুক পেজে যুক্ত হতে লাইক দিন : আহমেদ


