ইউরোপ মহাদেশের অন্তর্গত বিভক্ত শাসনের ছোট এক দেশ সাইপ্রাস । পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বুকে ছোট্ট দ্বীপটি দুই বৃহৎ প্রতিবেশীর দ্বন্দ্বের জেরে বিভক্ত হয় স্বাধীনতা লাভের মাত্র ১৫ বছরের মাথায়। অনেক চেষ্টায়ও সেই ভাঙন আর জোরা লাগেনি। তুরস্ক ও গ্রিসের বিরোধের মধ্যে পড়ে সাইপ্রাস দ্বীপে এখন পৃথক দুটি রাষ্ট্র।
তবে এসব কিছু সত্ত্বে দ্বীপটি তার জৌলুস হারায়নি। সৌন্দর্য আর ইতিহাস ঐতিহ্যের কারণে সাইপ্রাসে প্রতি বছর হাজির হয় লাখ লাখ পর্যটক। চলুন জেনে আসি সাইপ্রাস দেশটি সম্পর্কে
এক নজরে সাইপ্রাস দেশ
আয়তন : ৯ হাজার ২৫১ বর্গ কিলোমিটার
জনসংখ্যা : ১১ লাখ ৮৯ হাজার
আদি বসতি : খ্রিস্টপূর্ব ১০ সহস্রাব্দ
জাতিগত গোষ্ঠি : গ্রিক সাইপ্রিয়ট, তুর্কি সাইপ্রিয়ট ও আর্মেনিয়
ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা লাভ : ১৯৬০ সাল
বিভক্তি : ১৯৭৫
ধর্ম : ৭০ শতাংশ খ্রিস্টান, ১৮ শতাংশ মুসলিম, বাকিরা অন্যান্য ধর্মাবলম্বী
মুদ্রা : দক্ষিণ সাইপ্রাসে ইউরো, উত্তর সাইপ্রাসে তুর্কি লিরা

সাইপ্রাসের আয়তন ও অবস্থান
ভূমধ্যসাগরের সবচেয়ে পূর্ব দিকের দ্বীপ সাইপ্রাস। ৯ হাজার ২৫১ বর্গ কিলোমিটারের দ্বীপটির পশ্চিমে গ্রিস, পূর্বে লেবানন, সিরিয়া ও ইসরাইল, উত্তরে তুরস্ক ও দক্ষিণে মিসর। সাইপ্রাসকে বলা হয় গ্রিকদের প্রেম ও সুন্দরের দেবী আফ্রোদিতির জন্মস্থান। যে কারণে দ্বীপটিতে ইউরোপের দেশগুলোর যুগলদের ছুটি কাটানোর ভীড় নামে। অনেকে এটিকে বলেন রোমান্টিক হলিডে ডেস্টিনেশন।
তবে দেশটি রাজনৈতিকভাবে বিতর্কীত একটি ভূখণ্ড। জনসংখ্যা জাতিগতভাবে মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত- গ্রিক সাইপ্রিয়ট ও তুর্কি সাইপ্রিয়ট। শাসন নিয়ে গ্রিক ও তুর্কিদের মধ্যে বহু পুরনো বিরোধ। যা গড়ায় সামরিক সঙ্ঘাতে। এক পর্যায়ে দেশটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়।
গ্রিক সাইপ্রাস ও তুর্কি সাইপ্রাস
গ্রিক সাইপ্রাস হিসেবে পরিচিত দক্ষিণাংশের সরকারি নাম রিপাবলিক অব সাইপ্রাস। এই অংশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্র। রাজধানী নিকোসিয়া। দ্বীপের মাঝখানে অবস্থিত রাজধানী শহরটির দুই অংশ অবশ্য দুই পক্ষের দখলে। দেশটির উত্তরাংশের নাম টার্কিশ রিপাবলিক অব নর্দার্ন সাইপ্রাস। যার রাজধানী উত্তর নিকোসিয়া। তুর্কি সাইপ্রাসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। শুধুমাত্র তুরস্ক একে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এই অংশেরও পৃথক পার্লামেন্ট, সরকার সবই আছে। যদিও জাতিসঙ্ঘসহ পশ্চিমা দেশগুলো তুর্কি সাইপ্রাসকে দক্ষিণ সাইপ্রাসের বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল মনে করে। মোট ভূখণ্ডের ৫৯ শতাংশ দক্ষিণে আর ৩৬ শতাংশ উত্তরের দখলে। বাকি ৪ শতাংশ আছে জাতিসঙ্ঘের তত্তাবধানে বাফার জোন হিসেবে।
যেভাবে ভাগ হয় সাইপ্রাস
১৯৬০ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে দ্বীপটি পরিচালিত হয়ে আসছিল গ্রিক ও তুর্কি সাইপ্রিয়টদের সম্মিলিত শাসনে। সংবিধান প্রণয়নের সময় ঠিক করা হয় দ্বীপ দেশটির প্রেসিডেন্ট গ্রিকদের মধ্য থেকে এবং ডেপুটি প্রেসিডেন্ট হবেন তুর্কিদের মধ্য থেকে। পার্লামেন্টের আসনগুলোও জনসংখ্যার অনুপাতে ভাগ করে দেয়া হয়; কিন্তু দুই জাতির বিরোধ তাতেও কমেনি। ১৯৭৪ সালে গ্রীক জাতীয়তাবাদী গ্রীক সাইপ্রিয়টরা গ্রীসের সামরিক জান্তার সহায়তায় একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়।
আরো পড়ুন :
তারা দ্বীপটিকে গ্রিসের সাথে একীভূত করতে চেষ্টা চালায়। এ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মহল বাধা না দেয়ায় ৫ দিন পর তুরস্ক সরাসরি সামরিক অভিযান চালায়। চার সপ্তাহের যুদ্ধের পর দ্বীপটির উত্তরাংশ দখলে যায় তুর্কি সামরিক বাহিনীর। রাজধানীর একটি অংশসহ দেশের উত্তরাঞ্চল দখলে নেয় তুর্কি সেনারা।
১৯৭৫ সালে উত্তর সাইপ্রাস তুর্কি ফেডারেটেড স্টেট অফ সাইপ্রাস নাম নিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৯৮৩ সালের ১৫ নভেম্বর এর নাম তুর্কি প্রজাতন্ত্র উত্তর সাইপ্রাস রাখা হয়। দেশটিতে এখনো আছে তুরস্কের সৈন্য। আর দুই সাইপ্রাসের মাঝখানের বাফার জোনে অবস্থান করছে জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী।
এরপর থেকে অনিন্দ সুন্দর এই দ্বীপ দেশটি সেভাবেই পরিচালিত হয়ে আসছে। ২০০২ সালে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনান দ্বীপটির ঐক্যের জন্য আলোচনা শুরু করেছিলেন। উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পরে ২০০৪ সালে ঐক্যের একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়।
এ পরিকল্পনাটি জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন কওর; কিন্তু তুর্কি সাইপ্রিয়টরা এই পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও গ্রীক সাইপ্রিয়টদের অধিকাংশই এটি প্রত্যাখ্যান করে। যার ফলে কফি আনানের সেই চেষ্টা আর সফল হয়নি। এরই মধ্যে ২০০৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সদস্য পদ দেয় দক্ষিণ সাইপ্রাসকে। এর ফলে ঐক্য প্রক্রিয়া আরো পিছিয়ে যায়।
সাইপ্রাস দেশটি কেমন
দ্বীপের সবচেয়ে বড় শহর নিকোসিয়া উভয় অংশের রাজধানী। দ্বীপের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র নিকোসিয়া, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও এই শহরকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়। শহরটির দক্ষিনাংশ গ্রিক সাইপ্রাসের রাজধানী, আর তুর্কি সাইপ্রাসের রাজধানী অংশকে বলা হয় নর্থ নিকোসিয়া।
শহরের পুরাতন অংশের মূল সড়ক লেডরা স্ট্রিটের ওপর দুই অংশের ক্রসিং। দুই ক্রসিংয়ের মাঝখানে আছে জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে বেসামরিক জোন। পরিত্যক্ত এই অঞ্চলটিতে এখন কোন বাসিন্দা নেই। দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকার পর ২০০৩ সালে শুরু হয়েছে এক অংশ থেকে অন্য অংশে যাতায়াতের সুযোগ।

পুরাতন নিকোসিয়া অনেকটাই সুনশান। দুই দেশের মধ্যেই পড়েছে পুরাতন সিটি। এখানে আছে প্রাচীন আমলের অনেক স্থাপনা। উত্তর অংশে আছে ওসমানীয় যুগের অনেক মসজিদ, প্রাসাদসহ অন্যান্য স্থাপনা।
দিনে রাতে ৫ বার চারদিকের অনেকগুলো মসজিদ থেকে একযোগে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি। আর দক্ষিণাংশে গ্রিক, রোমান ও বাইজেন্টাইন যুগের সম্রাটদের প্রাসাদ, জাদুঘর ইত্যাদি বেশি। নিকোসিয়ার নতুন ও পুরাতন অংশের চিত্রটা পুরোপুরি আলাদা। একদিকে যেমন নিরিবিল আর পুরাতন স্থাপনায় ভরা ওল্ড নিকোসিয়া, অন্য দিকে চকচকে নগরী আধুনিক নিকোসিয়া। আধুনিকতার দিক থেকে অবশ্য উত্তরের চেয়ে দক্ষিণ অংশ এগিয়ে গেছে অনেকটাই। এই নগরী আধুনিকতায় ইউরোপের সাথে পুরোপুরি তাল মিলিয়ে উঠতে না পারলেও সে চেষ্টায় যেন কমতি নেই।
সাইপ্রাসের মুসলিম
নাগরিকদের জীবনযাত্রায় স্পষ্টই ইউরোপীয় প্রভাব। সেটা দুই অংশেই। উত্তরাংশের তুর্কি সাইপ্রিয়টদের ৯৯ শতাংশ মুসলিম হলেও তাদের সংস্কৃতিতে আছে যথেষ্ট পরিমানে ইউরোপীয় প্রভাব। তুরস্কের সাথেও সংস্কৃতিগত যথেষ্ট মিল রয়েছে বাসিন্দাদের। তুরস্কের সাথে দেশটি রাজনৈতিক যোগাযোগও রয়েছে ব্যাপক।
ছোট্ট দ্বীপ সাইপ্রাস প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ইতিহাস ঐতিহ্যে ভরপুর।
প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটকের পা পড়ে সাইপ্রাসে। আর দর্শনীয় স্থানের কথা এলে সবার আগে বলতে হবে পাফোস শহরের কথা। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় এই শহরটিকেই বলায় গ্রিক প্রেমের দেবী আফ্রোদিতির জন্মস্থান। ভূমধ্যসগারের বিশাল সৈকত ছাড়াও পাফোসে আছে প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার অনেক নিদর্শন ও তার ধ্বংসাবশেষ। এছাড়াও এখানে আছে ষষ্ঠদশ শতকে ওসমানীয় শাসকদের নির্মিত একটি দুর্গ। রোমান যুগের রাজাদের সমাধিক্ষেত্রটিও পর্যটকদের কাছে আরেক আগ্রহের নাম। এই শহরটি ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। এছাড়া পাফোস চিড়িয়াখানায় গেলে দেখা যাবে ২১০ প্রজাতির পশু-পাখি।

আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট
রোমান্টিক পর্যটকদের কাছে সাইপ্রাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা হিসেবে পরিচিত আরেক উপকূলীয় শহর আইয়া নাপা।
ভূমধ্যসাগরের নীল পানি আর সৈকতের সাদা বালুর ওপর চকচকে রোদ এক অপরুপ পরিবেশের জন্ম দেয়। এই সৈকতে পর্যটন মৌসুমে ঢল নামে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রোমান্টিক জুটিদের। প্রিয়জনের ছুটি উপভোগ করতে তারা ছুটে আসেন এখানে। রাতের আইয়া নাপা আরো আকর্ষণীয়। আলোঝলমলে সৈকত ও আশপাশের রেস্ট্রুরেন্ট, বার আর ড্যান্স ক্লাবগুলো যেন জেগে ওঠে তখন। এক সময়ের জেলেদের গ্রাম আইয়া নাপা এখন আধুনিক এক উপকূলীয় নগরী। এখানকার নিশি সৈকত ও ওয়াটার ওয়ার্ল্ডে সারা বছরই গেলে থাকে পর্যটকদের ভীড়।
আরো পড়ুন :
সাইপ্রাসের সবচেয়ে প্রাচীন ইতিহাসের দেখা মিলবে লারনাকা শহরে।
৬০০০ বছরের পুরনোর এই শহর এখনো বুকে নিয়ে দাড়িয়ে আছে প্রাচীন অনেক স্থাপনা। এছাড়া কাইরেনিয়ার সমুদ্রে বোটে চড়ে বেড়ানো কিংবা ট্রুডোস মাউন্টেন দেখতেও পর্যটকদের ভীড় কম হয় না। ছোট্ট দেশটি তার মোট জাতীয় আয়ের বড় একটি অংশ পায় বিদেশী পর্যটকদের কাছ থেকে।
ইউরোপীয় পর্যটকটরা দুহাতে অর্থ খরচ করেন ছুটি কাটাতে সাইপ্রাসে এসে। সাইপ্রাসও তাদের আতিথিয়েতা দিতে কমতি রাখে না এতটুকু। পর্যটকদের জন্য সব ব্যবস্থা করতে দুই সাইপ্রাসের সরকার যেন প্রতিযোগিতায় নামে। কে কত বেশি পর্যটক আকৃষ্ট করতে পারে তার একটি অলিখিত প্রতিযোগীতা আছে দুই অংশের মাঝে। যার ফলে দ্বীপটি দ্রুত উন্নতি করছে পর্যটন শিল্পে।
সাইপ্রাসের ভিসা
দ্বীপটির শিক্ষা ব্যবস্থায় আছে ইউরোপীয় ধারার ছাপ। যে কারণে এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক শিক্ষার্থী প্রতি বছর স্টুডেন্ট ভিসায় সাইপ্রাস যায়।
বাংলাদেশ থেকেও প্রচুর শিক্ষার্থী প্রতিবছর সাইপ্রাসের ভিসার জন্য আবেদন করে। অবশ্য অনেকের কাছে এর পেছনে শিক্ষার চেয়েও বেশি থাকে সাইপ্রাস হয়ে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে ঢোকার স্বপ্ন। তবে যাই হোক সাইপ্রাসের বিশ্ববিদ্যালয় গুলো প্রতি বছর অনেক বিদেশী শিক্ষার্থীদের ভর্তি হওয়ার সুযোগ দেয়। আবার এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীদের চাহিদা আছে পশ্চিমা বিশ্বের নামী দামী প্রতিষ্ঠানগুলোতে।


