ধারাবাহিক অস্থিতিশীলতার এক দেশ লেবানন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নানান কারণে দেশটিতে সঙ্কট লেগেই থাকে। লেবাননের এসব সঙ্কটের অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তবে এর মধ্যে একটি কারণ দেশটি নিয়ে সৌদি আরব ও ইরানের প্রভাব বিস্তারের লড়াই। উভয় দেশই লেবাননকে নিজের কব্জায় রাখতে চায়, আর এজন্য তারা ব্যবহার করে নিজ নিজ আশীর্বাদপুষ্ট নেতাদের। যে কারণে স্থিতিশীলতা আসেনি দেশটির রাজনীতিতে। ভূমধ্যসাগর উপকূলীয় ছোট্ট দেশটিতে প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুই আঞ্চলিক শক্তির লড়াইয়ের বিস্তারিত জানাবো এই লেখায়
দুটি হাতি যখন নিজেদের মধ্যে লড়াই করে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় ওই স্থানের ঘাসগুলোর। লেবাননের অবস্থাও হয়েছে এমন।
২০২১ সালের অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহের ঘটনা। ওই সময় লেবাননের নতুন দায়িত্ব নেয়া তথ্যমন্ত্রী জর্জ কোরদাহি ইয়েমেনের শিয়া হুথি বিদ্রোহীদের পক্ষ নিয়ে কিছু কথা বলেন। আর সমালোচনা করেন ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বে চলা সামরিক অভিযানের। লেবানিজ মন্ত্রীর এই বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয় সৌদি আরব। তারা রিয়াদে নিযুক্ত লেবানিজ রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করে এবং বৈরুত থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয়।
সৌদি আরবের পক্ষে অবস্থান নিয়ে একই ধরণের সিদ্ধান্ত নেয় আরো কয়েকটি উপসাগরীয় আরব দেশ। এখানেই শেষ হয়নি, এই বক্তব্যের জের ধরে লেবাননের সাথে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য স্থগিত করে সৌদি আরব। এতে বড় ধরনের সঙ্কটে পড়ে লেবানন। এমনিতেই অনেক বছর ধরে দেশটির অর্থনীতি চলছে খুড়িয়ে খুড়িয়ে, তার ওপর এই ধাক্কা সামলে উঠতে ভীষণ বেগ পেতে হয় মধ্যপ্রাচ্যের ছোট্ট দেশটিকে।
উভয় দেশই লেবাননে নিজ নিজ প্রভাব ধরে রাখতে চায়
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দেয় ইরান। ২০১৫ সালে হুথিরা দেশটির সরকারকে উৎখাত করে রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এরপর ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি আরব। দেশটিতে ইরান-সৌদি আরবের এই ছায়া যুদ্ধের অর্ধযুগ পেরিয়ে গেলেও কোন সমাধান আসেনি। হুথি বিদ্রোহীদের পক্ষ নিয়ে লেবানিজ মন্ত্রীর বক্তব্যে তাই ক্ষুব্ধ হয়েছে সৌদি আরব। আর তার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই তারা রাষ্ট্রদূত বহিষ্কার ও আমদানি-রফতানি স্থগিত করেছে।
এই ঘটনা উদাহরণ মাত্র। কয়েক যুগ ধরেই লেবানন নিয়ে প্রভাব বিস্তারের লড়াই চলছে সৌদি আরব ও ইরানের মাঝে। উভয় দেশই লেবাননে নিজ নিজ প্রভাব ধরে রাখতে চায়। এমনিতেই সাম্প্রদয়িকতার জালে পিষ্ট একটি দেশ লেবানন। দেশটির শাসনব্যবস্থাতেও আছে সাম্প্রদায়িক কাঠামো। সংবিধান অনুযায়ী লেবাননের প্রেসিডেন্ট পদটি ম্যারোনাইট খ্রিস্টানদের জন্য সংরক্ষিত। প্রধানমন্ত্রী হবেন সুন্নী মুসলিমদের মধ্য থেকে আর স্পিকার হবেন শিয়া। যে কারণে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিকে প্রতিনিয়ত সাম্প্রদায়িক বিভক্তি নিয়েই এগিয়ে চলতে হয়। আর মরার ওপর খাড়ার ঘা হিসেবে আছে দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই শক্তিধর প্রতিবেশীর লড়াই। আর এসব কিছু ফল ভোগ করতে হচ্ছে লেবাননের জনগনকে।
আরো পড়ুন :
সৌদি আরবকে যেভাবে বদলাতে চান এমবিএস
বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব কতখানি
লেবাননের সুন্নী নেতাদের ওপর প্রভাব রয়েছে সৌদি আরবের। তারা প্রায়শই এই নেতাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। অবশ্য দেশটির অর্থনীতিতেও বড় অবদান আছে সৌদি আরবের। লাখ লাখ লেবানিজ নাগরিক কাজ করে সৌদি আরবের বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। এছাড়া দেশটিতে এক সময় কোটি কোটি ডলার অর্থ সহায়তাও দিয়েছে সৌদি সরকার; কিন্তু সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠি হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ার সাথে সাথে সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে লেবাননের। হিজবুল্লাহ সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠি হলেও তারা সরাসরি জাতীয় রাজনীতিতে ভুমিকা রাখে এবং পার্লামেন্ট ও মন্ত্রীসভায় প্রতিনিধিত্ব করে। যে কারণে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, লেবাননের অস্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় কারণ এই গোষ্ঠিটি।
মাইকেল ইয়াং এর মতে, সৌদি আরব যখন থেকেই লেবাননকে ইরানি কার্ড ভাবছে, তখন থেকেই তারা দেশটিতে কাউন্টার পলিসির মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
হিজবুল্লাহকে সরাসরি পৃৃষ্ঠপোষকতা দেয় ইরান। ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হিজবুল্লাহকে প্রশিক্ষণ, অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দেয় তারা। ইসরাইলি আগ্রসন প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে হিজবুল্লাহ গঠিত হলেও তারা ক্রমশ দেশটিতে রাজনৈতিক প্রভাব জোরালো করেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে সরকারের চেয়েও বেশি প্রভাব দেখা যায় হিজবুল্লাহর। কেউ তাদের আখ্যায়িত করেন, সরকারের ভেতর আরেকটি সরকার হিসেবে।

লেবাননে ইরানি প্রভাব রুখতে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় আরব দেশগুলো সব সময়ই তৎপর। হুথিদের পক্ষ নিয়ে লেবানিজ মন্ত্রীর বক্তব্যকে দেখা হচ্ছে দেশটিতে হিজবুল্লাহর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের অংশ হিসেবে। রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তথ্যমন্ত্রী হিসেবে কোরদাহির নাম মন্ত্রীসভায় প্রস্তাব করেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট সুলেইমান ফ্রাঙ্গি। ফ্রাঙ্গি ম্যারোনাইট খ্রিস্টান হলেও হিজবুল্লার সাথে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। যে কারণে কোরদাহিকেও ভাবা হয় হিজবুল্লাহ ঘনিষ্ঠ হিসেবে। কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের বিশ্লেষক মাইকেল ইয়াং এর মতে, সৌদি আরব যখন থেকেই লেবাননকে ইরানি কার্ড ভাবছে, তখন থেকেই তারা দেশটিতে কাউন্টার পলিসির মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে মন্ত্রীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে লেবাননের সাথে সৌদি আরবের টানাপোড়েনকে তেহরান দেখছে নিজেদের কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত এক কর্মকতা নভেম্বরের শুরুতে এমনটাই দাবি করেছেন বার্তা সংস্থা রয়টার্সের কাছে।
লেবানন নিয়ে ইরান-সৌদি আরবের দ্বন্দ্ব যে এবারই প্রথম তা নয়। ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি রিয়াদ সফরে থাকতেই পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি সরকারের ওপর ইরানের প্রভাব বিস্তারকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। অভিযোগ উঠেছিল যে, রিয়াদে আটকে রেখে হারিরিকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে সৌদি সরকার। যদিও শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের মধ্যস্ততায় সে যাত্রা তিনি পদত্যাগের ঘোষণা প্রত্যাহার করেছিলেন। এবং আরেকটি বড় সঙ্কট থেকে রক্ষা পেয়েছিলো লেবানন।
আরো পড়ুন:
মুসলিম বিশ্বের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক কেমন?
রাশিয়া কেন পাকিস্তানের বন্ধু নয়?
এখানেই শেষ নয়। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পোল্যান্ডের রাজধানীতে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক একটি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও আরো ৮০টি দেশকে নিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয় ওই সম্মেলনে। সম্মেলনের মাত্র তিনদিন আগে লেবানন সফর করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ। আশ্চর্যজনকভাবে ওই সফরের সময়ই লেবানন সম্মেলনে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দেয়। শুধু তাই নয়, তারা পোল্যান্ডের ওই সম্মেলনকে ইরানবিরোধী সার্কাস হিসেবে আখ্যায়িত করে।
২০০৫ সালে লেবাননের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরিকে গাড়ি বোমা হামলায় হত্যা করা হয় রাজধানীতে। ওই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করা হয় হিজবুল্লাহকে। ওই হত্যাকাণ্ডের তদন্তেও দোষী প্রমাণিত হয়েছিল হিজবুল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠ কয়েকজন। হারিরি সমর্থকদের দাবি, লেবাননের ওপর সিরিয়ার অন্যায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কারণে সিরিয়ার ইন্ধনেই রফিক হারিরিকে হত্যা করেছে হিজবুল্লাহ।

জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগে গঠিত আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিটিও ওই হত্যাকাণ্ডের পেছনে সিরিয়ার সরকারের যোগশাসজসের আলামত পেয়েছে। ওই হত্যাকাণ্ডের পর পরই লেবাননে সিরিয়াবিরোধী হিসেবে পরিচিত আরো কয়েকজন নেতার ওপর হামলা হয়। আর সিরিয়ার প্রধানমন্ত্রী বাশার আল আসাদ যে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র সেটি কারো অজানা নয়।
রফিক হারিরি ছেলে সাদ হারিরি বর্তমানে লেবাননের সবচেয়ে বড় সৌদিপন্থী নেতা। বাবার মৃত্যুর পর দুই মেয়াদে লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন সাদ হারিরি। কাজেই দেশটিতে সৌদি আরব ও ইরানের প্রভাব বিস্তারের লড়াই বেশ পুরনো। এবং ক্রমশই তা জোরদার হচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের মিত্র হিজবুল্লাহ দেশটিতে সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খাতে ক্রমশ নিজেদের অবস্থান জোরালো করছে।

অন্যদিকে সৌদি আরবও চেষ্টা করে যাচ্ছে ইরানকে কাউন্টার দিতে। যার ফলে দুই রাষ্ট্রের এই লড়াইয়ে ভুগছে লেবানন। প্যারিস ভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল এন্ড স্ট্রাটেজিক অ্যাফেয়ার্সের অ্যাসোসিয়েট রিসার্চ ফেলো করিম বিটার এ প্রসঙ্গে বলেন, দুটি হাতি যখন নিজেদের মধ্যে লড়াই করে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় ওই স্থানের ঘাসগুলোর। লেবাননের অবস্থাও হয়েছে এমন। দুই অঞ্চলিক শক্তির লড়াইয়ের মধ্যে পড়ে হাসফাঁস করছে দেশটি।
অনেক দিন ধরেই অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে সময় পার করা লেবাননের জন্য যখন সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথ খোজার কথা তখন উল্টো তারা মুখোমুখী হচ্ছে এসব সমস্যার। পশ্চিমা দেশগুলো চাইছে অর্থনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাথে লেবাননের একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তি হোক এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা আসুক।
হিজবুল্লাহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ২০২২ সালের নির্বাচনের ফলাফলকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের মতো এবার আর হিজবুল্লাহ পার্লামেন্টে জোরালো অবস্থান নিতে পারেনি। ১২৮ সিটের পার্লামেন্টে ২০১৮ সালে ৭১ আসনে জিতেছিলো হিজবুল্লাহর জোট। এবার তারা পেয়েছে ৫৮ আসন।
বাস্তবতা হচ্ছে, লেবাননে ইরানপন্থীরা সরকারে থাকলেও সৌদি আরবের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে পারে না অর্থনৈতিক কারণে। আবার সৌদি পন্থীরা ক্ষমতায় থাকলেও ইরানকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে না হিজবুল্লাহর কারণে।
যে কারণে দুই দেশের এই রশি টানাটানির মধ্যেই চলতে হচ্ছে দেশটিকে।


