রাশিয়ার তৈরি এস-ফোর হান্ড্রেড এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের রহস্য এখনো ভেদ করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। এরই মধ্যে রাশিয়া এনেছে এই সিস্টেমের আরো উন্নত সংস্করণ এস ৫০০ মিসাইল । রুশদের দাবি, তাদের নতুন এই এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম যে কোন পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেট, কক্ষপথের নিচের দিকে থাকা স্যাটেলাইট ও হাইপারসনিক অস্ত্রকেও ধ্বংস করতে পারবে। এটিকে ডাকা হয় প্রমিথিউস নামে।
রাশিয়ার তৈরি সর্বাধূনিক এই এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবো এই লেখায়।
এস ৫০০ মিসাইল S 500 Missile defense system
রাশিয়া বলছে, শুরু থেকেই তার নতুন এই মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমকে পুরোপুরি কমব্যাট অ্যালাার্ট বা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখবে। ২০২১ সালের অক্টোবরে প্রথম সার্ভিসে যুক্ত করা হয়েছে। প্রথম ইউনিটটি মোতায়েন করা হয়েছে রাজধানী মস্কোয়। এর প্রতিটি ইউনিটের নির্মাণ খরচ ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
গ্রিক পুরাণে প্রমিথিউিস ছিলেন আগুনের দেবতা। রাশিয়া বলছে, তাদের তৈরি প্রমিথিউস ধ্বংস করতে পারবে আন্তমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক মিসাইল, হাইপারসনিক ক্রুজ মিসাইল, স্টিলথ ফাইটার, ড্রোন এমনকি পৃথিবীর কক্ষপথের নিচের অংশে থাকা স্যাটেলাইটও।
এই এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের রেসপন্স টাইম অর্থাৎ হামলা সনাক্ত করার পর মিসাইল ছুড়তে সময় লাগবে ৩ থেকে ৪ সেকেন্ড।
রাশিয়ার প্রভাবশালী সংবাদপত্র প্রাভদার এক রিপোর্টে বলা হয়, এস- ফাইভ হান্ড্রেডকে মোকাবেলা করার মত কোন ব্যবস্থা বিশ্বে নেই। এটি বিশ্বের প্রথম ও একমাত্র মহাশূন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আলমাজ-আন্তের প্রধান প্রোকৌশলী পাভেল সজিনভ ২০২০ সালের মাঝামাঝিতে রাশিয়ার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আমাদের এই সিস্টেম যুক্তরাষ্ট্রের যেকোন আক্রমণকে নিস্ক্রিয় করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের যত বিখ্যাত এন্টি এয়ার ও এন্টি মিসাইল সিস্টেম আছে তার সবগুলোকে ছাড়িয়ে যাবে।
পাল্লা ও ধ্বংস ক্ষমতা
এস ৫০০ মিসাইল S 500 Missile এর রেঞ্জ ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। এর পূর্বসূরী এস-ফোর হান্ড্রেড এর রেঞ্জ ছিলো ৪০০ কিলোমিটার। পূর্ববর্তী এক টেস্টে এই মিসাইল ৪৮০ কিলোমিটার দূরের টার্গেটে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। যেটি বিশ্বের যে কোন এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের ক্ষেত্রে রেকর্ড। এছাড়ার এর ইন্টারসেপ্টর ১৮৫ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত কাজ করে, যে কারণে এটি হাইপারসনিক ও ব্যালেস্টিক টার্গেটকেও ধ্বংস করতে পারবে। এই এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের রেসপন্স টাইম অর্থাৎ হামলা সনাক্ত করার পর মিসাইল ছুড়তে সময় লাগে ৩ থেকে ৪ সেকেন্ড। এস-ফোর হান্ড্রেড এর ক্ষেত্রে যেটি ৯ সেকেন্ড।
এস ৫০০ মিসাইল একই সাথে সেকেন্ডে ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার গতিতে উড়ে আসা ১০টি ব্যালেস্টিক ও হাইপারসনি টার্গেট সনাক্ত করতে পারে। ম্যাক ফাইভ বা শব্দের চেয়ে ৫ গুণ গতিতে আসা ক্ষেপণাস্ত্র বা মহাশূন্যযান ধ্বংস করতে পারে। ১৮০ থেকে ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত উচ্চতায় থাকা বস্তুতও এর আওতার মধ্যেই থাকবে।
এই সিস্টেমে আছে একটি কমব্যাট কমান্ড পোস্ট, যা সম্পূর্ণ অটোমেটিক। একটি রাডার কমপ্লেক্স, যাতে আছে মাল্টি ফাংশনাল ইলুমিনেশন রাডার এবং ১২টি পর্যন্ত এন্টি এয়ারক্রাফট মিসাইল লঞ্চার। রাশিয়া ও বেলারুশে নির্মিত ট্রাকের ওপর স্থাপিত হয়েছে যন্ত্রাংশগুলি। যার কারণে দ্রুত এটি যে কোন স্থানে নেয়া ও সেট করা সহজ।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কোন অস্ত্রই আর রাশিয়ার
ভূখণ্ডে আঘাত হানতে পারবে না
এর মিসাইল লঞ্চার ইউনিটটি ২০ চাকার আলাদা একটি ট্রাকের ওপর স্থাপিত। সেভেনটি সেভেন-পি-সিক্স সেল্ফ প্রোপেল্ড ট্রান্সপোর্টারটি ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার গতিতে চতুর্দিকে ঘুরতে পারে। আর এর ক্রুইজিং রেঞ্জ ৫০০ কিলোমিটার।
এস ৫০০ মিসাইল এর আবিষ্কার
২০১৫ সালে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আলমাজ-আন্তে এই সিস্টেমের যে প্রাথমিক নকশা প্রকাশ করেছিলেন, সেসময়ই জানা গেছে এই সিস্টেমের স্পেশাল ফিচারগুলো কী হতে যাচ্ছে।
এস- ফাইভ হান্ড্রেড এর সবগুলো ইউনিটই অত্যন্ত মজবুত ও দ্রুতগতির সামরিক ট্রাকের ওপর স্থাপিত। যে ট্রাকগুলো ১২, ১৬ ও ২০ চাকার। প্রতিটি ট্রাক ১৩ থেকে ২১ টন পর্যন্ত ওজন বহন করতে পারে। এর ফলে এই ডিফেন্স ব্যাটারি দ্রুত যে কোন জায়গায় নেয়া ও স্থাপন করা সহজ।
এস-৫০০ এ আছে সর্বাধূনিক অ্যাকুইজেশন এন্ড ব্যাটেল ম্যানেজমেন্ট রাডার, মাল্টিমুড এঙ্গেজমেন্ট রাডার ও এন্টি ব্যালেস্টিক মিসাইল এঙ্গেজমেন্ট রাডার। এস-৩০০ ও এস-৪০০ মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমে যেসব রাডার ব্যবহৃত হয়েছে তারচেয়ে অনেক উন্নত রূপ দিয়ে রাডারগুলো তৈরি করা হয়েছে এস- ৫০০ এর জন্য। এর রাডার ভূমিতে স্থাপিত আরো কয়েকটি রাডার সিস্টেম ও আর্লি ওয়ার্নিং স্যাটেলাইটের সাথে তথ্য আদান প্রদান করতে পারে। দুটি ব্যাটারি কমাণ্ডেও অনেকগুণ উন্নতি করা হয়েছে আগের চেয়ে।
এস- ফাইভ হান্ড্রেড এর প্রধান মিসাইল হিসেবে আছে ফোরটি-এন-সিক্স-এম সিরিজের ৩০ ফুট লম্বা দুই স্টেজের সলিড ফুয়েলের মিসাইল, যার সর্বোচ্চ গতি শব্দের চেয়ে ৯ গুণ বেশি। শতকরা ৯৫ ভাগ হামলার ক্ষেত্রে এটি নিশানা ভেদ করতে পারবে।
এই অস্ত্রে আরো যা আছে
ব্যালেস্টিক মিসাইল ও স্যাটেলাইটকে টার্গেট করার জন্য ‘প্রমিথিউসে’ ব্যবহৃত হয়েছে সম্পূর্ণ নতুন দুই ধরণের মিসাইল। রাশিয়ার তৈরি প্রথম ইনার্ট ওয়ারহেড বা বিস্ফোরকহীন ওয়ারহেড যুক্ত মিসাইল এগুলো। এই ওয়ারহেড গতিশক্তির সাহায্যে পারমাণবিক ওয়ারহেডকে ধ্বংস করবে। প্রতি সেকেন্ডে ৭ কিলোমিটার গতিতে এগুলো আঘাত হানবে টার্গেটে। ব্যালেস্টিক মিসাইল ধ্বংস করার জন্য এগুলো ২০০ কিলোমিটার উচ্চতায় আঘাত হানবে, যে কারণে মিসাইলের এর ধ্বংসস্তুপও ভূপৃষ্ঠে কোন ক্ষতির কারণ হবে না।
পরীক্ষা চালানোর সময় দেখা গেছে এস-ফাইভ হান্ড্রেড এর মিসাইল- রেকর্ড ৪৮০ কিলোমিটার দূরত্বে গিয়ে একটি টার্গেটে আঘাত হেনেছে। রাশিয়া দাবি করছে, তাদের এই এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড মার্টিন কোম্পানির তৈরি এজিএম-১৮৩ হাইপারসনিক মিসাইল ধ্বংস করতে পারবে। আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য শব্দের চেয়ে ৭ গুন গতি সম্পন্ন এই মিসাইলটি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হয়নি; কিন্তু তার আগেই রাশিয়া ঘোষণা দিয়েছে, তারা সেটিকে ভূপাতিত করতে পারবে।
যে কারণে রাশিয়ার এই সর্বাধূনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকে পশ্চিমাদের ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। রাশিয়ার দাবি সত্যি হলে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কোন অস্ত্রই আর রাশিয়ার ভূখণ্ডে আঘাত হানতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের এফ-৩৫ জয়েন্ট স্ট্রাইক ফাইটার, এফ-২২ র্যাপটর ফাইটারসহ সব বিমানই ধরা পড়বে এর রাডারে। অনেকগুলো উচ্চগতির ও দীর্ঘ তরঙ্গযুক্ত রাডার যুক্ত থাকায় এই ডিফেন্স ব্যটারির পক্ষে সম্ভব হতে পারে এফ-৩৫ কিংবা এফ-২২ এর মতো ফাইটারকে চিহ্নিত করা।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন জেভেজদা টিভির এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, আর্লি ওয়ার্নিং স্যাটেলাইট ও দিগন্ত বিস্তৃত রাডারের সাহায্যে পাওয়া সম্ভাব্য হামলা বিশ্লেষণ করবে এস-ফাইভ হান্ড্রেড এবং গুরুত্ব বিবেচনা করে টার্গেট নির্ধারণ করবে। প্রকৃত হুমকি নয় এমন টার্গেটকেও বেছে বেছে বাদ দিতে পারবে এটি এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে আসল টার্গেটটিকে ধ্বংস করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবেলায় এস ৫০০
তবে যুক্তরাষ্ট্রের জ্যামিং প্রযুক্তির বিপক্ষে এস-ফাইভ হান্ড্রেড কতটা সফল হবে সেটি স্পষ্ট নয়। ২০২১ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ বাহিনীর পক্ষ থেকে দেশটির প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রেথনের সাথে ১৭২ মিলিয়ন ডলারের একটি কাজের চুক্তি করা হয়েছে। কাজটি ছিলো- এয়ারক্রাফটে স্থাপনযোগ্য নেক্সট জেনারেশন মিড-ব্যান্ড জ্যামার তৈরির।
এয়ার ডিফেন্স ও কমিউনিকেশন সিস্টেমের বিপক্ষে ইলেকট্রনিক্স অ্যাটাকই হবে এই জ্যামারে কাজ। এর ফলে প্রতিপক্ষের রাডারের পক্ষে বিমানকে চিহ্নিত করার সম্ভব হবে না। রেথন ইলেকট্রনিক্স ওয়ারফেয়ার সিস্টেমের ভাইস প্রেসিডেন্ট আনাবেল ফ্লোরেস বলেন, এর ক্ষমতা আছে একই সাথে অনেকগুলো রাডারের জ্যামিং করার, যার ফলে মার্কিন নৌ বাহিনীর ইলেকট্রনিক্স অ্যাটাকের গতিপথই পাল্টে যাবে।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে তাদের নতুন এই নেক্সট জেনারেশন জ্যামার হাতে এলে রাশিয়ার যে কোন রাডারকেই ফাঁকি দিতে পারবে তাদের যুদ্ধবিমান।
রাশিয়ার এস-ফাইভ হান্ড্রেড এই নেক্সট জেনারেশন জ্যামারের বিপক্ষে কিভাবে কাজ করবে কিংবা কতটা সফল হতে পারবে তার ওপর নির্ভর করবে দুই দেশের সামরিক সক্ষমতার অনেক কিছু। এই মার্কিন প্রযুক্তি কি রাশিয়ার রাডারকে অন্ধ করে দিতে পারবে? কিংবা রাশিয়ার সর্বাধূনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের কী এমন কোন প্রযুক্তি আছে যা এখনো প্রকাশ করা হয়নি? হয়তো জানা যাবে সামনের দিকগুলোতে।
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন : আহমেদ স্টোর


