বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র ইউরোপ। বিশ্বে যে কোন প্রান্তের একজন ফুটবলারের স্বপ্ন থাকে ইউরোপের ফুটবলে জায়গা করে নেয়ার। তবে প্রচণ্ড প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ এসব ফুটবল আসরে খেলতে পারেন শুধু সেরারাই। শরীরে বাংলাদেশী রক্ত বয়ে চলা হামজা চৌধুরী (Hamza Choudhury) তাদেরই একজন। বাংলাদেশের ফুটবল যখন ক্রমশই তলানির দিকে যাচ্ছে সেখানে ইউরোপের ফুটবলে আলো ছড়াতে শুরু করেছেন এই বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত তরুণ।
ইউরোপে হামজা চৌধুরী
ইউরোপে বাংলাদেশী সংযোগ নিয়ে কারো খেলা এই প্রথম। যেখানে মেসি, রোনালদো, মোহাম্মাদ সালাহরা খেলেন সেখানে কারো পরিচয় বাংলাদেশী হিসেবে পাওয়া গেলে সেটি আমাদের জন্য গর্বেরই। মাথা ভর্তি ঝাকড়া চুলের এক মিডফিল্ডার যখন বিশ্বের বাঘা বাঘা ফুটবলারদের সাথে বল দখলের লড়াইয়ে নামেন, তাকে দেখে নিশ্চয়ই বাড়তি একটা ভালো লাগা কাজ করে বাংলাদেশী দর্শকদের।
ড্রেসিং রুম থেকে বের হবার সময় আয়াতুল
কুরসি পড়ি, আরো ছোট ছোট কিছু দোয়া
পড়ি যেগুলো মা আমাকে শিখিয়েছেন।
পেশাদার ফুটবলের সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ আসরগুলোর একটি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ English Premier League। সেখানে খেলছেন মিডফিল্ডার হামজা দেওয়ান চৌধুরি। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে ইতোমধ্যেই সমালোচকদের নজর কেড়েছেন। প্রতিপক্ষের আক্রমণ ব্যর্থ করে দেয়ার পাশাপাশি মাঝমাঠ থেকে ফরোয়ার্ডদের বল সরবরাহ করাই তার কাজ। ট্যাকলিংয়ে দারুণ দক্ষ হামজা। পাশাপাশি ড্রিবলিং আর গতিও রয়েছে তার খেলায়। ট্রান্সফার মার্কেট ডট কমের তথ্য অনুযায়ী হামজার বর্তমান মার্কেট ভ্যালু ৮ থেকে ১০ মিলিয়ন ইউরো। অবশ্য লেস্টারের ঘরের ছেলে হামজা আপাতত ক্লাবটিতে থেকেই নিজের অবস্থান শক্ত করতে চান।

বাংলাদেশের হামজা চৌধুরী
১৯৯৭ সালে পহেলা অক্টোবর ইংল্যান্ডের লাফবারা শহরে জন্ম হামজার। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সূত্রে জানা যায়, তার মা বাংলাদেশী ও বাবা ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দ্বীপ দেশ গ্রেনাডার নাগরিক ছিলেন। এই দম্পতির বসবাস ছিল ইংল্যান্ডে। তবে হামজার জন্মের পর তার বাবা-মায়ের বিয়ে ভেঙে যায়। ছোট্ট হামজা থেকে যান মায়ের কাছে।
বিচ্ছেদের পর হামজার মা রাফিয়া চৌধুরী আবার বিয়ে করেন বাংলাদেশী ব্রিটিশ নাগরিক দেওয়ান গোলাম মোর্শেদ চৌধুরীকে। এই পরিবারেই বেড়ে ওঠা হামজার। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে সবার বড় হামজা। সৎ বাবা ও মা, দুজনের বাড়িই বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলায়। এই পরিবারটি বিলেতে থাকলেও দেশের সাথে তাদের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। যে কারণে ইংল্যান্ডে জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও বাংলাদেশী সংস্কৃতির সাথে পুরোপুরি পরিচিত হামজা। বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারেন।

অবশ্য প্রমিত বাংলার চেয়ে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতেই হামজা বেশি অভ্যস্ত। কারণ পরিবারে সেই ভাষাটির চর্চাই বেশি। ঢাকার একটি পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে হামজা একবার বলেছেন, ‘২০ বারের বেশি বাংলাদেশে গিয়েছি। গ্রামে কাদার মধ্যে ফুটবল খেলেছি। ইংল্যান্ডে নিজের বাড়িতে সব সময় বাংলাতেই কথা বলি।’
হামজার বেড়ে ওঠা
গত কয়েক বছর ধরে শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে ব্যস্ততার কারণে দেশে আসার সুযোগ এখন কমই পান হামজা। তবে এক সময় প্রতি বছরই বেড়াতে আসতেন মাতৃভূমি বাংলাদেশে। ব্রিটিশ মুল্লুকে বাংলাদেশীদের অগ্রযাত্রার পথে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করা হামজা নিজের বাংলাদেশী শেকড় নিয়ে গর্ববোধ করেন। সব সময়ই বলেন- আমার বাবা-মা দুজনেই বাংলাদেশী। যে কারণে পাশ্চাত্য ফুটবলের রঙিন দুনিয়ায় বাংলাদেশের নামটিও বারবার উচ্চারিত হচ্ছে।
ছোটবেলা থেকেই বেশ দুরন্ত স্বভাবের হামজার ঝোঁক ছিল ফুটবলের প্রতি। যে কারণে কারণে চার বছর বয়স থেকেই ফুটবল খেলতে নিয়ে যেতেন মা। পাঁচ বছর বয়সে তাকে লাফবারা ফুটবল ক্লাবে ভর্তি করিয়ে দেয়া হলে শুরু হয় প্রাতিষ্ঠানিক ফুটবল চর্চা। ছয় বছর বয়সে এক ম্যাচ খেলতে গিয়ে নটিংহাম ফরেস্ট ক্লাবের কর্মকর্তাদের চোখে পড়েন হামজা। কয়েক দিন পর বিখ্যাত ক্লাব লেস্টার সিটির কর্মকর্তারাও আগ্রহ দেখায় তার ব্যাপারে। উভয় দলের আগ্রহ থাকলেও লেস্টার সিটির অ্যাকাডেমিতে হামজাকে ভর্তি করায় পরিবার। তার জন্যই পুরো পরিবার চলে যায় ওই শহরে। স্কুল ছুটির পর সপ্তাহে দুদিন প্রশিক্ষণ আর শনি ও রোববার খেলতেন ম্যাচ। শুরু হয় এক শিশু ফুটবলারের বেড়ে ওঠা।
লেস্টার সিটিতে হামজা চৌধুরী
লেস্টার সিটিতে বেড়ে উঠলেও হামজার সিনিয়র ফুটবলে অভিষেক হয়েছে অবশ্য ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় স্তরের দল বারটন আলবিয়নের হয়ে। লেস্টারের সিনিয়র দলের সাথে যুক্ত হলেও অভিষেক হওয়ার আগে ক্লাবটি তাকে ধারে খেলতে পাঠায় বারটন আলবিয়নে। দুই মৌসুমে ক্লাবটির হয়ে ২৬টি ম্যাচ খেলে ফিরে আসেন লেস্টারে।
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ইএফএল কাপের ম্যাচে লিভারপুলের বিপক্ষে লেস্টারের জার্সিতে ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে খেলার স্বপ্ন পূরণ হয় হামজার। পরের মাসে টটেনহামের বিপক্ষে ম্যাচে অভিষেক হয় প্রিমিয়ার লিগে। ২০১৯ সালের আগস্টে হামজার সাথে নতুন করে চার বছরের চুক্তি করে লেস্টার সিটি। এরপর লেস্টার সিটির অনূর্ধ-২৩ দলের অধিনায়কও হয়েছেন তিনি।
ক্লাবের হয়ে কয়েকটি ম্যাচ খেলেই ইংল্যান্ড ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নজর কাড়েন হামজা চৌধুরী । যার ফলস্বরূপ ডাক আসে ইংল্যান্ডের জার্সিতে খেলার। ২০১৮ সালে ইংল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে প্রথমবারের মতো মাঠে নামেন। চীনের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ২-১ গোলে জয় পেয়েছিল তার দল।
এরপর থেকে এই দলের নিয়মিত সদস্য হামজা। ২০১৯ সালে জুনে ইতালিতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ-২১ ইউরোপীয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ইংল্যান্ড দলের একাদশে ছিলেন নিয়মিত। বয়সভিত্তিক দলে মিডফিল্ডার হিসেবে আস্থা অর্জন করায় হয়তো ইংল্যান্ড জাতীয় দলের ডাক আসবে যেকোন দিন। হামজা আপাতত সেই অপেক্ষাতেই দিন গুনছেন। আর চেষ্টা করছেন মাঠে নিজের সেরাটা দিতে।
আরো পড়ুন :
সাদিও মানে ও তার ভাঙা আইফোনের গল্প
খাবিব নুরমাগোমেদভ : মার্শাল আর্ট কিংবদন্তী
মানুষের পাশে রোনালদো, মানবিক রোনালদো
হামজার স্বপ্ন
ইংল্যান্ডের হয়ে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্নটা পুষে রেখেছেন মনের কোনে। বয়স মাত্র ২৩, সামনে রয়েছে লম্বা ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ। তাই ইংল্যান্ড জাতীয় দলে সুযোগ হোক বা না হোক, হামজা অনেক দূর যাবেন বলেই বিশ্বাস সবার।
ব্রিটিশ মুল্লুকে বড় হলেও হামজা যে বাংলাদেশকে মনে প্রাণে ধারণ করেন সেকথা আগেই বলেছি। এবার আরেকটু প্রমাণ দেই। ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল যখন ইংল্যান্ডে খেলতে গেল, হামজা তখন ইংল্যান্ড অনূর্ধ-২১ দলের হয়ে ইতালিতে ইউরোপীয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে ব্যস্ত; কিন্তু সেখান থেকেই হামজা তার বাবার জন্য অনলাইনে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের টিকিট পাঠান বাবা দিবসের উপহার হিসেবে।
সৎ বাবার সংসারে বড় হয়েছেন, তাই তাকেই অভিভাবক হিসেবে মেনে নিয়েছেন। নিজেও খোঁজ খবর রাখেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের। সাকিব আল হাসান আর মুশফিকুর রহীমের ভক্ত হামজা চৌধুরী । সুযোগ পেলে বাংলাদেশের ক্রিকেট ম্যাচ দেখেন। ইউটিউবে খুঁজে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ফুটবল ম্যাচও দেখেন।
ব্যক্তিগত জীবনে এক কন্যা সন্তানের জনক হামজা। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা পেয়েছেন ধর্ম চর্চার। শিখেছেন কোরআন পড়া। এক সাক্ষাৎকারে বিবিসিকে হামজা বলেছেন, ‘আমি ড্রেসিং রুম থেকে বের হবার সময় আয়াতুল কুরসি পড়ি, আরো ছোট ছোট কিছু দোয়া পড়ি যেগুলো আমার মা আমাকে শিখিয়েছেন।’
২০২১ সালে লেস্টার সিটির হয়ে এফএ কাপ জেতার পর মাঠে শিরোপ উৎসবের সময় ফিলিস্তিনের পতাকা প্রদর্শন করেন হামজা চৌধুরী । এর উদ্দেশ্য ছিলো নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ।

এই ভূখণ্ডে জন্ম না নিলেও বাংলাদেশকে নিজের দেশ বলে মনে করা হামজা ইংল্যান্ডের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে খেললে এদেশের ফুটবল ভক্তদের মাঝে যে ইংল্যান্ড দলের সমর্থক হু হু করে বেড়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। সেই সাথে হামজার মাতৃভূমি হিসেবে বাংলাদেশের নামটিও উচ্চারিত হবে বিশ্ব ফুটবলে।
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন : আহমেদ স্টোর


