বঙ্গোপসাগর কোথায়, এর কৌশলগত গুরুত্ব কতখানি

বঙ্গোপসাগর কোথায় অবস্থিত

আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের তিন দিকে ভারত ও একদিকে সমুদ্র। দক্ষিণে পুরোটা জুড়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি। বাংলাদেশের একমাত্র সমুদ্র উপকূল এই বঙ্গোপসাগর । এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় উপসাগর।

বঙ্গোপসাগর একটি উপসাগর

সাধারণভাবে বললে, তিনদিকে স্থলভাগ ঘেরা সমুদ্রসীমাকে উপসাগর নামে ডাকা হয়। ভারত মহাসাগরের যে অংশটা পশ্চিমে শ্রীলঙ্কা ও ভারতের দক্ষিণাংশ এবং পূর্ব দিকে মিয়ানমার ও আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে রেখে উত্তর দিলে ঢুকে পড়েছে সেটাই বঙ্গোপসাগর নাম পেয়েছে। উত্তরে এসে এটি শেষ হয়েছে বাংলাদেশের উপকূল পর্যন্ত। শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূল থেকে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের উত্তর উপকূল পর্যন্ত একটি রেখা টানলে সেটিই বঙ্গোপসাগরের শেষ সীমানা।

বঙ্গোপসাগরের আয়তন কত

অর্থাৎ ভারত মহাসাগরের একটি অংশ বা শাখা বঙ্গোপসাগর। এই সমুদ্রসীমার মোট আয়তন ২৬ লাখ বর্গকিলোমিটার। এর সমুদ্রসীমায় অধিকার রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়ার। বঙ্গোপসাগরের গড় গভীরতা ৮ হাজার ৫০০ ফুট। আর সর্বোচ্চা গভীরতা ১৫ হাজার ৪০০ ফুট।

মানচিত্রে বঙ্গোপসাগর

বঙ্গোপসাগরে বিভিন্ন দেশের রয়েছে অর্ধশতাধিক সমুদ্রসৈকত। এর মধ্যে বাংলাদেশের কক্সবাজার বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা সমুদ্রসৈকত। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের নামানুসারে কক্সবাজারের নামকরণ হয়েছে। কক্সবাজার সৈকতের দৈর্ঘ ১৫০ কিলোমিটার। কুয়াকাটাসহ বাংলাদেশের আরো কয়েকটি সমুদ্রসৈকত রয়েছে। এছাড়া ভারত, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়ায় অনেকগুলো সমুদ্র সৈকত রয়েছে এই সাগরের উপকূলে।

বঙ্গোপসাগরের তলদেশে আছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গভীর খাদ সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড। ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার প্রস্থের এই খাদের গভীরতা প্রায় চার হাজার ফুট। বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমে সুন্দরবনের দুবলার চর থেকে ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে এই খাদটি অবস্থিত। ২০১৪ সালে জায়গাটি গবেষকদের নজরে আসে। জায়গাটিতে তিমি, ডলফিন, হাঙ্গরসহ অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণীর প্রজনন কেন্দ্র। যে কারণে ওই স্থানের ১ লাখ ৭৩ হাজার হেক্টর জায়গা নিয়ে একটি সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে।

ইতিহাস

আরব সাগর থেকে বঙ্গোপসাগর হয়ে এক সময় আরব বনিকরা বাংলায় এসেছিলেন। এই অঞ্চলে ইসলামের সুমহান বানী পৌছে দিয়েছেন তারা। এরপর যুগে পর্তুগিজ, ডাচ ও ইংজের নাবিকরা এই অঞ্চলে এসেছেন ব্যবসায় করতে। প্রাচীন হিন্দুশাস্ত্রে এই সাগরটির নাম মহোদধি হিসেবে উল্লেখ ছিলো। কালিঙ্গা সাগর নামেও পরিচিত ছিলো বিভিন্ন সময়। তবে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই সাগরকে বে অব বেঙ্গল নামকরণ করে। বৃহত্তর বাংলা অঞ্চলের সাথে মিল রেখেই এমন নাম দিয়েছিলেন তারা।

গবেষকদের মতে অন্তত ৫০ মিলিয়ন বছর আগে জন্ম বঙ্গোসাগরের। এই উপসাগরে উপকূল রয়েছে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কার। বাংলাদেশ এখানে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার টেরিটোরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল অর্থনৈতিক অঞ্চল ও চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সব ধরণের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের উপর সার্বভৌম অধিকার ভোগ করছে।

এই সাগরে পতিত হয়েছে গঙ্গা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, মহানদী, কৃষ্ণা, ইরাবতি, কাবেরীসহ অনেকগুলো নদী। এর মধ্যে বাংলাদেশ, চীন, নেপাল ও ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র সবচেয়ে বড় নদী হিসেবে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। বঙ্গোপসাগরের তীরেই রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। এই উপসাগরে বাংলাদেশের রয়েছে তিনটি সমুদ্র বন্দর- চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা। এছাড়া ভারতের আছে কলকাতা, বিশাখাপত্মম, চেন্নাইসহ বেশ কয়েকটি সমুদ্রবন্দর। আর মিয়ানমারেরও আছে একটি সমুদ্রবন্দর।

বঙ্গোপসাগরের দ্বীপ

অনেকগুলো দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জ আছে বঙ্গোপসাগরে। এর মধ্যে ভারতের অধীনে থাকা আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ও বাংলাদেশর সেন্ট মার্টিনস আইল্যান্ড অন্যতম। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের মালিকানায় দ্বীপের সংখ্যা অন্তত ৩৬টি। আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ রয়েছে ভারতের নিয়ন্ত্রণে। ৫৩৭টি ছোটবড় দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দ্বীপপুঞ্জের মাত্র ৩৭টিতে মানব বসতি আছে। মিয়ানমার উপকূলেও বেশ কিছু দ্বীপপুঞ্জ রয়েছে।

১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর সাতক্ষীরা জেলার হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনায় একটি নতুন দ্বীপ জেগে ওঠে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এর মালিকানা দাবি করে নাম দেয়া হয় দক্ষিণ তালপট্টি। অন্যদিকে ভারতও নিজেদের মানচিত্রে এর অধিকার দাবি করে, নাম দেয় পূর্বাশা বা নিউ মুর। এরপর ভারত ১৯৮১ সালে সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে দ্বীপটিতে নিজেদের পতাকা ওড়ায়। তবে নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে তালপট্টি দ্বীপটি আবার সমুদ্রগর্ভে হারিয়ে যায়।

সেন্ট মার্টিন্স আইল্যান্ড

বহু কাল থেকে বহু ঝড় জলোচ্ছ্বাসের উৎস এই সাগর কেড়ে নিয়েছে লাখ লাখ প্রাণ। সিডর, আইলা, নার্গিসের মতো প্রলংঙ্কারী অনেক ঘুর্নিঝড় সৃষ্টি হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। আবার এই সাগর কোটি কোটি মানুষের জীবিকারও উৎস হয়ে আছে। প্রচুর মানুষের আয়ের উৎস এই সাগর- এর মধ্যে অন্যতম মৎসজীবিরা।

বঙ্গোপসাগরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব

প্রতি বছর গড়ে ৬ মিলিয়ন টনের বেশি মাছ ধরা পড়ে বঙ্গোসাগরে, যা বিশ্বের মোট মৎস আহরনের প্রায় ৭ শতাংশ। বিশ্বের মোট জেলে সংখ্যার ৩১ শতাংশ জেলে মাছ ধরেন বঙ্গোপসাগরে। এর মধ্যে আছে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার জেলেরা। ২৬ থেকে ৪৪ প্রজাতির মাছ ছাড়াও প্রচুর সী ফুড প্রতিদিন আহরিত হয় এই সমুদ্রসীমা থেকে।

মৎস সম্পদ ছাড়াও বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক অর্থনীতির আরেকটি বড় খাত পর্যটন। বাংলাদেশের প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন ও কক্সবাজার-কুয়াকাটার মতো সৈকতগুলোতে প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক সমুদ্রের লোনাপানিতে পা ভেজাতে আসেন। সৈকতগুলোতে পর্যটনকে কেন্দ্র গড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ব্যবসায়।
বঙ্গোপসাগর বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অনেক বড় অবদান রাখছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। বাংলাদেশে ও ভারতের সমুদ্র বন্দরগুলোতে প্রতিদিন শত শত কন্টেইনার পণ্য লোড-আনলোড হয় জাহাজে।

বঙ্গোপসাগরে একটি মাছ ধরা নৌকা

বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যের বড় অংশই চলে এই সমুদ্র পথে। প্রতি বছর বাংলাদেশী পণ্য নিয়েই যাতায়াত করে তিন হাজারের বেশি জাহাজ। ভারত ও মিয়ানমারের ক্ষেতেও সংখ্যাটা কম নয়। বাণিজ্য সুবিধার লক্ষ্যে বঙ্গোপসাগরের আশপাশের ৭টি দেশকে নিয়ে গঠিত হয়েছে বিমসটেক জোট। এছাড়া ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের পণ্যবাহী জাহাজের জনপ্রিয় রুট হয়ে উঠেছে বঙ্গোপসাগর।

এই সাগর থেকে ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে বের হওয়া যায় সহজে। যে কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনেক বড় ভুমিকা রয়েছে বঙ্গোপসাগরের। বিশাল এই জলরাশির তলদেশে রয়েছে প্রচুর খনিজ সম্পদও। এখন পর্যন্ত এখানে প্রায় ১৩ রকমের খনিজ সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। যা বিশ্ব অর্থনীতির আরেক বড় সম্ভাবনার নাম।

কৌশলগত গুরুত্ব

বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বও কম নয়। দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এই উপসাগর ক্রমশই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। চীন, ভারত, জাপান তাদের ভূরাজনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিয়েছে বঙ্গোপসাগরকে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিও বঙ্গোপসাগরে নিজের অবস্থান বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হয়েছে।
চীনের প্রভাব মোকাবেলায় অনেক দিন ধরেই ভারতকে সাথে নিয়ে এই অঞ্চলে কার্যক্রমে ব্যাপক কৌশলগত পরিবর্তন এনেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

অন্যদিকে মিয়ানমারকে সাথে নিয়ে এবং তাদের সমুদ্রসীমা ব্যবহার করে বঙ্গোপসাগরে প্রভাব বাড়িয়ে চলছে চীন। এছাড়া তাদের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মধ্যেও অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে এই উপসাগরকে। তারা বিভিন্ন দেশকে সমুদ্রবন্দর নির্মাণে সহযোগিতা করছে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে রয়েছে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি বা আইপিএস। যাদের প্রধান লক্ষ্য চীনা প্রভাব রুখে দেয়া। উভয় পক্ষই বাংলাদেশকে নিজ নিজ দলে টানতে চেষ্টা করছে। সার্ক ও আশিয়ানের মতো দুটো আঞ্চলিক জোট আছে এই অঞ্চলে।

এই সাগর থেকে সহজেই ভারত মহাসাগর ও আরব সাগরে বের হওয়া যায়। আবার পূর্ব দিকে মালাক্কা প্রণালী হয়ে যাওয়া যায় প্রশান্ত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরে। ফিলিপাইন সাগর ও জাভা সাগরও খুব বেশি দূরে নয়। যে কারণে বিশ্ব রাজনীতির বড় বড় খেলোয়াড়দের কাছে বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব সামরিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই বেশি।

বঙ্গোপসাগর ও নৌ মহড়া

২০০৭ সালে বঙ্গোপসাগরে মালাবার নামে একটি যৌথ নৌ মহড়া চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান, সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীসহ অনেক যুদ্ধজাহাজ অংশ নিয়েছে ওই মহড়ায়।

২০১২ সালে এই সমুদ্রসীমায় আরেকটি যৌথ মহড়া চালিয়েছে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে পরেও বিভিন্ন সময় ভারত বিভিন্ন দেশকে নিয়ে নৌ সামরিক মহড়া চালিয়েছে বঙ্গোপসাগরে।

২০১৮ সালে বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন দ্বীপকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে মানচিত্র প্রকাশ করেছিল মিয়ানমার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটিতে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করতে চাইছে এমন গুঞ্জনও শোনা গেছে। দক্ষিণ তালপট্টি নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যেও বিরোধীতা চলেছে দীর্ঘদিন।

ভৌগলিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণেই বঙ্গোপসাগরের নিজ নিজ প্রভাব বজায় রাখতে এই অঞ্চল এবং এর বাইরের দেশগুলো চেষ্টা করে যাচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top