চিন্তা করুন তো! মাত্র কয়েক সেকেন্ডে একটি ফুল এইচডি মুভি ডাউনলোড হয়ে গেল আপনার মোবাইল ফোনে। কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষেরা ভিডিও কনফারেন্স করবেন যেখানে এক সেকেন্ডের বিলম্ব ছাড়াই বক্তার কথা পৌছে যাবে অন্যদের কাছে। কয়েক বছর আগেও এগুলো কল্পনা মনে হলেও আজ সেটাই সত্যি। কারণ ইন্টারনেট ব্যবহারে মানুষের যাবতীয় অভিজ্ঞতাকে বদলে দিতে এসে গেছে ৫ জি ইন্টারনেট সেবা। মোবাইল ফোনে অত্যধিক দ্রুতগতিসহ নানামুখী সুবিধার ফাইভ জি মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলবে, কেমন হবে এটি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা- সে সব জানাবো এই লেখায়।
বিশ্ব এখন ইন্টারনেট নির্ভর। মানুষের জীবনে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মতোই ইন্টারনেটের চাহিদা। সময়ের সাথে সাথে ক্রমশ উন্নত হচ্ছে এই প্রযুক্তি। ইন্টারনেট অব থিংস আবিষ্কারের ফলে কম্পিউটার ও স্মার্টফোনের পাশাপাশি টিভি, রেফ্রিজারেটর, বাল্বসহ অনেক কিছুই যুক্ত হয়েছে ইন্টারনেটের সাথে। যার কারণে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। মানুষের জীবন হয়ে উঠছে সহজ থেকে সহজতর। তবে সেটিকে আরো অনেকগুণ এগিয়ে নিয়ে যাবে ফাইভ জি।
ফাইভ জি নেটওয়ার্ক
মোবাইল ফোনের পঞ্চম প্রজন্মের ইন্টারনেটকে সংক্ষেপে বলা হয় ফাইভ জি। তার রয়েছে বহুমুখী সুবিধা। উত্তরাধুনিক যুগের অনলাইন সেবা থেকে মানুষ যা আশা করে, তার থেকেও অনেক বেশি কিছু নিয়ে হাজির হয়েছে এই প্রযুক্তি। অনেকে মনে করেন অতীতে যেমন চাকা কিংবা বিদ্যুতের আবিষ্কার মানুষের জীবনযাত্রাকে আমূল পাল্টে দিয়েছে। ফাইভ জিও তেমনি আরেকটি বিপ্লব আনবে যোগাযোগ প্রযুক্তিতে।
মোবাইল ফোন নির্ভর জীবনযাত্রাকেই নতুন যুগে
নিয়ে যাবে ফাইভ জি
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা ফাইভ জিকে আখ্যায়িত করছেন গেমচেঞ্জার হিসেবে। ওয়ান জি, টু জি, থ্রি জি ও ফোর জির পর এটি হবে যোগাযোগের নতুন গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড। এটি যে শুধু ভার্চুয়ালি মানুষকেই যুক্ত করবে তা নয়, এই প্রযুক্তি মেশিন, ডিভাইস কিংবা যন্ত্রের সাথে যন্ত্রের যোগাযোগও উন্নত করবে।
মোবাইল নেটওয়ার্কিংয়ের ফার্স্ট জেনারেশন এসেছিলৈা ১৯৮০’র দশকে, যার মাধ্যমে শুধু অ্যানালগ ভয়েস আদান প্রদান অর্থাৎ মোবাইল ফোনে কথা বলা যেত। ডিজিটাল ভয়েস ট্রান্সমিশন নিয়ে টু জি আসে ৯০ এর দশকে। এটি দিয়েছে এসএমএস পাঠানোর সুবিধা। আর চলতি শতাব্দির শুরুতে মোবাইল ডাটা নিয়ে বাজারে আসে থ্রিজি। যার মাধ্যমে প্রথমবার মানুষ মোবাইল ফোন দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পায়।
বেশির ভাগ দেশে এখন চলছে ফোর জি’র যুগ। ফোর জি নিয়ে এসেছে ইন্টারনেটে গেম খেলা কিংবা ভিডিও কলে কথা বলার ব্যবস্থা। যেটিকে বলা হয় মোবাইল ব্রডব্যান্ডের যুগ। যদিও তৃতীয় বিশ্বের সব মানুষ এখনো ফোর জি’র সুবিধা পেতে শুরু করেনি। তবে এরই মধ্যে ফোর জি’র আরো উন্নত সংস্করণ হিসেবে এসেছে ফাইভ জি। এটি আরো বেশি সমন্বিত এবং আরো বেশি এয়ার ইন্টারফেস বা অ্যাকসেস মুডের ক্ষমতা সম্পন্ন। অর্থাৎ ডিভাইসগুলোকে সংযুক্ত রাখতে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি উন্নত সেবা দেবে ৫জি।
৫ জি ইন্টারনেট
ফাইভ জি ওয়ারলেস টেকনোলজি দেবে অনেকগুণ বেশি ইন্টারনেট স্পিড। যোগাযোগ হবে তাৎক্ষণিক অর্থাৎ কোন বিলম্ব ছাড়াই নেওয়ার্কের অপর প্রান্তের সাথে যোগাযোগ করা যাবে। অনেক ব্যবহারকারী এক সাথে যুক্ত হলেও তা গতিতে কোন প্রভাব ফেলবে না।
ডেটা ট্রান্সফার স্পিড হবে প্রতি সেকেন্ডে ২০ গিগাবাইট বা তার চেয়েও বেশি
টেক এক্সপার্টদের ভাষায় ব্যবহারকারীদের পরবর্তী প্রজন্মের ও বাড়তি সুবিধা সংবলিত সেবা দিতে এই প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে। আবার অনেকে মনে করেন, মোবাইল ফোন নির্ভর জীবনযাত্রাকেই নতুন যুগে নিয়ে যাবে ৫ জি । পাশাপাশি শিল্পে আধুনিকায়ন, নিরাপদ পরিবহন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌছে দেয়াসহ অনেক কিছুই প্রভাব রাখবে এটি।
বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ফাইভ জি’র প্রভাবে এমন অনেক সফটওয়ার ও অ্যাপ্লিকেশন চলে আসবে যা হয়ে উঠবে মানুষের ভবিষ্যত। কাজেই ফাইভ জি’র প্রভাব সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা পেতে এই প্রযুক্তির বিস্তার না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে। এটি হয়তো আরো নতুন অনেক কিছু উদ্ভাবনের পথ খুলে দেবে যা এখনো মানুষের চিন্তায় আসেনি। মানুষ যার সাথে পরিচিত হয়নি এমন কিছু সেবা নিয়ে আসবে এটি।
ফাইভ জি মোবাইল
ফাইভ জি প্রধানত তিনটি সেক্টরে ব্যবহৃত হবে। সেগুলো হলো মোবাইল ব্রডব্যন্ড, আইওটি এবং মিশন ক্রিটিক্যাল কমিউনিকেশন। আইওটি হচ্ছে অনেকগুলো ডিভাইস, সেন্সর, সফটওয়ারের মধ্যকার যোগাযোগ। সেটি নিজস্ব কিংবা অন্য নেটওয়ার্কের সাথেও হতে পারে। আর মিশন ক্রিটিক্যাল কমিউনিকেশন বলতে বোঝায়, বড় আকারের এমন যোগাযোগ যা প্রচলিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে করার সম্ভব নয়।
যেমন বড় কোন অনুষ্ঠানে কয়েক হাজার মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী একটি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে শুরু করলে ইন্টারনেট স্পিড কমে যায় কিংবা নেটওয়ার্ক কলাপ্স করার শঙ্কা থাকে। ৫ জি এই সমস্যার সমাধান দেবে। আবার সঠিক সময়ে সঠিক ব্যক্তির সাথে নিরাপদে যোগাযোগ কিংবা দুর্যোগে বিধ্বস্ত এলাকায় যোগাগোগও এর মধ্যে পড়ে।
বাংলাদেশেও পরীক্ষামূলকভাবে এই সেবা চালু হয়েছে
মোবাইল ফোনে ভিআর বা ভার্চুয়াল রিয়েলিটি অনুভব করার পদ্ধতিকে দ্রুতগতি ও আরো উন্নত করবে ৫ জি। অনলাইনেই মানুষ পাবে দূরের বস্তুও বাস্তব অনুভূতি। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। অনলাইনে বাস্তবের অনুভুতি পাওয়ার যে প্রযুক্তি তা আরো সহজলভ্য ও গতিশীল করে তুলবে ফাইভ জি। খরচও অনেক কমে যাবে।
৫ জি ইন্টারনেট স্পিড
অনেকের মনেই প্রশ্ন আসতে পারে যে, ফাইভ জি’র ডেটা ট্রান্সফার স্পিড কেমন হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি হবে প্রতি সেকেন্ডে ২০ গিগাবাইট বা তার চেয়েও বেশি। তবে প্রযুক্তিবিদদের মতে ফাইভ জি আসলে উন্নত স্পিডের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এর নেটওয়ার্ক ক্যাপাসিটি হবে অনেকগুণ বেশি। এই প্রযুক্তি কোন বিলম্ব ছাড়াই বিশ্বের দুই প্রান্তের মানুষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করবে।
এতে কাছাকাছি এলাকায় অনেক ছোট ছোট টাওয়ার থাকবে যে কারণে ব্যবহারকারী স্থান পরিবর্তন করলেও ডেটা ট্রান্সফারে বিঘ্ন ঘটবে না। একটি এইচডি মুভি ডাউনলোড হবে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। আপলোড স্পিডও হবে এমনি বিস্ময়কর।
ইন্টারনেটের গতি
সাধারণ ব্যবহারকারীরা যখন এই প্রযুক্তি হাতে পাওয়া নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, তখন বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সেক্টরে ফাইভ জি’র প্রভাব নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। ফাইভ জি মানুষের জীবনযাত্রা যেমন পাল্টে দেবে তেমনি এর প্রভাব পড়বে বিশ্বের সব সেক্টরে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান কোয়ালকমের এক ইকোনমিক স্টাডির রিপোর্টে বলা হয়েছে, ফাইভ জি’র প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিধি ১৩ দশমিক এক ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে যাবে। যা হবে পণ্য ও সেবা উভয় খাতে। আর ২২ দশমিক ৮ মিলিয়ন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এই প্রযুক্তির কল্যাণে।
এর মধ্যে থাকবে ৫ জি সম্প্রসারণ সংশ্লিষ্ট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো, নেটওয়ার্ক অপারেটর, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, অ্যাপ ডেভলপার ও সাধারণ ভোক্তারা। সংস্থাটি বলছে, ২০৩৫ সাল নাগাদ বিশ্ব অর্থনীতিতে ৫ জি’র এই প্রভাব পুরোপুরি পরতে শুরু করবে।
আরো পড়ুন :
প্রচলিত ধারার মোবাইল কোম্পানিগুলোর বাইরেও অনেক সেক্টরে ছড়িয়ে পড়বে ফাইভ জি’র অর্থনীতি। বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় শিল্পখাত দ্রুত অগরসর হতে শুরু করেবে এর প্রভাবে। যুক্তররাষ্ট্র ভিত্তিক হানিওয়েলের সিনিয়র ডিরেক্টর পল ক্রিম ফোর্বস ম্যাগাজিনকে বলেন, বর্তমানে ওয়ার হাউজগুলোতে সর্টার, কনভেয়ার বেল্ট, ট্রাক আনলোডারের মতো যন্ত্রগুলো কমিউনিকেশন ক্যাবলের ওপর নির্ভরশীল।
ফাইভ জি এলে এগুলো তার ছাড়াই একটি আরেকটির সাথে তথ্য আদান প্রদান করতে পারবে এবং উৎপাদনের গতি অনেকগুণ বেড়ে যাবে। বিশ্বের অন্য প্রান্ত থেকেও একজন অপারেটর যন্ত্রগুলো চালাতে পারবেন এবং তার নির্দেশে সেগুলো কোন বিলম্ব ছাড়াই কাজ করবে।
পরীক্ষামূলকভাবে ৫ জি চালু হয়
ফাইভ জি প্রযুক্তি পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে ২০১৯ সালে। এরপর চীন, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অনেক দেশ এই প্রযুক্তি চালু করেছে ধীরে ধীরে। ফাইভ জি চালু হওয়া দেশের সংখ্যা ইতোমধ্যেই সত্তুরের কাছাকাছি পৌছে গেছে। ২০২১ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশেও পরীক্ষামূলকভাবে এই সেবা চালু হয়েছে। যার মধ্য দিয়ে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিও প্রবেশ করেছে উন্নত তথ্যপ্রবাহের যুগে।
৫ জি যুগে বাংলাদেশ
অবশ্য বাংলাদেশের সর্বত্র এখনো ফোর জি ইন্টারনেট সেবাই সহজলভ্য হয়নি। তবুও ফাইভ জি ইন্টারনেট সেবার জন্য স্মার্ট ফোন ব্যবহারকারীরা যে মুখিয়ে আছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই।
ফাইভ জি সুবিধা পাওয়ার জন্য মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের অবশ্যই এই প্রযুক্তি সম্বলিত স্মার্টফোন লাগবে। যে কারণে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো এখন পুরোদমে ফাইভ জি সাপোর্ট করবে এমন স্মার্টফোন উৎপাদন করছে। কবে নাগাদ বিশের বেশির ভাগ মানুষ ফাইভ জি’র আওতায় আসবে সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সেটি যে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ঘটতে চলেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন : আহমেদ স্টোর


