মুসলিম স্থাপত্যের ঐতিহাসিক এক নিদর্শন ইস্তাম্বুলের সুলতান আহমেদ মসজিদ ব্লু মস্ক বা নীল মসজিদ নামেই যেটি সর্বাধিক পরিচিত। তুরস্কের প্রাচীন নগরী ইস্তাম্বুলের এই স্থাপনাটি নির্মিত হয়েছিল ওসমানীয় শাসনামলে। দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলীর বিশাল আকারের মসজিদটি রূপ নিয়েছে একটি পর্যটন স্পটেও। প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক দেখতে আসেন এর সৌন্দর্য।
জানাবো এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সম্পর্কে নানা তথ্য
ইস্তাম্বুল
ইতিহাস, ঐতিহ্য আর ভৌগলিক কারণে বিখ্যাত এক নগরী ইস্তাম্বুল। বহু ইতিহাসের সাক্ষী এই নগরীটি তুরস্কের সাবেক রাজধানীও। বাইজেন্টাইন, কনস্টান্টিনোপল ও ওসমানীয় সম্রাজ্যের স্মৃতি নিয়ে সমৃদ্ধ হওয়া নগরীটি ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশের সংযোগ স্থল। ইস্তাম্বুলের বুক চিড়েই বয়ে গেছে বসফরাস প্রণালী।
বসফরাসের এক পাশে ইস্তাম্বুলের ইউরোপীয় অংশ, অন্য পাশে এশীয়া। ইস্তাম্বুলের ইউরোপীয় অংশে অবস্থান ব্লু মস্ক বা নীল মসজিদের। মসজিদটির অফিশিয়াল নাম সুলতান আহমেদ মসজিদ । ওসমানীয় খিলাফাহর ১৪তম শাসক প্রথম সুলতান আহমেদ মসজিদটি নির্মাণ করেন, তার নামানুসারেই এটির নামকরণ করা হয়।

ইস্তাম্বুলের প্রাণকেন্দ্রে সুলতান আহমেদ স্কয়ার। এই স্কয়ার ঘিরে চারপাশে বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। তারই একটি সুলতান আহমেদ মসজিদ। পারস্য সম্রাজ্যের সাথে যুদ্ধে পরাজয়ের পর সম্রাট সুলতান আহমেদ ওসমানীয় খিলাফার শাসন ব্যবস্থায় কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেন। সম্রাজ্যের সুনাম বৃদ্ধি ছিলো তার প্রধান লক্ষ্য। আর সেসব কার্যক্রম শুরু করেন একটি মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমে। এর আগে সর্বশেষ ৪০ বছরে তুরস্কে কোন রাজকীয় মসজিদ নির্মাণ করা হয়নি। যে কারণে এই মসজিদটির বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব ছিলো সুলতানের।
মিম্বরটি এমনভাবে বানানো হয়েছে, যাতে খুতবার সময় প্রত্যেক মুসল্লি ইমাম সাহেবকে দেখতে পান।
সাধারণত ওসমানীয় সুলতানরা যুদ্ধ জয়ের পর পাওয়া গনিমতের মাল খরচ করতেন মসজিদ নির্মাণে। কিন্তু সুলতান আহমেদ এই মসজিদটি নির্মাণের খরচ বহন করেন তার রাজকোষ থেকে। ১৬০৯ সালে মসজিদটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৬১৬ সালে। মসজিদ নির্মাণের জন্য স্থানটির আশাপাশে থাকা বাইজেন্টাইন সম্রাটদের প্রাসাদসহ বেশ কিছু পুরাতন স্থাপনা সরাতে হয়েছিল।
স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলী
ওসমানীয় ও ইসলামি স্থাপত্যের মিশ্রনে মসজিদটির নকশা করেছেন তুর্কি স্থপতি সেদেফকার মোহাম্মাদ আগা। মসজিদ ছাড়াও এর চারপাশে রয়েছে বিশাল এলাকা। সামনে বড় একটি চত্ত্বর। মসজিদের চারপাশে রয়েছে অযুখানা, মাদ্রাসা, হলরুম ও এতিমখানা। রয়েছে অনেকগুলো দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারা। রাতে যখন বিভিন্ন রঙের বাতির আলো মসজিদের মূল গম্বুজ ও মিনারে গিয়ে পড়ে, তখন পুরো এলাকা অপূর্ব সুন্দর হয়ে ওঠে।

মসজিদর নকশায় ব্যবহৃত হয়েছে সব অত্যাধুনিক পাথর ও টাইলস। ভেতরে ব্যবহৃত হয়েছে ২০ হাজার হাতে তৈরি টাইলস। এসব টাইলসে ছিলো ৫০টির বেশি পৃথক টিউলিপের নকশা করা। দেয়ালের নিচের দিকে প্রচলিত স্টাইলে টাইসল বসানো হলেও ক্রমশ ওপরের দিকে ফুল, ফল ও বাহারি গাছের দৃশ্য রয়েছে। বেশির ভাগ টাইলস হালকা নীল রঙের।
আছে ২০০টি নীল কাচের জানালা। এছাড়া বাইরের গম্ভুজের রংও হালকা নীল। এসব কারণেই মসজিদটি ব্লু মস্ক হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে। দেয়ালে পবিত্র কালেমা খচিত ক্যালিগ্রাফি রয়েছে। রয়েছে পবিত্র কোরআনের বেশ কিছু আয়াত ও হাদিসের বাণী। ওই সময়ের সেরা ক্যালিগ্রাফার সাইয়েদ কাশিম গুরাবি এগুলো তৈরি করেছেন। এছাড়ার খুটি, সিলিং সব কিছুতেই রয়েছে সৌন্দর্য আর নকশার ছোয়া।
মেহরাব ও মিম্বরেও রয়েছে চমৎকার কারুকাজ। মেহরাব বানানো হয়েছে মার্বেল পাথর দিয়ে। উপরে তিন দিকে ঘোরানো জানালা। মিম্বরটি এমনভাবে বানানো হয়েছে, যাতে মসজিদের প্রত্যেক মুসল্লি খুতবার সময় ইমাম সাহেবকে দেখতে পান। অত্যন্ত দামী ঝাড়বাতি ব্যবহার করা হয়েছে। ঝাড়বাতিগুলোর নকশা করা হয়েছে মাকরসার জালের মতো। মেঝেতে রয়েছে বিভিন্ন ডিজাইনের কার্পেট।
সুলতান আহমেদ মসজিদ : সৌন্দর্যে ভরপুর
ওপরের গম্ভুজগুলোর সাথে মিলিয়ে ভেতরের দেয়াল ও সিলিংয়ের অবয়ব নির্মাণ করা হয়েছে। ভেতর থেকেই বোঝা যায় গম্ভুজগুলোর আকৃতি। বড় গম্ভুজটিতে ২৮টি জানালা, আর প্রতিটি ছোট গম্ভুজে ১৪টি জানালা।
২৪০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২১৩ ফুট প্রস্থের মসজিদটিতে এক সাথে নামাজ আদায় করতে পারে ১০ হাজার মুসল্লি।

বিশাল এই মসজিদের ভেতরে যেমন মুসল্লী বা দর্শনার্থীরা অভিভূত হয় এর সৌন্দর্যে, বাইরে থেকে দেখলেও মুগ্ধ হতে হয়। সরু পথ পেড়িয়ে ঢুকতে হয় মসজিদের চত্বরে। এই গেটটিও চমৎকার নকশা করা। চত্বরের পাশে বর্তমানে যেটি তথ্য কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃ হচ্ছে, এক সময়ে সেখানেই ছিলো ঐতিহাসিক মক্তব। ছেলে-মেয়েরা কুরআন শিখতো এখানে।
আরো পড়ুন :
জেরুসালেম : তিন ধর্মের পবিত্র নগরী
হালাল মার্কেট কী, কেন জনপ্রিয় হচ্ছে
পশ্চিম দিক দিয়ে মসজিদ চত্বরের প্রবেশ মুখে একটি লোহার শেকল ঝোলানো রয়েছে। এই গেট দিয়ে সুলতান ছাড়া আর কেউ ঘোড়ায় চড়ে প্রবেশ করতে পারতেন না মসজিদের চত্বরে। বাকিদের পায়ে হেঁটে প্রবেশ করতে হতো। প্রবেশ মুখে ঝোলানো চেইনটি রাখার কারণ ছিলো,
যাতে প্রতিবার ঘোড়ায় চড়ে প্রবেশের সময় সুলতানকে মাথা নিচু করে যেতে হয়। সৃষ্টিকর্তার সামনে হাজির হওয়ার সময় প্রতিবার সুলতানকে মাথা নত করার এই বিষয়টি ছিলো মানুষের ক্ষুদ্রতা বোঝানের একটি প্রতীকী বিষয়।
নীল মসজিদের বাইরের সৌন্দর্যের প্রধান আকর্ষণ এর গম্ভুজগুলো। ধাপে ধাপে গড়া গম্ভুজগুলো অনেক দূর থেকেই দৃষ্টিগোচর হয়। ৫টি প্রধান গম্ভুজের পাশাপাশি রয়েছে ৮টি ছোট গম্ভুজ। আর রয়েছে ৬টি সু-উচ্চ মিনার। ছয়টি মিনার দিয়ে মসজিদটি নির্মাণের পর কিছুটা বিতর্ক শুরু হয়েছিল।
মিনার নিয়ে বিতর্ক
সে সময় মক্কার পবিত্র হারাম শরীফেও ছয়টি মিনার ছিলো। অনেকেই তাই নীল মসজিদকে হারাম শরীফের সাথে তুলনা করতে শুরু করেন। যে কারণে হারাম শরীফে বাড়তি আরেকটি মিনার নির্মাণের নির্দেশ দেন সুলতান আহমদ। প্রসঙ্গত সে সময় আরবের দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম ছিলেন ওসমানীয় শাসকরা।
গম্বুজ ও মিনারগুলো নীল ও সাদা সীসার গাঁথুনিতে তৈরি। ওপরের অংশের রয়েছে সোনালী রঙের নকশা। সবচেয়ে বড় গম্ভুজটির উচ্চতা ৪৩ মিটার বা ১৪১ ফুট। আর মিনারগুলোর উচ্চতা ৬৪ মিটার বা ২১০ ফুট। মসজিদের চার কোনায় চারটি মিনার, অন্য দুটি মিনার চত্বরের দুই কোনায়।
রাতে যখন বিভিন্ন রঙের বাতির আলো মসজিদের মূল গম্বুজ ও মিনারে গিয়ে পড়ে, তখন পুরো এলাকা অপূর্ব সুন্দর হয়ে ওঠে। মসজিদের চারপাশে রয়েছে অনেকগুলো স্টুডিও ও গিফটশপ। এখানে পুরোনো আমলের অনেক দুর্লভ সামগ্রী পাওয়া যায়। পর্যটকেরা এখানে এসে সুলতানী আমলের পোশাকপরিচ্ছদ পরে ছবি তোলেন।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ইস্তাম্বুলের ব্লু মস্ক
মসজিদটি শুধু নামাজের স্থানের সীমা ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছে তুর্কি সভ্যতার পীঠস্থানে। প্রতিদিন দেশী বিদেশী হাজারো দর্শনার্থী মসজিদটি দেখতে আসেন। নামাজের সময় ছাড়া দিনের অন্যান্য সময় সব ধর্মের মানুষের জন্য মসজিদটি ঘুড়ে দেখার সুযোগ রয়েছে।
ওসমানীয় যুগের নির্মাণশৈলী দেখে মুগ্ধ হন তারা। তবে ব্লু মস্ক ভ্রমণের ক্ষেত্রে দর্শণার্থীদের জন্য কিছু নিয়ম রয়েছে। পুরুষদের জন্য হাফ প্যান্ট পরে মসজিদে প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ। আর মহিলাদের জন্য ওড়না ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ।
তবে ওড়না ছাড়া যারা আসেন তাদের সুবিধার জন্য মসজিদ কর্তৃপক্ষ প্রবেশ মুখে ওড়না সরবরাহের ব্যবস্থা রেখেছেন। সেখান থেকে ওড়না নিয়ে গায়ে জড়িয়ে মসজিদে প্রবেশ করতে হয়। বের হয়ে যাওয়ার সময় সেটি আবার জমা দিয়ে যেতে হয়। এছাড়া দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য প্রবেশ মুখে অনেকগুলো পলিব্যাগের রোল রাখা হয়। সেখান থেকে পলিব্যাগ সংগ্রহ করে তাতে জুতো স্যান্ডেল বহন করতে পারেন দর্শনার্থীরা।
ইস্তাম্বুলের দর্শণীয় স্থানের তালিকায় সেরা স্থান হয়ে উঠেছে মসজিদটি। সারা বিশ্বেরই সুপরিচিত ধর্মীয় স্থাপনগুলোর একটি এই ব্লু মস্ক বা নীল মসজিদ। প্রাচীন ঐতিহ্য আর দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য শৈলীর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসে মসজিদটি দেখতে। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫ মিলিয়ন দর্শনার্থী আসেন ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষিত মসজিদটি দেখতে। তুরস্ক সফরে গিয়ে এই মসজিদটি না দেখে ফিরেছেন এমন লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন।
নীল মসজিদের খুব কাছেই অবস্থিত তুরস্কের আরো দুটি ঐতিহাসিক স্থাপনা- আয়া সোফিয়া বা হাগিয়া সোফিয়া এবং তোপকাপি প্যালেস। তিনটি স্থাপনাই পায়ে হাটা দূরত্বে। এক পাশে মসজিদটির দেয়াল ঘেষেই তোপকাপি প্যালেসের দেয়াল। পঞ্চদশ ও ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে তোপকাপি প্যালেস ছিলো ওসমানীয় সুলতানদের প্রধান বাসভবন ও প্রশাসনিক দফতর। আর এক সময়ের ক্যাথলিক গির্জা আয়া সোফিয়া মুসলিমরা কিনে নিয়ে মসজিদে রূপান্তর করেছিলেন। এই স্থাপনাগুলোর কিছুটা দূরেই ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত গ্র্যান্ড বাজার।


