বিশ্ব মুসলিমের কাছে এক আবেগের নাম, এক ভালোবাসার নাম মদিনা। এখানেই ঘুমিয়ে আছেন প্রিয় রাসূল সা.। মদিনার পূর্ব নাম কি, মদিনা কোথায় অবস্থিত- এসব সহ মদিনা সম্পর্কে কিছু তথ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে এই লেখা।
মদিনা শরীফ
মদিনা শরীফ বা পবিত্র মদিনা। বিশ্ব মুসলিমের কাছে পবিত্র এক নগরী। কারণ এই নগরীকে কেন্দ্র করেই মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সা. এর নেতৃত্বে বিকশিত হয়েছে ইসলাম। রাসুলের প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্র ছিলো মদিনা। পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরামগণও মদিনাকে কেন্দ্র করে খিলাফাহ পরিচালনা করেছেন। মদীনাকে বলা হয় মদিনা আল মুনাওয়ারা বা আলোকিত নগরী। জাহেলিয়াতের সেই যুগে ইসলামের আলোয় আলোকিত হয়েছিলো এখানকার মানুষরা।

মক্কার কুরশাইদের অত্যাচারের মুখে কৌশলগত কারণে হিজরত করা মহানবী সা.কে আপন করে নিয়েছিলেন মদিনার মানুষরা। সেই থেকে ইসলামের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে শহরটি। এখানেই ঘুমিয়ে আছেন মহানবী সা. ও তার প্রিয় অনেক সাহাবী। এই শহরে আছে ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্রতম স্থান মসজিদে নববী। আরো আছে ইসলামের প্রথম মসজিদ মসজিদে কুবা, আছে মসজিদে কিবলাতাইন। মদীনার কাছেই ওহুদ পাহাড়ের পাদদেশে কাফেরদের সাথে যুদ্ধ হয়েছিলো মুসলিমদের।
সৌদি আরবের হেজাজ অঞ্চলের মদিনা প্রদেশের রাজধানী মদিনা শহর। ইসলামের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে শহরটি সৌদি আরবের ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মদীনার মোট আয়তন ৫৮৯ বর্গকিলোমিটার। এরমধ্যে কিছু গ্রাম এলাকা রয়েছে। আবাসিক এলাকার বাইরে বড় একটি অঞ্চল জুড়ে হেজাজ পর্বতমালা ও কিছু উপত্যাকা। আছে কিছু কৃষি জমিও।
সৌদি আরবে পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থান মদিনা শহরের। মক্কা ও জেদ্দা শহর থেকে শহরটি উত্তর দিকে। রাজধানী রিয়াদ থেকে পশ্চিম দিকে শহরটি। মদিনা থেকে পশ্চিম দিকে এগিয়ে গেলে পাওয়া যাবে লোহিত সাগর।
মদিনার পূর্ব নাম কি
মদিনা নামকরণের পূর্বে মদিনার নাম ছিলো ইয়াসরিব।
ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোতে মদিনা শহরের অনেক পূর্ব-নাম পাওয়া যায়। যা থেকে বোঝা যায়, প্রাচীনকালেও শহরটি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। আল্লামা সামহুদি তার গ্রন্থ ও গবেষণা কর্মে মদিনার ৯৪টি নাম উল্লেখ করেছেন। তবে এই শহরের মদিনা নামটিই সবচেয়ে বেশি খ্যাতি পেয়েছে। কারণ কোরআন ও হাদিসের বিভিন্ন রেফারেন্সে মদিনা নামটিই ব্যবহৃত হয়েছে। যে কারণে এই নামটি অন্যসব নামকে ছাড়িয়ে গিয়েছে।
হাদিসের কোন কোন বর্ণনায় শহরটির তাবাহ কিংবা তাইবাহ নামও এসেছে। এই শব্দ দুটোর অর্থ উত্তম। আদ্দার, আল হাবিবা, দারুল হিজরা- ইত্যাদি নামও পাওয়া যায় বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে।
তবে ইয়াসরিব নামটি মদিনার পূর্ব-নাম হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। নবী সা. এর হিজরতের পূর্বে স্থানীয়দের কাছে শহরটি ইয়াসরিব নামে পরিচিত ছিলো। ইতিহাসবিদদের মতে, নূহ আ. এর সপ্তম উত্তর পুরুষ আসরিব ইবনে কানিজার নামানুসারে শহরটির ইয়াসরিব নামের উৎপত্তি। তিনি ছিলেন আমালিকা বংশের সদস্য। ওই বংশ মদিনাসহ আশপাশের অনেক এলাকা দীর্ঘদিন শাসন করেছে।

নবীজির হিজরতের পর শহরটির নতুন নাম মদিনাতুন-নবী বা নবীর শহর করা হয়। মদিনা শব্দের অর্থ শহর। নবী সা. এই শহরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই শহরের প্রতি রহমত নাজিলের জন্য তিনি আল্লাহর কাছে দুয়া করেছেন।
মদিনা সনদ কি
৬২২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর মহানবী সা. মক্কা থেকে হযরত আবু বকর রা.কে সঙ্গে নিয়ে মদিনায় হিজরত করেন। মদিনার অধিবাসীরা তাকে স্বাগত জানায়। বিনা বাধায় সেখানে চলতে থাকে দাওয়াতি কার্যক্রম। ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেয় দলে দলে মানুষ। রাসূল সেখানে গড়ে তোলেন ইসলামিক সমাজ।
সে সময় মদিনায় কয়েকটি গোত্রের মধ্যে গোষ্ঠিগত সংঘাত ছিলো। বিশেষ করে বনু আউস ও বনু খাজরায গোত্রের মধ্যে তুমুল বিরোধ ছিলো। রাসুল সা. মদিনা ও আশপাশের সমাজের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করেন। তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে উদ্বুদ্ধ করেন। রাসুলের এই ধারণাটি সবার কাছে গৃহীত হয়। এরপর সবাইকে নিয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। যেটি ঐতিহাসিক মদিনা সনদ নামে পরিচিত।
মদিনা সনদই পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান।

মদিনা সনদের ধারা কয়টি
মদিনার এই সনদে ৪৭টি ধারা ছিলো। কোন কোন বর্ণনায় অবশ্য ধারার সংখ্যা ৫৩টি বলা হয়েছে। তবে ৪৭টিই অধিক গ্রহণযোগ্য মত। এই ধারাগুলো মূলত স্থানীয় অধিবাসী ও সমাজব্যবস্থার মধ্যে ঐক্যের একটি বন্ধন তৈরি করে।
এর প্রধান প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে ছিলো- স্থানীয় গোষ্ঠিগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাস করবে। কোন গোত্র বাইরের শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে অন্য গোত্রগুলো তাদের পক্ষ হয়ে বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করবে (বর্তমান সময়ে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর মূলনীতিও এটি)।
মক্কার কোরাইশদের সাথে কেউ কোন সম্পর্ক রাখতে পারবে না। মদিনার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপে কেউ কোরাইশদের সাহায্য করবে না। মদিনার মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায় সবাই বিনা বাধায় নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। কেউ কারো ধর্ম পালনে বাধা দিতে পারবে না।
কোন গোত্রের কোন ব্যক্তি অপরাধ করলে সে জন্য পুরো গোত্রকে দোষী করা যাবে না, ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে বিচার হবে। কোন অন্যায় কার্যক্রমকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। দুর্বল ও অসহায়দের সাথে জুলুম করা যাবে না এবং তাদের রক্ষা করতে সবার দায়িত্ব নিতে হবে।
এই সনদে মদিনায় বলাৎকারসহ বিভিন্ন অপরাধ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কোন বিরোধ হলে তা মীমাংসার জন্য রাসুল সা. এর দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মদিনা সনদের মাধ্যমে রাসুল সা. এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, কূটনৈতিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের গুনাবলী ফুটে ওঠে। অন্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও রাসুলের প্রস্তাবিত নীতিগুলো মেনে নেয়। বিশেষ করে, সব সম্প্রদায়ের স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা বজায় রাখার মাধ্যমে একটি উদার সমাজব্যবস্থা গড়ে ওঠে এখানে। এবং একটি বৃহত্তর প্রজাতন্ত্র গঠনের পথও তৈরি হয়।
গবেষকদের মতে, মূলত মদিনা সনদের মাধ্যমেই ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের বীজ বপন করা হয়। এতে সব মতবাদের স্বাধীনতা দেয়া হলেও ইসলামের অনেক শিক্ষা এর মাধ্যমে অন্য সম্প্রদায়গুলোর কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়। তারা বিনা বাক্য ব্যয়ে এগুলোকে মেনে নেয়।
মদিনার দর্শণীয় স্থান
মদিনায় পর্যটকরা সবার আগে ছুটে যায় মহানবী সা. এর রওজার কাছে। আয়শা রা. এর ঘরে রাসুল সা. ইন্তেকাল করেছিলেন। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়েছে। বর্তমানে জায়গাটি মসজিদে নববীর এরিয়ার মধ্যে চলে এসেছে। কারণ যুগের সাথে সাথে মুসল্লিদের চাপ বাড়ার কারণে মসজিদের আয়তন বাড়াতে হয়েছে।
রাসুল সা. এর পাশেই সমাহিত হয়েছেন তার প্রিয় দুই সাহাবী হযরত আবু বকর রা. ও হযরত ওমর রা.।
মসজিদে নববীর পাশেই রয়েছে জান্নাতুল বাকি। এখানে রাসুল সা. এর অনেক সাহাবা ও আত্মীয়ের কবর রয়েছে। কয়েক কিলোমিটার দূরে রয়েছে মসজিদে কুবা, যেটি ইসলামের প্রথম মসজিদ। এখানে নামাজ আদায় করলে ওমরাহ এর সমপরিমাণ সওয়াব পাওয়া যায়।
এই শহরে আরো আছে মসজিদে কিবলাতাইন। যে মসজিদে রাসূল সা. সাহাবীদের নিয়ে নামাজ আদায়ের সময় আল্লাহর হুকুমে কেবলা পরিবর্তন হয়। সেই থেকে জেরুসালেমের আল আকসার বদলে নতুন কেবলা হয় মক্কার হারাম শরিফ।
মদিনা শহরের কিছুটা বাইরে রয়েছে ওহুদ পাহাড়। এই পাহাড়ের পাদদেশে ওহুদের যুদ্ধ হয়েছিলো। সেই যুদ্ধে রাসূল সা. নিজে আহত হয়েছিলেন। শহীদ হয়েছিলেন তার প্রিয় ৭০ জন সাহাবী।
মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়
ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব মদিনা বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি। ১৯৬১ সালে সৌদি সরকার এক রাজকীয় ঘোষণায় এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শরীয়াহ, কোরআন, হাদিস, উসুল আল দ্বীন প্রভৃতি বিষয়ে পড়ানো হয়। এছাড়া বিদেশীদের জন্য আরবি ভাষার ওপর উচ্চশিক্ষারও ব্যবস্থা রয়েছে। ২০০৯ সালে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টি খোলা হয়। ২০১১ সালে চালু হয় কম্পিউটার ও ইনফরমেশন সায়েন্স ফ্যাকাল্টি। পরের বছর চালু হয় ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্স। ২০১৯ সালে খোলা হয় জুডিশিয়ারি স্টাডিজ নামের নতুন বিভাগ।
বিভিন্ন বিষয়ে গ্রাজুয়েশন, মাস্টার্স ও ডক্টরেট ডিগ্রি নেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। শুধুমাত্র মুসলিম ছাত্ররাই এখানে ভর্তি হতে পারে। বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপ ও আবাসিক ব্যবস্থা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতিবছর নিজ খরচে অনেক বিদেশী ছাত্রকে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দেয়। বর্তমানে ২২ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে।
বিশ্বের অনেক নামী ইসলামিক স্কলার মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন। তাদের মধ্যে বিলাল ফিলিপস, মুফতি মেনক উল্লেখযোগ্য। টপিক : মদিনার পূর্ব নাম কি
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন : আহমেদ স্টোর


