কচ্ছপ নয় যেন দানব একেকটি। নাম আলদাবরা টরটয়েস। বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রজাতির কচ্ছপগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য এগুলো। ভারত মহাসাগরে অবস্থিত পছাট্ট দ্বীপ চাঙ্গু আইল্যান্ডে পাওয়া যাবে এই কচ্ছপগুলো। পূর্ব আফ্রিকার পদশ তানজানিয়ার অংশ এই দ্বীপটি।
ভারত মহাসাগরের জানজাবির দ্বীপটি তানজানিয়ার একটি আধা-সায়ত্বশাসিত অঞ্চল। জানজাবির আর আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডের মাঝখানে অবস্থিত ছোট্ট দ্বীপ চাঙ্গু আইল্যান্ড। জানজাবিরের আঞ্চলিক সরকার দ্বীপটির দেখাশোনা করে। দ্বীপটি দৈর্ঘ্যে দশমিক ৮ কিলোমিটার আর সবচেয়ে চওড়া স্থানের প্রস্থ দশমিক ২৩ কিলোমিটার। স্থাীয় কোন জনবসতি নেই সেখানে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর বিশালাকারের কচ্ছপগুলোর কারণে সারা বিশ্বের পর্যটকদের কাছে দ্বীপটি পরিচিত হয়ে উঠেছে।
এখানকার সবচেয়ে বয়স্ক কচ্ছপটির বয়স ১৯৩ বছর। সেটির গায়ে নীল কালিতে লেখা রয়েছে জন্ম সাল।
অঞ্চলটি ব্রিটিশ শাসনে থাকার সময় বিচ্ছিন্ন এই ছোট্ট দ্বীপটিকে ব্যবহার করা হতো বন্দীখানা হিসেবে। বিভিন্ন দেশের বন্দীদের রেখে আসা হতো দ্বীপে। তাই দ্বীপটি প্রিজন আইল্যান্ড নামেও পরিচিত ছিল এক সময়। ১৮৯৩ সালে জানজাবিরে নিযুক্ত ব্রিটিশ ফার্স্ট মিনিস্টার লয়েড ম্যাথিউস দ্বীপটি কিনে বন্দীখানা তৈরি করেন। পরে দ্বীপটিতে শুধুমাত্র পীত জ্বরে আক্রান্তদের রাখা হতো।
নীল সমুদ্রের মাঝখানে ছোট্ট দ্বীপটির মূল আকর্ষণই আলদাবরা প্রজাতির কচ্ছপগুলো। এগুলোর জন্যই বিখ্যাত হয়ে উঠেছে চাঙ্গু দ্বীপ। একসময় ভারত মহাসাগরের এই কচ্ছপ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া গেলেও এখন তা বিলুপ্ত প্রায়। এই অঞ্চলের কয়েকটি দ্বীপে পাওয়া যায় এই কচ্ছপগুলো। তবে শুধু চাঙ্গু দ্বীপের কচ্ছপগুলোই মানুষের কাছাকাছি আসে।
১৯১৯ সালে প্রতিবেশী দ্বীপরাষ্ট্র সিশেলসের তৎকালীন ব্রিটিশ গর্ভনর উপহার হিসেবে চাঙ্গু দ্বীপে নিযুক্ত ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের চারটি এই প্রজাতির কচ্ছপ উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। সিশেলসের আলদাবরা অটল দ্বীপ থেকে সেগুলো আনা হয়েছিল বলে কচ্ছপগুলো আলদাবরা টরটয়েস নামেই পরিচিতি পায়।

দ্রুত বংশবৃদ্ধি করার ফলে চারটি কচ্ছপ থেকে ১৯৫০ সালে দ্বীপটিতে কচ্ছপের সংখ্যা দুই শ’ ছাড়িয়ে যায়; কিন্তু পর্যটক ও চোরাকারবারিদের কারণে এই সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে। পর্যটকদের অনেকেই এখান থেকে কচ্ছপ নিয়ে যেতে শুরু করে, কেউ বাসায় পুষতে কেউ বা প্রিয়জনকে উপহার হিসেবে দিতে। আর চোরাকারবারিরা কচ্ছপগুলো চালান করতো ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে।
১৯৯৬ সালে দেখা যায় দ্বীপটিতে মাত্র ৭টি কচ্ছপ আছে। এরপর কর্তৃপক্ষ এগুলো সংরক্ষণে নজর দেয়। বিশ্ব প্রাণী সুরক্ষা কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় জানজাবির সরকার কচ্ছপগুলোর পরিচর্যার কার্যক্রম শুরু করে। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করার চেষ্টা করা হয়। আবার বাড়তে শুরু করে কচ্ছপের সংখ্যা।
বর্তমানে সেখানে অল্প ও পূর্ণ বয়স্ক মিলিয়ে কচ্ছপের সংখ্যা দুই শ’র কাছাকাছি। পালা করে দশজন সশস্ত্র প্রহরীর দল সারাক্ষণ পাহাড়া দেয় কচ্ছপগুলোকে। দ্বীপটিকে মূলত এই কচ্ছপগুলোর অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
যেখান থেকে এই কচ্ছপগুলো আনা হয়েছে হয়েছে অর্থাৎ সিশেলসের আলদাবরা অটল দ্বীপ- সেখানে এই প্রজাতির কচ্ছপ রয়েছে ১০ হাজারের বেশি। তবে প্রাণী বৈচিত্র সংরক্ষণের জন্য দ্বীপটিতে মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর তাই আলদাবরা কচ্ছপ দেখার জন্য চাঙ্গু দ্বীপেই যেতে হয়।

চাঙ্গু দ্বীপের বড় কচ্ছপগুলোর গড় ওজন আড়াইশ কেজি। দৈর্ঘ্য ১২২ সেন্টিমিটার (৪৮) পর্যন্ত হয়ে থাকে। স্ত্রী প্রজাতির আলদাবরা কচ্ছপের দৈঘ্য ৯১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। ভারি দেহটি বয়ে নেয়ার জন্য এই কচ্ছপের পাগুলোও বেশ শক্ত। শারীরিক উচ্চতার পাশাপাশি গলা বেশ লম্বা হওয়ায় অন্তত এক মিটার পর্যন্ত উচু গাছের পাতা খেতে পারে কচ্ছপগুলো।
এখানকার সবচেয়ে বয়স্ক কচ্ছপটির বয়স ১৯৩ বছর। সেটির গায়ে নীল কালিতে লেখা রয়েছে জন্ম সাল। প্রায় দুই শ’ বছর আগে কাজটি কেউ বিশেষ উদ্দেশ্য ছাড়াই করেছিলেন; কিন্তু এরপর কৃত্রিমভাবে প্রজনন শুরু হওয়ার পর সব কচ্ছপের গায়েই জন্ম তারিখ লিখে দেয়া হয়। গবেষকরা জানিয়েছেন, এই প্রজাতির কচ্ছপরা সাধারণত ৩০০ বছর বেঁচে থাকে।
প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রচুর পর্যটক আসেন চাঙ্গুদ্বীপে এই বিশাল আকৃতির কচ্ছপগুলো দেখতে। দ্বীপটিতে প্রবেশের জন্য পর্যটকদের চার মার্কিন ডলার ফি দিতে হয়। পানি থেকে যখন তখন উপরে উঠে আসে কচ্ছপগুলো পর্যটকরা এদের সাথে সময় কাটায়। কেউ খাবার দেয়, কেউ বা ছবি তোলে কচ্ছপদের সাথে। সাধারণত পর্যটকরা লেটুস পাতা কিংবা বাধকপি খাওয়ায় কচ্ছপদের। শিশুরা দারুণ মজা পায় কচ্ছপদের কাছ থেকে দেখে।


