আফগান যুদ্ধের দিনগুলোতে তালেবানের হয়ে আন্তর্জাাতিক গণমাধ্যমে নিয়মিত বক্তব্য তুলে ধরতেন গোষ্ঠিটির মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ । যদিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে তিনি ছিলেন এক অজানা রহস্য। যাকে কেউ চিনতে পারেনি। মার্কিন বাহিনী অসংখ্য অভিযান চালিয়েও যাকে ধরতে পারেনি। অথচ তিনি ছিলেন আফগানিস্তানেই, এমনকি রাজধানী কাবুলেও থাকতেন তিনি।
এক সময় সবাই মনে করতে শুরু করে, এই নামটি আসলে ভুয়া। তবে তালেবানের কাবুল দখলের একদিন পর সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রকাশ্যে আসেন। জবিউল্লাহ মুজাহিদ নিজেই জানিয়েছেন, কিভাবে মার্কিন সেনাদের চোখে ধুলো দিয়ে পালন করেছেন কঠিন দায়িত্ব।
তালেবানের মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ
আফগান যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে সব খবর আসতো এক পক্ষ থেকে। মার্কিন সেনাবাহিনী যে খবর পরিবেশন করতো সেটিই ছিলো সংবাদের প্রধান উৎস। তবে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে তালেবানের হাতে রাজধানী কাবুলের পতন হওয়ার পর অনেক পশ্চিমা সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক বুঝতে পেরেছেন- এতদিন তাদের কিভাবে অন্ধকারে রাখা হয়েছিল।
তালেবান রাজধানীতে প্রবেশ করার পরই অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে যায়। তালেবানকে এতদিন যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তার অনেক কিছুই মিথ্য প্রমাণিত হয়। বিশে^র এক সুপার পাওয়ারের বিরুদ্ধে ২০ বছর লড়াই করে জয় পাওয়া গোষ্ঠিটি সম্পর্কে নতুন ধারণা সৃষ্টি হয় সবার মাঝে।
দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা প্রচারণার বিপরীতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে কাজ করে গেছেন তালেবানের মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ। গোষ্ঠিটির সব খবর ও বক্তব্য তিনি জানাতেন মিডিয়ার কাছে। যদিও এসব করতে গিয়ে তার জীবনের ওপর দিয়ে বহু ঝড়-ঝঞ্ঝা বয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী অনেক বারই তাকে ধরতে অভিযান চালিয়েছে; কিন্তু কৌশলি জবিউল্লাহ মার্কিন সেনাদের ফাঁকি দিতে পেরেছেন প্রতিবারই। এক সাক্ষাৎকারে সেসব তথ্য জানিয়েছেন এই তালেবান মুখপাত্র।
জবিউল্লাহ বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমকে অডিও বার্তা ও লিখিত বক্তব্য পাঠাতেন। যে কোন ঘটনায় নিজেদের ভুমিকা তুলে ধরতেন। পাশাপাশি টেলিফোনে সাক্ষাৎকারও দিতেন তিনি। যার ফলে একটা সময় তাকে খুঁজতে মরিয়া হয়ে ওঠে মার্কিন সেনারা। সারা দেশে চলে জবিউল্লার সন্ধানে তল্লাশি।
এই প্রতিবেদনের ভিডিও দেখুন
পাকিস্তানের একটি সংবাদ মাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, গোয়েন্দা অনুসন্ধানের সূত্র ধরে মার্কিন বাহিনী অনেকগুলো অভিযান চালায় আমাকে ধরতে; কিন্তু প্রতিবারই আমি তাদের ফাঁকি দিতে সমর্থ হই। এক পর্যায়ে মার্কিন বাহিনী মনে করতে শুরু করে যে, জবিউল্লাহ নামে আসলে কেউ নেই। তালেবান তাদের বোকা বানাতে এই নামটি বারবার ব্যবহার করছে। মার্কিন বাহিনী ধারণা করে, যখনই কেউ তালেবানের হয়ে মিডিয়াকে তথ্য দেয়, তিনি নিজেকে জবিউল্লাহ মুজাহিদ নামে নিজেকে পরিচয় দেন। আসলে তারা একাধিক লোক এবং এই নামটি কাল্পনিক।
যেভাবে বোকা বানাতেন মার্কিনীদের
জবিউল্লাহ জানান, এক সময় তিনি পুরো আফগানিস্তান ঘুরে ঘুরে তালেবানের কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য মিডিয়াকে সরবরাহ করেছেন। তার অস্তিত্ব সম্পর্কে মার্কিন বাহিনীর ভুল ধারণার কারণে সেটি আরো সহজ হয়েছে। এমনকি অনেকের নাকের ডগায় অনেকদিন রাজধানী কাবুলেও ছিলেন তিনি।
তালেবানের গুরুত্বপূর্ণ সব ফ্রন্টলাইন অ্যাকশনের কাছাকাছি যাওয়ার অনুমতি ছিলো জবিউল্লাহর। যেখানেই কোন অপারেশনের পরিকল্পনা করা হতো, তিনি সেখানে ছুটে যেতেন এবং সর্বশেষ খবরাখবর মিডিয়াকে জানাতেন। দেশের যে প্রান্তেই ঘটনা ঘটুক, সেখানেই জবিউল্লাহর উপস্থিতির কারণে মার্কিন বাহিনী বিভ্রান্তিতে পড়ে গিয়েছিলো। এসব কারণেই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা এক সময় ধারণ করতে শুরু করে যে, জবিউল্লাহ একক কোন ব্যক্তি নয় এবং এটি একটি কাল্পনিক চরিত্র।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা তাকে হন্যে হয়ে খুজলেও জবিউল্লাহ কখনো আফগানিস্তান ছেড়ে যাবার কথা ভাবেননি। জীবনের ঝুকি আছে জেনেও দেশে থেকেই সংগঠনের আরোপিত দায়িত্ব পালন করে গেছেন। মার্কিন বাহিনী তার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে স্থানীয় অনেক নাগরিককে অর্থ দিতো। সেটি বুঝতে পেরে জবিউল্লাহ প্রায়ই নিজের সম্পর্কে ভুল তথ্য ছড়িয়ে দিতেন।
যেগুলো মার্কিন বাহিনীর হাতে চলে যেত। এরপর সেসব তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন এলাকায় দেয়া হতো রেইড; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার টিকিটিও ছুতে পারেনি তারা। এই মুখপাত্র বলেন, আমি কখনোই দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবিনি। দীর্ঘ এই দুঃসাহসিক পথ চলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নাগরিকরাও তাকে সহযোগিতা করেছেন বলে জানান।
কে এই জবিউল্লাহ মুজাহিদ
তালেবান সরকার গঠনের পর তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে।
আফগানিস্তানের পাকতিয়া প্রদেশের গারদেজ জেলায় জন্ম জবিউল্লাহর। সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ছোট বেলায় তাদের বাড়িতে আরবি ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হতো। যে কারণে ইংরেজী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সঠিক জন্ম তারিখটি তার জানা নেই। সেটি ১৯৭৮ সালের যেকোন এক সময়। তবে তার বর্তমান বয়স ৪৫ বছর (২০২৩ সালে)।
শৈশবে স্থানীয় স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছেন এই তালেবান নেতা। এরপর ভর্তি হয়েছেন মাদরাসায়। জালালাবাদ, খোস্তসহ বেশ কয়েকটি শহরের নামকরা মাদরাসায় শিক্ষা নিয়েছেন তিনি। পড়াশোনার জন্য গিয়েছিলেন পাকিস্তানেও। দেশটির খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের নামকরা মাদরাসা দারুল উলুম হাক্কানি থেকে ফিকহ শাস্ত্রে ডিগ্রি নিয়েছেন। সেখানে পড়ার সমেেয় ফিকহ শাস্ত্রের ওপর তার বেশ কিছু গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।
তরুণ বয়সে আফগানিস্তানের দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে জড়িত হন জবিউল্লাহ। তখন তার বয়স ছিলো মাত্র ১৬ বছর। সে সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। একবার আটক হয়ে ছয় মাস কারাগারেও ছিলেন। পরবর্তীতে যুক্ত হন তালেবানের সাথে।
তালেবানের সাথে যুক্ত হওয়া
সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন লেখালেখির চর্চা। দারি ভাষায় প্রকাশিত তালেবানের সারাক নামের ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখতেন জবিউল্লাহ। ১৯৯৬ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করার পর মফস্বল এলাকার একটি রেডিও স্টেশনের উপস্থাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে পশতু ও দারি উভয় ভাষায় সংবাদ পাঠ করেছেন দীর্ঘদিন।
২০০৭ আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে তালেবানের মুখপাত্র মুহাম্মদ হানিফ গ্রেফতারের পর জবিউল্লাহকে এই দায়িত্ব দেয়া হয়। জবিউল্লাহ বলেন, আমার লেখালেখি ও রেডিওতে সংবাদ পাঠ করার কারণে তারা ধারণা করেছিল, আমি এই দায়িত্ব পালন করতে পারবো। যে কারণে তালেবানের মজলিশে শুরা মুখপাত্র হিসেবে আমাকে মনোনীত করে।
ব্যক্তিগত জীবনে চার সন্তানের জনক জবিউল্লাহ। বড় ছেলের বয়স ২৪ বছর। আছে আরো এক পুত্র ও দুই কন্যা। ১৯৯৯ সালে তার বাগদান সম্পন্ন হলেও দায়িত্ব পালনের কারণে দুই বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে বিয়ে করতে। তার স্ত্রীও তালেবানের নীতি আদর্শের একনিষ্ঠ সমর্থক, যে কারণে ঘর-সংসার রেখে ফেরারি হয়ে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন সহজেই। তবে যখনই সুযোগ পেয়েছেন পরিবার ও সন্তানদের দায়িত্ব পালন করেছেন। যে কারণে তার পরিবার কখনো দায়িত্ব পালনের পথে বাধা হয়ে দাড়ায়নি।
যেভাবে কাজ করতেন জবিউল্লাহ মুজাহিদ
সাক্ষাৎকারের সবশেষে প্রশ্ন করা হয়- জবিউল্লাহ মুজাহিদ নামটি আসলেই তার কীনা। এর জবাবে তিনি বলেন, জবিউল্লাহ নামটি তার পারিবারিক নাম। আর মুজাহিদ অংশটি সিনিয়র তালেবান নেতাদের দেয়া। তারা ভালোবেসে মুজাহিদ বলে ডাকতেন তাকে। যে কারণে সেটিকে নিজের নামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন, হয়ে গেছেন জবিউল্লাহ মুজাহিদ।
মার্কিন বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া একটি গোষ্ঠির দায়িত্ব পালন করা নিঃসন্দেহে বিশে^র কঠিন কাজগুলোর একটি। এত সংগ্রামের মাঝেও সর্বদা চাপ মুক্ত থেকে দায়িত্ব পালন করতে চেষ্টা করতেন বলে জানান জবিউল্লাহ। তবে কাজের ধরণের কারণেই সব সময় প্রয়োজনীয় ঘুম ও খাওয়ার সুযোগ হতো না। নিজের অবস্থান গোপন রেখে দিন রাত সব সময় তালেবান কমান্ডারদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে হতো।
এরপর যোগাযোগ রাখতে হতো মিডিয়ার সাথে। টেলিফোনে তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতেন। যে কোন ঘটনার বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতেন স্পষ্টভাবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নিজেদের পক্ষে প্রচারণা চালাতেন। আর এসব কাজে তিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। যে কারণে এত কিছু করা সত্ত্বেও প্রায় ১৪ বছর ধরে খুজেঁও তাকে ধরতে পারেনি মার্কিন গোয়েন্দারা।
জবিউল্লাহ জানান, তিনি কখনো তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা মোহাম্মাদ ওমরকে সামান সামনি দেখেনিন। মোল্লা ওমরের গোপন অবস্থানের কারণে তার কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ হয়নি জবিউল্লাহর। তবে তিনি কাজ করেছেন পরবর্তী দুই নেতা মোল্লা মনসুর ও শেখ হাইবাতুল্লাহ আখুনজাদার সাথে। দুই নেতার কাছ থেকেই নিজের কাজের জন্য সাধুবাদ পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
লেখকের ফেসবুক পেজে যুক্ত হতে লাইক দিন : আহমেদ


