পম্পেই : পাপের নগরী

পম্পেই নগরী কোথায়

ভিসুভিয়াস পবর্তের আগ্নেয়গিরির লাভায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া এক প্রাচীন নগরী পম্পেই । পাপাচার আর অনচারে লিপ্ত এক সম্প্রদায়ের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে এই নগরী। প্রায় দুই হাজার বছর আগে আগ্নেয়গিরির লাভা আর ছাইয়ের নিচে চাপা পড়া এক জনপদ পম্পেই। যেখানে ছিলো আধুনিকতা, সম্পদের প্রাচুর্য, আর ব্যবসায় বাণিজ্যের রমরমা অবস্থা। ছিলো বিলাসিতার সব উপকরণ; কিন্তু এমন একটি জনপদ হঠাৎ একদিন ধ্বংস হয়ে যায় আগ্নেগিরির লাভায়। ইতালির সেই পম্পেই নগরী ও এর ধ্বংস হওয়ার ইতিহাস জানাবো এই লেখায়।

ইতালির দক্ষিণাঞ্চলের নেপলস শহরের খুব কাছেই অবস্থান পম্পেই নগরীর। একদিকে নেপলস উপসাগর আরেক দিকে বিখ্যাত ভিসুভিয়াস পবর্ত। যে কারণে জায়গাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও ছিলো অপরিসীম। কয়েক হাজার বছর আগে ভিসুভিয়াসের পাদদেশে গড়ে ওঠা নগরীটি হয়ে উঠেছিলো রোমান সম্রাজ্যের আধুনিকতা আর বিলাসিতার কেন্দ্রবিন্দু। তৎকালীন বাসিন্দারা নগরীটিকে সাজিয়েছিলো সম্ভব সব কিছু দিয়ে। বন্দর নগরী হওয়ার কারণে বাণিজ্যিক গুরুত্বও ছিলো পম্পেইয়ের। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর আধুনিক নানা উপকারণের কারণে পম্পেই এতটাই বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষরা আরাম আয়েশ করতে ছুটে যেত সেখানে। হয়ে উঠলো বিভিন্ন প্রান্তের ধনীদের অবকাশ যাপন কেন্দ্রও।

কিন্তু এসব করতে গিয়ে তারা গা ভাসিয়েছিলো অশ্লীলতা আর অনাচারে। বিলাসিতার নামে বিকৃত যৌনাচার হয়ে উঠেছিলো পম্পেইয়ের জীবনের অংশ। তবে এসবই একদিন হারিয়ে গেছে আচমকা দুর্যোগে। সে দুর্যোগ এতটাই আচমকা এসেছিলো যে, নগরীর বাসিন্দারা পালানোর সময়টুকু পায়নি।

পম্পেই নগরীর ইতিহাস

ইতালির নেপলস শহর থেকে ৪০ মিনিটের ট্রেন যাত্রার দূরত্ব পম্পেইয়ের। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে নগরীটির গোড়াপত্তন হয়েছিল ইতালির অসকান জাতিগোষ্ঠির লোকদের মাধ্যমে। এরপর গ্রিকরা আসে জায়গাটিতে। এরপর নগরীটি যায় রোমানদের অধীনে। রোমান যুগেই পম্পেই মূলত ধীরে ধীরে উন্নত নগরী হয়ে ওঠে। বন্দর নগরী হওয়ার কারণে বিভিন্ন দেশের বনিকরা আসতে শুরু করেন এখানে। ধীরে ধীরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের ধনীদের মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয় জায়গাটি।

হারকুলেনিয়াম

নগরীটি দু’ভাগে বিভক্ত ছিল, যার নিচু অংশটির নাম ছিলো পম্পেই, আর উঁচু এলাকাটির নাম হার্কুলেনিয়াম। তৎকালীন সময়ের রোমের বিশিষ্ট নাগরিকদের জন্য একটি সমৃদ্ধ আশ্রয়স্থল ছিল এ নগরীটি। মার্জিত ঘর এবং বিস্তৃত পাকা রাস্তা, অবাধ যৌনতা, পতিতালয় এসব কোনো কিছুর অভাব ছিল না এ নগরীতে। প্রাচীন গ্রিক, রোমসহ বিভিন্ন দেশের নাবিকদের অবাধ চলাচল ছিল এই নগরীতে। বাণিজ্যিক টুরিস্টদের জন্য সেখানে গড়ে উঠেছিল অত্যাধুনিক দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকা, প্রাসাদ, বাজার ইত্যাদি।

পম্পেই কতটা আধুনিক আর সমৃদ্ধ নগরী ছিলো তার একটি ধারণা পাওয়া যায় এর বর্তমান কাঠামোগুলো দেখে। প্রায় দুই হাজার বছর মাটি, ছাই আর পাথরের নিচে চাপা পড়ে থাকার পরও এর অনেক কিছুরই আকৃতি আগের মতো রয়ে গেছে। কতটা মজবুত আর টেকসই হলে এতদিন পরেও এসব কাঠামো টিকে থাকে। প্রত্মতাত্ত্বিক খননকাজে এর আগে পৃথিবীতে এতটা স্পষ্ট অবস্থায় কোন প্রাচীন জনপদ পাওয়া যায়নি।

এই নগরীতে ঢুকলেই চোখে পড়ে বিভিন্ন স্থানে দাড়িয়ে থাকা ভবনের কাঠামো। কোথাও পিলার আছে, কোথাও ছাদসহই দাড়িয়ে আছে ভবন। কোথাও দেয়াল দাড়িয়ে আছ। পাথুরে সড়কগুলো দিয়ে হাটতে হাটতে পর্যটকরা ভাবতে বাধ্য হন এক সমৃদ্ধ জনপদের কথা।

কলোসিয়াম

কলোসিয়াম

এখনো টিকে আছে নগরীর কলোসিয়াম বা অ্যাম্পিথিয়েটার ক্যাভেয়া। প্রাচীন যুগের এই স্টেডিয়ামটিতে কয়েক হাজার মানুষ বসতে পারতো। এর গ্যালারিতে বসে তারা উপভোগ করতো লড়াই। শাসক বা ধনী শ্রেণির কাছে সে লড়াই ছিলো এক বিকৃত বিনোদন। যেখানে হিংস্র প্রাণীদের বিপক্ষে লড়তে হতো মানুষকে। এই মানুষদের বেশির ভাগই হতো কারাবন্দী। তাদের বলা হতো প্রাণীটিকে হারাতে পারলে তুমি মুক্তি পাবে। আবার কখনো দুই বন্দীকে যুদ্ধে নামিয়ে দিয়ে বলা হতো, যে জিততে পারবে তাকে মুক্ত করে দেয়া হবে। এই রক্তের হোলিখেলা গ্যালারিতে বসে উপভোগ করতে সেখানকার মানুষেরা। আবার কখনো অন্য শহরের মানুষদের সাথে লড়াই হতো পম্পেইয়ের মল্লযোদ্ধাদের। অ্যাম্পিথিয়েটারটির কাঠামো এখনো দাড়িয়ে আছে সেই নৃশংসতার স্বাক্ষী হয়ে।

এছাড়া এই নগরীতে ছিলো আরো দুটি থিয়েটার বা মঞ্চ। যেগুলোতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন হতো সে সময়। আছে বাসিলিয়া নামের একটি জায়গা। যেটি ছিল নগরের আদালত প্রাঙ্গণ ও মূল ব্যবসায়িক কেন্দ্র। এর ২৮টি কলাম এখনো দাড়িয়ে আছে। এক সময় এই প্রাঙ্গণ মুখরিত থাকত ব্যবসায়ী আর ব্যাংকারদের পদচারণায়।

বাসিলিয়ার কিছুটা দূরেই একটি খোলা জায়গার নাম ফোরাম। যেটি ছিলো পম্পেই শহরের কেন্দ্রবিন্দু। এখানেই নগরের সব বড় বড় অনুষ্ঠান হতো। ফোরামের চারদিকে বিভিন্ন ধরনের ভবন। অনেকগুলো স্মৃতিস্তম্ভও রয়েছে। ফোরাম স্কয়ারটি এখনো তার প্রাচীন কাঠামোর নিদর্শন ধরে রেখেছে। মূল কাঠামোটি দৈর্ঘ্যে ৪৮২ ফুট আর প্রস্থে ১২৪ ফুট। স্কয়ারের দক্ষিণ দিকের দেয়ালের সঙ্গে রয়েছে মার্বেল-খচিত তিনটা বড় হল। এখানে বসতেন নগরের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। পশ্চিম দিকে ছিল শাকসবজি, ফলমূল আর বিভিন্ন খাবারের বাজার। এরই নিচের দিকে ছিলো জুপিটারের মন্দির। ধারণা করা হয়, এই মন্দির খ্রিষ্টপূর্ব দুই শতকে নির্মিত।

ফোরাম স্কয়ারের কাছেই একটি ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিলো ফোরাম বাথ। অর্থাৎ গণ-গোসলখানা। যেখানে ছিল নারী-পুরুষের জন্য গোসলের আলাদা ব্যবস্থা। ঠান্ডা ও গরম পানির সরবরাহ থাকতো সেখানে। এছাড়া রুটি তৈরির কারখানা, রাস্তারপাশের ফাস্টফুডের দোকান, ওয়াইনের দোকানগুলোর ধ্বংসাবশেষ রয়েছে এখানে। ছিলো দেড় শতাধিক বার।

পম্পেই নগরী কেন ধ্বংস হয়েছিল

এই নগরীতে অন্তত ২৫টি পতিতালয় ছিলো বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়টি একটা দোতলা ভবন যার নাম ‘লুপানার’। পম্পেইয়ের পাপাচারের সাক্ষী হয়ে এই ভবনটি এখনোও টিকে আছে। পতিতালয়গুলোতে উত্তর আফ্রিকা, এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের দখলকৃত এলাকা থেকে নারীদের ধরে আনা হতো। এছাড়া সমকামীতার ব্যাপক প্রচলণ ছিলো পম্পেইবাসীর মধ্যে। ছিলো আরো বিভিন্ন ধরণের বিকৃত যৌনাচার। পতিতালয়গুলোর দেয়ালে অশ্লীল ছবি আকা রয়েছে। রয়েছে অনেক অশ্লীল বাক্য লেখা।

পম্পেই : পতিতালয়গুলোর দেয়ালে অশ্লীল ছবি আকা রয়েছে

কিন্তু সব কিছুই একদিন ধ্বংস হয়ে গেল খোদায়ী গজবে। খুব কাছেই থাকা ভিসুভিয়াস পর্বতের আগ্নেগিরির লাভা ধ্বংস করে দিল পাপাচারে লিপ্ত থাকা ২০ হাজার বাসিন্দার এক সমৃদ্ধ জনপদকে।

পম্পেইয়ের যৌনাচার বিষয়ে খুব বেশি তথ্য গবেষকরা শুরুর দিকে প্রকাশ করেননি; কিন্তু ২০০৫ সালের পর থেকে বিষয়গুলো আর গোপন রাখা হয়নি।

লাস্ট ডেজ অফ পম্পেই

গবেষকদের মতে ভিসুভিয়াসের লাভা উদগিরণ হয়েছিল দুই ধাপে। সময়টি ছিলো ৭৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ আগস্ট। প্রথম দফায় দুপুরে শুরু হয়ে টানা ১৮ ঘণ্টা চলে পাথর আর জ্বলন্ত ছাইয়ের বৃষ্টি। এরপর কয়েঘণ্টা বিরতি দিয়ে ভোররাত অথবা পরদিন সকালের দিকে আবারো শুরু হয় লাভা উদগিরণ।

যে যেখানে যে অবস্থায় ছিলো সেভাবেই ধ্বংস হয়ে গেছে। অল্প কিছু লোক শুধু পালাতে পেরেছিল। তারপর বহু বছর এই জনপদের কথা মানুষ জানতো না।

পম্পেই : যে যেখানে ছিলো সেখানেই লাশ হয়ে গেছে

১৫৯২ সালে পম্পেইয়ের কিছু অংশ আবিস্কৃত হয়। এক ইতালীয় আর্কিটেক্ট কারখানার বর্জ্য অপসারণের নালা তৈরির জন্য মাটি খুড়তে গিয়ে একটি দেয়াল দেখতে পান- যেখানে বিভিন্ন আলপনা আকাঁ ছিলো। তবে তিনি বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে পম্পেইয়ের বিভিন্ন অংশ খুড়ে বের করতে থাকেন প্রত্মতত্ত্ববিদরা। ১৭৩৮ সালে হারকুলেনিয়াম এলাকাটি খুজে পাওয়ার পর স্পেনের সেনাবাহিনী এই কাজে যোগ দেয়। তবে তখনো কেউ জানতো না তারা কী বের করছে মাটি খুড়ে। ১৭৬৩ সালে পাওয়া একটি শিলালিপির পাঠোদ্ধার করে গবেষকরা জানান, এটি ছিলো প্রাচীন নগরী পম্পেই।

এখানে একটি মিউজিয়াম আছে। মিউজিয়ামে রয়েছে লাভায় চাপা পরে মারা যাওয়া একটা পরিবারের সদস্যদের অবয়ব। এছাড়া আরো অনেকগুলো মানবদেহ অবিকৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে মাটি খুড়ে। যদিও তারা পুড়ে শক্ত হয়ে গেছে। একটি মানব দেহের হাতে পাওয়া কোন বস্তুকে অর্ধখাওয়া রুটি বলে মনে করা হচ্ছে। পম্পেইয়ের মিউজিয়ামে মাটি খুড়ে পাওয়া ৯ হাজার সামগ্রী প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে। এসবের মধ্যে মানবদেহ ছাড়াও আছে থালা-বাটি, পণ্য পরিবহনের ছোট ছোট চাকাওয়ালা গাড়ি থেকে বাসিন্দাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক যায় পম্পেই ভ্রমনে। যার ধ্বংসাবশেষ এখনো সাক্ষী দিচ্ছে পাপাচারের কারণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া এক জনপদের।

আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন : আহমেদ স্টোর

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top