ফ্যাশন কিংবা কর্মক্ষেত্রের চাহিদা- দুই বিবেচনাতেই বুট জুতা হয়ে উঠেছে অপরিহার্য। এ কারনেই প্রাচীন এই বিশেষ ধরনের জুতোর চাহিদা কখনো কমে না। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে অনেক কিছু বদলালেও বুটের চাহিদা রয়ে গেছে আগের মতোই। সৈনিক, কারখানার শ্রমিক, দুর্গম পথের অভিযাত্রী কিংবা মিডিয়া সেলিব্রেটি সবার কাছেই আছে বুটের চাহিদা। কেউ প্রয়োজনে কেউবা ফ্যাশনের অনুসঙ্গ হিসেবে পরেন বুট।
বুট জুতার ইতিহাস
বুটের প্রচলন পৃথিবীতে কিভাবে হয়েছিল তার সঠিক বিবরণ পাওয়া কঠিন। খ্রিস্টের জন্মের ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার বছর পূর্বে স্পেনের গুহাচিত্রে বুট দেখা গেছে। এটিকেই বুটের সবচেয়ে প্রাচীন উৎস হিসেবে ধরা হয়। এসব চিত্রে পুরুষের পায়ে চামড়ার বুট ও নারীদের পায়ে পশমের বুট দেখা গেছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।
প্রাচীন মিসরের (খ্রিস্টপূর্ব ২১৪০-১৭৮৫) খুনুমহোতেব সমাধিতে বুটের সন্ধান পাওয়া গেছে। খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার অব্দে গ্রিকরা চামড়ার তৈরি বুট পরতো বলে জানা যায়। চামড়া দিয়ে ব্যাগের মতো তৈরি করে তার ভেতর পা গলিয়ে দুর্গম এলাকায় চলাফেরার জন্য ব্যবহার করতো তারা। এশিয়া ও আর্কটিক অঞ্চলের প্রাচীন সংস্কৃতিতেও এ ধরনের জুতার প্রচলন ছিলো।
পূর্ব এশিয়ার যাযাবর গোষ্ঠির লোকরা বুট পরতো। ১২০০ থেকে ১৫০০ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে মঙ্গোলীয় আক্রমণকারীদের মাধ্যমে এই জুতো ছড়িয়ে পড়ে চীন, রাশিয়া ও ভারতে।
তবে ক্রমশ বুটের আকৃতিতে পরিবর্তনের সাথে সাথে এটি অভিজাত শ্রেণির পোষাকের অংশ হয়ে ওঠে। শাসক ও সামরিক বাহিনীর পোষাকের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে বুট। সাধারণ মানুষের প্রায় সবাই যখন খালি পায়ে থাকতো তখন রাজা-বাদশাহরা বিভিন্ন মূল্যবান ধাতুতে সজ্জিত বুট পরতেন।
রোমান শাসকদের বুটের সোল বা তলা ছিলো স্বর্ণের তৈরি। বুটের গায়ে লাগানো থাকতো হীরা সহ অনেক মূল্যবান পাথর। প্রাচীন রোমে শাসকদের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের কমকতারাও বুট পরতেন। কখনো কখনো ব্যক্তির পদ মর্যাদা অনুযায়ী হতো বুটের উচ্চতা। আবার কখনো বিশেষ উৎসবের পোষাকের অংশ হতো বুট।
নানা ধরনের বুট জুতা
বুটের রয়েছে নানা রকমভেদ। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় কাউবয় বুট। প্রাচীন কালে রাখাল কিংবা অশ্বচালকরা যে ধরনের বুট পরতো সেটিই কাউবয় বুট হিসেবে পরিচিত। তবে কালের বিবর্তনে এই বুটই আধুনিক অভিজাত শ্রেণির পোশাকের অংশ হয়ে গেছে।
হাঁটু পযন্ত উচ্চতার এই বুট পশ্চিমা দুনিয়ার ফ্যাশনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অষ্টাদশ শতাব্দীতে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অশ্বারোহী সৈন্যদের মাঝে কাউবয় বুট ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিলো। এরপর এটি অঞ্চলে দ্রুত জনপ্রিয় হয়। পশ্চিমা দুনিয়ায় পুরুষদের মাঝে সর্বাধিক জনপ্রিয় চুক্কা বুট।

গোড়ালির একটু উপরে শেষ হয় এই বুট। ইউরোপ আমেরিকার মিডিয়া সেলিব্রেটিদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় চেলসি বুট। গোড়ালির কাছে দুই পাশে রাবারের ফিটিং থাকে এই বুটের। এটির উচ্চতাও চুক্কা বুটের মতো।
ওয়েলিংটন বুটের নামকরণ হয়েছে ওয়েলিংটনের প্রথম ডিউক আথার ওয়েলেসলের মাধ্যমে। ব্রিটিশ রাজপরিবারে সদস্যরা নিয়মিত পড়তেন এই বুট। কালের বিবর্তনে চামড়ার পাশাপাশি রাবার দিয়েও তৈরি শুরু হয়েছে এই বুট। এরপর ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণের মাঝেও।
ডেজার্ট বুটের প্রচলন শুরু হয়েছে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে। মরুভূমিতে চলাচলের সুবিধার জন্য ওই অঞ্চলের লোকরা এ ধরনের বুট পরতো। এছাড়া কাজের ধরনের ভিন্নতা অনুযায়ী রয়েছে রেসিং বুট, হাইকিং বুট, সেইলিং বুট, স্নো বুট, মাউন্টেনিয়ারিং বুট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল বুট।
মিলিটারি বুটের মধ্যে আবার রয়েছে বিভিন্ন রকম বুট যেমন- কমব্যাট বুট, ট্যাঙ্কার বুট, ডেজার্ট কমব্যাট বুট, মাউন্টেইন কমব্যাট বুট, জাম্প বুট, জাঙ্গল বুট, কোল্ড ওয়েদার বুট ইত্যাদি। অত্যধিক ঠাণ্ডায় মার্কিন সেনাবাহিনীর সদস্যরা ব্যবহার করে রাবারের তৈরি কোল্ড ওয়েদার বুট যা মিকি মাউস বুট নামেও পরিচিত।
জাম্পবুট ব্যাবহার করে প্যারাট্রুপাররা। সাধারণ কমব্যাট বুটে সুতার তৈরি ফিতা থাকলেও ট্যাঙ্কার বুটে থাকে চামড়ার ফিতা। যা ট্যাঙ্কে ডিউটিরত সৈন্যদের জন্য খোলা বা পরা সুবিধাজনক।
মহিলাদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ফ্যাশনাবল বুটের মধ্যে জনপ্রিয় গো-গো বুট। গত শতাব্দির ষাটের দশকে ফরাসি ফ্যাশন ডিজাইনার আন্দ্রে কারেজেস এই বুট বাজারে আনেন।
কারা পরেন বুট জুতা
সামরিক, ইন্ডাস্ট্রিয়াল কিংবা এ ধরনের কাজের পরিবেশ সম্পর্কীত বুট সারা বিশ্বে চললেও। পশ্চিমা বিশ্বে ফ্যাশন বুটের প্রচলন বেশি। হলিউড তারকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সবাই কমবেশি বুট পরেন। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন কাউবয় বুট পরতেন। ১৮তম প্রেসিডেন্ট উলিসেস এস গ্রান্টও হাঁটু পযন্ত কাউবয় বুট পরতেন। থিওডর রুজভেল্ট ও গারল্যান্ড ফোর্ড- দুজনে চুক্কা বুট পরতেন নিয়মিত।
যুক্তরাষ্ট্রের আরজে’স বুট কোম্পানির মালিক রকি ক্যারল দেশটির সাতজন প্রেসিডেন্টের জন্য বুট তৈরি করেছেন। কাউবয় বুট তৈরির এই এক্সপার্ট প্রেসিডেন্টদের বুট উপহার দিতেন। জজ এইচ ডব্লিউ বুশ যখন ভাইস প্রেসিডেন্ট সে সময় তাকে একজোড়া বুট উপহার দেন ক্যারল।

বুট জোড়া সিনিয়র বুশের এতটাই পছন্দ হয় যে তিনি প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের সাথে দেখা করে তাকেও বুট উপহার দেয়ার প্রস্তাব দেন ক্যারলকে। তার তৈরি বুট এতটাই আরামদায়ক ছিলো যে রিগ্যান পরার পরে বলেছিলেন, মনে হচ্ছে পায়ে মোজা পরে আছি।
এরপর জেরাল্ড ফোর্ড, জিমি কার্টার, ব্লিল ক্লিনটন, জজ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামাকেও তিনি কাউবয় বুট উপহার দিয়েছেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও বুট উপহার দেয়ার পরিকল্পনা ছিলো ক্যারলের; কিন্তু ট্রাম্প দায়িত্ব নেয়ার কয়েক মাস পরেই মৃত্যু হয় এই বুট প্রস্তুতকারকের।
হলিউডের কিংবদন্তি তারকা মারলন ব্রান্ডো দ্যা ওয়াইল্ড ওয়ান সিনেমায় যে বুট পরেছেন তা পরে জনপ্রিয় হয়েছে সারা বিশ্বে। মাইকেল জ্যাকসনের বিশেষ ডিজাইনের বুটও ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলো। বতমান সময়ের নারী তারকাদের কাছে জনপ্রিয় স্টুয়ার্ট উইজম্যান ফিফটি-ফিফটি বুট। টেইলর সুইফট, বিয়ন্সরা নিয়মিত পরেন এই ব্রান্ডের বুট। গ্রেনসন, ডুনে গুচ্চি, কেলভিন ক্লেইন, মেরেল কোম্পানির বুট পছন্দ পুরুষ তারকাদের। জনপ্রিয় অভিযাত্রী বেয়ার গ্রিলসের দুর্গম যাত্রার সঙ্গী মেরেলের শেমেলন হেক্স বুট।
বুট জুতার দাম
সাম্প্রতি সময়ের সবচেয়ে দামি বুট তৈরি করে বেলজিয়ামের এএফ ভ্যান্ডেভোস্ট কোম্পানি। ২০১৪ সালে তাদের তৈরি এক জোড়া বুটের দাম হাকা হয়েছিল ৩১ লাখ মার্কিন ডলার। দেড় হাজার ক্যারেট হিরা ব্যবহার করা হয়েছিল সেই বুট জোড়ায়।
স্পেনোর মানোলো ব্লাহনিকের তৈরি কুমিরের চামড়ার বুটের দাম ১৪ হাজার মার্কিন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেস আউটলস গ্রাহকের পছন্দ মতো কাউবয় বুট তৈরি করে। একটি মডেলের মাত্র এক জোড়াই তৈরি করে তারা।এই বুট পরতে হলে গুনতে হবে কম করেও ১৫ হাজার ডলার।

ফ্যাশন জগতে বুটের জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান গুচ্চি। তাদের বুটের দাম কম বেশি ৪ হাজার ডলার। তবে বর্তমানে চামড়ার পাশাপাশি সিনথেটিক বুট তৈরি হচ্ছে যা সাধারণ জুতার মতো কম দামেও পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের বাজারে বিভিন্ন দামের বুট জুতা পাওয়া যায়। সর্ব নিম্ন ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বুট জুতা পাওয়া যায় বাংলাদেশর বাজারে। সাধারণত দেড় হাজার থেকে ৪ হাজারের মধ্যেই বেশির ভাগ বুটের দাম। খাটি চামরার বুট কিনতে হলে খরচ করতে হবে ৫ হাজারের বেশি।
বাটা, এপেক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও বুট জুতা তৈরি করে। রাজধানীর এলিফেন্ট রোড বা গুলশান এলাকার বাটা, এপেক্স স্টোরগুলোতে পাওয়া যাবে। বসুন্ধরা সিটি বা যমুনা ফিউচার পার্কেও পাওয়া যাবে। এছাড়া এলিফেন্ট রোডের জুতার দোকানগুলোতেও বুট পাওয়া যায়। কোয়ালিটি অনুযায়ী দাম নির্ভর করে। রেক্সিন বা আর্টিফিশিয়াল লেদারের হলে এক হাজার থেকে আড়াই হাজার। আর চামরার হলে ৫ থেকে ৮ হাজার । এর বাইরে অনেক কোম্পানি আমদানি করা বুট বিক্রি করে অনলাইনের।
এছাড়া অ্যামাজন ডট কম থেকেও বাংলাদেশীরা বুট জুতা কিনতে পারেন অনলাইনে। সেক্ষেত্রে ৪০ ডলার থেকে উর্ধ্বে বিভিন্ন ডিজাইনের ও দামের জুতা রয়েছে। ক্ষেত্র বিশেষে এর চেয়ে কম মূল্যেও পাওয়া যায়।
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন : আহমেদ স্টোর
১৯.০৫.২০১৯


