অ্যাটাক হেলিকপ্টার কী
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ অ্যাটাক হেলিকপ্টার । ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সামরিক হেলিকপ্টারকে হেলিকপ্টার গানশিপ নামেও ডাকা হয়। বিশ্বের সেরা দুটি অ্যাটাক হেলিকপ্টার হলো যুক্তরাষ্ট্রের অ্যপাচি ও রাশিয়ার এলিগেটর। হামলার ক্ষমতা, টিকে থাকার দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সুবিধা- ইত্যাদি বিষয়ে এই দুটি হেলিকপ্টারের তুলনামূলক আলোচনা করবো এই লেখায়।
কম দূরত্বের শত্রু সৈন্যদের ওপর হামলা, শত্রুর ট্যাঙ্ক ও সাজোয়া যানে হামলায় হেলিকপ্টার খুবই কার্যকর। আবার পার্বত্য এলাকায় সামরিক অভিযানে অ্যাটাক হেলিকপ্টারের জুড়ি নেই। শত্রুর এলাকায় আটকে পড়া সৈন্যদের উদ্ধার কিংবা রসদ পৌছাতেও হেলিকপ্টারের বিকল্প নেই। যুদ্ধক্ষেত্রে হেলিকপ্টারের এসব উপযোগিতার কথা চিন্তা করেই পরাশক্তিগুলো বানিয়েছে আধুনিক সব অ্যাটাক হেলিকপ্টার।
এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা দুটি অ্যাটাক হেলিকপ্টার হলো যুক্তরাষ্ট্রের এএইচ-সিক্সটি ফোর অ্যাপাচি ও রাশিয়ার কেএ-ফিফটি টু এলিগেটর। যেটির আরেক নাম ব্ল্যাক শার্ক।
অ্যাপাচি ও এলিগেটর
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বহরে বর্তমানে অ্যাপাচি হেলিকপ্টার আছে ২ হাজার ৪০০টি। বিশ্বখ্যাত বিমান সংস্থা বোয়িংয়ের সহযোগি প্রতিষ্ঠান বোয়িং ডিফেন্স স্পেস এন্ড সিকিউরিটি বর্তমানে মার্কিন বাহিনীর জন্য এ্যাপাচি নির্মাণ করে। ১৯৮৬ সাল থেকে অ্যাপাচি সেবা দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে। আগামী আরো ৩০ বছর এগুলোকে বহরে রাখার পরিকল্পনা আছে বলে জানা গেছে। এর কয়েকটি ভার্সন আছে যেমন এএইচ সিক্সটি ফোর এ, বি, সি, ডি, ই ইত্যাদি। এর প্রতিটির নির্মাণ খরচ ৩ কোটি মার্কিন ডলারের আশপাশে।
৪৫ কিলোমিটার দূর থেকে শত্রুর ট্যাঙ্ক বহর সনাক্ত করে বলে দেবে ঠিক কতটি ট্যাঙ্ক আছে। আশপাশের ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে কোন যুদ্ধবিমান থাকলে সেটিও ধরা পড়বে এলিগেটরের রাডারে।
অন্য দিকে রুশ সামরিক বাহিনীর জন্য কেএ-ফিফটি টু এলিগেটর নির্মাণ করেছে জেএসসি কামোভ নামের একটি রুশ কোম্পানি। একই কোম্পানির কেএ-ফিফটি অ্যাটাক হেলিকপ্টারকে আরো আধুনিক হিসেবে গড়ে তুলে ১৯৯৫ সালে রুশ বহরে যুক্ত করা হয় কেএ ফিফটি টু অ্যালিগেটর। এর প্রতিটির নির্মাণ খরচ প্রায় দুই কোটি মার্কিন ডলার। বর্তমানে রাশিয়ার কাছে ফিফটি টু অ্যালিগেটর আছে ১০০টি। এই সংখ্যা ক্রমশই বাড়বে বলে জানা গেছে।
প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য
যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর জন্য নির্মিত অ্যাপাচি দুই ইঞ্জিনের অ্যাটাক হেলিকপ্টার। এটিতে মোট ক্রু থাকে তিনজন- পাইলট, কো পাইলট ও একজন গানার। এই তিন জনের বসায় জায়গা আলাদা। তিনটি জায়গার মধ্যে থাকে শক্ত একটি শিল্ড যাতে কোন আঘাত এলেও অন্তত একজন সুরক্ষিত থাকতে পারেন। সেই কথা চিন্তা করেই ক্রুদের সবার সিট থেকেই অ্যাপাচিকে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এর ইঞ্জিন দুটি বডির দুই পাশে রাখা হয়েছে, যাতে একটি আক্রান্ত হলেও অন্যটি চালুুু থাকে। অ্যাপাচির ক্রুদের হেলমেটের সাথেই রয়েছে এমন এক মনিটর- যার সামনে প্রয়োজনীয় সব তথ্য ভেসে ওঠে। এটিকে বলা হয় হেলমেট মাউন্টেড ডিসপ্লে সিস্টেম।
আফগানিস্তানের মতো পাবর্ত্য এলাকাগুলোতে
অ্যাপাচি কার্যকর হয়েছে বেশি
৫৮ ফুট ২ ইঞ্জি লম্বা অ্যাপাচির উচ্চতা ১২ ফুট ৮ ইঞ্চি। খালি অবস্থায় এর ওজন পাঁচ হাজার কেজির কিছু বেশি আর সর্বোচ্চ সাড়ে ১০ হাজার কেজি ওজন নিয়ে উড়তে পারে এটি। অ্যাপাচির রয়েছে চার ব্লেডের একটি পাখা, যার প্রতিটি ব্লেডের দৈর্ঘ ৪৮ ফুট। এছাড়া লেজের দিকে আছে ছোট একটি পাখা।
অ্যাপাচির রয়েছে এন-এপিজি সেভেন্টি এইট লংব্লো রাডার। যার ফ্রিকোয়েন্সি ৩৫ গিগাহার্টজ। এই রাডার ৫০ কিলোমিটার দূর থেকে একই সাথে ২৫৬টি টার্গেট চিহ্নিত করতে পারে। আবার শত্রুর রাডারে জ্যামিং করার জন্যও এর রয়েছে বিশেষ ধরনের কয়েকটি জ্যামার। আছে আর্লি ওয়ার্নিং, লেসার ওয়ার্নিং, ক্যামিকেল ওয়ার্নিং রাডার। এর ক্যামেরা আড়াই হাজার ফুট ওপর থেকে ৫ মাইল দূর পর্যন্ত স্পষ্ট ছবি তুলতে পারে।
অন্য দিকে একজন ক্রু ও একজন গানার নিয়ে এলিগেটর আকাশে ওড়ে। ৫২ ফুট ৬ ইঞ্জি দৈর্ঘের আকাশযানটির উচ্চতা ১৬ ফুট ২ ইঞ্চি। খালি অবস্থায় এর ওজন ৭ হাজার ৭০০ কেজি আর সর্বোচ্চ ১০ হাজার ৮০০ কেজি ওজন নিয়ে উড়তে পারে এটি। রাশিয়ার এই আকাশ যানটির রয়েছে তিন ব্লেডের দুটি পাখা। যা এটিকে দিয়েছে আকাশে শক্তি প্রদর্শনের অনেক বেশি ক্ষমতা।
সেকেন্ডে ১০ মিটার গতিতে এটি খাড়া উপরের দিকে উঠতে পারে আড়াই হাজার মিটার পর্যন্ত। আবার জায়গা না পাল্টেই দিক পাল্টাতে পারে এলিগেটর। এর পাখার ব্লেডের দৈর্ঘ ৪৭ ফুট ৭ ইঞ্চি। অ্যাপাচির মতো এটির ও ইঞ্জিন দুটি।
গতি ও প্রযুক্তিগত সুবিধা
দিন ও রাতের জন্য এটির আছে আলাদা নেভিগেশন সিস্টেম ও সেন্সর। এতে ব্যবহার করা হয়েছে এইএসএ রাডার। এই রাডার একই সাথে ১৮০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত স্থল ও সমুদ্রে ভাসমান টার্গেট চিহ্নিত করতে পারে। ৪৫ কিলোমিটার দূর থেকেও শত্রুর ট্যাঙ্ক বহর সনাক্ত করে বলে দেবে ঠিক কতটি ট্যাঙ্ক আছে সেখানে। একশো কিলোমিটার দূর থেকে সেতু সনাক্ত করতে পারে এটি।
আশপাশের ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে কোন যুদ্ধবিমান থাকলে সেটিও ধরা পড়বে এলিগেটরের রাডারে। শুরুর দিকে এর রাডার একই সাথে ২০টি করে এয়ার ও গ্রাউন্ড টার্গেট সনাক্ত করতে পারলেও পরবর্তীতৈ সেই সংখ্যা অনেক বেড়েছে।
এলিগেটর ঘণ্টায় ১৯৬ মাইল বেগে উড়তে পারে। আর সর্বোচ্চ উচ্চতায় ওঠার ক্ষমতা ১৮ হাজার ৪৪ ফুট পর্যন্ত। উড্ডয়ন রেঞ্জ ৬৮৩ মাইল। রেঞ্জ ও গতির দিক থেকে এটির চেয়ে পিছিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপাচি। অ্যাপাচির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১৮৮ মাইল আর রেঞ্জ ২৯৯ মাইল। তবে এলিগেটরের চেয়ে ৩ হাজার ফুট উচ্চতায় উঠতে পারে অ্যাপাচি। অর্থাৎ এর ম্যাক্সিমাম অলটিচ্যুড ২১ হাজার ফুট।
এই তিন হাজার ফুটের উচ্চতা অ্যাপাচিকে অনেক বেশি সুরক্ষিত রাখতে পারবে। আফগানিস্তানের মতো পাবর্ত্য এলাকাগুলোতে এ কারণেই অ্যাপাচি কার্যকর হয়েছে বেশি। আবার প্রয়োজনের সময় রাশিয়ার এলব্রাউস পাবর্ত্য এলাকায়ও এই হেলিকপ্টার মার্কিন সেনাদের সুরক্ষিত রাখতে পারবে। এই বিবেচনায় তাই এলিগেটরের চেয়ে অ্যাপাচিকে এগিয়ে রাখতে হবে।
সামরিক শক্তিতে সেরা অ্যাটাক হেলিকপ্টার কোনটি
তবে অ্যালিগেটরের সমরাস্ত্র বহরে আছে বৈচিত্র। এটি ছুড়তে পারে অত্যাধুনিক ভিখার ও আটাকা ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী গাইডেড মিসাইল। এছাড়া আকাশ থেকে ভুমিতে নিক্ষেপযোগ্য কেএইচ টুয়েন্টি ফাইভ মিসাইল ও ৮০ মিলিমিটার আনগাইডেড এস-এইট রকেটও ছুড়তে পারে।
এখানেই শেষ নয়- এলিগেটর ছুড়তে পারে কেএইচ-থার্টিফাইভ এন্টিশিপ মিসাইল। যা আঘাত হানতে পারবে ৮০ মাইল দূরে সাগরে ভাসমান যে কোন যুদ্ধজাহাজে। আছে থার্টি মিলিমিটার অটোমেটিক গান যেটি থেকে প্রতি মিনিটে ছোড়া যায় ৫৫০টি গুলি।
অন্যদিকে এএইচ-সিক্সটি ফোর অ্যাপাচি বহন করতে পারে এক সাথে ১৬টি হেলফায়ার মিসাইল আর ৭৬টি রকেট। ৩০ মিলিমিটার বন্দুকে এক সাথে লোড করা যায় ১২০০ রাউন্ড বিস্ফোরক। অ্যাপাচির আরেকটি বৈশিষ্ট হচ্ছে এটির পাইলট ড্রোনের সাথে সমন্বয় করে কাজ করতে পারে। ড্রোন থেকে ভিডিও ও তথ্য গ্রহণ করতে পারে এবং ড্রোনের সেন্সর এবং গতিপথও নিয়ন্ত্রণ করা যায় এই হেলিকপ্টার থেকে।
ড্রোনের বিষয়টি অ্যাপাচিকে এগিয়ে রাখবে এলিগেটরের চেয়ে। এছাড়া অ্যাপাচির আছে নাইট ভিশন টার্গেটিং সিস্টেম। যার করণে এটি রাতের অন্ধকারেও টার্গেট খুজে পেতে পারে। আবার অ্যাপাচির ইঞ্জিনের শক্তিও বেশি।
ধ্বংস ক্ষমতা
ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যায় অ্যাপাচি এগিয়ে থাকলেও ধ্বংস করার ক্ষমতার দিক থেকে সমর বিশেষজ্ঞরা এগিয়ে রাখছেন ফিফটি টু এলিগেটরকে। অ্যাপাচির হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে বেশি শক্তি নিয়ে আঘাত হানতে পারে এলিগেটরের ভিখার ও আটাকা মিসাইল। হেলফায়ার পারে ৮০০ মিলিমিটারের বর্ম ভেদ করতে।
কিন্তু ভিখার ও আটাকা পারে যথাক্রমে ৯৫০ ও এক হাজার মিলিমিটার বর্ম ভেদ করতে। আবার হেলফায়ার মিসাইলের অ্যাটাক রেঞ্জ যেখানে ৫ মাইল সেখানে এলিগেটরের ভিখার মিসাইল পারে সাড়ে ৭ মাইল দূরের টার্গেটে আঘাত হানতে। আবার শক্ত কোন প্রতিরোধ যেমন বাঙ্কার ইত্যাদিতে আঘাত হানতেও এলিগেটর সবচেয়ে উপযুক্ত।
আরো পড়ুন :
আকাশ যুদ্ধে কতটা শক্তিশাল রাশিয়া
কতটা ক্ষমতাধর ইরানের বিপ্লবী গার্ড
এলিগেটরের আছে এন্টিশিপ মিসাইল ছোড়ার ক্ষমতা। অ্যাপাচির হেলফায়ার মিসাইলকেও জাহাজের উদ্দেশ্যে ছোড়া যায়; কিন্তু এর ১৬ পাউন্ড ওজনের ওয়ারহেডের চেয়ে এলিগেটরের ৩২০ পাউন্ড ওয়ার হেডের কার্যকারিতা যে বেশি সেটি বুঝতে বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। তবে অ্যপাচি এয়ার টু এয়ার মিসাইল ছুড়তে পারলেও এলিগেটরের সেই ক্ষমতা নেই।
শেষ কথা
রাশিয়ার কেএ-ফিফটি টু অ্যালিগেটরের আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট আছে যা অ্যাপাচির নেই। সেটিকে বলা হয় সিট ইজেকশন সিস্টেম। অর্থাৎ কোন কারণে হেলিকপ্টার শত্রুর মিসাইল হামলায় আক্রান্ত হলে পাইলট একটি মাত্র সুইচে চাপ দিলে স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম চেয়ারসহ দুই ক্রুকে ছুড়ে ফেলবে শূন্যে। এরপর প্যারাসুট খুলে যাবে। সাধারণত ফাইটার জেটে এই ব্যবস্থাটি থাকলেও হেলিকপ্টারের ক্ষেত্রে অ্যালিগেটরই প্রথম পেয়েছে এই ইউনিক ফিচারটি।
আসলে সব কিছু মিলে এই দুটি অ্যাটাক হেলিকপ্টার এর মধ্যে কোনটি সেরা সেই আলোচনার উপসংহারে পৌছা কঠিন। কারণ একেক দিকে একেকটি সেরা। এলিগেটরের মিসাইলের পাল্লা বেশি হলেও এতে অ্যাপাচির চেয়ে কম মিসাইল বহন করতে পারে। আবার অ্যাপাচি বেশি উচুতে উঠে আক্রমন চালাতে পারলেও এটির পাইলটের জন্য বিপদের মুহুর্তে নেই সিট ইজেশন সিস্টেম। অ্যাপাচির অপারেশন সিস্টেম উন্নত, রাডারের শক্তিও এলিগেটরের চেয়ে বেশি।
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন : আহমেদ স্টোর


