এশিয়ার দুই বৃহৎ প্রতিবেশী চীন ও ভারত। আয়তনে দেশ দুটি যথাক্রমে এশিয়া মহাদেশের প্রথম ও দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। তবে প্রভাব প্রতিপত্তিতে দেশ দুটির রয়েছে বড় ব্যবধান। চীন অর্থনৈতিক ও সামরিক ভাবে ক্রমেই পরাশক্তি হয়ে ওঠছে, আর ভারত হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক রাজনীতির বড় কুশীলব। দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্কের ইতিহাস অম্ল-মধুর। কখনো সুসম্পর্ক যেমন গড়ে উঠেছে, আবার বিরোধীতা গড়িয়েছে যুদ্ধ পর্যন্ত। তবে গত দুই দশকে এসব ছাড়িয়ে এই লড়াই পৌছে গেছে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগীতায়। চীন ভারত যুদ্ধ সহ দুই দেশের সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে এই লেখা
ভারত চীন সম্পর্ক
চীন ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই মধুর ছিলো। দুই দেশের মাঝে বাণিজ্যসহ বিভিন্ন যোগাযোগ চলে আসছে যুগযুগ ধরে। চীনে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠার পর যে দেশগুলো বেইজিংেেক সবার আগে স্বীকৃতি দিয়েছে তার একটি ছিল ভারত; কিন্তু সেই সম্পর্ক এক দশক পরেই তিক্ততায় রূপ নিয়েছে সীমান্ত বিরোধ ও দালাইলামা ইস্যুতে। যা গড়িয়েছে যুদ্ধ পর্যন্ত। মাঝখানের সময়টাতে এসে উভয় পক্ষই সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করেছে।
বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সহযোগিতাও শুরু হয়েছে; কিন্তু সেই সুসম্পর্ক স্থায়ী হয়নি। কারণ গত শতাব্দীর নব্বুইয়ের দশকের শেষ দিকে এসে সেটি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া শুরু করে। এই সময়ে সীমান্ত বিরোধ, বাণিজ্যিক প্রতিযোগীতার পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইও দেশ দুটির সম্পর্কে জায়গা নিতে শুরু করে।
চীনের ক্রমশ অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হয়ে ওঠা এক্ষেত্রে ভুমিকা রেখেছে। নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ এই অঞ্চলের ছোট দেশগুলোতে প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে নেমেছে বেইজিং ও নয়া দিল্লি। আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির বড় দুই খেলোয়াড় এক্ষেত্রে কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। যে কারণে প্রতিযোগীতা বেড়েই চলছে। যার ফলে ভারত-চীনের লড়াইয়ে হয়ে উঠেছে বৈশি^ক রাজনীতির বড় ইভেন্ট।
বৈরীতার শুরু যেভাবে
ভারত মহাসাগরও এই দুটি দেশের সম্পর্কে বড় জায়গা দখল করে রেখেছে। বিশাল এই সমুদ্রসীমায় চীন ক্রমশ তার প্রভাব বিস্তার শুরু করেছে, আর ভারত কাউন্টার ব্যালান্সের নীতি গ্রহণ করেছে পশ্চিমাদের সমর্থন নিয়ে। পাকিস্তানের সাথে চীনের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার বিষয়টিও চীন-ভারত সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে। বেইজিং ও ইসলামাবাদের সম্পর্ক যখন থেকে ঘনিষ্ঠ হয়েছে, তার পর থেকেই ধীরে ধীরে চীন-ভারত দূরত্ব তৈরি হয়েছে। চীন পাকিস্তানকে কাছে টানায়, ভারত ঘনিষ্ঠ হয়েছে চীনবিরোধী হিসেবে পরিচিত পশ্চিমাদের সাথে। গত সিকি শতাব্দীতে দেশ দুটির মাঝে তাই বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও কূটনৈতিক ও সামরিক দূরত্ব ক্রমশই বেড়েছে। সব কিছু মিলে তাই চীন ও ভারতের সম্পর্ক অম্ল-মধুর।
চীন ভারত সম্পর্কের ইতিহাস
যদিও ঐতিহাসিকভাবে দেশ দুটির সুসম্পর্কই ছিলো। ভৌগলিকভাবে চীন ও ভারতকে পৃথক করেছে হিমালয় পর্বতমালা। এছাড়া দেশ দুটির মাঝখানে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দুই রাষ্ট্র নেপাল ও ভুটান- যা চীন ও ভারতের বাফার স্টেট হিসেবে কাজ করে। কাশ্মিরের অংশ আকসাই চীন ও ভারতের অরুনাচল প্রদেশ নিয়ে ভারত ও চীনের মাঝে সীমান্তবিরোধ রয়েছে। উভয় দেশই একে অন্যের ভূখ-ের কিছু অংশ নিজের বলে দাবি করে। সেসব অবশ্য উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়েছে।
মধ্যযুগে ভারত থেকে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারকরা চীনে ধর্ম প্রচারের কাজে যেতেন বলে জানা যায়। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে এর উল্লেখ রয়েছে। খ্রিষ্টিয় প্রথম শতাব্দীতেই ভারত থেকে চীনে বৌদ্ধ মতবাদ সম্প্রসারিত হয়েছে বলে ইতিহাসবিদদের ধারণা। ধর্ম প্রচারকদের সূত্র ধরেই যাতায়াত শুরু হয় বণিকদের। দুই অঞ্চলের মানুষের মাঝে শুরু হয় বাণিজ্য যাত্রা। এক্ষেত্রে ভুমিকা রেখেছে প্রাচীনকালের বিখ্যাত সিল্ক রোড। এর ফলে দুই অঞ্চলের মানুষের মাঝে সাংস্কৃতিক বিনিময়ও শুরু হয়।
চীন ভারত যুদ্ধ
উনবিংশ শতাব্দীতে ভারতীয় শিখ রাজ বংশ লাদাখ, জম্মু ও তিব্বতের অনেক এলাকা দখলে নিলে চীনা সম্রাজ্যের সৈন্যরা তাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এরপরও বিভিন্ন সময়ে দুই অংশের মাঝে কিছু সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার দুই বছর পর চীনে কমিউনিস্ট শাসনের সূত্রপাত হয়। দুই দেশের নতুন প্রশাসন পরস্পরের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
ভারতের প্রথম প্রধানমমন্ত্রী জওয়াহের লাল নেহেরু ও কমিউনিস্ট চীনের প্রথম প্রিমিয়ার ঝৌ এনলাই সমন্বিত পররাষ্ট্র নীতির বিষয়ে বেশ কিছু সমঝোতায় পৌছান; কিন্তু তিব্বত নিয়ে স্বার্থের দ্বন্দ্ব দেখা দেয় দুই দেশের মাঝে। কমিউনিস্ট শাসকরা শুরু থেকেই তিব্বতকে চীনের অংশ বলে দাবি করতে থাকে। আর এটা নিয়ে ভারতের উদ্বেগকে সরাসরি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখতে শুরু করেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মাও সে তুং। যার ফলে চীনকে ক্ষেপাতে না চাওয়া ভারত জানিয়ে যে, তিব্বত নিয়ে কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই তাদের। ১৯৫৪ সালে এক চুক্তিতে তিব্বতকে চীনের অংশ হিসেবে মেনে নেয় ভারত।
এরপর ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দুই দেশের মাঝে সব সেক্টরে সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারে আন্তরিকতা লক্ষ করা যায়। সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময় শুরু হয় দুই পক্ষের মাঝে। তবে ১৯৫৯ সালে তিব্বতের ধর্মীয় নেতা দালাইলামা ভারতের হিমাচল প্রদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় নিলে আবার উত্তেজনা তৈরি হয়। দালাইলামা তিব্বতের প্রবাসী সরকার গঠন করলে চীন এর দায় চাপায় ভারতের ওপর।
এর জের ধরেই ক্রমেই সীমান্ত বিরোধও আবার জেগে ওঠে। ১৯৬২ সালে যা যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়। সেই যুদ্ধে ভারত পরাজিত হয়। আকসাই চীন ও লাদাখের অনেক এলাকা দখল করে নেয় চীনা সৈন্যরা।
ওই বছর অক্টোবর-নভেম্বর মাসে এই যুদ্ধ হয়। চীনের ৮০ হাজার সৈন্যর বিপরীতে ভারতের ২২ হাজার সৈন্য যুদ্ধে অংশ নেয়। চীনের ৭২২ জন নিহত এবং ভারতের ১৩০০ এর বেশি সেনা নিহত হয়। তবে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দুই পক্ষের সংখ্যা ব্যাপক মতপার্থক্য আছে। এই যুদ্ধ হয়ে ছিলো পুরোপুরি স্থল যুদ্ধ এবং পাহাড়ি এলাকায়।
চীন পাকিস্তান সম্পর্ক
১৯৬২ সালের যুদ্ধের পর পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক জোরদার করে চীন। একই সাথে তাদের সম্পর্কের অবনতি হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে। যার প্রভাব পরে বেইজিং-নয়া দিল্লি সম্পর্কে। এরই মধ্যে ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে বেইজিং পাকিস্তানের পক্ষে সমর্থন দিলে, আরো খারাপ হয় চীন-ভারত সম্পর্ক।
’৬৭ সালে সিকিম সীমান্তে আরো দুটি সংঘর্ষ হয় দুই দেশের সেনাদের মাঝে। ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠিকে সমর্থন ও সহযোগিতা দিতে শুরু করে চীন। আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানের পক্ষ নেয় চীন। সব কিছু মিলে তাই ষাটের দশক জুড়ে চীন ও ভারতের মাঝে বিরোধীতা ক্রমশই বেড়েছে।
১৯৭৭ সালের ভারতের নির্বাচনে কংগ্রেস হেরে গেলে নবগঠিত মোরারজি দেশাইয়ের সরকার চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। পরের বছর তৎকালীন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ীর এক ঐতিহাসিক সফরের পর দুই দেশের কূটনৈতিক অচলাবস্থার বরফ গলতে শুরু করে। তবে ১৯৮৭ সালে সেই ধারায় ছেদ পরে আবার।
সীমান্ত ইস্যুতে দুই দেশ আবার যুদ্ধের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলে, যদিও শেষ মূহুর্তে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধীর বেইজিং সফরের ফলে আরেকটি যুদ্ধ থেকে রক্ষা পেয়েছিল অঞ্চলটি। রাজীব গান্ধীর সময়ে চীন ও ভারতের মাঝে বিজ্ঞান, তথ্য প্রযুক্তি, শিক্ষাসহযোগিতা বিনিময় জোরদার হয়। চালু হয় সরাসরি বিমান যোগাযোগ।
আঞ্চলিক বিরোধ
বর্তমান শতাব্দীতে দেশ দুটির সম্পর্ক দ্বিপক্ষীয় বিরোধীতার মাত্রা ছাড়িয়ে রূপ নেয় আঞ্চলিক বিরোধে। বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে ভারত ও চীন বিরোধপূর্ণ অবস্থান নেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো, নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোতে প্রভাব বিস্তারের লড়াই। এই খেলায় কখনো ভারতের জয় হয়েছে, কখনো চীনের। নেপালে গত কয়েক বছরে বারবার সরকার পরিবর্তনের পেছনে দেশ দুটির স্বার্থের দ্বন্দ্বই ক্রীড়ানক হিসেবে কাজ করছে। ব্যালান্স ও কাউন্টার ব্যালান্সের এই দৌড়ে মালদ্বীপ-শ্রীলঙ্কাতেও কোন দেশ এককভাবে স্বার্থ ধরে রাখতে পারেনি।
পাল্লা কখনো চীনের দিকে ঝুকেছে, কখনো ভারতের দিকে। তবে সর্বশেষ আফগানিস্তানে ভারতীয় আধিপত্য খর্ব হয়ে চীনের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তালেবানের ক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে।
অনেক দিন ধরেই দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বেইজিংয়ের অবস্থানের বিরোধীতা করে আসছে ভারত। ভারত মহাসাগরেরও দেশ দুটি মুখোমুখী অবস্থানে। অন্যদিকে ভারতকে দুদিক থেকে চাপে রাখতে পাকিস্তানের সাথেও চীনের সম্পর্ক ক্রমশ জোরালো হয়েছে। তবে চীন বিরোধী অবস্থানের জন্য ভারত সমর্থন পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের। আঞ্চলিক রাজনীততে তারা ভারতের শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে চীনের মোকাবেলায়। যেটা একই সাথে ভারতের প্রভাব বৃদ্ধিতেও ভুমিকা রাখছে।
এর মধ্যে সীমান্ত বিরোধ নিয়ে ২০২১ সালে আবারো যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌছে যায় বেইজিং ও নয়া দিল্লি। লাদাখ সীমান্তে উভয় দেশ বড় ধরণের সৈন্য মোতায়েন করে। যদিও শেষ পর্যন্ত সামরিক পর্যায়ে বেশ কয়েক দফা সংলাপের পর উত্তেজনা প্রশমিত হয়েছে।
চীন ভারত বাণিজ্য
তবে এতসব কিছু সত্ত্বেও দুই দেশের মাঝে বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে। উভয়ই একে অন্যের দেশে বিনিয়োগ করেছে। ভারতীয় গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি মাহিন্দ্র চীনে ভালো ব্যবসায় করেছে, সেখানে রয়েছে তাদের নিজস্ব কারখানা। আবার চীনা মোবাইল হ্যান্ডসেন্ট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে ভারতে রয়েছে সুবিধজনক অবস্থায়।
দুই দেশের তেল কোম্পানির মাঝে রয়েছে বেশ কিছু সমঝোতা। ভারত গড়ে প্রতি বছর ৬৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে চীন থেকে, আর দেশটিতে পাঠায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত ইলেক্ট্রনিকস পণ্য, যন্ত্রপাতি, অর্গানিক ক্যামিক্যাল, জাহাজ, রাসায়নিক সার, স্টিল, চিকিৎসা ও প্রযুক্তি সামগ্রী ভারতে রফতানি করে। অন্য দিকে ভারত থেকে চীন আমদানি করে সুতা, পাথর, লোহা, লবন, সালফার, সিমেন্ট ইত্যাদি।
২০১২ সালে দেশ দুটি নিজেদের মধ্যকার বাণিজ্য সম্পর্ক ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নিত করাার পরিকল্পনা নেয়। যদি সেই লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি।
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন : আহমেদ স্টোর
১৪-০৯-২০২১


