Lake Baikal

বৈকাল হ্রদ : সাইবেরিয়ার মুক্ত

প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি রাশিয়ার বৈকাল হ্রদ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র, পর্যটন- সব কিছু মিলেই হ্রদটি আকর্ষণীয় এক জলাধার। শীতে জমে বরফ হয়ে যাওয়া হ্রদের সৌন্দর্য কিংবা গ্রীষ্মের স্বচ্ছ পানির বৈকাল- কোনটাই কম আকর্ষণীয় নয়। বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন হ্রদ এটি এবং পানির পরিমানের দিক থেকে বৈকাল বিশ্বের সবচেয়ে বড় হ্রদ। (স্থানীয়রা নামটি ‘বাইকাল’ উচ্চারণ করেন বলেও শোনা যায়) সাইবেরিয়ার মুক্তা নামে খ্যাত বৈকাল হ্রদ কোথায় অবস্থিত এবং এর সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত নিয়ে এই লেখা।

বৈকাল হ্রদ কোথায় অবস্থিত

রাশিয়ার শীত প্রধান অঞ্চল সাইবেরিয়া। সাইবেরিয়ার নাম শুনলেই মনে আসে বরফে ঢাকা বিস্তির্ণ অঞ্চল আর গা হীম করা শীত। তা সত্ত্বেও এখানেই রয়েছে প্রকৃতির বিস্ময় বৈকাল হ্রদ। দক্ষিণ সাইবেরিয়ায় অবস্তিত লেকটি মিষ্টি পানির বিশাল এক জালাধার। পানির পরিমানের দিক থেকে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় লেক। এটির পানির পরিমান ২৩ হাজার ৬১৫ কিউবিক মিটার, যা বিশ্বের সারফেসের মিষ্টি পানির ২২ থেকে ২৩ শতাংশ।

সারফেস এরিয়ার দিক থেকে বৈকাল হ্রদের আয়তন বিশ্বে সপ্তম। এর সারফেস এরিয়া বা পানির উপরিভাগের আয়তন ৩১ হাজার ৭৪২ বর্গকিলোমিটার। আয়তনে যা পশ্চিম ইউরোপে দেশ বেলজিয়ামের চেয়েও বড়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েতের প্রায় দ্বিগুণ। লেবাননের মোট আয়তনের তিনগুনেরও বেশি।

এটি বিশ্বের সবচেয়ে গভীর হ্রদও। এর গড় গভীরতা ৭৪৪ মিটার বা ২ হাজার ৪৪২ ফুট, আর সবচেয়ে গভীর স্থানটি ১ হাজার ৬৪২ মিটার বা ৫ হাজার ৩৮৭ ফুট। এই হ্রদের তলদেশ সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ১৮৬ মিটার নিচু। বৈকাল হ্রদের দৈর্ঘ ৬৩৬ কিলোমিটার, সবচেয়ে চড়াও স্থানটির প্রশস্ততা ৭৯ কিলোমিটার।

রাশিয়ার সাইবেরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এবং পৃথিবীর প্রাচীনতম হ্রদ এটি। এর উত্তরপূর্বে রাশিয়ার ইরকুস্ট ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট আর দক্ষিণ পূর্বে স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল বুরিয়াত রিপাবলিক। হ্রদের চারদিকের অঞ্চলগুলো পাহাড় ঘেরা। উত্তর উপকূলে বৈকাল পবর্তমালা, উত্তর-পূর্বে রয়েছে পার্বত্য বারগুজিন রেঞ্জ ও টাইগা ন্যাশনাল পার্ক।

বৈকাল হ্রদের ইতিহাস

ধারণা করা হয়, ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন বছর আগে ‘বৈকাল রিফট এলাকা’র ভূগর্ভে তীব্র আলোড়নের ফলে ভূপৃষ্ঠে একপ্রকার ফাটলের সৃষ্টি হয়; আর তারই ফলে এই বিশাল জলাশয় বৈকাল হ্রদের সৃষ্টি। প্রাচীন কাল থেকেই বৈকাল অঞ্চলে মানুষের বসবাস ছিলো। তখন এখানে স্থানীয় উপজাতীয় গোত্রগুলো বাস করতো। বহু শতাব্দী পর্যন্ত এলাকাটির খোজ জানতো না ইউরোপীয়রা।

Baikal winter
শীতে জমে যাওয়া বৈকাল হ্রদে পর্যটকদের ভীড়

তখন এখানে ইজয়াংজু, হান গোত্রের লোকেরা বাস করতো। ষষ্ঠ শতাব্দীতে এখানে বাস করতো কুরিকান নামের একটি সাইবেরিয়ান উপজাতি। ১৬৪৩ সালে সর্বপ্রথম কুরবাত ইভানভ নামের এক রুশ অভিযাত্রী এই লেকটি খুজে পায়। এরপর রাশিয়ার শাসকরা সাইবেরিয়া দখলে নিয়ে হ্রদটিও চলে আসে রুশ ভূখণ্ডের অধীনে।

সব মিলে ৩৩০টি নদীর পানি এসে পড়েছে বৈকাল হ্রদে। এগুলোর মধ্যে আপার আঙ্গারা, বারগুজি, সেলেঙ্গা, তুরকা, সারমা নদী উল্লেখযোগ্য। তবে এত নদীর মাঝে শুধুমাত্র আঙ্গারা নদীর মাধ্যমে হ্রদের পানি বাইরে যায়।
বিশে^র সবচেয়ে স্বচ্ছ পানির লেকগুলোর একটি বৈকাল হ্রদ। গ্রীষ্মের পানির নিচে ১৫ থেকে ২৫ ফুট পর্যন্ত স্পষ্ট মাছসহ জলজপ্রাণীদের চলাচল দেখা যায়। আর শীতে যখন পানি জমে বরফ হয়ে যায়, স্বচ্ছতা বেড়ে দাড়ায় ১০০ ফুটেরও বেশি।

শীতকালে বৈকাল হ্রদ

বৈকাল হ্রদে শীত ও গ্রীষ্মে আলাদা দুটি পর্যটন মৌসুম রয়েছে। যারা শীত পছন্দ করে তাদের জন্য শীতে বরফের ওপর ছোটাছুটি, স্কিসহ বিভিন্ন খেলার আদর্শ জায়গা বৈকালের সারফেস। এছাড়া ডগ স্লেজিং, সাইক্লিং, আইস ফিশিং, ডাইভিং করার আদর্শ জায়গা এটি। মোট কথা যারা সাইবেরিয়ার শীত উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য বৈকাল হ্রদ সবচেয়ে ভালো জায়গা।

ডিসেম্বরের শুরু থেকে মে পর্যন্ত এই হ্রদের পানি জমে বরফ হয়ে থাকে। এতটাই পুরু সে বরফের স্তর যে, এর ওপর হাল্কা থেকে মাঝারি ওজনের যানবাহন চালানো যায় অনায়াসে। এই মৌসুমে বৈকালের সারফেসের বরফের পুরুত্ব হয় আধা মিটার থেকে দেড় মিটার পর্যন্ত, তবে কোথাও কোথাও দুই মিটারের বেশি পুরু বরফ জমে। এসময় তাপমাত্রা মাইনাস ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নামে।

অ্যাডভেঞ্জার প্রিয় অনেক পর্যটক এই সময়টাতে বৈকালের পাড়ে তাবুতে রাত কাটায়। অবশ্য বৈশি^ক উষ্ণতার কারণে প্রতি বছরই লেকের সারফেসের উষ্ণতা বাড়ছে। যে কারণে আগের চেয়ে বৈকালের পানি জমে থাকার সময় কমছে প্রতিনিয়ত।

গ্রীষ্মে বৈকাল উষ্ণ থাকে। এপ্রিলের পর থেকে তাপমাত্র বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে গলতে শুরু করে বৈকালের বুকে জমে থাকা বরফ। জুলাইয়ে এই অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অবশ্য সেটা দিনের বেলায়, রাতে তা নেমে আসে ৫ থেকে ৭ ডিগ্রিতে। গ্রীষ্মেই পর্যটকদের ভীড় বেশি থাকে। গ্রীষ্মে বৈকালের পানিতে নৌযানে ঘুরে বেড়ানো, আশপাশের পাহাড়, বনাঞ্চল ও পশু পাখি দেখার সুযোগ রয়েছে।

পানির গভীরতার ওপর নির্ভর করে স্থানভেদে হ্রদের পানির তাপমাত্র বিভিন্ন রকম হয়। ৩০০ মিটার বা তারও বেশি গভীরতার পানির তাপমাত্রা সারা বছরই ৩ থেকে ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াসের আশপাশেই থাকে।

বৈকাল হ্রদের মাছ

বৈকাল হ্রদের পানিতে অক্সিজেনের পরিমান অনেক বেশি হওয়ার কারণে এর অত্যন্ত গভীর অঞ্চলেও মাছসহ বিভিন্ন জলজপ্রাণী দেখা যায়। বৈকালের জীববৈচিত্রও কম বিস্ময়কর নয়। বর্তমানে এই অঞ্চলে অন্তত এক হাজার প্রজাতির বৃক্ষ ও আড়াই হাজার প্রজাতির প্রাণী দেখতে পাওয়া যায়।

যদিও গবেষকদের ধারণা এর প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারে। এবং এসব প্রাণীদের ৮০ শতাংশই বৈকালের স্থানীয় প্রজাতির। এগুলো পৃথিবীর অন্যত্র দেখা যায় না। যার ফলে বোঝা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই এলাকাটি জীববৈচিত্রে সমৃদ্ধ ছিলো।

বৈকালের পানিতে রয়েছে ৫৬ প্রজাতির মাছ। এখান থেকে ১৩ প্রজাতির মাছ বাণিজ্যিকভাবে ধরার অনুমতি রয়েছে। বৈকালের বেশি পরিচিত মাছগুলোর মাঝে রয়েছে টাইমেন, লেনোক, ওমুন, হোয়াইট ফিশ ইত্যাদি। বাণিজ্যিক মৎসজীবীরা সবচেয়ে বেশি আহরণ করে ওমুন মাছ।

এখানে দেখা মিলবে বৈকাল সীল। অবশ্য এখানে মোট তিন প্রজাতির সীল রয়েছে। বৈকালের আশপাশের পাহাড় ও জঙ্গলে দেখা মিলবে ইউরোশিয়ান বাদামী ভাল্লুক, বাদামী নেকড়ে, সাইবেরিয়ান লাল হরিণসহ কয়েক প্রজাতির হরিণ, ইয়েল, কাঠবিড়ালিসহ অনেক প্রজাতির বন্য প্রাণী। বৈকালে পাখি রয়েছে ২৩৬ প্রজাতির, তার মধ্যে প্রায় ৩০ প্রজাতির জলজ পাখি।

শামুক, কাকড়াসহ অসংখ্য অমেরুদ-ী জলজ প্রাণী রয়েছে বৈকালের পানিতে। পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণে বৈকালের ৫ হাজার ফুট গভীর পর্যন্ত মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর বসবাস রয়েছে। রয়েছে সবুজ শৈবালসহ অনেক জলজ উদ্ভিদ। বৈকালের পানির নিচে এমন অনেক জলজ উদ্ভিদ রয়েছে যা বিশে^র আর কোথাও দেখা যায় না।

বৈকাল হ্রদ জীবিকার উৎস

এই হ্রদের মাঝখানে রয়েছে ২৭টি দ্বীপ, যার মাঝে সবচেয়ে বড়টির নাম ওলখন। এই দ্বীপটির অবস্থান হ্রদের কেন্দ্রস্থলে। ওলখন দ্বীপের আয়তন ৭৩০ বর্গকিলোমিটার। এটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম হ্রদবেষ্টিত দ্বীপ। দ্বীপটির বাসিন্দা ১৭৫০ জনের মতো, যাদের সবাই মঙ্গলীয় বংশোদ্ভূত বুরইয়াত আদিবাসী সম্প্রদায়ের। ৫টি গ্রাম ও বিচ্ছিন্ন কয়েকটি বাড়ি রয়েছে দ্বীপটিতে। এরমধ্যে খুজির নামের একটি গ্রাম দ্বীপটির প্রশাসনিক কেন্দ্র, গ্রামটিতে বাস করে এক হাজার ২০০ বাসিন্দা। সেখানে রয়েছে স্থানীয় প্রকৃতি ও ইতিহাস বিষয়ক একটি জাদুঘর।

বৈকাল হ্রদে দ্বীপগুলোর বাসিন্দাদের প্রধান আয়ের উৎস মৎস চাষ ও কৃষি। বেশির ভাগই হ্রদের মৎস সম্পদ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অঞ্চলটিতে পর্যটন শিল্প বিকাশ লাভ করায় পর্যটকদের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। যে কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠির বড় একটি অংশ পর্যটন সংশ্লিষ্ট পেশায় জড়িয়ে পড়েছে। অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর আদিবাসীদের বিচিত্র সংস্কৃতি দেখতে এই দ্বীপে ভীড় করেন পর্যটকরা।

গ্রীষ্মে মেইনল্যান্ড থেকে ফেরিতে করে যাওয়া যায় ওলখন দ্বীপে। আর শীতে বরফে জমে যাওয়া পানিতে একটি বরফের সড়ক তৈরি করেন বিশেষজ্ঞরা। বৈকালের বুকে এটিই একমাত্র স্বীকৃতি আইস রোড। এই সড়ক দিয়ে তখন যাওয়া যায় দ্বীপটিতে। ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক দিয়ে চলতে পারে সর্বোচ্চ ১০ টন ওজনের গাড়ি। টপিক : বৈকাল হ্রদ কোথায় অবস্থিত

আমাদের ফেসুবক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন : আহমেদ স্টোর

০৮-০৬-২০২১

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top