পপি ফুল

পপি ও আফিম চাষ বন্ধে তালেবানের সফলতা

পপি গাছ থেকেই উৎপাদিত হয় ভয়ঙ্কর মাদক আফিম ও হেরোইন। পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য মরফিনও আসে এগুলো থেকে। তালেবান পপি চাষ থেকে তহবিল সংগ্রহ করছে বলে পশ্চিমারা অনেক দিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে। তবে গোষ্ঠিটি এবার পপি চাষের বিরুদ্ধে কঠোর হয়েছে এবং আফগানিস্তানের পপি চাষ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। পপি ফুল

আফিম যুদ্ধ

১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন তার মাদক বিরোধী লড়াই শুরু করেছিলেন- যা ‘ওয়ার অন ড্রাগ’ নামে পরিচিত। তবে কয়েক দশকের এই লড়াই আফগানিস্তানের আফিম উৎপাদন বন্ধে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেনি। অনেক বছর ধরেই বিশে^র ৮০ শতাংশের বেশি আফিম উৎপাদিত হয় আফগাস্তিানে। ২০০১ সালে দেশটিতে মার্কিন সামরিক আগ্রাসন শুরু হলেও তারা আফিম উৎপাদন বন্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি, অথবা নিতে পারেনি।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশকে যা করেনি, তালেবান মাত্র বছর খানেকের মধ্যেই তা করে দেখিয়েছে। তারা ইতোমধ্যেই দেশটিতে পপি চাষ নিষিদ্ধ করেছে। বিশে^র সবচেয়ে বড় মাদক প্রতিরোধী সংগঠনগুলো যা করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাই করে দেখিয়েছে তালেবান।

তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা নেয় ২০২১ সালের আগস্টে। সরকার গঠন করতে চলে যায় আরো কয়েক মাস। পরের বছর এপ্রিলে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা দেশ জুড়ে পপি চাষের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা মোল্লা হাইবতুল্লাহ আখুন্দজাদার জারি করা ফরমানে বলা হয়, সব আফগান নাগরিককে জানানো যাচ্ছে, দেশজুড়ে পপি চাষ ও ফসল সংগ্রহ নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। তাই কোন কৃষক তার জমিতে পপি চাষ করতে পারবে না। এমন নজির পাওয়া গেলে ফসল নষ্ট করা এবং কৃষককে শাস্তির মুখোমুখী করা হবে।

পপি
বেগুনি পপি ফুল ধরেছে ক্ষেত্রে; কিন্তু তালেবান সদস্যরা তা নষ্ট করে দিচ্ছেন

এক বছরের মধ্যে এই নিষেধাজ্ঞা এতটাই কার্যকর হয় যে, বিশেষজ্ঞরা এটিকে মানব ইতিহাসে সবচেয়ে সফল মাদক বিরোধী প্রচেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

পপি চাষ

এর আগে প্রথম দফায় তালেবান যখন ক্ষমতায় ছিলো তখনও তারা চেষ্টা করেছে পপি চাষ দমনের। এ জন্য ২০০০ সালে তালেবান সরকার পপি চাষ নিষিদ্ধ করার নির্দেশ জারি করে, তবে ২০০১ সালে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরু হলে সেই নির্দেশনা আর কার্যকর হয়নি। বরং তালেবানের উৎখাতের পর পশ্চিমাপন্থী সরকারের সময়ে এই চাষ আরো বেড়েছে।

এই রিপোর্টের ভিডিও দেখুন

২০২১ সালের হিসাব মতে, আফগানিস্তানের মোট জাতীয় উৎপাদনের ৯ থেকে ১৪ শতাংশ আসে আফিম চাষ ও উৎপাদন থেকে। দেশটির কৃষকদের বড় একটি অংশ আফিম চাষের সাথে ঝড়িত।

ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য টেলিগ্রামের সরেজমিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালেবানের এই ঘোষণার প্রভাব ছিলো নাটকীয়। তারা পপি চাষ রোধে কঠোরতা অবলম্বন করে। আদেশ অমান্য করে যারা পপি চাষ করেছে, তাদের ক্ষেতে গিয়ে ফসল নষ্ট করে দেয়া এবং কৃষকদের শাস্তির আওতায় আনা হয়। যার ফলে এক বছরের মধ্যে কমে যায় ৮০ শতাংশ পপি চাষ।

পপি ফুল

পপি চাষ যুগ যুগ ধরেই আফগানিস্তানে বহুল প্রচলিত। শীতকালে বৃষ্টিপাত হয় এমন আবহাওয়া পপি চাষের জন্য আদর্শ। সে কারণেই আফগানিস্তানের কৃষি জমি এই নিষিদ্ধ ফসলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সাধারণ কৃষি জমিতেই রবি শস্যের মতো করে পপি চাষ করা হয়। অক্টোর মাসে এর বীজ বপন করা হয়। দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে যখন শীত শুরু হয়, তখন গাছগুলোতে ফুল ও ফল ধরতে শুরু করে।

এই গাছের গোলাকৃতির ফলই মূলত আফিম উৎপাদনের উৎস। ফল যখন পরিপক্ব হয় তখন ব্লেড দিয়ে ফলের গায়ে গভীর করে আঁচড় কাটা হয়। কাটা জায়গা থেকে কষ বের হয়। এই কষই আফিম তৈরির কাচামাল। নেশার জগতে আফিম বহুল প্রচলিত। এছাড়া আফিম থেকেই রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয় হেরোইন। অবশ্য পপি ফল থেকে মরফিনও পাওয়া যায়। মরফিন ব্যথানাশক ঔষধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। যে কারণে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের কাছে পপি চাষের গুরুত্ব রয়েছে। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের গুরুত্ব ছাপিয়ে মাদক উৎপাদনই পপি চাষের প্রধান উদ্দেশ্যে হয়ে দাড়িয়েছে।

আফগানিস্তানের পপি চাষ

সারা বিশে^ যে পরিমাণ আফিম কেনাবেচা হয়, এতদিন তার আশি শতাংশই জোগান দিতো আফগানিস্তানের কৃষকরা। ইউরোপের বাজারে যে প্রতিবছর পরিমাণ হেরোইন সেবন করা হতো, তার ৯৫ শতাংশ তৈরি হতো আফগান আফিম থেকে।

এমনকি ছোট পরিসরেও কেউ পপি চাষ করলে তার ক্ষেত গুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে

আফগানিস্তানে মাদক উৎপাদনকারী পপি চাষের ইতিহাস বেশ পুরোন। দেশটির জনসংখ্যারও একটি অংশ নিয়মিত মাদক সেবন করে; কিন্তু দেশটির অর্থনীতি ও কৃষকদের বড় একটি অংশ পপি চাষের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কর্তৃপক্ষ খুব বেশি কঠোর হতে পারেনি আগে।

এক সময়ে দেশটির মোট পপি চাষের ৫ ভাগের চারভাগ হতো হেলমান্দ প্রদেশে। ২০০৬ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে মোটামুটি ৩ লাখ ২০ হাজার একর জমিতে নিয়মিত পপি চাষ হতো; কিন্তু গত বছর তা নেমে এসেছে আড়াই হাজার একরে।

তালেবানের সাফল্য

জুন মাসের শুরুতে আরেক ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসি একটি সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আফগানিস্তানের পপি চাষের ওপর। যাতে দেখা গেছে, তালেবান সদস্যরা পপি ক্ষেতে গিয়ে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে ফসল নষ্ট করছে। বিবিসির সাংবাদিকরা নানগারহার, কান্দাহার ও হেলমান্দ প্রদেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে গিয়ে দেখতে পেয়েছেন এ ধরণের দৃশ্য। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া আফগানিস্তানের পপি ক্ষেতগুলোর যে ছবি প্রকাশ করা হয়েছে, তাতেও দেখা গেছে ফসল শূন্য জমি পড়ে আছে। তালেবানের চাপে বেশির ভাগ কৃষক পপি চাষ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

তালেবানদের একটি টহল টিমের কমান্ডার তুর খান বিবিসিকে বলেন, তার দল ফেব্রুয়ারি মাস থেকে নানগারহার প্রদেশে পপি ক্ষেত ধ্বংস করতে নেমেছে। ইতোমধ্যেই তারা নষ্ট করেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল।

আফিমের পশ্চিমা বাজার

পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, আফগানিস্তানে পপি চাষে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে মাদকের বাজারে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে সেটি পূরণ করতে অন্য দেশগুলো এর চাষ বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে মেক্সিকো ও মিয়ানমারের মতো দেশের আফিম মার্কেট আরো বড় হয়ে উঠতে পারে। মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই পপি চাষ বেড়ে গেছে। কারণ দেশটির আইনশৃঙ্খল পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, সরকার এসব বিষয়ে নজর দিতে পারছে না।

বাজারে আর্টিফিশিয়াল আফিমের বিক্রি বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ধরণের আফিম প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত আফিমের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর।

তবে অন্য দেশে কী হলো সেটা নিয়ে তালেবানের মাথাব্যথা থাকার কথাও নয়। তাদের চিন্তা আফগান নাগরিকদের নিয়েই। অপরাধ ও মাদক দমনই তাদের লক্ষ্য। এছাড়া আফগান কৃষকদের মধ্যে যারা পপি চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিলো তারা দেশ ত্যাগ করতে পারে, যার ফলে ইউরোপের ওপর অভিবাসন প্রত্যাশীদের চাপ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের অর্থনীতির ওপর বড় ধকল নিয়ে আসতে পারে তালেবানের এই পদক্ষেপ।

যদিও এই নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটির অর্থনীতি বড় ধরণের ক্ষতির মুখ পড়েছে। আফগানিস্তানের আফিম উৎপাদন নিয়ে গবেষণা করেছেন ডক্টর ডেভিড ম্যানসফিল্ড। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটির কৃষিখাতে সাড়ে ৪ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়তে পারে। খরা, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে ধুকতে থাকা একটি দেশের অর্থনীতির জন্য এটি বড় আঘাত।

তালেবানের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পড়তে শুরু করেছে। বাজারে বেড়ে গেছে আফিমের দাম। এমনকি ব্রিটেনের রাস্তা ঘাটেও হেরোইন বিক্রি কমে গেছে ৫৫ থেকে ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত। মরফিনের সঙ্কট নিয়েও উদ্বেগ শুরু হয়েছে।

তালেবান কি সাফল্য ধরে রাখতে পারবে

পশ্চিমা অনেক বিশ্লেষজ্ঞ মনে করছেন, তালেবানের এই নিষেধাজ্ঞা স্থায়ী নাও হতে পারে। অনেকের মতে, প্রথম মৌসুমের পরই আবার দেশটিতে পপি চাষ শুরু হবে। সঙ্কট বাড়লে সাধারণ মানুষ আবার পপি চাষের দিকে ঝুঁকবে। সাধারণত প্রতি বছর নভেম্বরে পপি গাছের বীজ বপন করা হয়। তাই চলতি বছর নভেম্বরে বোঝা যাবে তালেবান তাদের সিদ্ধান্তে কতটা অনড় রয়েছে।

তবে গোষ্ঠিটির ধর্মীয় অনুশাসন মানার যে প্রবণতা, তাতে ধর্মীয় কারণেই মাদক চাষ দেশটিতে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বেলজিয়াম ভিত্তিক থিংক ট্যাংক ক্রাইসিস গ্রুপের গবেষক গ্রায়েম স্মিথের মতে, বাজারে মাদকের সরবরাহ যে পরিমাণ কমেছে তাতে বলা যায়, তালেবানের এই সাফল্য মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মাদকবিরোধী প্রচেষ্টা।

নওয়াজদ জেলার একজন কৃষক মোহাম্মদ উল্লাহ টেলিগ্রাফকে বলেন, তালেবান বেশ জোরেশোরেই তাদের নির্দেশ বাস্তবায়ন তদারকি করছে। তাদের একটি চোখ সব সময়ই কৃষকদের ক্ষেতের দিকে আছে। এমনকি ছোট পরিসরেও কেউ পপি চাষ করলে তার ক্ষেত গুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকদের দেয়া হচ্ছে শাস্তি।

তবে এতে করে সমস্যায় পড়েছেন গরিব কৃষকরা। অনেকেই দেশ ছাড়ার চিন্তা করছেন। কেউ সম্পদ বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। কেউ বা জমি বিক্রি করে দিচ্ছেন। কারণ পপি চাষের বিকল্প কিছু করতে তালেবান এসব কৃষকদের উৎসাহ বা প্রণোদনা দেয়ার মতো কিছু করেনি এখনো। পপি ফুল

১২-০৭-২০২৩

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top