সুখী দেশ

ডেনমার্ক : সুখী মানুষের দেশ

সুখের সঠিক সংজ্ঞা কী, কিংবা সুখি জীবনের রহস্য কী- এই প্রশ্নের সবচেয়ে ভালো উত্তর দিতে পারবেন সম্ভবত ডেনমার্কের মানুষেরা। কারণ সুখি মানুষের দেশ বলতেই বোঝায় ডেনমার্ককে। সাজানো গোছানো পরিপাটি এক দেশ ডেনমার্ক। ধনী দেশ ডেনমার্ক, সমুদ্র আর হারবারের দেশ ডেনমার্ক।- এসবই কি তাদের সুখী জীবনের রহস্য নাকি, অন্য কিছু? চলুন জেনে আসি। তবে তার আগে এক নজরে দেখে নেব উত্তর ইউরোপের দেশটি সম্পর্কে কিছু তথ্য।

দেশ : ডেনমার্ক
অফিশিয়াল নাম : কিংডম অব ডেনমার্ক
রাজধানী : কোপেনহেগেন
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা : অষ্টম শতাব্দী
আয়তন : ৪২ হাজার ৯৩৩ বর্গকিলোমিটার
জনসংখ্যা : ৫৮ লাখ ২৫ হাজার
জাতীয়তা : ডেনিশ
অফিশিয়াল ভাষা : ডেনিশ
মুদ্রা :
ধর্ম : ৭৫ শতাংশ খ্রিস্টান, ৪.৪ শতাংশ ইসলাম, বাকিরা ধর্মহীন
সরকার ব্যবস্থা : পার্লামেন্টারি ও সাংবিধানিক রাজতন্ত্র
পার্লামেন্ট : ফোলকেটিং (এক কক্ষবিশিষ্ট)
শিক্ষিতের হার : ৯৫ শতাংশ (মাধ্যমিক উত্তীর্ণ)

ডেনমার্ক কোন মহাদেশে অবস্থিত

উত্তর ইউরোপের নরডিক অঞ্চলের দেশ ডেনমার্ক। স্ক্যান্ডেনেভিয়া অঞ্চলের সাথে ইউরোপের মূল ভূখ-ের সংযোগ স্থাপনকারী দেশটি। ইউরোপের ভূখ-ের যে অংশটি উত্তর সাগরে ঢুকে গিয়ে উপদ্বীপের সৃষ্টি করেছে সেটিকে বলা হয় জুটল্যান্ড। জুটল্যান্ড উপদ্বীপের দক্ষিণের কিছুটা অংশ জার্মানির মধ্যে, আর বাকি অংশটা জুড়েই ডেনমার্ক। এছাড়াও আছে ৪৪৩টি ছোট বড় দ্বীপ।

ডেনমার্ক মুসলিম
মানচিত্রে ডেনমার্ক

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দ্বীপটির নাম জিল্যান্ড, যেখানে অবস্থিত ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন। মূল ডেনমার্ককে ডাকা হয় ডেনমার্ক প্রোপার নামে, এর সাথে দুটি স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল মিলে গঠিত হয়েছে কিংডম অব ডেনমার্ক। অঞ্চলটির একটি উত্তর আটলান্টিক মহাসগারের বিশাল দ্বীপ গ্রীনল্যান্ড, যেটি মূল ডেনমার্কের চেয়ে আয়তনে তিনগুন বড়। আর অন্যটি স্কটল্যান্ডের উত্তর দিকের ফারো দ্বীপপুঞ্জ। ডেনমার্কের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে উত্তরে নরওয়ে, উত্তর পূর্বে সুইডেন। পশ্চিমে উত্তর সাগর, সাগরের ওপারে ব্রিটেন।

আর দক্ষিণে জার্মানি। যদিও এর মধ্যে শুধু জার্মানির সাথেই ছোট্ট একটু স্থল সীমান্ত রয়েছে দেশটির। সুইডেনের সাথে সড়ক যোগাযোগ তৈরি হয়েছে বাল্টিক সাগরের ওপর দিয়ে তৈরি একটি ব্রিজের মাধ্যমে।

ডেনমার্কের ভৌগলিক কিছুটা বিচিত্র ধরনের। প্রকৃতির অদ্ভ’ত খেয়ালে এই দ্বীপরাষ্ট্রটিতে আছে কয়েক হাজার পোতাশ্রয় বা হারবার। বিভিন্ন জায়গায় সমুদ্রের অংশ ভূখ-ের ভেতর ঢুকে গিয়ে তৈরি করেছে এসব হারবার। যে কারণে দেশটির যে কোন জায়গা থেকেই সমুদ্রের দূরত্ব ৬৪ কিলোমিটারের বেশি নয়। উপকূলীয় অঞ্চল বেশি থাকায় উত্তর ইউরোপের দেশ হয়েও ডেনমার্কের আবহাওয়া তুলনামূলক উষ্ণ। সমুদ্রর আর দেশজুড়ে অবারিত সবুজ- দুইয়ে মিলে দেশটি হয়ে উঠেছে অসম্ভব সুন্দর।

তবে এর পেছেনে দেশটির নাগরিকদের অবদান সবচেয়ে বেশি। ডেনিশরা অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও গোছানো জাতি। চারপাশকে সুন্দর রাখতে পছন্দ করে তারা। দেশটির বাহারি রঙের ঘর বাড়িগুলো দেখলে তাদের সেই রুচির পরিচয় পাওয়া যাবে। উপকূলীয় এলাকায় একেকটি বাড়ি একেক রঙে রাঙানো। যেন শিল্পীর তুলিতে আকা।

সুখী দেশের তালিকা ২০২২ এবং ডেনমার্ক

ডেনমার্ককে বলা হয় সুখী মানুষের দেশ। প্রতিবছর বিশ্বে সুখী মানুষের দেশের যে তালিকা জাতিসঙ্ঘ করে তাতে ২০১৭ সালে এক নম্বরে ছিলো ডেনমার্ক। এছাড়া প্রতি বছরই এক থেকে তিন নম্বরের মধ্যে থাকে দেশটি। ২০২২ সালের তালিকায় দেশটির অবস্থা দুই নম্বরে। (এক নম্বরে ফিনল্যান্ড)। ডেনমার্কের নাগরিকেরা বেশ আমুদে স্বভাবের। জীবনের প্রতিটি মূহুর্তকেই তারা উপভোগ করে। বলা হয়ে থেকে যে, এক কাপ কফি খাওয়ার সময়টুকুও যতটা আনন্দপূর্ণ করা যায়, তার চেষ্টায় কমতি রাখে না ডেনিশরা। পার্টি, আড্ডা, ক্লাব সব কিছু মিলিয়ে তারা জীবনটাকে উপভোগ করে।

প্রথাগত ইউরোপীয়দের মতো ঘড়ির কাটা ধরে চলতে রাজি নন ডেনিশরা। সাধারণত উইকেন্ড ছাড়া পশ্চিমা জগতে রাস্তায় কারো সাথে দেখা হলেও যেন কথা বলার সময়টুকু হয়ে ওঠে না। ডেনিশরা সেদিক থেকে ব্যতিক্রম। তবে কাজ বাদ দিয়ে যে তারা জীবনকে উপভোগ করে সেটি বলার সুযোগ নেই। আর সব ইউরোপীয়দের মতো ডেনিশরাও পরিশ্রমি জাতি।

ডেনিশরা যে বিলাসী জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত নয় সেটি বোঝা যায় রাস্তায় বের হলে। ডেনমার্কের লোকেরা সাইকেল চালাতে পছন্দ করে। দেশটির শহরগুলোর রাস্তায় প্রচুর সাইকেল দেখা যায়। এতে যেমন দেশ দূষণমুক্ত থাকে, তেমনি শরীর চর্চা হয়ে নাগরিকদের। দেশটির সরকারও তাই ব্যক্তিগত গাড়ি কিনতে অনুৎসাহিত করে সবাইকে। রাস্তায় সাইকেল চালানোর জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে সব রকম সুযোগ সুবিধার।

ডেনমার্কের অর্থনীতি

তবে ডেনিশদের জীবন উপভোগের নেপথ্যে আছে দেশটির উন্নত অর্থনৈতিক অবস্থা। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর একটি ডেনমার্ক। অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলা হয় উচ্চ আয়ের দেশ। এই দেশের নাগরিকরা উচুমানের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত। তবে তাদের এই নির্ভার থাকার মূল রহস্য ডেনিশ সরকারের নীতি। দেশটিতে শিক্ষা, চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারগুলো বিনামূল্যে পেয়ে থাকে নাগরিকরা। ছাত্রদের জন্য উচ্চশিক্ষাও বিনামূল্যে, শুধু তাই নয় ১৮ বছরের উর্ধে কোন শিক্ষার্থী সরকারের কাছে আবেদন করলে প্রতিমাসে পায় সরকারি ভাতা।

আবার বয়স্ক নাগরিকরা সরকারের কাছ থেকে যে পেনশন বা অবসর ভাতা পায় সেটি তাদের জন্য যথেষ্ট। শ্রমিকের অধিকার বিষয়ক র‌্যাঙ্কিংয়ে ডেনমার্ক বিশ্বে এক নম্বরে অবস্থান করছে। শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি এখানে বিশ্বের সবদেশের চেয়ে বেশি। উদারহরণ স্বরূপ বলা যায়, ম্যাকডোনাল্ডসের মতো ফাস্টফুড চেইন শপগুলোর কর্মীরা প্রতি ঘণ্টায় মজুরি পায় ২০ মার্কিন ডলার। যা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। অর্থনৈতিক এই নিরাপত্তার মাঝেই মূলত ডেনিশরা নির্ভার হয়ে জীবনকে উপভোগের মন্ত্র খুঁজে পাচ্ছে।

ডেনমার্কের রাজকুমারী ম্যারি

দর্শনীয় স্থানের অভাব নেই ডেনমার্কে। অসংখ্য সমুদ্র সৈকত যেমন আছে, তেমনি আছে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা। হারবারগুলোর নীল পানিতে সাড়ি সাড়ি বোট আর তীরে রং-বেরংয়ের বাড়িগুলো আপনাকে মুগ্ধ করবে। তবে এই দুইয়ের বাইরে ডেনমার্কের ট্রেডমার্ক হয়ে গেছে লিটল মারমেইড নামের ভাস্কর্যটি।

কোপেনহেগেন হারবারের তীরে একটি পাথরের ওপর বসানো বোঞ্জের তৈরি এক মৎস কন্যা যে কিনা প্রেমে পড়েছে রাজপুত্রের। হান্স ক্রিস্টিয়ান অ্যান্ডারসনের রূপকথা থেকে জন্ম ১.২৫ মিটার উচু এই ভাস্কর্যের। আর মৎসকন্যাকে গড়েছেন ভাস্কর এডভার্ড এরিকসন ১৯১৩ সালে। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক ভীড় করে এই মৎসকন্যাকে দেখতে।

ইংল্যান্ড ডেনমার্ক
দ্য লিটল মারমেইড, ডেনমার্ক

অবশ্য ইন্টারন্টে সার্চ ইঞ্জিন গুগল বলছে, কোপেনহেগেনের টিভোলি গার্ডেন্স (Tivoli Gardens) শুধু ডেনমার্কেরন, সমগ্র ইউরোপেরই সেরা টুরিস্ট স্পটগুলোর একটি। এটি মূলত একটি থিম পার্ক যেটি স্থাপিত হয়েছে ১৮৪৩ সালে। তবে নামে থিমপার্ক হলেও এখানে কোন কিছুরই অভাব নেই। লেক, ফুলের বাগান থেকে শুরু করে থিয়েটার, শপিং সেন্টার, রেস্ট্রুরেন্ট সবই আছে এখানে। আছে বড় ও ছোটদের জন্য অনেক গুলো আলাদা রাইড। টিভোলি গার্ডেনের রোলার কোস্টার অ্যাডভেঞ্জার প্রিয়দের পছন্দের শীর্ষে থাকে। রাতে এই পার্কের লাইটিং উপভোগের আরেক উপলক্ষ। এক সাথে জলে ওঠে এক লাখ ১১ হাজার রঙিন বাতি।

এর খুব কাছেই আছে ডেনশি ন্যাশনাল গ্যালারি, ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ডেনমার্ক ও কোপেনহেগেন চিড়িয়াখানা। কোপেনহেগেনে গেলে পাশ্ববর্তী ছোট্ট শহর হিলেরোডের ফ্রেডারিস্কবর্গ ক্যাসল (Frederiksborg Castle) না দেখে ফিরতে মন চায়না পর্যটকদের। সপ্তদশ শতকের ডেনমার্ক-নরওয়ের শাসক রাজা চতুর্থ ক্রিস্টিয়ানের বাসভন হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের এই ভবনটি। তিন দিকে লেক আর এক দিকে বাগান রয়েছে এই ভবণের। পরবর্তীতে ভবণটিকে দুর্গে রূপ দেন রাজা দ্বিতীয় ফেডারিক।

এবং আরো কিছু

স্ক্যান্ডেনেভিয়া অঞ্চলের প্রতীক হিসেবে পরিচিত অরেসান্ড ব্রিজ। অরেসান্ড প্রনালীর ওপর দিয়ে ডেনমার্কের জিল্যান্ড দ্বীপের সাথে সুইডেনের দক্ষিণ উপকূলের মালমো বন্দরকে যুক্ত করেছে ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্রিজ। এই জিল্যান্ড দ্বীপেই রয়েছে রাজধানী কোপেনহেগেন। বিশাল এই ব্রিজটির আরেকটি বৈশিষ্ট হচ্ছে এর এক প্রান্ত সাগরের ওপরে, আরেক প্রান্ত ভূগর্ভস্থ টানেলে। গাড়ি ও ট্রেনের পৃথক পথ রয়েছে ব্রিজে। বিখ্যাত টিভি সিরিয়াল দ্য ব্রিজ নির্মিত হয়েছে এই ব্রিজটিকে কেন্দ্র করেই।

শেকসপিয়র প্রেমীদের কাছে হেলসিগনর শহরের ক্রোনবর্গ ক্যাসল(Kronborg) আকর্ষণীয় এক জায়গা। সাগর পাড়ের বিশাল এই দুর্গ শেকসিপয়রের বিখ্যাত ট্রাডেজি হ্যামলেটের কাহিনী মনে কড়িয়ে দেবে আপনাকে। দ্বীপের দেশ ডেনমার্কে দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে যেতে পারেন বোর্নহলম দ্বীপে (Bornholm)।

নাম ধরে ধরে বললে ডেনমার্কের দর্শনীয় স্থানের তালিাক শুধু দীর্ঘই হবে। আরহাউস শহরের ওপেন এয়ার মিউজিয়াম, রসকিল্ডের ভাইকিংস বোট মিউজিয়াম কিংবা শিশুদের স্বপ্নরাজ্য হিসেবে পরিচিত বিল্যান্ড শহরের লেগোল্যান্ড কী কম আকর্ষণীয়! মোটেই নয়। বরং সাগরের বুকের অল্প জনসংখ্যার এই দেশটি নিজেকে সাজিয়ে রেখেছে এমন অসংখ্য আকর্ষণীয় জিনিস দিয়ে।
১৮.০৬.২০২০

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top