প্রশান্ত মহাসাগর বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলরাশির নাম। সবচেয়ে বড় মহাসাগর এটি। এটি বিশ্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সমুদ্রসীমাও। বিশ্ববাণিজ্য, রাজনীতি, সমরনীতিসহ সব কিছুতে এই মহাসাগর জড়িয়ে আছে। এই মহাসাগর দিয়ে বিশ্বের বেশিরভাগ পণ্য পরিবহন করা হয়। আবার এর গুয়াম দ্বীপে রয়েছে বিশাল মার্কিন রণপ্রস্তুতি। সেখানে যুদ্ধবিমান, থেকে মিসাইল সবই মোতায়েন রেখেছে চীন। প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতা , আয়তন, বিস্তৃতিসহ নানা তথ্য জানাবো এই লেখায়।
প্রশান্ত মহাসাগরের একটি অংশ দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীনের সাথে ওই অঞ্চলের প্রায় ১০টি দেশের বিরোধ চলছে। চীন এই সাগরের পুরোটা অংশ নিজের বলে দাবি করে। লাতিন আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা থেকে চীন, রাশিয়া, জাপানের মতো দেশ এই মহাসাগরের তীরে অবস্থিত।
আলাস্কা উপসাগরের কাছে যেখানে বেরিং সাগরের সাথে প্রশান্ত মহাসাগর মিলিত হয়েছে সেখানে দুই সাগরের পানি পাশাপাশি আলাদা রঙে প্রবাহিত হতে দেখা যায়। গাঢ় নীল ও হালকা আকাশী রঙের পানির পাশাপাশি প্রবাহ খালি চোখেই ধরা পড়ে। বেরিং সাগরের পানিতে লবনের পরিমাণ কম থাকায় এমন মনে হয়।
[ez-toc]
প্রশান্ত মহাসাগরের আয়তন
এই মহাসাগরের আয়তন ১৬ কোটি ৫২ লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার বা ৬ কোটি ৩৮ লক্ষ বর্গমাইল। বিশ্বের মোট ওয়াটার সারফেস বা জলসীমার ৪৬ শতাংশ জুড়ে এই মহাসাগর। আর বিশ্বের মোট আয়তনের ৩২ শতাংশ জুড়ে আছে এটি। জেনে রাখুন, সমগ্র বিশ্বের স্থলভাগের আয়তন ১৪ কোটি ৮০ লাখ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ সমগ্র স্থলভাগের চেয়েও বড় প্রশান্ত মহাসাগর।
প্রশান্ত মহাসাগর কোথায় অবস্থিত
প্রশান্ত মহাসাগর কোথায় অবস্থিত- এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় বা এক বাক্যে দেয়া সম্ভব নয়। কারণ প্রশান্ত মহাসাগর সমগ্র পৃথিবীর বিরাট একটি অংশ জুড়েই অবস্থান করছে। উত্তরে আর্কটিক সাগর থেকে দক্ষিণে দক্ষিণ মহাসাগর বা অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ পর্যন্ত এর বিস্তৃতি।
নিচের ছবিটিতে খেয়াল করুন উত্তর আমেরিকা মহাদেশ ও লাতিন আমেরিকা মহাদেশের বাম দিকের পুরোটাই প্রশান্ত মহাসাগর। যেহেতু পৃথিবী গোলাকার, তাই সেখান থেকে পশ্চিমে যেতে পূর্ব দিকে চীন, রাশিয়া অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত পৌছেছে প্রশান্ত মহাসাগর (ছবির ডান দিকে লক্ষ্য করুন)।

প্রশান্ত মহাসাগরের অবস্থান বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে একটি ভূগোলক সামনে নিয়ে বসা। সেটাতে লক্ষ্য করুন বাম দিকে থেকে পৃথিবীর উল্টো পাশ ঘুরে ডান দিকে চীন-রাশিয়া পর্যন্ত ঠেকেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই সমুদ্রসীমা।
আরেকটি ছবি দেখুন

আমি পরপর কয়েকটি ছবিতে প্রশান্ত মহাসাগরের অবস্থান বোঝানোর চেষ্টা করছি। ছবিগুলো লক্ষ্য করুন।
সিঙ্গাপুর, হংকং, ম্যানিলা, সিডনি, সান ফ্রান্সিসকো, লস এঞ্জেলেসর মতো বৃহৎ বন্দর নগরীগুলো এই মহাসাগরের তীরে অবস্থিত।

প্রশান্ত মহাসাগর কোন দেশে অবস্থিত
এই প্রশ্নটি অবান্তর। কারণ প্রশান্ত মহাসাগর এতই বিশাল যে এটি কোন দেশের মধ্যে হতে পারে না। বরং বলা যেতে পারে এই সাগরের পাড়ে কোন কোন দেশ রয়েছে। সেক্ষেত্রে মানচিত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল ঘেঁষে আছে লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের দেশ চিলি, পেরু, ইকুয়েডর কলম্বিয়া।
মধ্য আমেরিকায় গুয়েতেমালা, এলসালভাদর, নিকারাগুয়া। উত্তর আমেরিকায় এই মহাসাগরের উপকূলে রয়েছে মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া, ওয়াশিংটন ও আলাস্কা স্টেট প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে। আর কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া প্রদেশ।
এগুলো গেল এক প্রান্তের কথা। মহাসাগরের ঠিক উল্টে দিকে রয়েছে রাশিয়া, জাপান, চীন, পাপুয়া নিউগিনি, অস্ট্রেলিয়া এই রাষ্টগুলো।
প্রধানত দুটিভাগে বিভক্ত এই মহাসাগর- উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর ও দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর। নিরক্ষরেখার দুই পাশের অংশকে এই দুই নামে ডাকা হয়। আবার আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার দুই পাশের অংশকে পূর্ব ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর বলা হয়।
তবে বিভিন্ন দেশের উপকূলে কাছে গিয়ে এই মহাসাগর আবার বিভিন্ন নাম ধারণ করেছে। যেমন রাশিয়ার কাছে ওখোটস্ক সাগর, এরপর চীন সাগর, ফিলিপাইন সাগর, অস্ট্রেলিয়ার কাছে কোরাল সাগর। মূলত এগুলো একই জলরাশি। তবে এলাকাভেদে নামকরণ ভিন্ন হয়েছে। উত্তর আমেরিকার আলাস্কার কাছে নাম দেয়া হয়েছে বেরিং সাগর ও আলাস্কা উপসাগর।
প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতা কত
প্রশান্ত মহাসাগর বিশ্বের গভীরতম মহাসাগর। এর গড় গভীরতা ৪ হাজার মিটার বা ১৩ হাজার ফুট। স্থান ভেদে গভীরতা কম বেশি হয়ে থাকে। উত্তর পশ্চিমাংশে মারিয়ান ট্রেঞ্চ জায়গাটি পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরতম স্থান। এখানকার গভীরতা ১০ হাজার ৯২৮ মিটার বা ৩৫ হাজার ৮৫৩ ফুট।

প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতম স্থানের নাম কি
আগের অনুচ্ছেদে আমরা জেনেছি প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতম স্থান মারিয়ানা ট্রেঞ্চ। মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ থেকে ২০০ কিলোমিটার পূর্ব দিকে জায়গাটির অবস্থান। চাঁদের আকৃতির এই জায়গাটির দৈর্ঘ প্রায় ২ হাজার ৫৫০ কিলোমিটার, প্রস্থ ৬৯ কিলোমিটার। এর দক্ষিণাংশটি সবচেয়ে গভীর যেটির নাম দেয়া হয়েছে চ্যালেঞ্জার ডিপ।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে জায়গাটির গভীরতা ২ কিলোমিটারে বেশি। অর্থাৎ এর একেবারে তলা থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠ পর্যন্ত উচ্চতা মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতার চেয়েও বেশি।
প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপসমূহ
প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে রয়েছে প্রচুর দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জ। এখানের দ্বীপের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। সারা বিশ্বের আর কোন সাগর-মহাসাগর মিলেও এত দ্বীপ নেই। মাইক্রোনেশিয়া, পলিনেশিয়া ও মেলানেশিয়া অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে প্যাসিফিক বা প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপাঞ্চলগুলোকে।
প্রথম অঞ্চলে রয়েছে মার্শাল আইল্যান্ডস, কিরিবাতি, ক্যারোলিন দ্বীপপুঞ্জ। প্রশান্ত মহাসাগরের সবচেয়ে বড় দ্বীপ নিউ গায়ানা। এটির অবস্থান মেলানেশিয়া অঞ্চলে। এখানে আরো আছে ফিজি, ভানুয়াতু, সলোমন আইল্যান্ডস। পলিনেশিয়া অঞ্চলে দ্বীপের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। প্রায় ১৩০টির মতো। এর মধ্যে সামোয়া, টুভালু, টোঙ্গা প্রভৃতি দ্বীপ দেশ রয়েছে।
প্রশান্ত মহাসাগরের একটি উল্লেখযোগ্য দ্বীপ হলো গুয়াম। এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ঘাঁটি রয়েছে। গুয়ামে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল যুদ্ধবিমান, মিসাইল ও সাবমেরিন বহর রয়েছে। মূলত চীনকে মোকাবেলার জন্য এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দ্বীপটি চীনের ভূখণ্ডের কাছাকাছি অবস্থিত। এছাড়া হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জেও মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। টপিক : প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতা
প্রশান্ত মহাসাগরের ইংরেজি নাম প্যাসিফিক ওশেন Pacific Ocean
লেখকের ফেসবুক পেজে যুক্ত হতে লাইক দিন : আহমেদ


