ডেড সি কি Dead sea
রহস্যময় এক জলাশয় ডেড সি বা মৃত সাগর। আরবিতে বলা হয় আল-বাহর আল-মাইয়িত। লুত সাগর নামেও পরিচিত এটি। মূলত একটি বিশাল আকারের এক লেক এটি। এর পানির প্রধান বৈশিষ্ট হচ্ছে এখানে কোন মানুষ ডোবে না। সাঁতার না জানলেও যে কেউ এই পানিতে ভেসে থাকবে। চাইলেও এই পানিতে বেশিক্ষণ ডুবে থাকা যায় না। এর কারণ এই পানির অস্বাভাবিক প্লবতা। বিশাল এই জলাশয়ে নেই মাছ বা অন্য কোন জলজ প্রাণী।
রহস্যময় মৃত সাগর কোথায় অবস্থিত , এর ইতিহাস ও এর বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত নিয়ে জানাবো এই লেখায়।
মৃত সাগর কোথায় অবস্থিত
মৃত সাগর কোথায় অবস্থিত ? এটির অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে। নামের সাথে সাগর থাকলেও এটি আসলে একটি লেক বা হ্রদ। উত্তর দক্ষিণে লম্বাভাবে বিস্তৃত এই জলাশয়ের পূর্ব দিকে জর্দান আর পশ্চিমে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর। পবিত্র নগরী জেরুসালেম এখান থেকে ১৫ মাইল দূরে। জর্দানের রাজধানী আম্মান থেকে এর দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার। জর্দান নদীর পানি প্রবাহ এই লেকে গিয়ে পড়ে।
উত্তরদিক থেকে জর্দান নদী এসে মৃত সাগরে পতিত হয়েছে। আবার উত্তর-পূর্ব, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে কিছু পাহাড়ি নদী জর্দানের পশ্চিম এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এখানে পতিত হয়েছে।

মৃত সাগরের পানির সারফেস সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৪১২ ফুট নিচে। যে কারণে এটি স্থলভাগের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে নিচু জায়গা হিসেবে বিবেচিত।
ডেড সি কোথায় অবস্থিত
মৃতসাগরের দৈর্ঘ ৫০ কিলোমিটার বা ৩১ মাইল। আর সবচেয়ে চওড়া স্থানটি ১৫ কিলোমিটার বা ৯.৩ মাইল। আর পানির উপরিভাগ অর্থাৎ সারফেস এরিয়া ৬০৫ বর্গকিলোমিটার। প্রাকৃতিক কারণে এই জলাশয়ের সারফেস এরিয়ার পরিমাণ দ্রুত কমছে। ১৯৩০ সালে এর সারফেস এরিয়া ছিলো ১০৫০ বর্গকিলোমিটার। গড় গভীরতা ১৯৯ মিটার বা ৬৫৩ ফুট। সবচেয়ে গভীর স্থানটির ৯৭৮ ফুট পর্যন্ত। আর মোট পানির পরিমান ১১৪ কিউবিক মিটার। সাগরটি চারদিকে ভূমি ও ব্যাসাল্ট পাথরের পাহাড়বেষ্টিত।
মৃত সাগরে মানুষ ভাসে কেন
মৃতসাগর পৃথিবী পৃষ্ঠের সর্বাপেক্ষা লবণাক্ত পানির উৎসগুলোর একটি, যার পানির শতকরা ৩৫ ভাগই লবণ।
সাধারণত সমুদ্রের পানি লবনাক্ত হয়ে থাকে; কিন্তু এটি কোন খোলা সমুদ্র নয়, একটি আবদ্ধ লেক। তবুও সাগরের পানির তুলনায় এর পানি প্রায় ১০ গুণ বেশি লবণাক্ত এবং গভীরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে লবণের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। মৃত সাগরের তলদেশে লবণের ঘনত্বের পরিমাণ এত বেশি যে, লবন দানা বেধে সাদা পাথরের মতো হয়ে যায়।
কোথাও বা পানির নিচে স্তম্ভ আকারে দাড়িয়ে থাকে লবন। গবেষণা থেকে জানা যায়, এখানে সারফেস থেকে ৪০ মিটার গভীর পর্যন্ত প্রতি লিটার পানিতে ৩০০ গ্রাম লবণ এবং ৪০ মিটার থেকে ৩০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত প্রতি লিটার পানিতে ৩৩২ গ্রাম লবণ রয়েছে।
মৃত সাগরের পানিতে মিশে থাকা এই লবণে ১৪ শতাংশ ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড, ৪ শতাংশ পটাশিয়াম ক্লোরাইড, ৫০ শতাংশ ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইড এবং ৩০ শতাংশ সোডিয়াম ক্লোরাইড রয়েছে। এই সকল উপাদানের কারণে এখানে পানির প্লবতা অনেক বেশি। যে কারণে কোনো মানুষ ইচ্ছে করলেই এখানের পানিতে নিজেকে ডুব দিয়ে ধরে রাখতে পারবে না। সাঁতার না জানলেও মানুষ এই পানিতে ভেসে থাকবে। অন্যান্য জলাশয়ের পানিতে ডুবে যাবে এমন অনেক কিছুই মৃতসাগরের পানিতে দিব্যি ভেসে থাকে।
অধিক পরিমাণে লবণাক্ততার কারণে মৃতসাগরে কোন মাছ বা জলজ প্রাণী বাস করতে পারে না। জর্দান নদী থেকে কোন কিছু এই পানিতে প্রবেশ করলেও সাথে সাথে মারা যায় এবং কিছুক্ষণের মাঝেই মাছের শরীরে লবনের পুরু আস্তরণ পরে যায়। যে কারণে এটির নাম হয়েছে ডেড সী বা মৃতসাগর। তবে সাম্প্রতিক সময়ে গবেষকরা এর পানিতে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের উপস্থিতি পেয়েছেন।
বাইরের পানি প্রবাহিত হওয়ার পরিমান কম থাকায় মৃতসাগরের পানি দ্রুত কমছে। বাস্প হয়ে যে পরিমান পানি প্রতিদিন এখান থেকে উড়ে যায়, সেটি পূরণ হয় না পর্যাপ্ত নদী এর সাথে যুক্ত না থাকায়। গড়ে বছরে প্রায় ৫ মিটার করে পানির স্তর নিচে নেমে যায় মৃতসাগরে। পানি কমে যাওয়ার ফলে এখানে লবনাক্ততার হারও বাড়ছে ক্রমশ।
মৃত সাগর সৃষ্টির রহস্য
প্রায় তিন মিলিয়ন বছর পূর্বে বর্তমান জর্দান নদী, মৃত সাগর এবং ওয়াদি আরাবাহ অঞ্চল লোহিত সাগরের পানিতে বারবার প্লবিত হত। এর ফলে একটি সরু উপসাগরের সৃষ্টি হয়। উপসাগরটি জেজরিল উপত্যকায় একটি সরু সংযোগের মাধ্যমে লোহিত সাগরের সাথে যুক্ত ছিল। এরপর প্রায় ২ মিলিয়ন বছর পূর্বে উপত্যকা এবং ভূমধ্যসাগরের মধ্যবর্তী স্থলভাগ যথেষ্ট উচ্চতা লাভ করে। ফলে এই অঞ্চলে সৃষ্ট উপসাগরটি ভূমিদ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে হ্রদে পরিণত হয়।

তবে পবিত্র কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী এই জলাশয়টির ইতিহাস জড়িয়ে আছে নবী হযরত লুত (আ.) এর কওমের ধ্বংসের ইতিহাসের সাথে। ভূপৃষ্ঠে এত বিশাল আকারের একটি নিচু জায়গা বা ভূতাত্ত্বিক বেসিন কিভাবে সৃষ্টি হলো সেই প্রশ্ন বিজ্ঞানীদের বহু বছর ধরে তাড়া করে ফিরছে। তবে কোরআনের বর্ণনায় চোখ রাখলে এই প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব মেলে।
কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বছর আগে ওই এলাকাটি উন্নত অথচ নৈতিকতার দিক দিয়ে অধঃপতিত এক জাতি বসবাস করত। এখানে দুটি শহর ছিলো সাদুম ও গোমাররা নামে। ওই জনগোষ্ঠির মাঝে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল সমকামীতা। যাদের আলোর পথে আনার জন্য নবী হযরত লুত আ. আল্লাহর নির্দেশে ওই এলাকায় যান; কিন্তু তারা নবীর কথায় কর্নপাত করেনি।
হযরত লুত আঃ এর স্ত্রীর ঘটনা
উল্টো আল্লাহর নবীকে বিতাড়িত করার সিদ্ধান্ত নেয়। আল্লাহর নির্দেশে লুত আ. তার পরিবার নিয়ে ওই শহর ছেড়ে চলে যান। তাদের বলা হয় একবারের জন্যও পেছনে ফিরে না তাকাতে। এরপর দুর্যোগ নেমে আসে ওই জনগোষ্ঠির ওপর। প্রচুর পরিমানে লাভা বৃষ্টির পর জমিনটিকে উল্টিয়ে দেয়া হয়। যার ফলস্বরূপ বিশাল ওই ভূতাত্ত্বিক বেসিনের সৃষ্টি হয়েছে।
কোরআনের বর্ননা অনুযায়ী আরো জানা যায় যে, লুত আ. এর স্ত্রী ইমানদার ছিলেন না, ছিলেন পাপিষ্ঠদের সহযোগী। যে কারণে তিনি চলে যাওয়ার সময় নির্দেশ অমান্য করে পেছনে ফিরে তাকিয়েছিলেন। ঠিক এ অবস্থায়ই তিনি জমে লবন হয়ে যান। পবিত্র কোরআনের সুরা আশ শুয়ারার ১৭০ ও ১৭১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে এ প্রসঙ্গে। আরো বিভিন্ন জায়গায় এ প্রসঙ্গে বর্ণনা এসেছে। মৃত সাগরের পশ্চিম পাড়ে সাদুম পর্বতের কাছে এখনো পেছনে তাকানো মানুষসদৃশ একটি লবনের স্তম্ভ দেখা যায়। এবং সেটিই লুত আ. এর স্ত্রীর অবয়ব বলে মনে করা হয়।
সব মুসলিম স্কলারই মৃতসাগরের ইতিহাস বিষয়ে এই বর্ণনার সাথে একমত। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থেও একই ধরণের আলোচনা রয়েছে মৃতসাগরের ইতিহাস সম্পর্কে। ভূবিজ্ঞানের বর্তমান গবেষণাতেও বহুবছর আগে ওই অঞ্চলে তীব্র ভূমিকম্পের কিছু লক্ষণ পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মৃতসাগর সৃষ্টির সাথে তীব্রকম্পনের সম্পর্ক রয়েছে।
মৃত সাগরের রহস্য
প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর মৃতসাগর। এর পানিতে মিশে থাকা পটাশিয়া, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়া আহরন করে অনেকগুলো ইসরাইলি ও জর্দানি প্রতিষ্ঠান। এজন্য এর চারপাশে গড়ে উঠেছে অনেক শিল্পকারখানা। এসব কারখানার কারণে মৃতসাগরের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে ইসরাইলি প্রতিষ্ঠানগুলো এই জলায়শয়টিকে ধ্বংস করেেত বেশি আগ্রাসী আচরণ করছে বলে জানা গেছে।

প্রতি বছর প্রচুর সংখ্যক পর্যটক বেড়াতে যায় মৃতসাগরে। অদ্ভুত এই পানির আচরণ কাছ থেকে দেখতে তারা ভেসে থাকেন এই পানিতে। তবে মৃতসাগরের পানি শরীরের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে চোখে এই পানি গেলে জ্বালাপোড়া হয়। যে কারণে সাগরের পারেই পর্যটকদের জন্য বানানো হয়েছে মিষ্টি পানির কৃত্রিম লেক, আছে অনেকগুলো পানির কলও।
যাতে মৃত সাগরের পানি থেকে উঠে এখানে শরীর ধুয়ে নিতে পারেন পর্যটকরা। অবশ্য ইদানিং বেশ কিছু গবেষণায় মৃত সাগর পাড়ের লবণাক্ত কাদা শরীরের বিভিন্ন চর্মরোগ সাড়াতে উপকারী এমন তথ্য উঠে আসার পর অনেকেই এই কাদা গায়ে মাখেন।
২১-০৬-২০২১
আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন : আহমেদ স্টোর


