স্নায়ুযুদ্ধ কী, স্নায়ুযুদ্ধ কাকে বলে
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধ। অনেকে এটাকে ঠাণ্ড যুদ্ধ বা শীতল যুদ্ধ নামেও ডাকেন। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন- এই দুই পরাশক্তির ছায়া যুদ্ধের চার দশককে বলা হয় স্নায়ুযুদ্ধ যুগ। পারমাণবিক শক্তিধর দুই পক্ষ সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত না হয়ে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও প্রভাব বিস্তারের যে ছায়া যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল- সেটিই ইতিহাসে স্নায়ুযুদ্ধ নামে পরিচিত। যার প্রভাব আজো রয়ে গেছে বিশ্ব রাজনীতিতে। আর যার সমাপ্তি হয়েছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।
কেমন ছিলো স্লায়ুযুদ্ধের দিনগুলো, কী ঘটেছিলো ওই চল্লিশ বছরে- সেসব জানাবো এই লেখায়।
‘স্নায়ুযুদ্ধ ছিলো গণতন্ত্র আর কমিউনিজমের প্রভাব
বিস্তারের লড়াই’
স্নায়ুযুদ্ধের কারণ ও ফলাফল
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়ই মিত্র শক্তির হয়ে লড়াই করলেও যুদ্ধের মাঝখানেই কিছু বিষয়ে তাদের মাঝে মতবিরোধ দেখা দেয়। এর মধ্যে একটি ছিলো দেরি করে রাশিয়ার যুদ্ধে যোগদান। আবার যুদ্ধের পর বিশ্বব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দুই পক্ষের মাঝে শুরু হয় দ্বন্দ্বের। এই দ্বন্দ্বের একটি মূল কারণ দুই দেশের শাসন ব্যবস্থার বৈপরীত্য।
একদিকে উদার গণতন্ত্র ও পুজিবাদের যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে কমিউনিস্ট শাসনের সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আদর্শিক লড়াই শুরু হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের। ওই সময় মস্কোর রাজনৈতিক প্রভাবে বেশ কিছু দেশে কমিউনিস্ট শাসন শুরু হয়। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর যেসব অঞ্চল রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে যায়, তার অনেক দেশে তারা কমিউনিস্ট নেতাদের শাসন ক্ষমতায় বসায়।
এতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী কমিউনিজমের বিস্তার নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাপী কমিউনিজম প্রতিষ্ঠিত করতে সোভিয়েত নেতাদের ছিলো প্রানান্তকর চেষ্টা। পূর্ব ইউরোপের অনেকগুলো দেশে কমিউনিস্ট শাসন শুরু হয়। অন্য দিকে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র ব্রিটেনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করতে শুরু করে। এর ফলে ইউরোপ মহাদেশ মূলত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
স্নায়ুযুদ্ধ কবে শরু হয়
মূলত সেখান থেকেই সূত্রপাত চার দশকের ছায়াযুদ্ধের। অনেক বিশ্লেষকের মতে, স্নায়ুযুদ্ধ ছিলো গণতন্ত্র আর কমিউনিজমের প্রভাব বিস্তারের লড়াই। কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রযুক্তি, মহাকাশ, এমনকি প্রপাগাণ্ডা ছড়ানোও ছিলো সেই লড়াইয়েরর অংশ। অর্থাৎ শুধু সামনা সামনি লড়াই ছাড়া, দুই পক্ষের মাঝে বিরোধের সব উপাদানই ছিলো ওই সময়টাতে। নিজ নিজ মিত্র দেশগুলোকে ব্যবহার করে মস্কো ও ওয়াশিংটন লড়াই করেছে। বেশ কয়েকটি যুদ্ধও হয়েছে দুই পক্ষের মিত্রদের মাঝে।
উত্তেজনার এক পর্যায়ে সাবমেরিনের কমান্ডার মার্কিন ডেস্ট্রয়ার লক্ষ্য করে টর্পেডো ছোড়ার নির্দেশও দিয়েছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত সাবমেরিনের এক কর্মকর্তার দৃঢ়তায় এড়ানো গেছে সরাসরি সঙ্ঘাত। আর বিশ্ব বেঁচে গেছে আরেকটি বড় আকারের যুদ্ধ থেকে।
১৯৪৮ সালে গিয়ে বিরোধের চূড়ায় পৌছায় এই ছায়াযুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে ছোড়া বোমার আদলে আরো বোমা তৈরিতে উৎসাহ দিতে শুরু করে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ১৯৪৯ সালে রাশিয়া প্রথম আনবিক বোমার পরীক্ষা চালায়। যার ফলে এই সেক্টরে যুক্তরাষ্ট্রের একক রাজত্বের অবসান হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান নির্দেশ দেন হাইড্রোজেন বোমা কিংবা আরো ধ্বংসাত্মক বোমা তৈরির। সোভিয়েত শাসক জোসেফ স্টালিনও তার বিজ্ঞানীদের একই পন্থা অনুসরণের আদেশ জারি করেন।
স্নায়ুযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়
একই বছর মিত্র দেশগুলোকে নিয়ে সামরিক জোট ন্যাটো গঠন করে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৫০ সালে ট্রুম্যান রুশ আধিপত্য রোধে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগেরও সুপারিশ করেন ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের কাছে। মার্শাল আইল্যান্ডে সমুদ্রের তলদেশে প্রথম হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ২৫ বর্গকিলোমিটারের একটি অগ্নিগোলক তৈরি করে বোমাটি। আর তাতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, পারমাণবিক লড়াই কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে বিশ্বের জন্য।
পারমাণবিক প্রতিযোগীতার প্রভাব পড়ে দুই দেশের সাধারণ মানুষের মাঝেও। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা বাড়ির পেছনে বোম্ব শেল্টার বানাতে শুরু করেন। স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন স্থানে আত্মরক্ষার মহড়া শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রে বামধারার সমর্থকদের ওপর চালানো হয় ব্যাপক ধরপাকড়। রাশিয়ার চিত্রও ছিলো একই রকম।
আরো পড়ুন :
প্রায় একই সময়ে সোভিয়েত সমর্থিত উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট শাসকদের বাহিনী আগ্রসান চালায় দক্ষিণ কোরিয়ায়। যুক্তরাষ্ট্র এটিকে সারা বিশ্বে কমিউনিজম কায়েমের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ধরে নেয়। এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়াকে রক্ষায় সেনা পাঠায়। তবে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৩ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয় কোরীয় উপদ্বীপে। দুই বছর পর ন্যাটোর প্রতিপক্ষ হিসেবে একটি সামরিক জোট গঠন করে রাশিয়া।
ওয়ার’শ চুক্তিতে গঠিত ওই জোটে ছিলো পোল্যান্ড, রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়াসহ আরো কিছু ইউরোপীয় দেশ। রাশিয়ার সাথে এই জোটে ছিলো পূর্ব জার্মানি। অন্য দিকে একই বছর পশ্চিম জার্মানি ন্যাটোতে যোগ দিলে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়ে ওঠে। পূর্ব ও পশ্চিমা জার্মানির দখলে থাকা বার্লিন নগরীর দুই অংশের মাঝখানে দেয়াল নির্মাণ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন।
প্রায় একই সময় উভয় দেশ আন্তমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক মিসাইল প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করে। এই মিসাইল আবিষ্কারের ফলে নিজ দেশ থেকেই বিশ্বের যে কোন প্রান্তে পারমাণবিক হামলা চালানো ক্ষমতা অর্জন করে দেশ দুটি।
কিউবার মিসাইল সঙ্কট
এরপরই আসে কিউবার মিসাইল সঙ্কট। ১৯৬২ সালে গোপনে ক্যারিবীয় অঞ্চলের কমিউনিস্ট শাসনের দেশ কিউবায় মিসাইল স্থাপন করতে শুরু করে সোভিয়েত ইউনিয়ন।
যুক্তরাষ্ট্রের গুুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোকে টার্গেটে রাখাই ছিলো এর উদ্দেশ্য। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের কাছে বিষয়টি ধরা পড়লে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কিউবার সমুদ্রসীমায় কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ পাঠায় ওয়াশিংটন। একই সময় ওই অঞ্চলে ছিলো একটি সোভিয়েত সাবমেরিন। উত্তেজনার এক পর্যায়ে সাবমেরিনের কমান্ডার মার্কিন ডেস্ট্রয়ার লক্ষ্য করে টর্পেডো ছোড়ার নির্দেশও দিয়েছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত সাবমেরিনের এক কর্মকর্তার দৃঢ়তায় এড়ানো গেছে সরাসরি সঙ্ঘাত। আর বিশ্ব বেঁচে গেছে আরেকটি বড় আকারের যুদ্ধ থেকে।
তবে এই যুদ্ধ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, কোন দেশই অন্যের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সাহস করেনি, এর কারণ পাল্টা প্রতিশোধের ভয়। অন্যকে শেষ করতে গিয়ে নিজেও শেষ হয়ে যাওয়ার এই ঝুঁকি কোন দেশই নেয়নি। এবং তারা বুঝতে পারে, এই অস্ত্র আসলে সমশক্তি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না। যার কারণে ১৯৬৩ সালে উভয় দেশ ভূখণ্ডের ওপরে পারমাণবিক পরীক্ষা বন্ধের চুক্তি করে।
তবে ছায়া যুদ্ধ থামেনি। ভিয়েতনামে নিজ নিজ পছন্দের পক্ষকে ক্ষমতায় বসতে মরিয়া হয়ে ওঠে ওয়াশিংটন ও মস্কো। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ ভিয়েতনামের হয়ে সেই যুদ্ধে উত্তর ভিয়েতনামের কাছে হার মানে যুক্তরাষ্ট্র। ভিয়েতনাম যুদ্ধকেই এই লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরাজয় বলে মনে করা হয়। এছাড়া আফগাস্তিানে রুশ আগ্রাসন ঠেকাতেও ব্যর্থ হয়েছে তারা। পূর্ব জার্মানি, হাঙ্গেরি, চেকোস্লোভাকিয়াতেও কমিউনিস্ট শাসকদের টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল সোভিয়েত সেনারা। যুক্তরাষ্ট্রের সফলতা ছিলো গুয়েতেমালা, ডমিনিকান রিপাবলিক ও গ্রানাডায় কমিউনিস্ট শাসকদের উৎখাত।
স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হয় কত সালে
তবে বেশির ভাগ জায়গায় রাশিয়া দাপট দেখালেও শেষ হাসিটা হেসেছিলো যুক্তরাষ্ট্র। কারণ চার দশক ব্যাপী এই লড়াইয়ের অবসান হয়েছিলে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের মধ্য দিয়ে। আশির দশকের শেষ দিকে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে কমিউনিস্ট শাসনের পতন হয়। ভেঙে ফেলা হয় বার্লিন দেয়াল। এরপর বিভিন্ন অঞ্চলে জাতীয়তাবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ১৫টি আলাদা রাষ্ট্র গঠিত হয়। এমনকি খোদ রাশিয়াতেও ক্ষমতায় আসে কমিউনিস্ট বিরোধী একটি গণতান্ত্রিক সরকার।
স্নায়ুযুদ্ধের আরেকটি ফ্রন্ট ছিলো মহাকাশ। মহাকাশে প্রভাব বিস্তারের লড়াইও ব্যাপক জমিয়ে তুলেছিলো দুই পরাশক্তি। ১৯৫৭ সালে রাশিয়া প্রথম পৃথিবীর কক্ষপথে কৃত্রিম স্যাটেলাইট প্রেরণ করে। সেটিই ছিলো পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো প্রথম মানুষের তৈরি কোন বস্তু। সারা বিশ্বে হৈচৈ ফেলে দেয়া এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের মানুষদের জন্য সুখকর ছিলো না। পরের বছরই যুক্তরাষ্ট্রর স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে। এবং প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার মহাকাশ গবেষণার জন্য নাসা গঠনের আদেশ জারি করেন।
আরো পড়ুন :
গণিতের উদ্ভব যে ইসলামিক লাইব্রেরি থেকে
এ থেকেই বোঝা যায় মহাশূন্যে প্রভাব বিস্তারের লড়াইটাকেও কতটা গুরুত্বের সাথে নিয়েছিলো তারা। তবে ১৯৬১ সালে মহাশূন্যে প্রথম মানুষ পাঠিয়ে আবারো এগিয়ে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। যদিও এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে একই কাজে সফলতা দেখায় যুক্তরাষ্ট্র এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি নিকট ভবিষ্যতে চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এবং এখানেও শেষ পর্যন্ত জয়টা যুক্তরাষ্ট্রেরই হয়। ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদে পা রাখেন মার্কিন নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং।
স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের সূচনাটা হয়েছিলে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭তম প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের মাধ্যমে। তিনি সামরিক শক্তির পরিবর্তে কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্বে প্রভাব বিস্তারের তত্ত্ব দেন। তার চেষ্টার ফলেই কমিউনিস্ট চীনকে স্বীকৃতি দেয় জাতিসঙ্ঘ। সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যাপারেও নমনীয় হতে শুরু করে। এরপর ক্রমশ পরিণতির দিতে যেতে শুরু করে চার দশকের এই লড়াই। যার সমাপ্তি হয় পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে কমিউনিস্ট শাসকদের উৎখাত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের মাধ্যমে।
এবং
স্নায়ুযুদ্ধে ফলে আমূল পরিবর্তন আসে বিশ্ব রাজনীতিতে। পুরো বিশ্ব ব্যবস্থা দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে যায়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সামরিক,অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রভাবই এরপর থেকে বিশ্ব ব্যবস্থার নিয়ামক হয়ে দাড়ায়। ওই সময়ে শুরু হওয়া অস্ত্র প্রতিযোগিতাও আর থামেনি বিশ্বে


