সাংবাদিকতা যখন ফেসবুকে

মোহাম্মাদ হাসান শরীফ

ফেসবুকে প্রায়ই দেখা যায়, অনেকে অভিযোগ করছেন যে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ‘অন্যায়ভাবে’ তাদের ওপর রেস্ট্রিক্টশন আরোপ করেছে। এমনকি কেউ কেউ বলছেন, তাদের আইডি পর্যন্ত বাতিল হয়ে গেছে। মজার ব্যাপার হলো, তারা এই অভিযোগ প্রকাশ করার জন্য আবার ফেসবুকের আশ্রয়ই নিয়ে থাকেন। অর্থাৎ ফেসবুক ছাড়া আমাদের চলছে না। যানজটে আটকে পড়া, বিয়েবার্ষিকী, ছাদবাগানে আম ধরা- সবকিছুতে ফেসবুকই ভরসা। স্ত্রী মারা যাচ্ছে- এমন খবর দিতে হাসপাতালে যন্ত্রণাকাতর ওই নারীর সাথে নিজের দুঃখ ভারাক্রান্ত ছবিও পোস্ট করা হচ্ছে।

সাংবাদিকতাও সমাজের বাইরের কিছু না হওয়ায় সামাজিক মাধ্যমের জালে আটকে গেছে। টুইটারসহ আরো অনেক মাধ্যম থাকলেও বাংলাদেশে ফেসবুকটাই সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। সংবাদের অনেক সূত্র যেমন ফেসবুকে পাওয়া যায়, আবার সংবাদটি দ্রুত প্রচারের কাজেও ফেসবুক সহায়ক হয়। সুবিধা যেমন আছে, সমস্যাও কম সৃষ্টি হচ্ছে না। ফেসবুকের কারণে সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটি হচ্ছে তা হলো চটকদার নিউজ অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়ছে। সবার আগে দিতে হবে, বেশি হিট হতে হবে, ডলার আনতে হবে। অতিরঞ্জন, সেনসেশন যে যত করতে পারে, তাকে ততই সফল বিবেচনা করা হচ্ছে।

মিডিয়া যখন ছাপানো সংবাদপত্র নির্ভর ছিল, তখনো এমন ছিল। জাতীয় এক নেত্রী … মা হতে চলেছেন- শিরোনামের পত্রিকা বাস স্ট্যান্ডগুলোতে পাওয়া যেত। মূলধারার সংবাদপত্রগুলো এ ধরনের বিষয় এড়িয়ে যেত; কিন্তু ফেসবুকের কারণে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোতে বিষয়টি ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। যেন ঘটনা ঘটার আগেই খবরটি প্রকাশ করতে হবে।

সার্বক্ষণিক প্রতিযোগিতা, দম ফেলার ফুসরত নেই। কী করছি, কেন করছি- ভাবারও অবকাশ নেই। অর্থের দাপট যে কত ভয়াবহ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সম্প্রতি বলিউডের এক পরিচালক জানিয়েছেন। তার কথা হলো, এখন আর চলচ্চিত্রের শিল্পগুণ নিয়ে বিচার করা হয় না। বক্স অফিসে তার অবস্থান নিয়ে চলচ্চিত্রটির সাফল্য নির্ধারিত হচ্ছে। বিষয়টি সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

মিডিয়াতেও একই কথা। দিনশেষে কত আয় হলো। পরিণতি যা হবার তাই হচ্ছে। অনেক তথ্যে, অনেক যত্নে করা কোনো প্রতিবেদন যখন তাৎক্ষণিকভাবে তৈরী, চটকদার কাহিনীর কাছে মার খায়, তখন খুব কম লোকই সাহস পায় ওই পথে হাঁটতে। লাইক, হিট এনে দিতে পারা প্রতিবেদকের উদ্ধত আচরণের কাছে ম্রিয়মান থাকাটা শেষ পর্যন্ত সুখকর হয় না। এর রেশ সহজে কাটে না।

ফেসবুক আমাদের কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে?
সবশেষ কথা হলো, এটি আমেরিকার একটি প্রতিষ্ঠান। আমেরিকান মূল্যবোধ, আমেরিকান জাতীয় স্বার্থই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় কথা। সেইসাথে আছে পুঁজিবাদী অর্থনীতির শোষণ। ভোগবাদের প্রচারে একনিষ্ঠ থাকার বিষয়ও আছে। আর এর মাধ্যমে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বের মিডিয়াগুলো খুদ-কুঁড়া পেয়েই সন্তুষ্ট থাকছে। বাংলাদেশী যেসব কোম্পানি আগে স্থানীয় মিডিয়াকে বিজ্ঞাপন দিত, এখন তারা দিচ্ছে গুগল আর ফেসবুককে। তাদের হাত ঘুরে আমাদের মিডিয়া ওইসব বিজ্ঞাপন পাচ্ছে। ফলে ফেসবুকের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আঁতাত না করে উপায়ও নেই। যে মিডিয়া হাউসের আত্মপ্রকাশ ভোগবাদ, বস্তুবাদ উচ্ছেদের জন্য, তারাও প্রথম যেসব কাজ করে, তার একটি হলো ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খোলা।

আরো পড়ুন: 

সংবাদ ও সাংবাদিকতার প্রাথমিক ধারণা

অনলাইন সাংবাদিকতা : যা জানা জরুরী

সন্দেহ নেই, ফেসবুকের কারণে সাধারণ অনেকেও লাইমলাইটে আসতে পারছে। সমাজের অনেক দুর্নীতি, অন্যায়, অবিচারের প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে ফেসবুকের মাধ্যমে। মিসরে হোসনি মোবারক সরকারের পতন সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমেই হয়েছে বলে অনেক দাবি করে থাকে; কিন্তু সেই একই সামাজিক মাধ্যম কিন্তু সিসি সরকারের স্বৈরাচার দমন করতে পারেনি।

আবার যখন সামাজিক মাধ্যমগুলোর অস্তিত্ব ছিল না, তখনো কিন্তু দুর্নীতি, অন্যায়, অবিচারের কোনো কোনো ঘটনার প্রতিকার পাওয়া যেত। স্বৈরাচারের পতনও হতো। ফিলিপাইনে মার্কোসের পতন কিংবা বার্লিন প্রাচীরের ধ্বংস কিন্তু ফেসবুক ছাড়াই হয়েছে। আরো অনেক আগে, সেই ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলাটির কথা চিন্তা করুন। ফকির-সন্ন্যাসীরা যেভাবে ভাওয়ালের রানিকে ব্যাভিচারী বানিয়ে পুরো দেশে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল, তাতে নিশ্চয় বিচারকাজ প্রভাবিত হয়েছিল। এখন ফেসবুক একই কাজ করে।

অবশ্য, সামাজিক মাধ্যমগুলোর আত্মপ্রকাশের ফলে আমাদের মিডিয়া জগতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথ সৃষ্টি করেছে। প্রথমে টেলিভিশন, পরে স্যাটেলাইট টেলিভিশন এসেও যে পরিবর্তন করতে পারেনি, ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক মাধ্যম সেটা করে ফেলেছে। কল্পনাতীত গতিতে প্রিন্ট মিডিয়ার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। ফেসবুক না থাকলে কেবল অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রিন্ট সংস্করণের ভিত সত্যিই নাড়িয়ে দিতে পারত কিনা সন্দেহ আছে। ফেসবুকের মতো কিছু না থাকায় টেলিভিশন, স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল খুব একটা সমস্যা সৃষ্টি করতে পারেনি প্রিন্ট মিডিয়ার; কিন্তু অনলাইন নিউজ পোর্টাল আর ফেসবুক প্রায় একই সাথে এসে একে অপরের পরিপূরক হয়ে বিদ্যমান ব্যবস্থাকেই কাঁপিয়ে দিয়েছে।

প্রিন্ট মিডিয়া না থাকলে যে জীবন অচল হয়ে যাবে, তা নয়। অনেক আগে যখন প্রিন্ট মিডিয়া ছিল না, তখন কি জীবন অচল ছিল? তখনকার জীবন তখনকার মতোই ছিল। তখনো মানুষ হাসত, কাঁদত। প্রিন্ট মিডিয়ার দরকারও তারা অনুভব করত না। ভবিষ্যতে যখন আরো নতুন কোনো প্রযুক্তি আসবে, তখন বর্তমানের সামাজিক মাধ্যমও থাকবে না। তখনকার সময়ের ব্যবস্থার সাথে তখনকার লোকজন অভ্যস্ত হবে।

বলা হয়ে থাকে, কেউ যখন অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করে, তখন তার কোষের সংখ্যা বেড়ে যায়। আর ওইসব কোষের চাহিদা পূরণ করার জন্য পরেরবার তাকে আরেকটু বেশিই খেতে হয়। যারা হিসাব রাখতে পারে না, তারা আবারো একটু বেশি খায়। তাতে আরেক দফা কোষের বৃদ্ধি ঘটে। আর এভাবেই দেহ স্থূল হতে থাকে। একবার স্থূল হতে থাকলে তা দমন করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষ করে অনলাইনভিত্তিক নিউজ পোর্টালগুলোর অবস্থাও একই রকম হয়ে পড়েছে। প্রতিনিয়ত বেশি লাইক পাওয়া, বেশি হিট পাওয়া, বেশি ডলার কামানোর দিকে ছুটতে হয়; কিন্তু রাতে ঘুমানোর আগে সারা দিনের হিসাব যখন করা হয়, তখন কোনো কিছুই মেলে না। এক পাগলামি আরো পাগলামির পথ সৃষ্টি করছে। ক্লান্তি, আচ্ছন্নতা বাড়ছে। আর প্রশান্তি, মননশীলতা হ্রাস পাচ্ছে।

এ থেকে মুক্তির কোনো উপায় আছে? আছে।

নিজেকে সংযত করে চেষ্টা চালানো যেতে পারে। পথটি কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়।

লেখক : অনলাইন এডিটর, দৈনিক নয়া দিগন্ত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top