হামাস কি

হামাস কোন দেশের সংগঠন | হামাসের ইতিহাস

হামাস কি

হামাস কোন দেশের সংগঠন -সেসব নিয়ে আলোচনার আগে জেনে নেব হামাস সম্পর্কে কিছু কথা। দখলদার ইহুদি রাষ্ট্রের বর্বর হামলার মুখে বেঁচে থাকা আর নিজেদের ঘরবাড়ি রক্ষা করাই ফিলিস্তিনিদের নিত্যদিনের চ্যালেঞ্জ। যেখানে সুবহে সাদিকে আজানের শব্দের আগেই কানে ভেসে আসে ইসরাইলি বাহিনীর মেশিন গানের শব্দ, রাতের নিদ্রা শুরু হয় আগামী দিনটি জীবনে আসবে কি না সেই অনিশ্চয়তা নিয়ে।

যেখানে বেঁচে থাকা মানে শত্রুকে মোকাবেলা করে টিকে থাকা, আর জীবনের প্রতিটি দিন মানে যুদ্ধের প্রস্তুতি। যেখানে শিশু, যুবক, বৃদ্ধ সবাই জানে- বাঁচতে হলে শত্রুকে মোকাবেলা করেই টিকে থাকতে হবে। মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে হলে তাড়াতে হবে দখলদারদের।

আর ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের এই লড়াই কে নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে হামাস। যারা প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে।

হামাস কোন দেশের সংগঠন

মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ভূখণ্ড ফিলিস্তিনের একটি সশস্ত্র সংগঠন হামাস। এর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থাকলেও হামাস বিখ্যাত তার প্রতিরোধ যুদ্ধের কারণেই। এটির কার্যক্রম মূলত গাজা উপত্যকা নির্ভর। ফিলিস্তিনিদের হয়ে প্রতিদিন ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই করে সংগঠনটির যোদ্ধারা। হামাস একটি সশস্ত্র সংগঠন, যারা সরাসরি ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যই নিবেদিত। এই সংগঠনটির প্রধান উদ্দেশ্য ইসরাইলের হাত থেকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড মুক্ত করা।

আরো পড়ুন :

হিজবুল্লাহ : ইসরাইলের আতঙ্ক

ফিলিস্তিনের বিশাল ভূখণ্ড এখন ইসরাইলের দখলে। তার ওপর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রটিও এখনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়। এর নেই কোন স্বার্বভৌমত্ব। প্রতিদিন ইসরাইলি সেনারা ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে টহল দেয়। পবিত্র নগরী জেরুসালেমকে তারা অনেক আগেই দখল করে নিয়েছে। গাজা উপত্যকাকে করে রেখেছে অবরুদ্ধ। গাজার মানুষ চাইলেই বের হতে পারে না।

হামাস কোন দেশের সংগঠন
হামাসের সামরিক শক্তি বাড়িয়েছে তাদের বিভিন্ন পাল্লার রকেট

হামাসের ইতিহাস

১৯৪৮ সালের ১২মে রাত ১২টা এক মিনিটে ইসরাইল নামক ইহুদিবাদী রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া হয়। এর বহু আগে থেকেই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইহুদিদের এনে জড়ো করতে থাকে। মূলত ব্রিটিশরা ওই জায়গাটিতে ইহুদিদের একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করে। পরে সেটিকে এগিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।

রাষ্ট্র ঘোষণার পর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গুলোতে নতুন নতুন ইহুদি বসতি বানাতে থাকে ইসরাইল। ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রতিদিন বাড়তে থাকে নির্যাতনের মাত্রা। শুরু থেকেই ফিলিস্তিনিরা এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে থাকলেও তাদের কোন সংঘবদ্ধ কাঠামো ছিলো না।

১৯৭০ সালে মিসর থেকে দেশে ফেরেন ফিলিস্তিনি সংগঠন শেখ আহমদ ইয়াসিন। শুরুতে তিনি ইসরাইলি বাহিনীর হাতে নির্যাতিত মানুষদের পাশে দাড়ান। আহতদের চিকিৎসা সেবা দেয়া, গৃহহীনদের গৃহনির্মাণসহ দাতব্য কার্যক্রম শুরু করে ফিলিস্তিন জুড়ে। এক পর্যায়ে ইসরাইলের এই অন্যায় আচরণ ঠেকাতে হাতে অস্ত্র তুলে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন শেখ ইয়াসিন। বুঝতে পারেন, নিজেদের লড়াই নিজেদেরই করতে হবে, বিশ্ব বিবেক ফিলিস্তিনিদের পাশে দাড়াবে না।

আরো পড়ুন : 

যেভাবে অভিযানের প্রস্তুতি নিয়েছে হামাস

১৯৮৭ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন হামাস। দখলদার বাহিনীকে তাড়াতে নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের ঐক্যবদ্ধ করতে শুরু করেন তিনি। এরপর শুরু হয় সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ। দ্রুত ফিলিস্তিনিদের ভালোবাসা অর্জন করতে শুরু করে সংগঠনটি।

১৯৯১ সালে হামাসের পৃথক সামরিক শাখা ইজ্জদিন আল কাসসাম ব্রিগেড গড়ে তোলা হয়। যেটি আল কাসসাম ব্রিগেড নামেও পরিচিত। এই শাখাটি সরাসরি ইসরাইলি সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে খুব বেশি সহযোগিতা না পাওয়ায় হামাস নিজেরাই অস্ত্র উৎপাদনের দিকে মনযোগ দে। অল্প কয়েক বছরের মধ্যে আল বান্না, আল বাতার, আল ইয়াসিনসহ বিভিন্ন পাল্লার রকেট উৎপাদন করতে সক্ষম। এসব রকেট ঘুম হারাম করে দেয় ইসরাইলের।

সেই সাথে প্রতিরোধ যুদ্ধের নতুন নতুন কৌশল গ্রহণ করে সংগঠনটি। হামাসকে ঠেকাতে বিশাল পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামে তেল আবিবের ইহুদিবাদী সরকার।

হামাসের সামরিক শক্তি

২০১৫ সালে হামাসের আল কাসসাম ব্রিগেডের মুখপাত্র আবু ওবায়দা গণমাধ্যমকে জানান, ২০০১ সাল থেকে আল কাসসাম ব্রিগেড প্রথম রকেট নির্মাণ শুরু করে। এরপর ক্রমান্বয়ে এর পাল্লা বাড়তে থাকে। এক বছরের মধ্যে ৮০ কিলোমিটা পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম হয় হামাসের রকেট।

২০১৪ সালের যুদ্ধে হামাস আর-১৬০ রকেট ব্যবহার করে, যা ইসরাইলের হাইফা নগরীতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়। এছাড়া একই যুদ্ধে তাদের জে-৮০ রকেট তেলআবিবে পৌছায়। ২০২১ সালের মে যুদ্ধে হামাস যেসব রকেট ব্যবহার করে তার পাল্লা ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছিলো। সেবার হামাস ১৩৭টি এস-ফোর্টি মিসাইল ছোড়ে ইসরাইলের আশকেলন ও আশদোদ শহর লক্ষ্য করে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি ভবন। নিহত হয় ২ ইসরাইলি নাগরিক। সেদিন রাতেই কয়েক ডজন রকেট হামলা হয় তেল আবিব ও গুশ দান শহরে।

কয়েক দিন পর ইসরাইলের র‌্যামন বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ২৫০ কিলোমিটার পাল্লার রকেট ছুড়ে তাক লাগিয়ে দেয় হামাস। এভাবে ক্রমশই তারা হামালার রেঞ্জ বাড়িয়েছে। এসব হামলার বেশির ভাগ ইসরাইলের আয়রন ডোম এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের মাধ্যমে ধ্বংস হলেও হামাস যে আতঙ্ক ধরাতে পেরেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

হামাসের অস্ত্র ভান্ডার সম্পর্কে কখনোই সঠিক তথ্য প্রকাশ করা হয় না। কারণ ইসরাইলি গুপ্তচরদের চোখ এড়াতে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে কার্যক্রম চালায় তারা। বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এটি স্পষ্ট যে, জেরুসালেম, তেল আবিবসহ ইসরাইলের সব উপকূলীয় এলাকায় হামলার ক্ষমতা হামাসের রয়েছে।

আরো যত অস্ত্র

মধ্যপ্রাচ্যের সমরাস্ত্র বিশ্লেষক ফাবিয়ান হিনজের বরাত দিয়ে জার্মানিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টা জানিয়েছে, হামাসের কাছে অন্তত ১৫ ধরনের আন-গাইডেড রকেট রয়েছে। বেশির ভাগই হামাস নিজেরা উৎপাদন করে। এছাড়া ইরান ও সিরিয়া থেকে রকেট সংগ্রহ করে তারা।

হামাস পিক
ইসমাইল হানিয়া

ইরান থেকে তারা ১২ কিলোমিটার পাল্লার কিউ-টোয়েলভ ও ২০ কিলোমিটার পাল্লার কিউ-টোয়েন্টি রকেটের প্রযুক্তি পেয়েছে। এছাড়াও ইরান তাদের দিয়েছে ৭৫ কিলোমিটার পাল্লার রকেট ‘ফজর-থ্রি’। এছাড়া নিজেরা বানিয়েছে এম-সেভেনটি ফাইভ (পাল্লা ৭৫ কিলোমিটার ), জে-এইটি (৮০ কিমি) ও জে-নাইনটি (৯০ কিমি)।
হামাসের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেটটি হচ্ছে এম-থ্রি হানড্রেড টু। ১৮০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম এই মিসাইল সিরিয়া থেকে সংগ্রহ করা।

হামাসের বর্তমান প্রধান কে

সংগঠনটির বর্তমান রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়া। ২০১৭ সালে তিনি এই দায়িত্বে আসেন। খালেদ মেশালের পর তিনি এই পদে আসেন। হানিয়ার সহকারী প্রধান হিসেবে আছেন ইসমাইল আল আরুরি। ফিলিস্তিনের ২০০৬ সালের নির্বাচনে হামাস জেতার পর ইসমাইল হানিয়া প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তবে বহির্বিশে^র চাপে তারা ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি।

১৯৬২ সালে গাজা উপত্যকার একটি উদ্বাস্তু শিবিরে তার জন্ম। যেসব পরিবার ইসরাইলের দখলকৃত ভূখ- থেকে উচ্ছেদ হয়ে উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে, তার মধ্যে ছিলো হানিয়ার পরিবারও।

হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান কার্যালয় কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থিত। এর আগে বেশ কয়েকজন হামাস প্রধানকে ইসরাইল বিমান হামলা চালিয়ে হত্যা করার পর এই কৌশল নেয়া হয়েছে। যে কারণে হামাসের প্রধান নির্বাচিত হওয়ার পর ইসমাইল হানিয়াও দোহায় বসবাস করতে শুরু করেন। টপিক : হামাস কোন দেশের সংগঠন

আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন : আহমেদ স্টোর

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top