ইরাক পিক

ইরাকের রাজধানীর নাম কি । ইরাকের মুদ্রা । কারবালা কাহিনী

ইরাক

মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ ইরাক। ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অনেক অধ্যায়ের সাথে জড়িয়ে আছে দেশটির নাম। তারও আগে মেসোপটোমিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন সভ্যতাও গড়ে উঠেছিল ইরাকে। তেল শিল্পের ওপর নির্ভর করে আধুনিক ইরাকও পা দিয়েছিল সমৃদ্ধির পথে। তবে সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের ওপর পশ্চিমাদের সামরিক অভিযানের পর এখন দেশটি একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র হিসেবেই টিকে আছে। ইরাকের অতীত বর্তমান নিয়ে অনেক অজানা কথা জানবো এই লেখায়, আরো জানবো ইরাকের রাজধানীর নাম কি

ইরাকের মুদ্রার নাম কি

দেশটির অফিশিয়াল নাম : রিপাবলিক অব ইরাক, রাজধানী : বাগদাদ। বৃটেন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে ৩ অক্টোবর, ১৯৩২ সালে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটির আয়তন  ৪ লাখ ৩৭ হাজার ৭২ কিলোমিটার। আর মোট জনসংখ্যা ৩ কোটি ৮৪ লাখ ৩৩ হাজার।
নাগরিকদের জাতীয়তা : ইরাকি, অফিশিয়াল ভাষা : আরবি, কুর্দি, মুদ্রা : ইরাকি দিনার।
ধর্ম প্রধানত ইসলাম ৯৯ শতাংশ ( এর মধ্যে শিয়া ৬০ শতাংশ, সুন্নী ৪০ শতাংশ) বাকির অন্যান্য ধর্মাবলম্বী।
সরকার ব্যবস্থা : ফেডারেল পার্লামেন্টারি, পার্লামেন্ট : এক কক্ষবিশিষ্ট, আর প্রদেশ রয়েছে ১৯টি
শিক্ষিতের হার : ৮৪ শতাংশ

ইরাক কোন মহাদেশে অবস্থিত

বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতা মেসোপটোমিয়া গড়ে উঠেছিল আজকের ইরাকেই। খ্রিস্টের জন্মের ৬ হাজার বছর আগে দজলা ও ফোরাত নদী দুটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এই সভ্যতা। ইরাক ছাড়াও ইরান, কুয়েত, সিরিয়া, জর্ডান, তুরস্কের কিছু অংশ ছিলো মেসোপটোমিয়ার অংশ। তবে প্রাচীন এই সভ্যতার ঠিক বিপরীত চিত্র যেন উত্তরাধুনিক ইরাক। পশ্চিমাদের আগ্রাসনে দেশটি এখন যেন এক ধ্বংসপুরী।

আয়তনে মধ্যপ্রাচ্যের তৃতীয় বৃহত্তম দেশ ইরাক। দেশটির চারদিকে ঘিরে আছে তুরস্ক, সিরিয়া, জর্দান, সৌদি আরব, কুয়েত ও ইরান। দক্ষিণে রয়েছে পারস্য উপসাগরের ৫৮ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা। এছাড়া অন্য সব দিকেই স্থলবেষ্টিত দেশ ইরাক। দজলা ও ফোরাত নদীর মাঝখানের এলকাটিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল মেসোপটোমিয়া সভ্যতা।

প্রায় তিনশ বছর ওসমানীয় খিলাফাহর অধীনে থাকা ইরাক প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর চলে যায় ব্রিটিশদের হাতে। ১৯৩২ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা ও ১৯৫৮ সালে রাজতন্ত্র উৎখাত করে প্রজাতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা হয় দেশটিতে। আর ১৯৬৮ সালে শুরু হওয়া বাথ পার্টির শাসন শেষ হয়েছে ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা সামরিক আগ্রাসনে সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের মধ্য দিয়ে।

ইরাকের জনসংখ্যার ৯৯ শতাংশই মুসলিম। আর মুসলিমদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়ারা। মুসলিমদের প্রায় ৬০ শতাংশ শিয়া, বাকি ৪০ শতাংশ সুন্নী। এছাড়া খ্রিস্টান, ইয়াজিদি, ইয়ারসানস ধর্মের লোকদের বসবাস রয়েছে দেশটিতে। জাতিগত দিক থেকে দেশটিতে আরব ছাড়াও রয়েছে কুর্দি, আসিরিয়ান, তুর্কি, শাবাকিস, আর্মেনিয়ানসহ বিভিন্ন জাতির লোক। তবে জনসংখ্যার ৮০ শতাংশই আরব। আর ১৫ শতাংশ কুর্দি এবং বাকি ৫ শতাংশ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠির লোক।

ইরাকের রাজধানীর নাম কি

উত্তরাঞ্চলটি পাহাড়ি এলাকা, এছাড়া দেশের বেশির ভাগই মরু অঞ্চল। বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকার পুরোটাই সিরিয়ান মরুভূমির অংশ। দেশটির মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে ফোরাত ও দজলা নামের দুটি ঐতিহাসিক নদী। দজলা বা টাইগ্রিস নদীটি উত্তরের তুর্কি-সিরিয়া-ইরাক সীমান্ত পয়েন্টের কাছাকাছি জায়গা দিয়ে ঢুকেছে ইরাকে। এরপর একে বেকে বয়ে গেছে এক হাজার কিলোমিটারের বেশি। আর ইউফ্রেটাস বা ফোরাত নদীটি সিরিয়া থেকে ঢুকেছে ইরাকে।

দুটি নদী অনেকটা সমান্তরালে বয়ে ইরাকের দক্ষিণ সীমান্তের কাছাকাছি গিয়ে মিলিত হয়ে পড়েছে পারস্য উপসাগরে। এই দুই নদীর অববাহিকাই মূলত ইরাকের উর্বর অঞ্চল। ফোরাত ও দজলার মধ্যবর্তী অঞ্চলেই গড়ে উঠেছিল প্রাচীন মেসোপটোমিয়া সভ্যতা। আজকের ইরাকের সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোও মূলত এই দুই নদীকে ঘিরেই। দজলা নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে রাজধানী বাগাদাদ, মসুলসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ নদী। অন্য বড় শহরগুলোও বেশির ভাগই এই দুই নদীর তীরে।

ইরাকের এক টাকা বাংলাদেশের কত টাকা

ইরাকের মুদ্রার নাম দিনার। এক দিনার সমান ০.০০০৭৭ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক হাজার ইরাকি দিনারে পাওয়া যাবে ৭৭ মার্কিন সেন্ট (১০০ সেন্টে ১ ডলার)। আর ১০ হাজার ইরাকি দিনারে পাওয়া যাবে ৭.৭০ মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশের মুদ্রার মানও ইরাকি দিনারের চেয়ে এগিয়ে। ১ ইরাকি দিনার সমান বাংলাদেশের ০.০৮১ টাকা। অথবা ১০০ ইরাকি দিনারে পাওয়া যাবে বাংলাদেশের ৮ টাকা ১৪ পয়সা। তবে এই হার আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে বেশি কম হতে পারে।

ইরাকের তেল

ইরাকের অর্থনীতিরি মূল চালিকা শক্তি দেশটির তেল সম্পদ। অর্থনীতির ৬৭ শতাংশ-ই যোগান দেয় তেল বাণিজ্য। জাতীয় বাজেটের ৯০ শতাংশ আসে অপরিশোধিত তেল রফতানি আয় থেকে। তেল মজুদের দিক থেকে বিশ্বে সৌদি আরব ও ভেনেজুয়েলার পরই ইরাকের অবস্থান। ইরাকের মাটির নিচে তেল মজুদের পরিমাণ ১৪ কোটি ব্যারেলের বেশি। তেল রফতানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশটি।

১৯৭০ এর দশকে ইরাকের প্রতিদিন তেল উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে দাড়িয়েছিল ৩৫ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত; কিন্তু ১৯৯০ সালে সাদ্দাম হোসেন সরকারের কুয়েত দখল করার পর জাতিসঙ্ঘসহ পশ্চিমা বিশ্ব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে ইরাকের তেল রফতানি ও সেই সাথে উৎপাদান অনেকগুন কমে আসে। তবে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক অভিযানে সাদ্দাম হোসেন সরকারের পতনের পর আবার পশ্চিমা দেশগুলো ইরাক থেকে তেল কিনতে শুরু করেছে, যে কারণে উৎপাদনও বেড়েছে অনেকগুন।

ইরাক আমেরিকা যুদ্ধ

শধু তেল নয় শিল্প নয়, ২০০৩ সালের ওই পশ্চিমা সামরিক অভিযান পুরো ইরাককেই পাল্টে দিয়েছে। গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে এমন অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্রের বুশ প্রশাসন ইরাকে হামলা চালাতে উঠে পড়ে লাগে। যদিও শেষ পর্যন্ত কিছুই পাওয়া যায়নি। যে কারণে অনেকেই বলেই, ইরাকের তেল শিল্প দখল করতেই পশ্চিমারা সামরিক অভিযান চালিয়েছে।

সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতই শুধু নয়, তাকে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডও দেয়া হয়েছে আমেরিকার পরিচালিত ক্যামেরা ট্রায়ালে। ওই যুদ্ধের পর আজকের ইরাক অনেকটাই বিধ্বস্ত। জায়গায় জায়গায় যুদ্ধের ধ্বংস্তুপ চোখে পড়ে। কোথাও ধসে যাওয়া বাড়ির পাশে তাবু খাটিয়ে বসবাসের দৃশ্য চোখে পড়ে। ওই যুদ্ধে নিহত হয় তিন লাখের বেশি ইরাকি নাগরিক।

এরই মধ্যে মরার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে আসে চরমপন্থী গ্রুপ আইএসের উত্থান। দীর্ঘ ৫টি বছর আইএস রাজত্ব করেছে ইরাকের বিভিন্ন এলাকায়। তবে আশার কথা হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত আইএসকে পরাজিত করা গেছে। আইএসের অধীন এলাকাগুলোর নাগরিকরা বলছেন, তাদের কাছে সেই জীবনছিল রীতিমতো বিভিষিকাময়।
জাতিসঙ্ঘের হিসেবে আমেরিকার চাপিয়ে দেয়া ওই যুদ্ধে উদ্বাস্তু হয়ে দেশ ছেড়েছে অন্তত ২০ লাখ ইরাকি নাগরিক।

যাদের বেশির ভাগই আশ্রয় নিয়েছে সিরিয়া ও জর্দানে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তারা ফিরতে শুরু করলেও সরকার তাদের জন্য ঘর নির্মাণ কিংবা পানি-বিদ্যুৎ সরবরাহের কোন ব্যবস্থা করতে পারেনি। যে কারণে দেশটিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও আসেনি। কিছুদিন পরপরই সরকার বিরোধী বিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করে। ২০২০ সালে এমনি এক বিক্ষোভ থেকে হামলা হয়েছিল বাগদাদের মার্কিন দূতাবাসেও।

ইরাকের শিয়া সুন্নী

জাতিগত বিভক্তিও ইরাকে অস্থিশীলতার একটি কারণ। দেশটিতে শিয়ারা সংখাগরিষ্ঠ। মার্কিন অভিযানের পর তাই ক্ষমতা পেয়েছিল শিয়ারা; কিন্তু তারা ভালো কিছু দিতে পারেনি দেশটিতে। আবার উত্তরাঞ্চলের কুর্দিরা চাইছে স্বাধীনতা।

মাসুদ বারজানি নেতৃত্বে তারা কয়েক বছর আগে স্বাধীনতার ঘোষণাও দিয়েছিল; যদিও প্রতিবেশী দেশগুলোসহ আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন না পাওয়ায় সেই দাবি টেকেনি। শিয়া-সুন্নী-কুর্দি মিলে তাই ইরাকে জাতিগত বিভক্তি প্রবল। যুদ্ধের পর এই বিভক্তিই দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান বাধা।

বর্তমান যেমনই হোক ইরাকের অতীত খুবই সমৃদ্ধ। মেসোপটোমিয়াসহ বেশ কিছু সভ্যতা ছাড়াও এই দেশটি জড়িয়ে আছে ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অনেক অধ্যায়ের সাথে। ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর রাসুল (সা) যে শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার অধীনেই ছিল ইরাক। এছাড়া হযরত ইবরাহিম (আ) এর জন্মও ইরাকে।

ইসলামের চতুর্থ খলিফা ও রাসুল্লাহ (সা) এর জামাতা হযরত আলী (রা.) এর মাজার রয়েছে ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজাফ শহরে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ তার কবর জিয়ারতের জন্য প্রতিদিন ভীড় করেন এখানে। এই শহরেই তিনি শাহাদাত বরণ করেছিলেন।

ইরান ইরাক যুদ্ধ সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

কারবালা কাহিনী

ইসলামের ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায় সংঘটিত হয়েছিল ইরাকের কারবালায়। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের ১০ মহররম যেখানে শাহাদাৎ বরণ করেছিলেন রাসুলুল্লা (সা.) এর দৌহিত্র ইমান হোসাইন (রা)। কারবালা শহরটি ইরাকের মধ্যাঞ্চলে রাজধানী বাগদাদ নগরী থেকে ১৬২ কিলোমিটার দক্ষিণপূর্বে ফোরাত নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছে। কারবালার যুদ্ধক্ষেত্রের পাশেই সমাহিত করা হয়েছিল ইমাম হুসাইন (রা.)কে। প্রতিদিন তার কবর জিয়ারত করতেও ভিড় করেন অনেক মানুষ।

এছাড়া ৬৭০ খ্রিস্টাব্দে গড়ে তোলা কুফার বড় মসজিদ ও সামারার মসজিদের প্রাচীন মিনারও ইরাকের ইসলামি শাসনের যুগের দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এর বাইরে ইরাকের মসুলসহ বিভিন্ন শহরে রয়েছে প্রাক ইসলামি যুগের অনেক স্থাপনা। মেসোটোমিয়া, বেবিলনসহ প্রাচীন সভ্যতাগুলোর নির্দশন এখনো মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে দেশটিতে। কয়েক হাজার বছর আগের অনেক প্রাচীন দুর্গ, মন্দির কিংবা প্রসাদের দেখা মিলবে ইরাকের মরুভূমির বিভিন্ন জায়গায়।

আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন : আহমেদ স্টোর

১৭-০৮-২০২০

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top