সাইবেরিয়ার নাম শুনলেই মনে আসে বরফে ঢাকা বিস্তির্ণ অঞ্চল আর গা হীম করা শীত। সাইবেরিয়া মানেই উড়ে আসা অতিথি পাখির দেশ। সাইবেরিয়া মানেই তুষার ধস আর বরফের বৃষ্টি। রাশিয়ার বিশাল এই অঞ্চলটিতে বসবাস করেন অল্প সংখ্যক মানুষ। কেমন তাদের জীবন যাত্রা, সাইবেরিয়ার আবহাওয়াই বা কেমন, সাইবেরিয়া কোন মহাদেশে সেসব জানাবো এই লেখায়
সাইবেরিয়া কোন মহাদেশে
উত্তর এশিয়ার একটি বিস্তির্ণ ভৌগলিক অঞ্চল সাইবেরিয়া। অঞ্চলটি ভৌগলিকভাবে এশিয়ার অন্তর্ভূক্ত হলেও রাজনৈতিকভাবে সেটি ইউরোপের অংশ। কারণ রাশিয়ার স্বার্বভৌমত্বের অংশ সাইবেরিয়া। রাশিয়া বিশে^র সবচেয়ে বড় দেশ। আর এই রাশিয়ার মোট ভূখ-ের ৭৭ শতাংশই সাইবেরিয়ার অন্তর্গত।
রাশিয়ার মোট আয়তন এক কোটি ৭০ লক্ষ ৯৮ হাজার ২৪৬ বর্গকিলোমিটার। তার মাঝে এক কোটি ৩১ লক্ষ বর্গকিলোমিটার সাইবেরিয়ার। যদিও বিশাল অঞ্চলটিতে বসবাস করে রাশিয়ার মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ ভাগের একভাগ। সাইবেরিয়া পূর্ব পশ্চিমে ইউরাল পর্বতমালা থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। উত্তরে আর্কটিক সাগর থেকে দক্ষিণে চীন -মঙ্গোলিয়াার সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকাটি।

অঞ্চলটিতে মানব বসতি কবে স্থাপিত হয়েছে সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। শুরুতে এই অঞ্চলটিতে ইনেট, নেনেট, হান, উইঘুরসহ বিভিন্ন যাযাবর গোষ্ঠি বিভিন্ন এলাকায় আবাস স্থাপন করেছে বলে জানা যায়। সাইবেরিয়ার আলতাই পার্বত্য অঞ্চল থেকেই তুর্কিদের উদ্ভব হয়েছিল।
এখান থেকেই ধীরে ধীরে তারা ছড়িয়ে পড়েছে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকায়। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মঙ্গলরা সাইবেরিয়ার বিরাট একটি অংশ দখল করেছিল। ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে রাশিয়ার প্রভাব বৃদ্ধির সাথে সাথে অঞ্চলটি ক্রমশ রাশিয়ার দখলে যেতে থাকে। রুশ বনিকরা এসব অঞ্চলে গিয়ে বসতি স্থাপন করে, আর তাদের নিরাপত্তার জন্য পাঠানো হয় রাশিয়ার সেনাবাহিনী।
১৭০৯ সালে সাইবেরিয়ায় রুশদের সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় ২ লাখ ৩০ হাজারে। রুশ শাসকরা অপরাধীদের নির্বাসন কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করতে শুরু করে সাইবেরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পরও এখানে স্থাপিত হয়েছে অনেকগুলো লেবার ক্যাম্প, যাতে রাখা হতো বন্দীদের।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর প্রকাশিত কিছু আধা সরকারি নথিতে জানা গেছে, ১৯২৯ থেকে ১৯৫৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এক কোটি ৪০ লাখের বেশি লোককে এসব ক্যাম্পে বন্দী রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সাইবেরিয়ার ক্যাম্পে মারা গেছে ৫০ লাখের বেশি বন্দী।
১৮৯১ সালে ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলওয়ে স্থাপনের পর থেকে এই অঞ্চলে হু হু করে বাড়তে থাকে রুশদের উপস্থিতি। বর্তমানে সাইবেরিয়ার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। তবে বিশাল এই অঞ্চলটির তুলনায় তা সামান্যই। কারণ সাইবেরিয়ায় গড়ে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে মাত্র ৩ জন। সাইবেরিয়ার বাসিন্দারা সবাই রাশিয়ার নাগরিক।
সাইবেরয়িার রাজধানীর নাম কি
রাশিয়ার ৮টি ফেডারেল ডিস্ট্রিক্টের মাঝে সাইবেরিয়ান ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট, ফার ইস্টার্ন ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট, ও ইউরাল ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট বৃহত্তর সাইবেরিয়ার অন্তর্ভূক্ত। আর বিভিন্ন মর্যাদায় রাশিয়ার যে ৮৫টি ফেডারেল সাবজেক্ট রয়েছে সেগুলোর ১৭টি এই অঞ্চলের মধ্যে পড়েছে। সাইবেরিয়ার বেশির ভাগটাই পার্বত্য অঞ্চল।
কাজেই সাইবেরিয়া একক কোন প্রদেশ বা সায়ত্বশাসিত অঞ্চল নয়, তাই এর কোন নির্দিষ্ট রাজধানী নেই। সাইবেরিয়ার মধ্যে রাশিয়ার যে তিনটি ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট রয়েছে সেগুলোর পৃথক তিনটি রাজধানী বা প্রশাসনিক কেন্দ্র রয়েছে।
ভূতাত্ত্বিকরা অবশ্য সাইবেরিয়াকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করেছেন পশ্চিম সাইবেরিয়ান সমভূমি ও মধ্য সাইবেরিয়ান মালভূমি। পশ্চিম সাইবেরিয়া মূলত সমভূমি, যার বিভিন্ন জায়গায় আছে জলাধার। এই অঞ্চলটির উত্তরাংশ চিরস্থায়ী হিমায়িত অঞ্চল, আর দক্ষিণে আছে সবুজ তৃণভূমি। পশ্চিমে আছে সমভুমি। সেন্ট্রাল সাইবেরিয়ার পুরোটাই পার্বত্য অঞ্চল। এখানে প্রচুর বনাঞ্চলও রয়েছে।
সাইবেরিয়া আবহাওয়া
সাইবেরিয়াকে অনেকে বলেন বরফের রাজ্য। মূলত এই অঞ্চলটি তার শীতল আবহাওয়ার জন্যই বিশ্বব্যাপী পরিচিত। তবে এখানকার আবহাওয়া শীতপ্রধান হলেও এতে রয়েছে নাটকীয় বৈচিত্রতা। কোথাও কোথাও সংক্ষিপ্ত গ্রীষ্মকালও রয়েছে। তবে এই অঞ্চলের শীতকাল খুবই দীর্ঘ ও অসহ্য।

শীতের তীব্রতা এখানে এতই বেশি যে প্রায় সারা বছরই সাইবেরিয়ার বেশির ভাগ অঞ্চলই বরফে ঢাকা থাকে। আর্কটিক সার্কেলের উত্তরাংশে বছরে এক মাস গ্রীষ্মকাল দেখা যায়। দক্ষিণ সাইবেরিয়াতে অবশ্য গ্রীষ্মকালটি আরেকটি দীর্ঘ হয়।
সাইবেরিয়া তাপমাত্রা
দক্ষিণ সাইবেরিয়ার বেশিরভাগ মানুষের বসবাস ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়েকে কেন্দ্র করে। এখানে বছরে অন্তত চার মাস গ্রীষ্মকাল। জুলাইতে এই অঞ্চলের তাপমাত্র ১৯ ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠে। তবে শীতে এসব এলাকায় গড় তাপমাত্রা নেমে আসে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
এই অঞ্চলে ওমস্ক, নভোসিব্রিস্ক শহরগুলো অবস্থিত। দক্ষিণ-পশ্চিম সাইবেরিয়ায় ওবি নদীর তীরে অবস্থিত নভোসিব্রিস্ক শহরটি সাইবেরিয়ার সবচেয়ে বড় শহর। এখানে বাস করে ১৫ লাখ মানুষ। মে থেকে সেপ্টম্বর পর্যন্ত এই শহরে গ্রীষ্মকাল। জুলাইয়ের গড় তাপমাত্রা ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
অক্টোবর থেকে কমতে শুরু করে তাপমাত্রা, জানুয়ারিতে তা নেমে আসে মাইনাস ১৮ ডিগ্রিতে। মার্চ মাস পর্যন্ত হিমাঙ্কের নিচেই থাকে তাপমাত্রা। চলে ভয়ঙ্করসব তুষার ঝড়। এখানে ডিসেম্বর জানুয়ারিতে দিনের আলো থাকে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। বাকি সময়টা রাত। গ্রীষ্মের মাঝামাঝিতে কিছুদিন ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকে সূর্যের আলো। আর ওমস্কের আবহাওয়ার আচরণও প্রায় একই ধরণের। ওমস্কের বাসিন্দা সাড়ে ১১ লাখ।
সাইবেরিয়ার উত্তরপূর্বাঞ্চলে শীতের তীব্রতা বেশি। এই অঞ্চলের ভারখোয়ানস্ক ও ওমিয়ানকন শহর দুটিতে মাইনাস ৬৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার রেকর্ড রয়েছে। উত্তরাঞ্চলীয় শহর ভারখোয়ানস্কে ১৯৩৩ সালে পরপর তিন রাত তাপমাত্রা নেমেছিল মাইনাস ৬৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
উত্তর গোলার্ধের সবচেয়ে ঠা-া জনবসতিপূর্ণ এলাকা এই শহর দুটি। আবার এই এলাকাগুলোই সাইবেরিয়া এমনকি পুরো রাশিয়ারই সবচেয়ে উষ্ণ অঞ্চল হয়ে ওঠে গ্রীষ্মকালে। এখানে তাপমাত্রা কখনো ৩০ ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠে। সারা বিশে^ই আবহাওয়ার এমন বিপরীত চিত্র আর কোথাও দেখা যায় না।
সাইবেরিয়া ধর্ম কি
জাতিগত দিক থেকে এদের অধিকাংশ স্লাভিক বংশোদ্ভ’ত রুশ ও রুশ ইউক্রেনিয়ান। আরো আছে অনেকগুলো ছোট ছোট জাতিগত গোষ্ঠি- যেমন তুর্কি, মঙ্গল, সাইবেরিয়ান তাতার ইত্যাদি। এদের কারো শেকড় সাইবেরিয়াতেই, কেউ বা অন্য কোন অঞ্চল থেকে আসা। ২০০২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী সাইবেরিয়ায় তাতার জনগোষ্ঠির সংখ্যা ৫ লাখ। তুর্কি ভাষী ইয়াকুত জাতিগোষ্ঠির লোক রয়েছে সাড়ে চার লাখ।
ধর্ম পালনের দিক থেকে সাইবেরিয়ার অধিবাসীদের মাঝে বেশির ভাগই অর্থডক্স খ্রিস্টান। এছাড়া আড়াই লাখ মুসলিম ও ৭০ হাজার ইহুদি। আছে কিছু বৌদ্ধ।
সাইবেরিয়া দেশ কেমন
শীত মোকাবেলা করে বেচে থাকার ক্ষেত্রে সাইবেরিয়ার বাসিন্দারা বিশ্বের যে কোন অঞ্চলের চেয়ে এগিয়ে। এখানাকার কিছু এলাকা সারা বছরই প্রায় বরফে ঢাকা থাকে। এছাড়া চলে তুষার ঝড়, পাহাড়ি এলাকাগুলোতে তুষার ধসও নিয়মিত ঘটনা। এসব এলাকার বাসিন্দারা বিশেষ উপায়ে তৈরি বাড়িতে বাস করে। পড়তে হয় ভারী পোষাক।

এত শীত সত্ত্বেও বিশে^র সবচেয়ে বড় মিষ্টি পানির জলাধারটি সাইবেরিয়াতেই অবস্থিত। দক্ষিণ সাইবেরিয়ার বৈকাল হ্রদ, ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন বছর আগে বিশাল এই লেকটির উৎপত্তি বলে গবেষকদের ধারণা। ৩১ হাজার ৭২২ বর্গকিলোমিটারের লেকটিতে আছে ৬৫ প্রজাতির মাছ।
আছে আরো অনেক জলজ প্রাণী। এছাড়া এর আশপাশের বনাঞ্চলে রয়েছে ২৩৬ প্রকারের পাখি। শীতের সময়টায় বৈকালের সারফেসের পানি জমে বরফ হয়ে যায়। গ্রীষ্মের নীল পানির লেক শীতে হয়ে যায় বরফের সমুদ্র। দর্শনার্থীরা তখন হেটে বেড়ায় বরফের ওপর।
রাশিয়ার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রয়েছে সাইবেরিয়ার। অশেষ খনিজ সম্পদের ভা-ার এই বরফে ঢাকা অঞ্চলটি। নিকেল, সোনা, রুপা, হিরা, সীসা, কয়লা, দস্তার মতো প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব নেই সাইবেরিয়ার ভূগর্ভে। এছাড়া আছে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের অনেক মজুদ।
রাশিয়ার তেল সম্পদেও ৭০ শতাংশই আসে পশ্চিম সাইবেরিয়ার খানতি-মানসিস্ক অঞ্চল থেকে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় নিকেলের মজুদ এখানে। খনিজ শিল্পে কাজ করে সাইবেরিয়ার জনসংখ্যার একটি বড় অংশ। এই শিল্পে কাজের সুবাদেই রাশিয়ার অন্যান্য অঞ্চল থেকেও প্রচুর মানুষ সাইবেরিয়াতে স্থায়ী হয়েছে।
সাইবেরিয়ায় কৃষির উপযোগী মৌসুম খুবই ছোট। দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জমি তুলনামূলক উর্ভর। এখানে গম, বার্লি, আলু উৎপাদিত হয়। ভেড়াসহ অন্যান্য গবাদি পশু পালন করে এখানকার কৃষকরা।
সাইবেরিয়ার কাঠ রাশিয়ার অর্থনীতির আরেক গুরুত্বপূর্ণ উপদান। এখানে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বনাঞ্চল। যদিও পূর্বাঞ্চলের বেশিরভাগ বনভুমি সারা বছর এতটাই বরফের নিচে ঢাকা থাকে যে, সেখান থেকে কাঠ সংগ্রহ করা কঠিন। ওখোটস্ক সাগরের মাছও বিশ্ব বিখ্যাত।
সাইবেরিয়া বিশ্বের মৎস সম্পদের ১০ শতাংশের যোগান দেয়। সাগর ছাড়া বৈকাল হ্রদ এবং আরো অনেক জলাভুমিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। টপিক : সাইবেরিয়া কোন মহাদেশে
সাইবেরিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা
বরফে ঢাকা জনপদ হওয়ার কারণে অঞ্চলটির যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো নয়। উত্তর সাইবেরিয়ার অনেক শহরে সড়ক পথে যাওয়া যায় না। তবে ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলওয়ে অঞ্চলটিসহ পুরো বিশ্ব যোগাযোগ ব্যবস্থারই এক মাইলফলক। ১৯১৬ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়া রেলপথটি মস্কো থেকে ভ্লাদিভোস্তক পর্যন্ত বিস্তৃত।
৯ হাজার ২৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ চলে গেছে সাইবেরিয়ার বুক চিড়ে।
যার ফলে ইউরোপ থেকে বহু দূরের এই জনপথটি আর বিচ্ছিন্ন থাকেনি আধুনিক বিশ্ব থেকে।
০২-০৬-২০২১
লেখকের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন : আহমেদ


