সবচেয়ে বড় স্থলচর প্রাণী হাতি। বিশালদেহী এই প্রাণীটির সৌন্দর্যের দুটি উপদান শুঁড় ও দাত। শুঁড়ের দুই পাশ দিয়ে বেড় হয়ে আসে বিশাল দুটি বাঁকানো দাঁত; কিন্তু সৌন্দর্যের উপাদান এই দাঁতই হাতির প্রাণনাশের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী রয়েছে হাতির দাঁতের বিশাল অবৈধ বাজার। এই দাঁত সংগ্রহের জন্য প্রতি বছর হত্যা করা হয় অসংখ্য হাতি। হাতির দাঁতের দাম কত , কী কাজে ব্যবহৃত হয় এগুলো, কিভাবে হত্যা করা হয় হাতিকে- সেসব নিয়ে আলোচনা করবো এই লেখায়
হাতির দাঁত কয়টি
হাতির যে দুটি দাঁত আমরা দেখতে পাই সেগুলো মূলত শোভা বর্ধনকারী। খাবার গ্রহণের কাজে এ দুটি দাঁত ব্যবহৃত হয় না। এছাড়া মুখের ভেতরে আরো ২৬টি দাঁত থাকে প্রতিটি হাতির। প্রধান দুটি দাঁত ছাড়াও অন্য দাঁতগুলো দিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন শিল্পকর্ম তৈরির প্রচলন রয়েছে প্রাচীনকাল থেকেই। আর এই হস্তশিল্পটিই কাল হয়ে দাড়িয়েছে হাতির জীবনের জন্য।
চোরা শিকারিরা প্রথমে গুলি করে হাতিকে ধরাশায়ী করে। বিশাল শরীরের কারণে কালশনিকভ রাইফেলের গুলিতেও হাতির মৃত্যু হয় না, কিন্তু লুটিয়ে পড়ার পর তারা হাতির পেশীগুলো কেটে দেয়। রক্ত বের হয়ে গেলে হাতি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এরপর মাথা কেটে বের করে নেয়া হয় দাঁত। সেগুলো বিভিন্ন হাত হয়ে চলে যায় কারখানায়।
এই কারণে দ্রুত কমছে হাতির সংখ্যা। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেও যেখানে বিশ্বে হাতির সংখ্যা ছিলো কয়েক মিলিয়ন, সেখানে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বে হাতির সংখ্যা ৪ লাখে নেমে এসেছে বলে জানা গেছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৪০ সাল নাগাদ হাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
হাতির দাঁতের দাম কত
এই প্রাণীর দাঁত দিয়ে গলার মালা, লকেট, আংটি, চুরি, চিরুনি, দাবার গুটি, চামচসহ আরো অনেক কিছু তৈরি করা হয়। বিভিন্ন ধরণের শোপিস, মূর্তি, মুকুট, তলোয়ার বা চাকুর খাপ তৈরি ও আসবাবপত্রের নকশা করা হয় হাতির দাঁত দিয়ে। হাতির দাঁত সহজলভ্য না হওয়ায় এসব সামগ্রীর দাম অনেক বেশি হয়। যে কারণে শৌখিন ধনীরা সাধারণত এসব পণ্য ব্যবহার করেন।
হাতির দাঁতের দাম কত এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেয়া সম্ভব নয়। তবে একটি হাতির দাঁত থেকে যে পরিমাণ পণ্য তৈরি হয়, তার দাম কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। হাতি শিকার নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে এর দাম ক্রমশ আরো বাড়ছে।
হাতি সাধারণত ৬০ বছরের বেশি বাঁচে। আর প্রাপ্ত বয়স্ক একটি হাতির দাঁত ১০ ফুটেরও বেশি লম্বা হতে পারে। সাধারণত এশিয়ান হাতির তুলনায় আফ্রিকান হাতির দাঁত আকারে বড় হয়। যে কারণে আফ্রিকান হাতি হত্যার হারও বেশি।
হাতির দাঁতের চিরুনি
হাতির দাতের শিল্প কর্মের বিশাল বাজার রয়েছে চীনে। দেশটিতে কয়েক বছর আগেও বিলাসবহুল সব শপিং মলের দোকানগুলোতে লাখ লাখ ডলারের হাতির দাঁতের শিল্পকর্ম বিক্রি হতো। এসব বিক্রেতারা সরকারের অনুমোদন নিয়েই এগুলো বিক্রি করতেন। যে কারণে ১৯৯০ এর দশকে হাতি শিকার নিষিদ্ধ হলেও তা বন্ধ হয়নি। অল্প সংখ্যক অনুমোদিত দোকান ও কারখানার আড়ালে চলতে থাকে বিশাল অবৈধ বাজার।
চিরুনি থেকে চাবির রিং, গহনা থেকে ব্রেসলেট সবই তৈরি হয় হাতির দাঁত থেকে। কয়েকশো বছর ধরেই হাতির দাঁতের শিল্পকর্ম বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। খুব বেশি শক্ত না হওয়ার কারণে এতে নকশা করা কিংবা পছন্দ মতো আকৃতি দেয়া সহজ। যে কারণে হস্তশিল্পীরাও এই বস্তু দিয়ে বিভিন্ন শিল্পকর্ম তৈরিতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। আবার দেখতেও আকর্ষণীয় এগুলো। যে কারণে বহু বছর ধরেই এই বাণিজ্য চলে আসছে। আর এর পরিণতিতে প্রাণ দিতে হচ্ছে নিরীহ হাতিগুলোকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পাচার হওয়া হাতির দাঁতের ৭০ শতাংশই যায় চীনে। যেখানে নতুন মধ্যবিত্ত হয়ে ওঠা একটি শ্রেণি এই পণ্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। যে কারণে বিলাসী পণ্য হিসেবে এর চাহিদা ক্রমেই বেড়ে চলছে। আর এতে হাতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। যে কারনে বাধ্য হয়ে ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে চীনে সব ধরণের হাতির পণ্যের বাজার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ওই বছর চীন সরকার ৩৫টির মতো হাতির দাঁতের পণ্য তৈরির কারখানা ও কয়েকশো দোকান বন্ধ করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রেও কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এই বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবুও এই বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং নিষিদ্ধ হওয়ায় পণ্যের দাম আরো বেড়েছে। চীনের সায়ত্বশায়িত অঞ্চল হংকংয়েও হাতির পণ্যের বাঁজার এখনো চালু রয়েছে। এছাড়া ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, লাওস প্রভৃতি দেশে রয়েছে হাতির দাঁতের বাজার। এসব দেশে প্রকাশ্যেই চলছে বেচাকেনা।
হাতির দাঁতের গহনা
রোমান সম্রাজ্যের যুগ থেকে হাতির দাঁতের শিল্পকর্মের ব্যবহার শুরু হয়। তখন যুদ্ধ, পণ্য পরিবহন ও কলোসিয়ামের ফাইটের জন্যও সম্রাটরা উত্তর আফ্রিকা থেকে হাতি সংগ্রহ করতো। শুরুতে মৃত হাতির দাঁত সংগ্রহ করে এসব করা হলেও বিষয়টিতে অর্থপ্রাপ্তির লোভে শুরু হয় হাতি হত্যা।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে এসে চোরাকারবারীরা আরো সংঘবদ্ধ হয়। তারা ট্রান্স সাহারান বাণিজ্য রুটে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে হাতির দাঁত ইউরোপে নিতে শুরু করে। উত্তর ও পূর্ব আফ্রিকা উপকূল জুড়ে রীতিমতো বাজার বসতে শুরু করে। এখান থেকে ইউরোপ ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়ায় যেতে শুরু করে হাতির দাঁত।
পর্তুগিজ বনিকরা আফ্রিকায় যাওয়ার পর এই লাভজনক ব্যবসাটির সন্ধান পায়। তারা ব্যাপক হারে কিনতে শুরু করে হাঁতির দাঁত। নতুন ক্রেতার সন্ধান পেয়ে হাতি শিকারিরাও বিপুল উৎসাহে শুরু করে দাত সংগ্রহ। ক্রমশ এই ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়ে অনেক আফ্রিকান পরিবার।
ঔপনিবেশিক যুগে এসে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় আরো সহজ হয়ে যায় এই অবৈধ বাণিজ্য। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে এসব পণ্যের বাজার। ১৯৬০ এর দশকে এসে আফ্রিকান দেশগুলো স্বাধীনতা পেতে শুরু করলে অনেক শাসক হাতি সংরক্ষণের চিন্তা শুরু করেন। কিছু জায়গায় শিকার বন্ধে আইন পাস হয়। তবে সেসব আইনের প্রোয়োগ খুব জোড়ালো ছিলো না, যে কারণে- হাতি শিকার বন্ধ হয়নি। বরং বেড়েই চলেছে।
হাতির দাঁত কি কাজে লাগে
হাতির দাঁতের চোরাকারবার নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত ব্যাটেল ফর দ্যা এলিফেন্ট-এ দেখানো হয়েছে কিভাবে দ্রুত আফ্রিকার জঙ্গল থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে হাতি। আর এর প্রধান কারণ হাতির দাঁতের অবৈধ কারবার। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে এসব দাঁত চলে যায় চীনে।
বিপন্ন প্রজাতির বাণিজ্য নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে আফ্রিকায় পাচারকারীদের হাতে নিহত হয়েছে ২৫ হাজার হাতি। যদিও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। শুধুমাত্র তানজানিয়ায় গড়ে প্রতিদিন ৩০টি হাতি নিহত হয় পাচারকারীদের হাতে।
আফ্রিকা মহাদেশ হাতি পাচারের কেন্দ্র হয়ে ওঠার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে যেমন, পর্যাপ্ত সংখ্যক নিরাপত্তা কর্মীর অভাব, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া, সশস্ত্র চোরকারবারীদের হাতে হতাহত হওয়ার ভয় এবং অত্যন্ত সুসংগঠিত অপরাধী নেটওয়ার্ক। এছাড়া অঞ্চলটির দরিদ্র জনগোষ্ঠির একটি অংশ অবৈধ এই আয়ের সাথে জড়িয়ে পড়ছে।
বিভিন্ন সময় নিরপত্তা বাহিনীর কাছে কিছু ধরা পড়লেও পরিমাণে খুবই সামান্য। উদাহরণস্বরূপ হংকং বন্দরে প্রতিদিন যে পরিমাণ শিপিং কন্টেইনার আসে তার মাত্র ১ শতাংশ কন্টেইনারে চোরাই পথে আসা হাতির দাঁতের সন্ধানে তল্লাশি চালানো হয়। এসব তল্লাশিতে চোরাকারবারের সাথে জড়িত যারা ধরা পড়ে তাদেরও খুব একটা কঠিন শাস্তি হয় না। বরং অপরাধীদের বাণিজ্য নেটওয়ার্ক আরো জোরদার ও নিরাপত্তা বাহিনী সে তুলনায় আধুনিক না হওয়ার কারণে আফ্রিকার হাতি ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে।
হাতির দাঁত : আরো কিছু কথা
১৯৯০ এর দশকে বণ্যপ্রাণী সংরক্ষণে একটি কনভেনশন গৃহীত হয়। কনভেনশনে স্বাক্ষর করা দেশগুলো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বন্যপ্রাণী শিকার নিষিদ্ধ করে। তবে বতসোয়ানা, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়া এতে স্বাক্ষর করেনি তখন। এর ফলে ওই দেশগুলোতে দেদারসে হাতি শিকার চলতে থাকে। আর কনভেনশনে স্বাক্ষর করা দেশগুলোতেও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় শিকার বন্ধ হয়নি।
এর কারণ চীনসহ অনেক দেশে হাতির দাঁতের তৈরি পণ্যসামগ্রী বেচাকেনা চলতে থাকে বৈধভাবে। বৈধ বাজার সীমিত আকারে থাকলেও এর আড়ালে চলে প্রচুর অবৈধ কেনাবেচা। কোন ক্রেতা এ জাতীয় পণ্য কেনার পর আর সেটি বোঝার উপায় নেই যে, বৈধ না নাকি অবৈধভাবে উৎপাদিত। তাই স্বল্প পরিসরে বৈধ বাজারের সুযোগ নিয়ে চোরকারবারীরা প্রচুর সংখ্যক পণ্য বেচাকেনা করতে থাকে গোপনে। আর এই দাঁতের যোগান দিতে মরতে হয় হাতিগুলোকে।
ব্যাটেল ফর এলিফেন্ট সিনেমার ডিরেক্টর জন হেমিংওয়ের মতে, আফ্রিকার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবাদীরা তাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন; তবুও তারা এ লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছেন। কারণ বন্য প্রাণীর দাঁতের অবৈধ বাজার খুবই লাভজনক এবং আমাদের গবেষণা বলছে, চীনে এসব পণ্যের বাজার ক্রমশই বাড়ছে।
এমনও তথ্য আছে যে, বিভিন্ন দেশ হাতি শিকারিদের ওপর ধরপাকড় চালিয়ে যে দাঁত জব্দ করে সেগুলোর একটি অংশ সরকারের গুদাম থেকে আবার কালোবাজারে বিক্রি হয়। যে কারণে বিভিন্ন দেশ তাদের জব্দ করা হাতির দাঁত পুড়িয়ে দিয়েছে বিভিন্ন সময়। তবে এত কিছুর পরেও হাতি শিকার বন্ধ হচ্ছে না।
কারণ হিসেবে বলা হয়, এই অপরাধের সাথে জড়িয়ে আছে অত্যন্ত সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক। যারা প্রভাব কিংবা অর্থের বিনিময়ে বনরক্ষী, কাস্টমস, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ম্যানেজ করে চালিয়ে যাচ্ছে অপরাধ। যে কারণে বিলুপ্ত হতে চলেছে হাতি। টপিক : হাতির দাঁতের দাম কত
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন : আহমেদ স্টোর
০৬-০৪-২০২১


