মাঠে তিনি সেরাদের একজন। চ্যাম্পিয়ন ফুটবলার; কিন্তু মাঠের বাইরেও তিনি অনন্য এক মানুষ। যার মহান হৃদয়ের খবর অনেক বারই পেয়েছে বিশ্ব। মাঠে যেমন গতিময় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো সবাইকে টেক্কা দিয়ে বল নিয়ে ছুটে যান গোল পোস্টের দিকে, মাঠের বাইরে অসহায় মানুষের পাশে দাড়াতে, তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেও রোনালদো ছুটে যান সবার আগে।
জানাবো পর্তুগিজ সুপারস্টার রোনালদোর বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজের খবর। যা পরিচয় করিয়ে দেয় মাঠের বাইরের ভিন্ন এক তারকাকে।
বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে জিতেছেন অনেক কিছু। নিজ দেশ পর্তুগালের সীমা ছাড়িয়ে ইংল্যান্ড, স্পেন ও ইতালিতে গিয়ে লিগ জিতেছেন। জিতেছেন ৫টি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ও ৫টি ফিফা ব্যালন ডি’অর। দেশের হয়ে জিতেছেন ইউরো ও উয়েফা নেশন্স লিগের শিরোপা; কিন্তু এসবের পাশাপাশি মানুষের হৃদয়টাও জয় করে নিয়েছেন এই উইঙ্গার। ‘যত বড় খেলোয়াড়, তত বড় হৃদয়’ রোনালদোর বিষয়ে একটা কথা অনেকেই বলে থাকেন। বিভিন্ন সময় মানুষের কল্যাণে তার অনুদানের কথা মিডিয়ায় এসেছে।
মানবিক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে ২০২০ সালের শুরুর দিকে থমকে গিয়েছিলো বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন। খেলা বন্ধ থাকায় খেলোয়াড়ারাও অনেক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তবু সে সময় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো জুভেন্টাসে তার সতীর্থদের উৎসাহ দিয়েছেন ক্লাবের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বেতনে ছাড় দিতে। মার্চ থেকে জুন এই চার মাসে শুধু রোনালদো একাই বেতনে ছাড় দিয়েছেন ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি।

এছাড়া এই মহামারীর সময়ে তিনি ও তার এজেন্ট জর্জ মেন্ডেস মিলে একটি হাসপাতালে দান করেছেন ১ মিলিয়ন পাউন্ড। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের শান্তা মারিয়া হাসপাতালের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ফেরো বলেছেন, রোনালদোর এজেন্ট জর্জ মেন্ডেস আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছেন, তারা স্বেচ্ছায় কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় দুটি আইসিইউ ইউনিটের জন্য অর্থ সহায়তা দিয়েছেন। তিনি জানান, এই অর্থে ইউনিটের জন্য ফ্যান, মনিটর, ইনফিউশন পাম্প ইত্যাদি কেনা হয়েছে।
আরো পড়ুন :
সাদিও মানে ও তার ভাঙা আইফোনের গল্প
এখানেই শেষ নয়, ইউরো চ্যাম্পিয়নশীপের বাছাই পর্ব উৎরে যাওয়ার পর পর্তুগাল দলকে দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে যে বোনাস দেয়া হয়েছে, সিআর সেভেনের উদ্যোগে সেখান থেকেও ৫০ শতাংশ দান করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। পর্তুগিজ মিডফিল্ডার বার্নাডো সিলভা ওই সময় সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, যখন আমরা ২০২০ ইউরোতে সুযোগ পেলাম, সে আমাদের কাছে প্রস্তাব দিলো বোনাসের একটি করোনা মোকাবেলায় দান করতে। আমাদের জাতীয় দলের সব ফুটবলার তার বোনাসের পঞ্চাশ শতাংশ এই তহবিলে দান করতে রাজি হয়।
ফিলিস্তিনিদের পাশে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
২০১১ সালে ইউরোপীয়ান গোল্ডেন বুট জেতেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ৪০ গোল করে ইউরোপের মধ্যে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার হিসেবে পাওয়া গোল্ডেন বুটটি নিলামে তোলেন এই মহান হৃদয় ফুটবলার। নিলামে সেটি বিক্রি হয়েছিল ১২ লাখ ব্রিটিশ পাউন্ডে। এই অর্থ পুরোটাই রোনালদো দান করেছিলেন ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার মানুষের জন্য।

এই অর্থ দিয়ে যুদ্ধ বিধ্বস্ত উপত্যকাটির শিশুদের জন্য নির্মাণ করা হয় কয়েকটি স্কুল। ২০১৩ আবারো মহৎ উদ্দেশ্যে সিআরসেভেন তার ব্যালন ডি’অর ট্রফিটি নিলামে তোলেন। এবার নিলাম থেকে আসে ৫ লাখ ৩০ হাজার ইউরো, যা দান করা হয় মেইক-এ উইশ ফাউন্ডেশন নামের একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে।
বেশ কয়েক বছর ধরে শিশুদের জন্য কাজ করা তিনটি শীর্ষস্থানীয় দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সাথে আছেন এই জুভেন্টাস ফরোয়ার্ড। সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউনিসেফ ও ওয়ার্ল্ড ভিশনের শুভেচ্ছা দূত তিনি। ২০১৪ সালের ব্যালন ডি অর’ জিতে রোনালদো লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের কথা তুলে ধরেছিলেন তার বক্তৃতায়। নিজেও এই শিশুদের জন্য কাজ করছেন জানিয়ে, বিশ্ববাসীকে আহ্বান জানান এসব শিশুদের পাশে দাড়াতে।
এছাড়া ২০১৬ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ শিশুদের উদ্দেশ্যে একটি ভিডিও বার্তা পাঠান রোনালদো। যেখানে তিনি এসব শিশুদের প্রকৃত বীর হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, আমি তোমাদের পাশে আছি। এছাড়া সেভ দ্যা চিলড্রেনে একটি বড় অংকের অনুদান দিয়েছেন এবং সংস্থাটিকে অনুরোধ করেছেন এই দানের পরিমান কখনোই প্রকাশ না করতে।
এসবের বাইরে কতবার যে নিজের বোনাসের অর্থ দান করেছেন তার ঠিক নেই। ২০১৩ সালে উয়েফার বর্ষসেরা একাদশের ফুটবলার নির্বাচিত হওয়ার পর পাওয়া ৮৯ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড দান করেন আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা রেড ক্রসে। ২০১৩-১৪ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের লা ডেসিমা অর্থাৎ দশম ইউরোপীয়ান কাপ জয়ের উৎসবে ক্লাব থেকে পান সাড়ে ৪ লাখ পাউন্ড বোনাস। এই বোনাসের পুরো অর্থ দান করে দেন সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউনিসেফ ও ওয়ার্ল্ড ভিশনকে।
নিয়মিত রক্ত দান করেন
মাঝে মধ্যেই রক্ত দান করেন এই পর্তুগিজ উইঙ্গার। যে কারণে তিনি শরীরে ট্যাটু আকেঁন না। ট্যাটু আকাঁর কয়েক দিনের মধ্যে রক্ত দান করলে ইনফেকশনের শঙ্কা থাকে, যে কারণে নিজের পছন্দের এই শিল্পকর্মটি থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন তিনি। ২০১৫ সালে এক সাক্ষাৎকারে সিআরসেভেন বলেছিলেন, আমরা রক্ত দান করার মাধ্যমেও বড় কিছুতে অবদান রাখতে পারি। প্রতি ব্যাগ রক্ত কখনো কখনো তিনজন পর্যন্ত মানুষের উপকারে লাগতে পারে। রক্ষা পেতে পারে মানুষের জীবন। যে কারণে আমি উদ্যোগী হয়েছি বিশ্বব্যাপী সবাইকে রক্তদানে উৎসাহী করতে। সাবেক টিমমেট কার্লোস মার্টিনেসের ছেলের চিকিৎসার জন্য একবার বোন ম্যারো দান করেছিলেন তিনি।
আরো পড়ুন:
ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোন দেশ নয়, তাহলে কী
এবি ডি ভিলিয়ার্স, মিস্টার ৩৬০ ডিগ্রি
খাবিব নুরমাগোমেদভ : মার্শাল আর্ট কিংবদন্তী
বিশ্বের সব প্রান্তের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্যই মন কাঁদে তার। ২০১৫ সালে নেপালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর সেখানকার মানুষের পাশে দাড়াতে এগিয়ে আসেন। ওই ভূমিকম্পে ৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় হিমালয় অধ্যুষিত ছোট্ট দেশটিতে, আহত হয় ২২ হাজারের বেশি মানুষ। শোনা যায়, সে সময় সেভ দ্যা চিলড্রেনের দুর্যোগকালীন ত্রাণ তহবিলে নেপালের শিশুদের জন্য ৫০ লাখ পাউন্ড অনুদান দেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো । তবে এ বিষয়টি কখনোই প্রকাশ্যে ঘোষণা দেননি এই তারকা।
২০০৭ সালে ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মা ডোলোরেস আভেইরো। পর্তুগালের যে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তিনি সুস্থ্য হয়ে ওঠেন, সেখানে পরবর্তীতে ১ লাখ ২০ হাজার পাউন্ড দান করেন রোনালদো। যে অর্থ ব্যয় করা হয় হাসপাতালটির ক্যান্সার চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার কাজে।
শিশু হায়দারের জন্য রোনালদোর ভালোবাসা
লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ২০১৫ সালের নভেম্বরে আত্মঘাতি বোমা হামলায় বাবা-মা উভয়কে হারায় হায়দার নামের এক রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থক শিশু। অনলাইনে রিয়াল সমর্থকদের প্রচারণার কারণে বিষয়টি নজরে আসে রোনালদোসহ রিয়াল মাদ্রিদ ক্লাব কর্তৃপক্ষের। তারা হায়দারকে মাদ্রিদে আমন্ত্রণ জানান।
সেখানে হায়দারকে স্বাগত জানান ক্লাবটির প্রেসিডেন্ট স্বয়ং। রোনালদোসহ রিয়ালের মূল দলের সবার সাথে সাক্ষাৎ হয় হায়দারের। পিতা-মাতা হারানো শিশু ভক্তের সাথে রোনালদোর আলিঙ্গনের সেই দৃশ্য চোখে পানি এনে দিয়েছে সারা বিশ্বের কোটি ফুটবল প্রেমীর।
ভক্তদের প্রতি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এমন ভালোবাসার নজির আরো আছে। ২০০৯ সালে টার্মিনাল ক্যান্সারে আক্রান্ত এক ভক্তের খবর পৌছে যায় এই পর্তুগিজ সুপারস্টারের কাছে। নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি পাঠিয়ে নুহুজেত গুলিয়েন নামের ওই ভক্তকে রিয়াল মাদ্রিদের টিম হোটেলে ডেকে আনান তিনি। নিজের উদ্যোগে তাকে প্রাইভেট বক্সে বসিয়ে রিয়ালের ম্যাচ দেখার ব্যবস্থা করে দেন। ওই ম্যাচে রোনালদো তার একটি গোল উৎসর্গ করেন গুলিয়েনকে, ম্যাচ শেষে জার্সিটিও উপহার দেন তাকে।

এখানেই শেষ করেননি দায়িত্ব। যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার যাবতীয় চিকিৎসারও দায়িত্ব নেন। কিন্তু এতকিছু করেও প্রিয় ভক্ততে বাঁচাতে পারেননি রোনালদো। ২০১৩ সালের মার্চে তার মৃত্যু হয়।
শিশুদের পাশে রোনালদো
২০১৪ সালে অপরিণত কোষ নিয়ে জন্ম নেয়া ১০ মাস বয়সী একটি শিশুর মা রোনালদোর প্রতি আহ্বান জানান শিশুটির জন্য একটি জার্সি উপহার দিতে। ইচ্ছে ছিলো সেটি নিলামে তুলে চিকিৎসার টাকা জোগাড় করা; কিন্তু রোনালদো চেয়েছিলেন নিষ্পাপ শিশুটির জন্য আরো কিছু করতে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো শিশুটির ব্রেইন সার্জারির জন্য ৫৫ হাজার পাউন্ড সহায়তা পাঠান এবং পরবর্তী চিকিৎসার জন্যও খরচ দেয়ার অঙ্গীকার করেন। এছাড়া নিজের অটোগ্রাফ যুক্ত একটি ক্রীড়া সামগ্রী নিলামে তোলেন শিশুটির সহায়তার জন্য।
এসব তো দান অনুদানের খবর। ভক্ত কিংবা বন্ধু-সতীর্থদের সাথে রোনালদোর সম্পর্ক কতটা আন্তরিক তার প্রমাণ পাওয়া গেছে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঘটনায়। ২০১৪ সালের জুলাইয়ে এফসি বার্নমাউথের সাথে রিয়াল মাদ্রিদের একটি প্রীতি ম্যাচে রোনালদোর করা ফ্রি-কিক গিয়ে লাগে গ্যালারিতে বসা এক বালকের হাতে। জোরালো শটে তার কবজি ভেঙে যায়। এ ঘটনায় ছেলেটির জন্য দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়াও তার জন্য একটি জার্সি উপহার পাঠান রোনালদো।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো : আরো কিছু গল্প
আরেকবার প্রাকটিসের সময় তার একটি শট গিয়ে লাগে আরেক ক্ষুদে দর্শকের গায়ে। শিশুটির কান্না থামাতে রোনালদো বেড়া টপকে চলে যান তার কাছে। নিজের গা থেকে প্রাকটিসের জার্সিটি খুলে উপহার দেন শিশুটিকে। ভক্তরা অনেকবারই ম্যাচ চলাকালীন মাঠে ঢুকে তাকে একটি বার ছুয়ে দেখতে কিংবা সেলফি তুলতে চেয়েছে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো প্রতিবারই নিরাপত্তা কর্মীদের হাত থেকে ওই সব ভক্তদের বাঁিচয়েছেন।
২০১৬ সালে স্কটিশ ক্লাব রেঞ্জার্সের সাবেক ফুটবলার ফার্নান্ডো রিকসেনের অসুস্থতার খবর পেয়ে তাকে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে খেলা দেখার আমন্ত্রণ জানান রোনালদো। ম্যাচ শেষে উপহার দেন নিজের জার্সিটি। রিয়াল মাদ্রিদের দশম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জেতার পর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো তার টিমমেটদের প্রত্যেককে বিশেষভাবে তৈরি হাতঘড়ি উপহার দিয়েছেন, যার প্রত্যেকটির দাম ৫ হাজার পাউন্ড।
বন্ধু ও এজেন্ট মেনডেসের বিয়ের সময় তাকে উপহার দিয়েছেন ৪০ মিলিয়ন পাউন্ডে কেনা গ্রিসের একটি দ্বীপ।
এসব কিছুই এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি। যিনি মাঠের খেলা আর মাঠের বাইরের মানবিকা- দুজায়গাতেই নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।
আমাদের ফেসবুক পেজটিতে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন : আহমেদ স্টোর


