ইউক্রেন Ukraine যুদ্ধের শুরু থেকেই সবচেয়ে আলোচিত চরিত্রগুলোর একটি হয়ে উঠেছেন রমজান কাদিরভ Ramzan Kadyrov । রাশিয়ার এই আঞ্চলিক নেতা একের পর এক আগ্রাসী বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় থাকছেন নিয়মিত। কাদিরভ রাশিয়ার স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল চেচনিয়া রিপাবলিকের শাসক।
মুসলিম অধ্যুষতি চেচনিয়া অঞ্চলটির ওপর মস্কোর শাসকদের গণহত্যা ও নৃশংসতার ইতিহাস পায়ে দলে কাদিরভ এখন ভ্লদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একজন। অনেক ক্ষেত্রে পুতিন কিংবা তার সেনা কমান্ডারদের চেয়েও আগ্রাসী আচরণ করছেন তিনি।
পুতিনের মিত্র কাদিরভ
ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই চেচনিয়ার আঞ্চলিক সরকারের বাহিনী এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। কাদিরভ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসী বক্তব্য দিয়ে এই সৈন্যদের পাঠিয়েছেন ইউক্রেনে। মারিওপোল ও রাজধানী কিয়েভ অঞ্চলে লড়াই করেছে এই বাহিনী। পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমগুলোর মতে, ইউক্রেনে অনেক নৃশংসতা চালিয়েছ কাদিরভের সেনারা। এমনকি তারা তিন দফায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে হত্যার চেষ্টা করেছে বলেও অভিযোগ আছে।

এই যুদ্ধের শুরু থেকে কাদিরভকে রাশিয়ার শীর্ষ রাজনীতিক কিংবা সেনা কমান্ডারদের চেয়েও বেশি উৎসাহী হতে দেখা গেছে। রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভ্লদিমির পুতিন একটি করে ব্যাটালিয়ন পাঠানোর নির্দেশ দিলেও চেচনিয়া থেকে ইউক্রেন যুদ্ধে যোগ দিয়েছে তিন ব্যাটালিয়ন সেনা।
অক্টোবরের শুরুতে কাদিরভ ইউক্রেনে স্বল্প মাত্রার পারমাণবিক হামলা করতে পরামর্শ দিয়েছেন রুশ সেনাবাহিনীকে। সারা বিশ্ব যখন রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন নিয়ে শঙ্কিত, তখন এমন একজন নেতার কাছ থেকে এই বক্তব্যকে উস্কানি হিসেবেই সাব্যস্ত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর দুদিন পরই কাদিরভ জানিয়েছেন, তার তিন কিশোর ছেলেকেও ইউক্রেনে যুদ্ধ করতে পাঠাবেন। যাদের বয়স ১৫ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। ছেলেদের যুদ্ধ মহড়ার ভিডিও তিনি প্রকাশ করেছেন। এসবই শেষ নয়, কাদিরভ স্বশরীরে তার বাহিনীর কর্মকাণ্ড দেখতে এই যুদ্ধের মধ্যে ইউক্রেনেও গিয়েছিলেন।
পাশাপাশি সম্মুখযুদ্ধে রাশিয়ার বাহিনীর পিছু হটার ঘটনায় সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করতে দেখা গেছে কাদিরভকে। লিম্যান শহর থেকে রুশ সেনারা সরে আসার পর কাদিরভ বলেছেন, ‘আমি সেনাপ্রধান হলে কমান্ডার লাপিনের ব্যাজ কেড়ে নিতাম। একটি রাইফেল হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে সামনের সাড়িতে পাঠাতাম। যাতে করে তিনি রক্ত দিয়ে লজ্জা ঢাকতে পারেন।’
চেচেন মুসলিমদের লড়াকু ও যোদ্ধা জাতি হিসেবে পরিচিতি আছে; কিন্তু কাদিরভের কারণে তারা এখন ব্যবহৃত হচ্ছে ইউক্রেনের ভূখ- দখলের কাজে।
কে এই রমজান কাদিরভ Ramzan Kadyrov
রমজান কাদিরভকে চিনতে হলে ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখতে হবে। সময়টা ১৯৯১ সাল। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর দীর্ঘকালের রুশ দুঃশাসনের কবল থেকে পরিত্রাণ লাভের আশায় চেচেন জাতির লোকেরা স্বাধীনতার ডাক দেয়। চেচেন রিপাবলিক অব ইচকেরিয়া নামের স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়।
পূর্ব ইউরোপের উত্তর ককেশাস পার্বত্য অঞ্চলের জর্জিয়ার সীমান্তের কাছে এই ভূখ-টি। চেচনিয়ার আয়তন ১৭ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার। আর এর বর্তমান জনসংখ্যা ১৪ লাখের আশপাশে। বাসিন্দারা প্রধানত জাতিগত চেচেন। আর চেচেনদের ৯৫ শতাংশ মুসলিম।
তৎকালীন রুশ প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলেৎসিন চেচনিয়ার স্বাধীনতা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং ১৯৯৪ সালে চেচনিয়া আক্রমনে সেনাবাহিনী পাঠান। শুরু হয় যুদ্ধ, যা ইতিহাসে প্রথম চেচেন যুদ্ধ নামে পরিচিত। চেচেন স্বাধীনতাকামীদের প্রতিরোধের মুখে রুশ বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে চলতে শুরু করে চেচনিয়া। তবে মস্কোর সরকারের সাথে তাদের বিরোধ লেগেই ছিলো।

১৯৯৯ সালে ভ্লাদিমি পুতিন রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর আবার চেচনিয়ায় সামরিক অভিযান শুরু করেন। এবার বিমান হামলায় পুরো অঞ্চলটিকে বিধ্বস্ত করে দেয় রুশ বাহিনী। নিহত হয় অসংখ্য বেসামরিক চেচেন। হামলার পাশাপাশি পুতিন একটি কৌশল গ্রহণ করেন। তিনি স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের কমান্ডার আখমদ কাদিরভকে লোভ দেখিয়ে দলে ভেড়ান।
কাদিরভ পরিবারের বিশ্বাসঘাতকতা
২০০০ সালে আখমদ কাদিরভ তার দলবল নিয়ে মস্কোর পক্ষে যোগ দেয়ায় বিদ্রোহীরা বিভক্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে দ্রুত সফলতা পেতে শুরু করে রুশ বাহিনী। এক পর্যায়ে রাজধানী গ্রোজনি দখলে নেয় পুতিনের সেনারা। স্বাধীনতাকামী মুসলিমদের ওপর চলে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ আর দমন পীড়ন। মৃত্যু হয় স্বাধীন চেচনিয়ার।
আখমদ কাদিরভকে চেচনিয়ার আঞ্চলিক সরকারের প্রধান করেন পুতিন। তবে শর্ত ছিলো একটাই- মস্কোর আনুগত থাকতে হবে এবং স্বাধীনতার দাবি চিরতরে ত্যাগ করতে হবে।
আখমদ কাদিরভের ছেলেই আজকের রমজান কাদিরভ। বাবার শাসনামলে চেচেন সরকারের বিশেষ বাহিনীর প্রধান ছিলেন রমজান। যার নেতৃত্বে চলতো স্বাধীনতাকামীদের ওপর দমন-পীড়ন। গুম, খুনসহ সব করতো সেই বাহিনী।
স্বাধীনতাকামীদের বোমা হামলায় আখমদ কাদিরভ নিহত হওয়ার পর রমজানকে চেচনিয়ার শাসক বানিয়েছেন পুতিন। যার ফলে অঞ্চলটিতে অব্যাবহত আছে দমন-পীড়ন। এভাবেই এক সময়ের স্বাধীনতাকামী কাদিরভ পরিবার আজ ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। যাদের হাতে লেগে আছে চেচেন বিদ্রোহীদের রক্ত।

২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ফ্রিডম হাউজ মানবাধিকার র্যাঙ্কিংয়ে চেচনিয়াকে ‘খারাপের খারাপ’ ক্যাটাগরিতে স্থান দেয়। যে তালিকায় আরো আছে উত্তর কোরিয়া ও মিয়ানমারের মতো দেশ। তবে পিতার মতোই মস্কোর নিঃশর্ত আনুগত্য করার কারণে রমজান কাদিরভের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।
আরো পড়ুন :
রাশিয়ার সাথে মুসলিম বিশ্বের সম্পর্ক কেমন
কাদিরভ কেন এত আগ্রাসী হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে উস্কানি দিচ্ছেন সে বিষয়ে সিনিয়র মার্কিন সাংবাদিক ও ব্লুমবার্গের এডিটরিয়াল বোর্ড মেম্বার ক্লারা ফেরেইরা বলেন, আনুগত্য দেখিয়ে রমজান কাদিরভ মস্কোর কাছ থেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ করতে চাইছেন। পুতিন সরকারের অর্থমন্ত্রী হওয়ার বাসনাও তার রয়েছে।
পুরস্কার ইতোমধ্যে কাদিরভ কিছুটা পেয়েছেন। অক্টোবরের ৫ তারিখ তাকে রুশ সেনাবাহিনীর তৃতীয় সর্বোচ্চ পদ কর্নেল জেনারেল হিসেবে সম্মানসূচক পদোন্নতি দিয়েছেন পুতিন। তবে কাদিরভের চাওয়া সম্ভবত আরো বেশি। তিনি হয়তো আঞ্চলিক নেতা থেকে রাশিয়ার জাতীয় নেতৃত্বের সাড়িতে আসতে চান। যে কারণে ইউক্রেনের ভূখ- দখলে ব্যাপক উৎসাহ দেখাচ্ছেন।
০৭-১০-২০২২
লেখকের ফেসবুক পেজে যুক্ত হতে লাইক দিন : আহমেদ


