আর্জেন্টিনা ফুটবল যেন সমর্থক শব্দ , মেসি-ম্যারাডোনার দেশ। শুধু কি তাই? মোটেই নয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার আর্জেন্টিনা। জলপ্রপাত, হিমবাহ, তুষারাবৃত পবর্ত, অপূর্ব সুন্দর সমুদ্র সৈকত- কী নেই দেশটিতে। খুব কাছ থেকে তিমি মাছ দেখার লোভই বা আপনি কিভাবে সামলাবেন। ইচ্ছেমত বরফে গড়াগড়ি কিংবা স্কি করায় কেউ বাধা দেবে না। যেতে পারেন কিংবদন্তী বিপ্লবি চেগুয়েভারার জন্মস্থান দেখতে। মেসি-ম্যারাডোনার শহরেও ঢু মারতে পারেন। সব মিলে সৌন্দর্যের আকর্ষণী এক প্যাকেজ যেন আর্জেন্টিনা।
এক নজরে
দেশ : আর্জেন্টিনা
অফিশিয়াল নাম : আর্জেন্টিনা রিপাবলিক Argentina Republic
রাজধানীয় : বুয়েনস আইরেস
স্পেন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা : ৯ জুলাই ১৮১৬
আয়তন : ২৭ লাখ ৮০ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার
জনসংখ্য : ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৩৮ হাজার
জাতীয়তা : আর্জেন্টাইন
রাষ্ট্রভাষা : স্প্যানিশ
মুদ্রা : পেসো
ধর্ম : ৬৩ শতাংশ ক্যাথলিক খ্রিস্টান, ১৯ শতাংশ ধর্মহীন। সামান্য কিছু মুসলিম, বৌদ্ধ ও ইহুদি আছে দেশটিতে
সরকার ব্যবস্থা : ফেডারেল প্রেসিডেন্সিয়াল
প্রদেশ : ২৩টি
আইনসভা: দুই কক্ষ বিশিষ্ট
শিক্ষিতের হার : ৯৮ শতাংশের বেশি
আদি প্রস্তুর যুগ থেকেই আর্জেন্টিনায় মানব বসতি ছিলো বলে জানা যায়। ১৫১৬ সালে স্প্যানিশ নাবিক জুয়ান ডায়াস ডি সোলিস আর্জেন্টিনায় পৌছান। এরপর থেকেই সেখানে বাড়তে থাকে ইউরোপীয়দের উপস্থিতি। এরপর ধীরে ধীরে স্পেনের উপনিবেশে পরিণত হয় দেশটি। ১৮১০ সালে আর্জেন্টিনা স্বাধীনতা ঘোষণা করে। দীর্ঘ যুদ্ধের পর ৯ জুলাই ১৮১৬ স্বাধীন আর্জেন্টিনা রাষ্ট্র গঠিত হয়। এরপর শাসনপদ্ধতি নিয়ে কয়েক বছরের গৃহযুদ্ধ শেষে দেশটিতে চালু হয় ফেডারেল সরকার ব্যবস্থা।
আর্জেন্টিনা কোন মহাদেশে
আয়তনে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের দ্বিতীয় ও বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম রাষ্ট্র আর্জেন্টিনা। যার পশ্চিমে চিলি। চিলির সাথে দেশটির সীমান্তকে পৃথক করেছে আন্দিজ পর্বতমালা। উত্তরে বলিভিয়া ও প্যারাগুয়ে, ব্রাজিলের সাথেও সীমান্ত আছে। আর পূর্ব ও দক্ষিণে আটলান্টিক মহাসাগর। পূর্বাঞ্চলীয় আটলান্টিক উপকূলীয় নগরী বুয়েনস আইরেসে দেশটির রাজধানী। আটলান্টিকের বুকে জেগে ওঠা কিছু দ্বীপ আর্জেন্টিনার অধীন। আর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ব্রিটেনের সাথে দেশটির বিরোধ বহুপুরনো। যেটি নিয়ে ১৯৮২ সালে যুদ্ধও হয়েছে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের মধ্যে।
আর্জেন্টিনার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইতিহাসও সংঘাতময়। ক্ষণে ক্ষণে ক্ষমতার পালা বদল হয়েছে দেশটিতে। সংঘাতের কারণে এক সময়ে বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশটি ব্যাপক অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়ে। দেশটির সবচেয়ে বিখ্যাত প্রেসিডেন্ট হুয়ান পেরন শ্রমিক শ্রেণী ও দরিদ্রদের কাছে খুব জনপ্রিয় ছিলেন, কিন্তু তিনি ছিলেন একজন একনায়ক, যিনি সমস্ত বিরোধিতা কঠোর হাতে দমন করতেন। পেরন যুগের শেষে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসন চলার পর দেশটিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ আর রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের ধকল কাটিয়ে উঠতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটি।

আর্জেন্টিনার অর্থনীতি
আর্জেন্টিনার অর্থনীতি মূলত শিল্প ও কৃষি নির্ভর। প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদও আছে দেশটিতে। কৃষিপণ্য রফতানি করে আসে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার বড় অংশ। আর আছে পর্যটন শিল্প। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর বিশ্ব ঐতিহ্যের মিলনমেলা যেন আর্জেন্টিনা। আছে ৩০টি ন্যাশনাল পার্ক, যেখানে দেখা মেলে বন্য প্রাণীর। যে কারণে পর্যটকদের কাছে দেশটি দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভ্রমণকেন্দ্র।
উইকিপিডিয়া বলছে, ২০১৩ দেশটিতে ভ্রমণ করেছে ৫৫ লাখের বেশি বিদেশী পর্যটক। ওই বছর দেশটি পর্যটন শিল্প থেকে আয় করেছে ৪৪১ কোটি মার্কিন ডলার। এরপর প্রতিবছর এই সংখ্যা বাড়ছেই। আর্জেন্টিনার সরকারও পর্যটন শিল্পকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে।
আর্জেন্টিনার রাজধানী
দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পর্যটকের পা পড়ে যে নগরীতে সেটি আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেস। আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ভূখণ্ডে ভেতরে ঢোকা অংশটি রিভার প্লেট বা রিও ডি লা প্লাটা নামে পরিচিত। কেউ এটিকে বলেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় নদী কেউবা বলেন উপসাগর। রিভার প্লেটের তীরেই গড়ে উঠেছে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় নগরী বুয়েনস আইরেস। যার অপর পাড়ে উরুগুয়ে।
আরো পড়ুন :
ব্রাজিল : ফুটবল আমাজন আর ঐতিহ্যের দেশ
প্রাচীন ও আধুনিক ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলিতে গড়ে ওঠা বুয়েনস আইরেস নগরীটি মনে করিয়ে দেয় এখানকার স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক যুগের কথা। ঔপনিবেশক শাসনের সাক্ষী হয়ে এখনো দাড়িয়ে আছে অনেক স্থাপনা। আধুনিক স্থাপনাগুলোতেও আছে ইউরোপী শৈলী। নগরীর আনাচে কানাচে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বার ও নাইটক্লাব। রাতের বুয়েনস আইরেস যেন অন্য এক রূপ নিয়ে হাজির হয় পর্যটক ও নাগরিকদের কাছে। ট্যাঙ্গো স্ট্রিট ড্যান্স নগরীর ঐতিহ্যবাহী জিনিসগুলোর একটি। অনেকগুলো অঞ্চলে বিভক্ত নগরীটি, যে অঞ্চলগুলো স্থানীয়ভাবে ব্যারিও নামে পরিচিত।
সান তেলমো ব্যারিওতে গেলে দেখা মিলবে অনেক ড্যান্স পার্লার, ক্যাফে ও অ্যান্টিক শপের। অত্যাধুনিক সব শপিং মলও আছে এলাকাটিতে। আবার লা বোকা ব্যারিওতে গেলে মনে হবে আপনি দাড়িয়ে আছেন ইতালির কোন নগরীতে। এখানকার স্থাপনা, সড়কসহ সব কিছুতেই ইতালীয় স্থাপত্যের ছাপ স্পষ্ট। ট্যাঙ্গো স্ট্রিট ড্যান্স উপভোগ করারও সবচেয়ে ভালো জায়গা এটি।

নাইন ডি জুলিও অ্যাভিনিউ 9 de Julio Avenue
এই নগরীতেই আছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রশস্ত সড়ক নাইন ডি জুলিও অ্যাভিনিউ 9 de Julio Avenue। আর্জেন্টিনার জাতীয় দিবস ৯ জুলাইয়ের স্মরণে সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে। প্রতি পাশে সাতটি করে লেন আছে এই সড়কে। আবার এর দুই পাশে আছে দুই লেনের আলাদা দুটি সড়ক।
ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী করদোভাতেও দর্শকদের আকষর্ণ করার মতো আছে অনেক কিছু। করদোভা নগরী আপনাকে মনে করিয়ে দেবে দেশটির স্প্যানিশ শাসনের অতীত ইতিহাস।
আর্জেন্টিনার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি টানে মিসিওনেস প্রদেশের ইগুয়াজু জলপ্রপাত । জলপ্রপাত, পাহাড় আর ঝর্নার সৌন্দর্য উপভোগ করতে আপনাকে যেতে হবে সেখানে।
ব্রাজিল সীমান্তে অবস্থিত এই জলপ্রপাতটির দুটি অংশ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মধ্যে। দুই অংশ মিলে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলপ্রপাত। তবে বড় অংশটা আর্জেন্টিনার ভূখণ্ডে। অনেক উচু থেকে উগুয়াজু নদীতে পড়া বিশাল জলরাশি দর্শকদের মোহিত করে রাখে। এই জলপ্রপাতটির আরেকটি বৈশিষ্ট হচ্ছে এটি দুই ধাপের। ১১৫ ফুট ওপর থেকে প্রথম ধাপে পানি যেখানে পতিত হয়, সেখান থেকে আবার নেমে আসে আরেকটি ধাপ।

দ্বিতীয় ধাপটি ১৩১ ফুটের। পাশ আছে অনেকগুলো ছোট-বড় জলপ্রপাত। যার সংখ্যা প্রায় তিনশো টি।
এই বিশাল জলরাশির অর্ধেকেরও বেশি একটি ফাটলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পড়ে ইগুয়াজু নদীতে। যে জায়গাটিকে বলা হয় শয়তানের গলা। এটি এই জলপ্রপাতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। এই খাদটি নেমে গেছে ৩০০ ফুট নিচে। যা চওড়ায় ২৬০ ফুট। ইগুয়াজু জলপ্রপাতের পাশেই একটি বিশাল ন্যাশনাল পার্ক। যেখানে দেখা মিলবে অনেক বন্য প্রাণীর। এই সুন্দর জলপ্রপাতটি দেখতে বছরে প্রায় ১০ লাখ পর্যটক আর্জেন্টিনাতে আসেন।
আরো পড়ুন :
আর্জেন্টিনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য
চিলি সীমান্তবর্তী দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় সান্তাক্রুজ প্রদেশের পেরিতো মরেনো হিমবাহ আর্জেন্টিনার আরেকটি আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট। আন্দিজ পর্বতমালা পাদদেশের এই হিমবাহটি একটি বরফের নদী। অ্যান্টার্কটিক ও গ্রীনল্যান্ডের পর সবচেয়ে বড় বরফণ্ড আছে এখানে। এটি ৩০ বর্গকিলোমিটারের একটি বরফখণ্ড যেটি বিশ্বের তৃতীয় বড় নিরাপদ পানির উৎস। এখানে কিছুটা দূর থেকে দেখতে হবে বিশাল এই বরফখণ্ড।
তবে আরো কাছ থেকে বরফের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে যেতে পারেন বারিলোচিতে। এখানে আপনি পাবেন এক সাথে সব কিছু। গ্রীষ্মে পর্বতারোহন আর শীতে বরফের ওপর স্ক্রি করার জন্য এই জায়গাটি বিখ্যাত। এখানকার ছেড়ো ক্যাটেড্রাল দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় স্কি স্টেশন। বরফ ঢাকা পাহাড়ের পাদদেশের অপার সৌন্দর্যের গ্রামগুলোতে দাড়িয়ে মনে হতে পারে আপনি আছেন সুইজাল্যান্ডের কোন জায়গায়। আবার লেকের পানিকে ঘুরতে পারবেন নৌকা নিয়ে। বারিলোচি চকলেটের জন্যও বিখ্যাত। আর্জেন্টিনা ফুটবল
বোটে চড়ে তিমি মাছ দেখতে চাইলে যেতে হবে পুয়েত্রো মাদরিন সৈকতে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এখানে খুব কাছ থেকে দেখা যায় তিমিদের। যে কারণে এই সময়টায় পর্যটকের ঢল নামে এখানে। আর সৈকতে রোদ পোহাতে পোহাতে নীল জলরাশির সৌন্দর্য উপভোগ করতে যেতে পারেন মাল দেল প্লাটা বিচে।

প্রাকৃতি সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে আরো যেতে পারেন পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষিণের শহর উশুআইয়া দ্বীপে, যেটি এক সময় ব্যবহৃত হতো বন্দীখানা হিসেবে। এখান থেকেই যাত্রা শুরু করেন অ্যান্টার্কটিকার অভিযাত্রীরা। যেতে পারেন মেনদোজায় যেখানে দেখা যাবে ওই অঞ্চলের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ অ্যাকোনকাগুয়া।
ফুটবলের দেশে যাবেন আর মেসি-ম্যারাডোনার শহরে যাবেন না তাই কি হয়! রাজধানী বুয়েন্স আইরেসের খুব কাছেই ফুটবল ঈশ্বর খ্যাত দিয়াগো ম্যারডেনার লানুস শহর। আর মেসির শহর রোসারিও অবস্থিত মধ্যবর্তী সান্তা ফে প্রদেশে। বিপ্লবী চে গুয়েভারার জন্মও এই শহরে। এইসব বিখ্যাত মানুষদের এবং দেশটির অন্যান্য ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে আর্জেন্টিনায় আছে অনেকগুলো জাদুঘর। সেসব দেখতেও ভুলবেন না যেন!
আর্জেন্টিনা ফুটবল টিম Argentina Football Team
আর্জেন্টিনার কথা বললে বিশ্বের যে কোন মানুষের চোখে ফুটে উঠে আকাশী-সাদা জার্সি। যে জার্সিতে বিশ্ব কাপিয়েছেন ডিয়াগো ম্যারাডোনা। এখন বিশ্ব মাতিয়ে চলছেন লিওনেল মেসি। এই দলটি ফুটবল বিশ্বের এক পরাশক্তি। যদিও তারা বিশ্বকাপ জিতেছে মাত্র দুবার (১৯৭৮ ও ১৯৮৬)। দ্বিতীয় ট্রফিটি এসেছে ফুটবল ঈশ্বর খ্যাত ম্যারাডোনার পায়ের জাদুতে। আর্জেন্টিনা ফুটবল
এরপর বহু বছর দলটি বিশ্বকাপ জেতেনি। এখন তারা তাকিয়ে আছে লিওনেল মেসির দিকে। মেসি দলটিকে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে ফাইনালে তুলেছিলেন; কিন্তু জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে রানার্স আপ হয় দলটি। তবে ২০২১ সালের কোপায় দলটিকে শিরোপা এনে দিয়েছেন মেসি, ডি মারিয়ারা। সেটি কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনার ১৫তম শিরোপা। এছাড়া ১৯৯২ সালে ফিফা কনফেডারেশন কাপের শিরোপা জিতেছে দলটি।
ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে আমাদের সঙ্গে থাকুন : আহমেদ স্টোর


