ইরান বিক্ষোভ
ইরানে গত দুই সপ্তাহ ধরে চলছে সঙ্ঘাতময় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। এই বিক্ষোভের ওপর কঠোর হয়েছে সরকার, যে কারণে প্রায় একশো জন নিহত হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের নিহতের সংখ্যাই বেশি, তবে কিছু নিরপত্তা বাহিনীর সদস্যও নিহত হয়েছে।
পুলিশ হেফাজতে এক নারীর মৃত্যুর কারণে দেশব্যাপী এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
যে কোন দেশে এমন ঘটনায় বিক্ষোভ হওয়াটাই স্বাভাবিক; এমন ইস্যুতে জনগন প্রতিবাদ ও বিচার চাওয়ার অধিকার রাখেন।
এছাড়াও সরকারের যে কোন সিদ্ধান্ত বা আইনের বিরুদ্ধেও বিক্ষোভ দেখানোর অধিকার রয়েছে নাগরিকদের।
ইরান বিক্ষোভ : যেভাবে শুরু
মাহসা আমিনি (২২) নামের এক নারী কুর্দিস্তান থেকে তেহরানে বেড়াতে গিয়ে মোড়াল পুলিশের হাতে আটক হয়। যথাযথভাবে হিজাব না পরার কারণে তাকে আটক করে পুলিশ।
মোড়াল পুলিশ ইরানের জনগনের মাঝে পোশাকসহ ধর্মীয় বিধানগুলো তদারকি করে। আটকের পর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে মৃত্যু হয় মাহসার’।
অভিযোগ উঠেছে পুলিশের নির্যাতনে তার মৃত্যু হয়েছে, অন্য দিকে পুলিশ বলছে হার্ট অ্যাটাক মৃত্যুর কারণ।
পুলিশ হেফাজতে কারো মৃত্যুর ঘটনায় দোষীদের বিচারও চাওয়া অবশ্যই ন্যয় সঙ্গত, এজন্য আন্তর্জাতিকভাবে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবি উঠা উচিত।
কিন্তু ইরানের এবারের বিক্ষোভের শুরু থেকেই আমরা দেখছি- বিক্ষোভকারীরা ইসলাম ধর্মীয় বিভিন্ন উপাদানকে বিক্ষোভের মাঠে টেনে এনেছে।
তারা প্রকাশ্যে রাস্তায় হিজাব পুড়িয়েছে, পথচারীদের গা থেকে টেনে বোরকা খুলে ফেলেছে। অনেক নারী মাথা থেকে হিজাব খোলার পর নিজেদের চুলে কেটে ফেলেছেন প্রতিবাদের অংশ হিসেবে।
পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমগুলো এই খবর ফলাও করে প্রচার করেছে।

সরকার কী বলছে
যে কারণে ইরানের সরকার বলছে, এটি কোন সরকার বিরোধী বিক্ষোভ নয়, এই বিক্ষোভ মূলত ইসলামের পর্দার বিধানের বিরুদ্ধে। বিক্ষোভকারীরা দেশে মানুষের হিজাব পরা বন্ধ করতে চায়।
ইরান সরকারের মতে, এই বিক্ষোভ করছে একদল সেক্যুলার ও ইসলাম বিদ্বেষী প্রজন্ম। যারা ধর্মীয় শাসনের মূলোৎপাটন করতে চায়।
বিক্ষোভকারীরা পশ্চিমা দেশগুলোর কাছেও সহযোগিতা চেয়েছে। তারা পশ্চিমা সরকারগুলোকে অনুরোধ করেছে, সরকার পতনের আন্দোলনে সহযোগিতা দেয়ার জন্য।
বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে ইরানের কূটনৈতিক লড়াইও শুরু হয়েছে। বেশ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূততের ডেকে ইরান সরকার প্রতিবাদ জানিয়েছে।

ইরানে সরকারের দিক থেকেও সমস্যা আছে। দেশটিতে নির্বাচিত সরকার ব্যবস্থা থাকলেও তা পুরোপুরি ধর্মীয় নেতাদের নিয়ন্ত্রিত। দেশটিতে জনগনের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খুবই সঙ্কুচিত।
চাইলেই ইরানে সরকারের কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে বিক্ষোভ করা যায় না। ধর্মীয় নেতাদের নিয়ন্ত্রিত শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ দেশটিতে মেনে নেয়া হয় না।
দেশটিতে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে পশ্চিমা দেশগুলোর। ইরানের সরকার ব্যবস্থায় ধর্মীয় নেতারাই শেষ কথা, তাদের কোন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার ক্ষমতা কারো নেই।
দেশটিতে জনগনের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয় ঠিকই; কিন্তু প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী কে হবে সেটি ধর্মীয় নেতারাই ঠিক করে দেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, যে কোন নাগরিক চাইলেই ইরানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে পারে না।
হিজাবের পক্ষ-বিপক্ষ
এবারের বিক্ষোভেও একেবারে প্রথম দিন থেকে পুলিশ গুলি চালিয়েছে বিক্ষোভকারীদের ওপর। অতীতেও দেখা গেছে দেশটির বিভিন্ন বিক্ষোভে পুলিশের নির্মমতা।
এবারের হিজাব বিরোধী বিক্ষোভ দমনে মাঠে হিজাব পরা কমান্ডো নামিয়েছে সরকার।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে বলেছেন, ওই নারী কমান্ডোর হিজাব পরলেও তাদের দেশে মনে হচ্ছে ভ্রু প্লাক করা, যেটি ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ।
অতএব ইরানের উভয় পক্ষের মধ্যে সমস্যা রয়েছে।
দেশটিতে সরকারের বিশাল জনসমর্থন রয়েছে। হিজাবের পক্ষে তেহরানসহ বিভিন্ন জায়গায় হিজাবের সমর্থনে বড় আকারের বিক্ষোভ হয়েছে।
আবার যারা সরকারের বা হিজাবের বিপক্ষে বিক্ষোভ করছে তাদের পক্ষেও রয়েছে বিশাল জনসমর্থন।
যারা বিক্ষোভ করছে, তারা সরকার বিরোধী বিক্ষোভে নেমে ধর্মীয় বিষয়গুলোকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলেছে। হিজাব পোড়ানো, বোরকা খুলে ফেলা তারই ইঙ্গিত।
সরকার বলছে, তাদের বিক্ষোভ পুরোপুরি ইসলামিক বিধিবিধানের বিপক্ষে। অন্য দিকে, সরকারও ভিন্নমত সহ্য করতে পারছে না।
আরো পড়ুন : লেবাননকে নিয়ে সৌদি-ইরান রশি টানাটানি


