ক্রোয়েশিয়া দেশ পরিচিতি (Croatia) । আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের কাছে দেশটি অনেকটাই অপরিচিত।
ইতিহাস ঐতিহ্য কিংবা বিশ্ব রাজনীতিতে দেশটির জোরালো অবস্থান না থাকায়, ক্রোয়েশিয়া নামক দেশটি খুব বেশি দৃষ্টি কাড়তে পারেনি বিশ্ববাসীর। ফুটবলের কারণে কিছুটা পরিচিত হলেও বিশ্বে আলোচিত হওয়ার মতো আর কোন কারণ নেই দেশটির। তবে, সাবেক যুগোশ্লাভিয়ার অংশ দেশটির আছে অবারিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। ধনী দেশগুলোর একটি ক্রোয়েশিয়া সাগর, পাহাড় আর সবুজে ঘেরা এক দেশ।
ক্রোয়েশিয়া দেশ পরিচিতি
অফিশিয়াল নাম : রিপাবলিক অব ক্রোয়েশিয়া (Republic of Croatia)
রাজধানী : জাগরেব Zagreb
যুগোশ্লাভিয়া থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা : ২৫ জুন, ১৯৯১
আয়তন : ৫৬ হাজার ৫৯৪ বর্গ কিলোমিটার
জনসংখ্যা : ৪০ লাখ ৭৬ হাজার
জাতীয়তা : ক্রোয়েশিয়ান
অফিশিয়াল ভাষা : ক্রোয়েশিয়ান
মুদ্রা : কুনা Croatian Kuna
ধর্ম : ৯১ শতাংশ খ্রিস্টান, ৪.৫ শতাংশ ধর্মহীন, ১.৪৭ শতাংশ ইসলাম
সরকার ব্যবস্থা : বহুদলীয় গণতন্ত্র
পার্লামেন্ট : সাবোর (এক কক্ষবিশিষ্ট)
শিক্ষিতের হার : ৯৯.২ শতাংশ
ক্রোয়েশিয়া কোন মহাদেশে অবস্থিত Where is Croatia
দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশ ক্রোয়েশিয়া। সাবেক যুগোশ্লাভিয়া রাষ্ট্রটি ভেঙে যে সাতটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে তার একটি ক্রোয়েশিয়া। দেশটির উত্তর পশ্চিমে স্লোভেনিয়া, উত্তর পূর্বে হাঙ্গেরি, পূর্বে সার্বিয়া, দক্ষিণপূর্বে মন্ট্রেনিগ্রো ও বসনিয়া। পশ্চিমে আড্রিয়াটিক সাগরের বিশাল উপকূল, সাগরের ওপারে ইতালি। আড্রিয়াটিক সাগর দিয়েই একদিকে ইতালি আর অন্য দিকে আলবেনিয়াকে রেখে ভূমধ্যসাগরের সাথে দেশটির নৌ যোগাযোগ।

প্যালিওলিথিক যুগ থেকেই দেশটিতে মানব বসতির আস্তিত্ব পাওয়া যায়। আর ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে এখানে আসে ক্রোয়াট জাতির লোকেরা। দুইশ বছর তাদের শাসনে থাকার পর যায় হাঙ্গেরির শাসনে। দুটি বিশ্ব যুদ্ধের আগে পরে কয়েক দফা কর্তৃত্ব হাত বদল হয়ে পরিণত হয় যুগোশ্লাভিয়ার একটি স্টেটে। আর যুগোশ্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর গঠিত হয় সার্বভৌম রাষ্ট্র রিপাবলিক অব ক্রোয়েশিয়া।
জাতিগত ক্রোয়াটদের নিয়েই মূলত গঠিত ক্রোয়েশিয়া। তবে দেশটিতে আছে কিছু সার্ব ও অন্যান্য জাতির লোক। অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়ার বাইরেও প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে আছে ক্রোয়াটরা। ইউরোপের উচ্চ আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত ক্রোয়েশিয়া। নাগরিকদের জীবনযাত্রার মানও উন্নত। ২০১৯ সালের এক হিসেবে দেখা গেছে, দেশটির শ্রমিকদের সর্বন্মি বেতন সাড়ে ছয় হাজার কুনা।
ক্রোয়েশিয়ার অর্থনীতি মূলত সেবাখাত নির্ভর। জিডিপির ৭০ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। এরপরই আছে শিল্প ও কৃষি খাত। দেশটির শিল্পখাতের মধ্যে আছে জাহাজ নির্মাণ শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজতকরণ, ঔষধ, তথ্য প্রযুক্তি ও কাঠ শিল্প।
অর্থনীতির প্রধান চালিকা সেবার খাতের সবচেয়ে বড় অংশ জড়িত পর্যটন শিল্পের সাথে। মোট জিডিপির ২০ শতাংশ আসে দেশি বিদেশী পর্যটকদের আতিথিয়েতা দিয়ে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পর্যটন শিল্পে বড় ধরনের ধস নামলেও দেশটির নীতি নির্ধারকরা বুঝতে পারে যে, অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাড় করাতে হলে পর্যটনই দ্রুত উন্নতির প্রধান পন্থা। যার ফল দ্রুতই পেতে শুরু করে তারা। এখন প্রতি বছর গড়ে এক কোটি ১০ লাখ পর্যটক ভ্রমণে যায় দেশটিতে। যার বেশির ভাগই ইতালি, জার্মানির মতো ধনী দেশের।
ডুবরোভনিক : ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে সুন্দর জায়গা

ক্রোয়েশিয়ার পর্যটন শিল্প মূলত আড্রিয়াটিক সাগরের উপকূলকে কেন্দ্র করে। বিশাল উপকূলীয় এলাকা আর সাগররের বুকে হাজার খানেক দ্বীপ ডেকে আনে পর্যটকদের। উপকূলীয় সৌন্দর্যের প্রসঙ্গ এলে সবার আগে মনে পড়বে প্রাচীন নগরী ডুবরোভনিকের কথা।
এই প্রতিবেদনের ভিডিও দেখুন
ইউরোপের সেরা পর্যটন স্পটগুলোর একটি এটি। ৪২ হাজার মানুষের এই নগরী ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। আড্রিয়াটিক সাগরের তীর ঘেষে মধ্যযুগে গড়ে ওঠা ডুবরোভনিকের পুরাতন অংশে আছে দুর্গ, ওয়াচ টাওয়ার, কামান সহ অনেক প্রাচীন ঐতিহ্য।
কমলারঙের ছাদ ওয়ালা কয়েকশো ভবন আর তার কাছেই সাগরের নীল পানি- এ যেন এক অপরূপ সৌন্দর্য। সাগরে বেড়ানোর জন্য এখানে খুব কম পয়সায় ভাড়া পাওয়া যায় ছোট ছোট বোট। একটু দূরের আছে সবুজ বৃক্ষে ছাওয়া সাড়ি সাড়ি পাহাড় আর পাহাড়ের বুক চিড়ে নেমে আসা ঝর্ণা। আছে জাদুঘর ও অনেক প্রাচীন স্থাপনা।
ক্রোয়েশিয়ার দর্শণীয় স্থান
আগেই বলেছি আড্রিয়াটিক সাগরে হাজার খানের দ্বীপ রয়েছে ক্রোয়েশিয়ার।
তার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ভার দ্বীপ। কৃষিতে সমৃদ্ধ দ্বীপটিতে আছে জলপাই বাগান, ফলের বাগান ও দৃষ্টিনন্দন ল্যাভেন্ডার ক্ষেত। ভার দ্বীপের বন্দর ইয়টের জন্য বিখ্যাত। এখানে বাধা থাকে বিদেশী সেলিব্রেটিদের ইয়ট বা প্রোমোদ তরী। ছুটি কাটাতে তারা আসেন এই দ্বীপে।
পয়সা খরচ করেন দুহাত ভরে। যা যোগ হয় ক্রোয়েশিয়ার রাজস্ব খাতে। পকেট ভরে পর্যটন ব্যবসায়ীদের। ভার দ্বীপের রেস্ট্রুরেন্টগুলোর সী-ফুডকে অনেকেই বলেন পৃথিবীর সেরা। দ্বীপটির ছোট্ট শহরটি বেশ পরিপাটি আর সাজানো গোছানো। যেন পর্যটকদের অভ্যর্ত্থনা জানাতে প্রস্তুত হয়ে থাকে সব সময়।
পাহাড়, ঝর্না আর সবুজে ঘেরা প্লিটভিচ ন্যাশনাল পার্ক পর্যটনের আরেক বিখ্যাত কেন্দ্র।
বসনিয়া সীমান্তের কাছে প্রায় তিনশ বর্গ কিলোমিটার বন্য ও পাহাড়ি অঞ্চল নিয়ে ১৯৪৯ সালে স্থাপিত এই পার্কটিতে আছে ১৬টি লেক। যার একেকটির পানি একের রঙের। কোনটির পানি নীল, কোনটি সবুজ আর কোনটি ধূসর রঙের। আছে অনেকগুলো মনোরম ঝর্ণা। পার্ক জুড়ে আছে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ কাঠের পাটাতনের তৈরি পথ। যার ওপর দিয়ে হাটতে হাটতে দর্শনার্থীরা মুগ্ধ হয়ে দেখেন পার্কের সৌন্দর্য। প্লিটভিচ ন্যাশনাল পার্কে বন্য প্রাণীদের মধ্যে আছে ভালুক, নেকড়ে, ঈগল, পেচাসহ কয়েক ধরনের পশুপাখি।
এই পার্কটিও ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী স্প্লিট (Split)
বন, পাহাড় আর সমুদ্রই নয়, ক্রোয়েশিয়ার নগর জীবনও কম সুন্দর নয়। দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী স্প্লিট। রোমান যুগের স্থাপত্য চোখে পড়বে এই নগরীতে পা রাখলে। মূলভূখণ্ড থেকে আড্রিয়াটিক সাগরের ভেতর ঢুকে যাওয়া উপদ্বীপের মত একটি জায়গায় অবস্থিত নগরীটি। তিন দিকে সাগর আর এক দিকে মেইনল্যান্ড। রোমান, বাইজেন্টাইন, অস্ট্রিয়া, ওসমানীয়সহ অতীতের অনেকগুলো সম্রাজ্যের স্মৃতিচিহ্ন বুকে দাড়িয়ে আছে স্প্লিট নগরী। রোমান সম্রাট ডিওচেষ্টাইনের প্রাসাদ এখানকার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ স্থান।
রাজধানী জাগবের না দেখলে ক্রোয়েশিয়া ভ্রমণ সম্পন্ন হবে না।
দেশটির উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের সবুজে ঘেরা এই পাবর্ত্য নগরী দুটি ভাগে বিভক্ত- আপার টাউন ও লোয়ার টাউন। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৪০০ ফুট উচুতে অবস্থান নগরীটির। পাহাড়ের ওপর অংশটি আপার টাউন নামে পরিচিত যেখানে আছে প্রাচীন অনেক স্থাপত্য। আর অপৈক্ষাকৃত নতুন অংশটি নদীর তীর ঘেষে তুলনামূলক সমভূমিতে অবস্থিত। দেশটির রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও গবেষণার প্রাণকেন্দ্র জাগরেব। ক্রোয়েশিয়া দেশ পরিচিতি
ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল
ক্রোয়েশিয়ার অতীত আর বর্তমানের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে আছে ফুটবল। ২০১৮ সালে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবলে দেশটি ফাইনালে খেলেছে। ফুটবলের কোন স্বীকৃতি পরাশক্তি না হয়েও বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলে সারা বিশ্বের নজর কেড়েছে দেশটি। তবে ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ প্রথমবার খেলতে এসেই তৃতীয় স্থান অধিকার করে হইচই ফেলে দেয় ডেভর সুকারের (Davor Šuker) দেশটি।

তবে ক্রোয়াটদের ফুটবলপ্রীতির সাথে মিল নেই প্রথাগত ইউরোপীয় সংস্কৃতির।
বরং ফুটবল নিয়ে তাদের মানসিকতার মিল পাওয়া যায় লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সাথে। আবেগ দিয়ে ফুটবল উপভোগ করে এই জাতিটি। ফুটবলকে জাতীয় চেতনার অংশ মনে করে ক্রোয়েশিয়ানরা। তার প্রমাণ বিশ্ববাসী পেয়েছে রাশিয়ায় বিশ্বকাপ ম্যাচের সময় গ্যালারিতে দলের পক্ষে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কোলিন্দা গ্রাবার-কিরাতোভিচের উল্লাসের মধ্য দিয়ে। সব কূটনৈতিক প্রোটোকল ভুলে গিয়ে যিনি গলা ফাটিয়েছিলেন ক্রোয়েশিয়ার পক্ষে। প্রেসিডেন্ট হয়েও খেলা দেখতে গিয়েছিলেন ফুটবল দলের জার্সি পরে।
স্বাধীন ক্রোয়েশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট ফ্রাঞ্জো তুদজম্যান, যিনি নব্বইয়ের দশকে যুগোস্লাভিয়ার তিক্ত ভাঙ্গন ও যুদ্ধের সময় দিয়ে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তার একটি বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে, ‘ফুটবলে বিজয় একটি দেশের আত্মপরিচয়কে ততটাই রূপায়ন করে, যতটা করে যুদ্ধ।’
কথিত আছে যে, ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল ১৯৯০ সালের মে মাসের একটি দিন থেকে, যেদিন স্থানীয় ফুটবল ক্লাব জাগরেব ও সার্বিয়ার বেলগ্রেডের ভক্তদের মধ্যে ঘটেছিল সঙ্ঘাতের ঘটনা। যদিও এই গল্পটি পুরোপুরি সত্য নয়, তবে ওই ফুটবল ম্যাচের একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ছিলো স্বাধীন ক্রোয়েশিয়া রাষ্ট্র গঠনে।
ক্রোয়েশিয়া দেশ পরিচিতি লেখাটি আপনাকে কতটুকু সন্তুষ্ট করেছে তা মন্তব্য করে আমাদের জানান।
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন : আহমেদ স্টোর


