Babar Azam pic

বাবর আজম : ক্যারিয়ার ও পরিসংখ্যান

বাবর আজম

অনেক দিন ধরেই বিশ্ব ক্রিকেটে সেরা ব্যাটসম্যানদের পাশাপাশি উচ্চারিত হচ্ছে তার নাম। বিরাট কোহলি, স্টিভ স্মিথ, কেন উইলিয়ামসন ও জো রুট- এই চার ব্যাটসম্যানকে বলা হতো ফেবুলাস ফোর; কিন্তু বাবর আসার পর সেটা ফেবুলাস ফাইভ হয়ে গেছে। অনেক দিন ধরেই পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপের স্তম্ভ হয়ে আছেন এই তরুণ। ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রাখার পর থেকেই দ্রুত নিজেকে নিয়ে গেছেন সেরাদের কাতারে। বাবর আজম মোট সেঞ্চুরি কয়টি

২০২১ সালের এপ্রিলের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে গিয়ে ওয়ানডে সিরিজ জেতে পাকিস্তান। এটি ছিলো প্রোটিয়াদের মাটিতে পাকিস্তানের দ্বিতীয়বারের মতো ওয়ানডে সিরিজ জয়। এর বাইরে অস্ট্রেলিয়া ছাড়া আর কোন দলের দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে একটির বেশি ওয়ানডে সিরিজ জয়ের রেকর্ড নেই। পাকিস্তান প্রথমবার দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়ে সিরজ জিতেছিলো মিসবাহ উল হকের নেতৃত্বে। আর এরপর জিতলো বাবর আজমের  নেতৃত্বে।

ক্রিকেট দুনিয়ায় পা রেখেই বাবর দৃষ্টি কাড়েন বিশেষজ্ঞদের। প্রথম দিন থেকেই তার মাঝে পরিণত ক্রিকেটারের ছোয়াঁ দেখতে পান সবাই। নিখুঁত টেকনিক, ফুটওয়ার্ক, শট সিলেকশন সব কিছুতেই তিনি আলাদা ছিলেন যে কোন নবীন ক্রিকেটারের চেয়ে। যতই সময় গড়িয়েছে তার প্রমাণও দিয়েছেন বাবর। দুবাইয়ের মরুর বুকে যেমন রানের ফুলঝুড়ি ছুটিয়েছেন, তেমনি অস্ট্রেলিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজ-ইংল্যান্ডের মাটিতে রানের পর রান করেছেন।

মিসবাহ উল হক, ইউনুস খানদের বিদায়ের পর পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা বেশ ভালোভাবেই কাটিয়ে উঠেছে দলটি। আর এই জায়গাটি পূরণ করেছেন ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান। সব ফরম্যাটের ক্রিকেটে সমান কার্যকার তার ব্যাট। যে কারণে অস্ট্রেলিয়ার দুইবারের বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক রিকি পন্টিং তার মাঝে বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান হওয়ার সম্ভাবনা দেখেন।

বাবর আজম ক্যারিয়ার

ক্রমশই তিনি নিজেকে নিয়ে যাচ্ছেন নতুন উচ্চতায়। ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব মেধাবি ক্রিকেটার বাবর আজম। উইকেটের চারদিকে শট খেলতে পারেন সমান তালে। আর যার প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে প্রতি ম্যাচে। ২০১৫ সালে অভিষেক ওয়ানডেতে হাফ সেঞ্চুরি দিয়ে শুরু। পরের বছর আরব আমিরাতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পরপর তিন ম্যাচে খেলেছেন ১২০, ১২৩ ও ১১৭ রানের ইনিংস। সে বছরই ডাক পান টেস্ট দলে।

Babar Azam cover drive
বাবর আজম

২০১৭তে অস্ট্রেলিয়া সফরে অ্যাডিলেডে স্টার্ক-হ্যাজেলউল-কামিন্সদের বিরুদ্ধে খেলেছেন ১০০ রানের অনবদ্য ইনিংস। এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গিয়ে প্রভিডেন্সে খেলেন অপরাজিত ১২৫ রানের ইনিংস। ওই বছর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে পাকিস্তান শিরোপা জেতে। সেখানে বড় কোন ইনিংস না খেললেও মাঝারি কিন্ত কার্যকর কয়েকটি ইনিংস খেলেন।

একই বছর অক্টোবরে দুবাই ও আবুধাবিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পরপর দুই ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি করেন। মোট কথা এই সময়টাতেই বিশ্ব ক্রিকেটে দাপুটে আবির্ভাব বাবর আজমের। ৭১ ইনিংসে এসে পেয়েছেন ১১তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি, যেটি করতে বিরাট কোহলির লেগেছিল ৮২ ইনিংস।

আরো পড়ুন : আফ্রিদি কারা, কোথায় বাস করে

রান করেছেন বিশ্বের সব প্রান্তে। ২০১৯ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অসাধারণ এক সেঞ্চুরি করে ম্যাচ জিতিয়েছেন। সব মিলে ৪৭৪ রান করেছেন ওই আসরে। যা পাকিস্তানিদের মধ্যে সর্বোচ্চ। টপকে গেছেন জাভেদ মিয়দাদের ১৯৯২ বিশ্ব কাপের রেকর্ড। আসরে নেট রান রেটের ব্যবধানে পাকিস্তান সেমিফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হলেও বিশ্ব পেয়ে গেছে নতুন এক ক্রিকেটারের আগমনী বার্তা।

আর বিশ্বকাপের পর অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে পরপর দুই টেস্টে ব্রিসবেন ও অ্যাডিলেডে খেলেছেন ১০৪ ও ৯৭ রানের ইনিংস।

বাবর আজম মোট সেঞ্চুরি কয়টি

এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (১২ সেপ্টেম্বর ২০২৩) ১০৭ ওয়ানডেতে তার মোট রান ৫৩৮০, ব্যাটিং গড় ৫৮.৪৭, সেঞ্চুরি ১৯টি।

৪৯ টেস্ট খেলে গড় ৪৮ প্রায়, মোট রান ৩৭৭২ সেঞ্চুরি আছে ৯টি। আর আন্তর্জতিক টি-টোয়েন্টিতে ১০৪ ম্যাচে রান করেছেন ৩৪৮৫, সেঞ্চুরি ৩টি।  আইসিসি র‌্যাঙ্কিংয়ে ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ওয়ানডেতে আছেন এক নম্বরে। টি-টোয়েন্টিতে ৩ নম্বরে আর টেস্টে ৪ নম্বরে।

বাবর আজম পিক
ফ্যাশন সচেতন বাবর আজম

টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে কম ইনিংসে এক হাজার রান করার বিরাট কোহলির রেকর্ডও নিয়েছেন নিজের দখলে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিন ফরম্যাটেই সেঞ্চুরি আছে যে অল্প কয়েকজন ক্রিকেটারের, তাদের একজন বাবর। পাকিস্তানিদের মধ্যে আন্তর্জতিক ক্রিকেটে দ্রুততম ১০ হাজার রান করার রেকর্ডও তার দখলে।

বাবর আজমের মোট সেঞ্চুরির সংখ্যা সহ তার ম্যাচ পরিসংখ্যান নিচের ছকে দেয়া হলো-

[table id=8 /]

যার সাথে তার বেশি তুলনা করা হতো সেই বিরাট কোহলিকে সরিয়েই  ব্যাটসম্যানদের ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ের ১ নম্বরে উঠেছিলেন পাকিস্তানের ব্যাটিং সেনসেশন বাবর আজম, সেটা ২০২১ সালের এপ্রিলের কথা। এর আগে দীর্ঘ ৪১ মাস বা সাড়ে তিন বছর এই অবস্থানে ছিলেন কোহলি; কিন্তু বাবর আজমের কাছে মুকুট হারাতে হয়েছে তাকে।

আরো পড়ুন :

বাবার মৃত্যু যেভাবে বদলে দিল কোহলিকে

ভারত-পাকিস্তান : হেড টু হেড পরিসংখ্যান

বিশেষজ্ঞদের মন জয়

সাধারণত ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট এক্সপার্টরা তাদের মাটিতে রান করতে না পারলে কোন ব্যাটসম্যানকে সেরা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চান না- বিশেষ করে উপমহাদেশের ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে। কারণ উপমহাদেশের টার্নিং উইকেটে খেলে অভ্যস্ত ব্যাটসম্যানদের জন্য ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাউন্সি পিচে রান করা কঠিন।

ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতি নিয়ে একটি বল যখন হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে মাথার কাছে, কিংবা মিডল স্ট্যাম্পে পড়েও সুইং করে অফ স্ট্যাম্পের বাইরে দিয়ে চলে যায়- তখনই আসলে ব্যাটসম্যানের আসল পরীক্ষাটা হয়ে যায়। বাবর আজম ক্যারিয়ারের শুরুতেই এই পরীক্ষায় পাস করেছেন।

আরো পড়ুন :

মুয়াজ্জিন হতে চান মঈন আলী

২০১৯-২০ সালে দেশের মাটিতে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের বিপক্ষেও খেলেছেন দুর্দান্ত। আর দক্ষিণ আফ্রিকায় সিরিজ জয়ের গল্প তো সবারই জানা। বিশ্বের সব প্রান্তে, সব ধরনের পিচে রান করতে পারার এই দক্ষতাই তাকে সেরা বানিয়েছে। বাউন্সি উইকেট কিংবা উপমহাদেশের স্লো, টার্নিং উইকেট- বাবর আজম যেন ব্যাট হাতে এক সুনিপুন শিল্পী । উইকেটের চারদিকে যিনি আকেন একের পর এক আল্পনা।

টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি- সব ফরম্যাটে সমান তালে খেলতে পারা ব্যাটসম্যান বিশ্বে খুব কমই আছেন। বাবর আজম তাদের ই একজন। বর্তমানে তিন ফরম্যাটেই নেতৃত্ব দিচ্ছেন পাকিস্তানকে। ফর্ম আর ফিটনেস ধরে রাখতে পারলে যে আরো অনেক দূর যাবেন সে ব্যাপারে কারো এতটুকু সন্দেহ নেই।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা

১৯৯৪ সালের ১৫ অক্টোবর পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের লাহোরে জন্ম বাবর আজমের। বেড়ে উঠেছেন পাকিস্তান ক্রিকেটের সঙ্কটময় সময়টাতে। ২০০৯ সালে এই লাহোরেই শ্রীলঙ্কার টিম বাসে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকেই দেশটিতে অনেক বছর বন্ধ ছিলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। যখন পাকিস্তানকে হোম সিরিজও খেলতে হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা অন্য কোন দেশে। এরপর পাকিস্তানে ক্রিকেট ফেরাতে যখন মরিয়া দেশটির ক্রিকেট বোর্ড সেই সময় জাতীয় দলে আসেন বাবর। অনেক আলোচনার পর ২০১৫ সালে জিম্বাবুয়ে দল পাকিস্তান সফর করে। সেই সিরিজে নিজ শহর লাহোরে আন্তর্জাতিক অভিষেক বাবরের।

ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ক্রিকেটের মধ্যে। বাড়িতেই ছিলো ক্রিকেটের চর্চা। চাচাতো ভাইদের সাথে বাড়ির উঠানে খেলতেন। তার চাচাতো ভাই ছিলেন আকমল ব্রাদার্স- অর্থাৎ কামরান আকমল, আদনান আকমল ও ওমর আকমল। আকমলরা তিন ভাই-ই খেলেছেন পাকিস্তান জাতীয় দলে। ছোট বেলায় বাড়ির উঠানে টেনিস বল দিয়ে একসাথে খেলতেন এই চারজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার। এরপর স্থানীয় একটি অ্যাকাডেমিতে ক্রিকেট শিখেছেন।

বাবর আজম সম্পর্কে ভিডিও প্রতিবেদন দেখুন

পাশাপাশি গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সিরিজে বল হিসেবে কাজ করেছেন। সে সময়ই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের স্বপ্নটা ঢুকে যায় বাবরের মাথায়। তবে তার স্বপ্ন পূরণে সবচেয়ে বড় মেন্টর ছিলেন বাবা আজম সিদ্দিকী। বয়সভিত্তিক দলে অনুশীলনের সময় বাবা সারা দিন বসে থাকতেন নেটের পাশে।

বাবর আজমের পাকিস্তানের হয়ে খেলার প্রথম সুযোগ আসে অনূর্ধ-১৫ দলের হয়ে। এরপর ২০১০ ও ২০১২ সালের অনূর্ধ-১৯ বিশ্বকাপ খেলেছেন। শেষবার পাকিস্তানকে নেতৃত্বও দিয়েছেন। দুইবারই ছিলেন দলের পক্ষে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। টপিক : টপিক বাবর আজম মোট সেঞ্চুরি কয়টি

লেখকের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন : আহমেদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top