যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে আলি খামেনী এবং কয়েকজন শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তার অবস্থান সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছিল। এরপর, এবারের হামলায় ছোড়া প্রথম ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্রই খামেনীর বাসভবনে আঘাত করে।
তিনি নিহত হন। আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও সেখানে মারা যান।
এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল রেজিম চেঞ্জ। এই ধরনের কৌশলে সাধারণত প্রথম ধাপ হয় শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া, যাকে ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক বলা হয়।
সে হিসেবে প্রধান লক্ষ্য ছিলেন খামেনী, এবং সেটাই ঘটেছে।
কিন্তু এতে কি যুদ্ধ শেষ হয়েছে বা জয়ের নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে? আমি বলবো, পুরাপুরি তার বিপরীত ঘটনাই ঘটেছে।
খামেনীকে কোনো গোপন আস্তানা থেকে ধরতে হয়নি। তাকে পালিয়ে বেড়ানো অবস্থায় পাওয়া যায়নি। তিনি যেখানে নিয়মিত থাকেন, সেখানেই ছিলেন—প্রকাশ্যে, বৈঠকে অংশ নিচ্ছিলেন।
ফলে তাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন বা আত্মগোপনকারী নেতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়নি।
এটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আলি খামেনী কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন।
ইরান একটি সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র হলেও একই সঙ্গে একটি ইসলামিক রিপাবলিক। রাষ্ট্র কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে টুয়েলভার শিয়া মতবাদের একটি ধারণা—উইলায়াত আল-ফকিহ, অর্থাৎ ইসলামি জুরিস্টের অভিভাবকত্ব।
এই ব্যবস্থায় সুপ্রিম লিডার শুধু প্রশাসনিক প্রধান নন, তিনি ধর্মীয় কর্তৃত্বেরও সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকেন।
শিয়া ঐতিহাসিক স্মৃতিতে কারবালার ঘটনা এবং ইমাম হুসাইনের মৃত্যু একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। আত্মত্যাগ ও শহীদের ধারণা সেখানে নৈতিক দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ ধর্মীয়-রাজনৈতিক কর্তৃত্বে থাকা কাউকে হত্যা করলে তার মৃত্যু সেভাবেই ব্যাখ্যা পাবে।
আমরা এমন একজন মানুষকে নিয়ে কথা বলছি, যাকে ক্যাথলিকদের কাছে তাদের পোপ যেমন মর্যাদা পান তেমনভাবেই শ্রদ্ধা করা হয়।
তিনি শুধু একজন মানুষ নন। তিনি ঈশ্বরবিশ্বাসেরও প্রতীক। তিনি তাদের ধর্মীয় কাঠামোর অংশ। আমরা তাকে হত্যা করেছি।
এখন, যদি আমি কল্পনা করি যে আমি সিআইএ–র উপদেষ্টার ভূমিকায় আছি—আমি যদিও আর তাদের হয়ে কাজ করি না, কিন্তু আগে কাজ করেছি। আমি জানি তারা কীভাবে ভাবে। আমি বুঝি তারা কীভাবে সমস্যাগুলি সমাধানের চেষ্টা করে।
যদি আমাকে পরামর্শ দিতে বলা হতো, তাহলে আমি বলতাম, ইরানের শাসনব্যবস্থাকে ভাঙার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল আলি খামেনীকে জীবিত রাখা, একটা বাঙ্কারে, বা আত্মগোপনে।
তারপর আপনি তার সাহস নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। তার ব্যক্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। বলবেন, কেমন মানুষ তিনি, যিনি লুকিয়ে থাকেন, আর ইরানের মানুষ তার সিদ্ধান্তের মূল্য দেয়!
আপনি তার বিরুদ্ধে প্রচার চালাবেন, তাকে ছোট করার চেষ্টা করবেন, এমনকি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা আপত্তিকর ছবিও ছড়াবেন।
সবকিছুর লক্ষ্য হবে একটাই, ইরানের ভেতরে এই মানুষটির ওপর আস্থা ভেঙে দেওয়া, সেই সঙ্গে ইসলামিক রিপাবলিকের ভিত্তিকে দুর্বল করা।
কিন্তু আপনি যা করবেন না তা হল, একজন মানুষ, যিনি প্রকাশ্যে বলেছেন তার শরীর দুর্বল হয়ে গেছে এবং যার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা শহীদ হয়ে মৃত্যুবরণ করা—তাকে সেই শহীদির সুযোগ করে দেওয়া।
আলি খামেনী জানতেন তিনি মারা যেতে পারেন। যে বৈঠকে তিনি অংশ নিয়েছিলেন, সেদিনই হোক বা পরের দিন, তিনি জানতেন ঝুঁকি আছে। তিনি বুঝতেন এর ফল কী হতে পারে।
তিনি জানতেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নিহত হলে ইরানের মানুষ এমনভাবে তাদের বিশ্বাসকে ঘিরে একত্রিত হতে পারে, যেভাবে বহুদিন তারা একত্র হয়নি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযান ঘোষণা করার সময় বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন পরিস্থিতি তৈরি করবে যাতে ইরানের জনগণ নিজেরাই উঠে দাঁড়ায় এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা নির্ধারণ করে। কিন্তু সেটি জনগণের ওপরই নির্ভর করবে।
জনগণকে সেই পর্যায়ে আনতে হলে সরকারের ওপর আস্থা ভাঙতে হয়। মানুষকে দিয়ে বলাতে হয়, আমরা এই সরকার বদলাতে প্রস্তুত।
কিন্তু আজকে ইরানের শহরগুলোতে মানুষ রাস্তায় নেমে আসছে, এবং তারা খামেনীর মৃত্যু চাইছে না, খামেনীর বিদায় চাইছে না, তারা বলছে—শহীদ খামেনী দীর্ঘজীবী হোন।
লেখক : সাবেক মার্কিন মেরিন কর্পস গোয়েন্দা কর্মকর্তা, জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শক


