বিশ্ব রাজনীতির এক অমীমাংসীত ইস্যু চীন- তাইওয়ান দ্বন্দ্ব। সব উপাদান থাকার পরও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি তাইওয়ান । চীন দাবি করে তাইওয়ান তাদের অংশ এবং সেটিকে ধরে রাখতে প্রয়োজনে সামরিক বাহিনী পাঠাবে তারা। চীনের প্রভাবের কারণেই উল্লেখযোগ্য কোন রাষ্ট্র তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করছে না। তাইওয়ানের সোয়া দুই কোটি নাগরিক তাই সব কিছু থাকার পরেও পরিচয় সঙ্কটে ভুগছে। যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও সামরিক সহযোগিতা দিতে শুরু করেছে। যে কারণে চীন-তাইওয়ান উত্তেজনা ক্রমশই বাড়ছে।
চীন-তাইওয়ান দ্বন্দ্বের ইতিহাস, বর্তমান অবস্থা এবং এ নিয়ে সামরিক উত্তেজনার খবরাখবর জানাবো এই লেখায়।
রাষ্ট্র হিসেবে সব উপাদান থাকার পরও তাইওয়ানের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নেই
এক নজরে তাইওয়ান
আয়তন : ৩৬ হাজার ১৯৭ বর্গ কিলোমিটার
জনসংখ্যা : ২ কোটি ৩২ লাখ
মুদ্রা : তাইওয়ান ডলার
রাজধানী : তাইপে
ধর্ম : ৪৪ শতাংশ চাইনিজ ফোক, ২১ শতাংশ বৌদ্ধ, ১৩ শতাংশ ধর্মহীন, ৫ শতাংশ খ্রিস্টান, ১ শতাংশ মুসলিম
জাতিয়তা : ৯৭ শতাংশ হান তাইওয়ানিজ
তাইওয়ান কি স্বাধীন দেশ
চীন তাইওয়ানে সামরিক আগ্রাসন চালাবে কি না সেটি নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উদ্বেগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ানের আশপাশে চীনের সামরিক তৎপরতা সেই উদ্বেগ বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। চীন তাইওয়ানকে দেখে একটি বিচ্ছিন্ন প্রদেশ হিসেবে, যেটিকে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও আবার মূল ভূখণ্ডের সাথে একীভূত করা হবে।

অন্য দিকে তাইওয়ানের জনগনের বড় অংশ এই কথার সাথে একমত নয়। আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা থাক বা না থাক, তারা নিজেদের পৃথক জাতি মনে করে। তাইওয়ানের রাজনৈতিক নেতারাও তাদের ভূখণ্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই দেখে। ৩৬ হাজার ১৯৩ বর্গকিলোমিটারের একটি দ্বীপ তাইওয়ান। তাইওয়ানের রয়েছে নিজস্ব সংবিধান ও সরকার ব্যবস্থা।
চীনে কমিউনিস্ট পার্টির একদলীয় শাসন চললেও তাইওয়ানে গণতান্ত্রিক উপায়ে সরকার গঠিত হয়। নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন হয়। দেশটির ৩ লাখ সদস্যের একটি সেনাবাহিনীও রয়েছে। তথাপি ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই দ্বন্দ্বের কারণে রাষ্ট্র হিসেবে তাইওয়ানের মর্যাদা কী তা স্পষ্ট নয়।
তাইওয়ান আর চীনের এই বিরোধীতার ইতিহাস বহু পুরনো। তাইওয়ানের আদি বাসিন্দারা চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকা থেকে এসেছিলো বলে ধারণা করা হয়। তারা ছিলো অস্ট্রোনেশিয়ান উপজাতি সম্প্রদায়ের লোক। চীনা দলিলপত্রে ২৩৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম তাইওয়ানের কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। ওই সময় একজন শাসক দ্বীপটি জয় করতে সেনা পাঠিয়েছিলেন।

এই ইতিহাসকে ভিত্তি ধরেই চীন তাইওয়ানকে নিজের অংশ বলে দাবি করে। আর আধুনিক ইতিহাসে তাইওয়ান ১৬২৪ থেকে ১৬৬১ সাল পর্যন্ত ছিলো নেদারল্যান্ডের উপনিবেশ। এরপর দুইশো বছরেরও বেশি সময় ছিলো চীনের কিং সম্রাজ্যের অংশ। ওই সময় চীন থেকে প্রচুর মানুষ তাইওয়ানে গিয়ে বসবাস শুরু করে। তাইওয়ানের আজকের জনসংখ্যার বেশির ভাগই সেইসব চীনা অভিবাসীদের উত্তর পুরুষ। ১৮৯৫ সালে চীন-জাপান যুদ্ধের পর তাইওয়ান যায় জাপানের দখলে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান আত্মসমার্পন করার পর ভূখণ্ডটির দায়িত্ব নেয় চীন।
চীন-তাইওয়ান বিরোধ
১৯৪৯ সালে চীনে সংগঠিত হয় কমিউনিস্ট বিপ্লব। মাও সে তুংয়ের কমিউনিস্ট বাহিনী বেইজিংয়ের দখল নেয়। এর ফলে তৎকালীন শাসক চিয়াং কাই-শেকের সেনাবাহিনী ও সরকারের শীর্ষ নেতারা তাইওয়ানে আশ্রয় নেয়। তারা তাইওয়ান থেকেই চীনৈর বৈধ সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও তাইওয়ানের সরকারকেই চীনা কর্তৃপক্ষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে থাকে। এমনকি জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদেও চীনের প্রতিনিধিত্ব করে তাইওয়ানে পালিয়ে যাওয়া সেই সরকার।
কিন্তু বেইজিংয়ের কমিউনিস্ট শাসকরা তাদের দক্ষ কূটনীতি দিয়ে অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে সমর্থ হয়। ধীরে ধীরে অনেক দেশই তাইওয়ানের বদলে বেইজিংয়ের সরকারকেই স্বীকৃতি দিতে শুরু করে। বিশ্বব্যাপী চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব এতে ভুমিকা রাখে। ১৯৭১ সালে তাইওয়ানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষাকারী দেশের সংখ্যা কমতে কমতে ১৫তে নেমে আসে। সংখ্যাটা সেই পনেরোতেই থেমে আছে। গুয়েতেমালা, হন্ডুরাস, হাইতি, প্যারাগুয়ে’র মতো দেশগুলো তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করছে। যার কোনটিই আবার বিশ্ব রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য নয়। যে কারণে রাষ্ট্র হিসেবে সব উপাদান থাকার পরও তাইওয়ানের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নেই।
চীনের সাথে সম্পর্ক
১৯৮০’র দশকে চীন-তাইওয়ান সম্পর্ক উন্নতি হতে শুরু করেছিলো। তবে ওই সময় চীন ‘এক রাষ্ট্র, দুই নীতি’ নামে একটি ফর্মূলা দেয়। যার অর্থ ছিলো, তাইওয়ান আলাদা প্রশাসনের অধীনে চললেও কাগজে কলমে সেটি চীনেরই অংশ থাকবে। তাইওয়ানের জনগনকে আশ্বস্ত করার জন্য বেইজিংয়ের নেতারা দ্রুততার সাথে হংকংয়ে এই নীতি চালু করে; কিন্তু তাইওয়ানিজরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করে। তবে তারা চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নাগরিকদের বাধা দেয়নি।
তাইওয়ানের ব্যবাসায়ীরা চীনে বিনিয়োগ করতে থাকেন। চীন ভ্রমণেও তাদের বাধা দেয়া হতো না। শুধু তাই নয়, বিপ্লবের পর কমিউনিস্ট শাসকদের সাথে তাইওয়ানের যে যুদ্ধ চলছিলো তাও ১৯৯১ সালে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। দুই পক্ষের মাঝে অনানুষ্ঠানিক সংলাপও চলেছে। তবে তাইওয়ানের রিপাবলিক অব চায়না সরকারকে বেইজিং অবৈধ হিসেবে আখ্যায়িত করতো, যে কারণে তারা তাইওয়ানে সাথে কোন আনুষ্ঠানিক সংলাপে বসেনি।
২০০০ সালের নির্বাচনে চেন শুই-বিয়ান তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর দুই পক্ষের মাঝে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। চেনকে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করে চীন। এবং তারা তাইওয়ানের ব্যাপারে আরো সতর্ক হয়ে ওঠে। ২০০৪ সালে চেন পুর্ননির্বাচিত হলে চীন একটি বিতর্কীত আইন পাস করে, যাতে বলা হয় তাইওয়ান বিচ্ছিন্ন হতে চাইলে বেইজিং সেটি ঠেকাতে যে কোন পদক্ষেপ নিতে পারবে।
তবে ২০০৮ সালে সালে নতুন প্রেসিডেন্ট মা ইং-জিউ দায়িত্ব নিয়েই অর্থনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের ঘোষণা দেন। ৮ বছর পর ২০১৬ সালে ক্ষমতায় আসেন প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েন। ডেমোক্রেটিক প্রোগ্রেসিভ পার্টির এই নেতা স্বাধীনতাপন্থী হিসেবে পরিচিত। যে কারণে চীন-তাইওয়ান উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে।
বিশ্ব রাজনীতিতে তাইওয়ান সঙ্কট
ওই বছরই ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার তার সাথে টেলিফোনে কথা বলেন সাই ইং ওয়েন।
৪০ বছরেরও বেশি সময় পর ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের সাথে টেলিফোন আলাপ করেন। এরপর থেকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও তাইওয়ানকে বেশকিছু প্রতিরক্ষা সামগ্রী দেয়ার ঘোষনা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। আর এ নিয়ে পূর্ব এশিয়ার রাজনীতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
২০১৮ চীন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করে তাদের ওয়েবসাইটে তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে দেখাতে। অন্যথায় চীনে তাদের ব্যবসায় বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়। ২০২০ সাই যখন দ্বিতীয় মেয়াদে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, ওই সময় হংকংয়ে কয়েক মাস ধরে চীনা প্রভাবের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছিলো। এই ঘটনা তাইওয়ানের স্বাধীনতাপন্থীদের আরো উৎসাহিত করে। ওই বছরের শেষ দিকে হংকংয়ের ওপর ন্যাশনাল সিকিউরিটি আইন নামের একটি নীতি চাপিয়ে দেয় চীন। যা এইসব অঞ্চলগুলোর ওপর বেইজিংয়ের কড়া অবস্থানকে আরো স্পষ্ট করে তোলে।
প্রায় একই সময়ে তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক আরো মজবুত করতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের প্রতি সমর্থনও অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা তাইওয়ান সফর করেন, যেটি ছিলো কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম। যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায় চীন। তারা তাইওয়ানের স্বাধীনতা নিয়ে অগ্রসর হতে যুক্তরাষ্ট্রকে হুশিয়ার করে। এছাড়া মার্কিন কর্মকর্তার ওই সফরের সময় তাইওয়ান প্রণালীতে তাজা গোলার সামরিক মহড়া চালায় চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি।

যুক্তরাষ্ট্রের জো বাইডেন প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর জানিয়েছে, তাইওয়ান নিয়ে তাদের অঙ্গীকার আগের মতোই দৃঢ় রয়েছে। চীন এই বক্তব্যেরও প্রতিবাদ জানিয়েছে, তবে সেটা অন্যভাবে। তারা পর পর দুদিন তাইওয়ানের আকাশসীমায় যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে। কয়েকদিন পর চীনা ফাইটার জেটের বিশার এক বহর ঢুকে পড়ে তাইওয়ানের আকাশে। এ ঘটনার পর পেন্টাগনের ইন্দো-প্যাসিফিক জোনের প্রধান অ্যাডমিরাল জন অ্যাকুইলিনো সতর্ক করে দিয়ে বলেন, তাইওয়ানে চীনা আগ্রাসন খুবই নিকটে।
তাইওয়ানিজদের ভাবনা
তবে এসব রাজনৈতিক অচলাবস্থা সত্ত্বেও তাইওয়ানের সাথে চীনের নাগরিকদের বন্ধনও ক্রমশ জোরালো হয়ে ওঠে গত কয়েক দশকে। তাইওয়ানের কোম্পানিগুলো চীনে ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। ১০ লাখের বেশি তাইওয়ানিজ নাগরিক চাকরি বা ব্যবসায়ের সূত্রে বসবাস করেন চীনের বিভিন্ন শহরে।
তাইওয়ানের স্বাধীনতা নিয়েও তাদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। অনেকে মনে করেন তাইওয়ানের অর্থনীতি চীনের ওপর নির্ভরশীল, যে কারণে তাইওয়ান স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। আবার অনেকে মনে করেন তার উল্টোটা। ২০১৪ সালে একটি বিতর্কীত বাণিজ্য চুক্তির পর তাইওয়ানে সানফ্লাওয়ার মুভমেন্ট নামে চীন বিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ করে ছাত্র ও সমাজকর্মীরা।
তাইওয়ানের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ডেমোক্র্যাটিক প্রোগ্রেসিভ পার্টি স্বাধীনতাপন্থী, অন্য দিকে কৌমিনতাং নামের যে দলকে হটিয়ে ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্টরা ক্ষমতা দখলে করেছিলো- তারাই এখন চীনপন্থী হিসেবে পরিচিত। এই দলটি প্রকাশ্যেই তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে সরাসরি চীনের সাথে যুক্ত হওয়ার বিষয়েও তারা প্রকাশ্যে কোন ঘোষণা দেয়নি।
২০২১ সালে তাইওয়ান সরকারের পরিচালিত এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, স্বার্বভৌমত্বের নিরাপত্তার জন্যই বেশির ভাগ নাগরিক ক্ষমতাসীন ডিপিপিকে সমর্থন করে। ২০২০ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট সাই’য়ের ৮২ লাখ ভোট পাওয়াকেও তাইওয়ানিজদের স্বাধীনতার দাবির প্রতি সমর্থন হিসেবেই দেখা হয়।


