বর্তমান সময়ে যুদ্ধের প্রধান উপকরণ হয়ে দাড়িয়েছে অ্যাটাক ড্রোন। আনম্যানড এরিয়েল ভেহিকেল বা সংক্ষেপে ইউএভি। যার বাংলা করলে দাড়ায় মনুষ্যবিহীন বিমান। ড্রোন নামেই সবচেয়ে বেশি পরিচিত এগুলো। প্রকৃত বিমানের তুলনায় এর আকার হয় অনেক ছোট।
বিভিন্ন দেশ এখন পাল্লা দিয়ে ড্রোন উদ্ভাবন করছে। নতুন নতুন চাহিদার কথা মাথায় রেখে বানানো হচ্ছে ড্রোন। তবে অনেক ড্রোন আছে যার মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন। প্রায় একই ধরনের শক্তিমত্তার কথা জানা যায়। আবার অনেক ড্রোনের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানাও যাচ্ছে না। তবে প্রতিরক্ষা ও সমরাস্ত্র বিষয়ক বিভিন্ন ওয়েবসাইটের পর্যালোচনার আলোকে তুলে ধরছি সেরা ৫টি ড্রোনের সংক্ষিপ্ত তথ্য।
যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যবহার বৃদ্ধির অনেকগুলো কারণ রয়েছে। অনেক দূরের সামরিক ঘাঁটিতে কম্পিউটারের সামনে বসে চালানো এই ড্রোন শত্রুর ভূখণ্ডে ঢুকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যেমন সংগ্রহ করতে পারে, তেমনি হামলার জন্য টার্গেট নির্ধারণ করতে পারে নিখুত ভাবে। হামলার ক্ষেত্রেও এর টার্গেট খুব বেশি মিস হয় না। আবার শুত্রুর গুলিতে যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলে পাইলট নিহত বা ধরা পরার যে ভয় থাকে, ড্রোন ভূপাতিত হলেও সেটি থাকে না।
অনেকটা ভিডিও গেমের মতো, একটি ড্রোন শত্রুর হাতে ভূপাতিত হলে অপারেটর সাথে সাথেই আবার আরেকটি পাঠাতে পারেন ওই এলাকায় হামলা চালাতে। চলুন জেনে আসি সেরা ৫টি কমব্যাট বা মিলিটারি ড্রোনের সম্পর্কে।
প্রেডিটর সি অ্যাভেঞ্জার, যুক্তরাষ্ট্র
ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক জেনারেল অ্যাটোমিকস অ্যারোনটিকাল সিস্টেমস ২০০৯ সালে উদ্ভাবন করেছে অ্যাভেঞ্জার। যেটিকে ডাকা হয় প্রেডিটর সি নামেও। এটিকেই মনে করা হয় সবচেয়ে উন্নত ও যুদ্ধক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী ড্রোন।

মার্কিন বিমান বাহিনীতে ৯টি ড্রোন আছে এ ধরণের। প্রতিটির নির্মাণ খরচ এক কোটি ৩০ লাখ থেকে দেড় কোটি মার্কিন ডলার। এটি একটি স্টিলথ ড্রোন। যাতে রাডার, ইনফ্রারেড, রেডিও ফ্রিকেয়েন্সির খুব কম রিফ্লেকশন হয়। যে কারণে সহজেই শত্রুর নজর এড়াতে পারে এটি। এফ-থার্টিফাইভ ফাইটারের মতোই এতে ব্যবহার করা হয়েছে ইলেকট্রো অপটিক্যাল টার্গেটিং সিস্টেম।
হেলফায়ার মিসাইল বহনে সক্ষম অ্যাভেঞ্জার। এছাড়া জিবিইউ টুয়েলভ, জিবিইউ থার্টি ওয়ান ও জিবিইউ থার্টি টুসহ এই সিরিজের সবগুলো লেসার গাইডেড বোমা বহন করতে পারে এটি। সর্বোচ্চ এক হাজার কেজি ওজনের অস্ত্র বহন করতে পারে এটি। এর পাখা ও বডির সাথেও বাড়তি অস্ত্র জুড়ে দেয়া যায়। এতে আছে অল ওয়েদার অ্যাক্টিভ ফেসড অ্যারে রাডার। সর্বোচ্চ ১৮ হাজার মিটার উচ্চতায় প্রতি ঘণ্টায় ৭৪০ কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারবে অ্যাভেঞ্জার। তবে প্রয়োজনে ৫০ হাজার ফুট পর্যন্ত উচ্চতায় উঠতে পারে এটি।
ড্রোনের তুলনায় প্রেডিটর সি সব দিক থেকেই উন্নত। ড্রোনটিতে ব্যবহার করা হয়েছে টার্বোফ্যান জেট ইঞ্জিন। তবে এখন পর্যন্ত কোন যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এই ড্রোন ব্যবহার করেছে বলে জানা যায় না।
হিরন টিপি, ইসরাইল
মাঝারি উচ্চতায় দীর্ঘক্ষণ উড়তে সক্ষম ইসরাইলের আইএআই হিরন বা হিরন টিপি ড্রোন। হিরন ড্রোনের কয়েকটি ভার্সন আছে ইসরাইলের, তার মধ্যে সর্বাধুনিক হিরন টিপি। এটির আরেক নাম এইতান। নকশা ও উন্নয়ন করেছে ইসরাইলি অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রি।

১০ হাজার ৭০০ মিটার উচ্চতায় টানা ৪৫ ঘণ্টা উড়তে পারে ড্রোনটি। অপারেটরের সাহায্য ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে উড়তে পারে এটি। যেটিকে বলা হয় অটোনোমাস মুড। এই ক্ষমতার কারণে কখনো কন্ট্রোল রুমের সাথে ড্রোনটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও এটি ফিরতে পারবে ঘাটিতে। হামলাও চালাতে পারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। ১৪ মিটার দৈর্ঘ্যরে ড্রোনটির দুই পাখার প্রান্তের দূরত্ব ২৬ মিটার। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪০৭ কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারবে। ৭ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত কন্ট্রোল রুমের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারে।
১৯৯৪ সালে প্রথম হিরন ড্রোন আনে ইসরাইল, হিরন টিপি আসে ২০০৪ সালে। প্রতিটির নির্মাণ খরচ সাড়ে তিন কোটি মার্কিন ডলার।
নজরদারির ক্ষেত্রে এটির আছে অপটিক্যাল ইলেকট্রনিক্স ও ইনফ্রারেড সিস্টেম। খুবই ছোট কিন্তু শক্তিশালী রাডার। টার্গেটের গতিবিধিও পড়তে পারে এই ড্রোন। শত্রুর রাডারকে ফাঁকি দিয়ে চালাতে পারে মিসাইল হামলা।
২০০৮-০৯ সালে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় হামলায় হিরন টিপি ব্যবহার করেছে ইসরাইল। ইসরাইলের কাছ থেকে এই ড্রোনটি কিনেছে ভারত, কানাডা, ব্রাজিল, তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ।
প্রিডেটর বি ড্রোন, যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী, নাসা, ইতালি, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের বিমান বাহিনীতে মোতায়েন আছে প্রিডেটর বি ড্রোন। পুরো নাম এমকিউ-নাইন রিপার প্রিডেটর বি। ২০০১ সালে পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের পর ২০০৩ সালে সর্বপ্রথম এটি যুক্ত করা হয় মার্কিন নৌ বাহিনীর বহরে। তবে পূর্ণ মাত্রায় সেবা দিতে শুরু করে ২০০৭ সাল থেকে।
২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭৪ নং অ্যাটাক উইং থেকে এফ-সিক্সটিন ফাইটার জেট সরিয়ে পুরোপুরি এমকিউ-নাইন রেপার ড্রোন মোতায়েন করা হয়।

মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ড্রোনটি নির্মাণ করেছে ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জেনারেল অ্যাটোমিকস অ্যারোনটিকাল সিস্টেমস। এর প্রতিটির নির্মাণ খরচ দেড় কোটি মার্কিন ডলার। ড্রোনটি ১৩ হাজার ৭০০ ফুট উচ্চতায় টানা ২৪ ঘণ্টা উড়তে পারে। পূর্ণাঙ্গ লোড হয়ে একটানা উড়তে পারে ১৪ ঘণ্টা। সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৪৮০ কিলোমিটার।
এটি হেলফায়ার এয়ার টু সারফেস মিসাইল হামলা চালাতে পারে। হান্টার কিলার ক্যাটাগরিভূক্ত ড্রোনটি টার্গেট চিহ্নিত করে হামলা চালাতে পারে নিখুঁতভাবে। এক সাথে সর্বোচ্চ ১৪টি মিসাইল বহনের ক্ষমতা আছে প্রেডিটর বি ড্রোনের। এছাড়া প্রয়োজনে প্রতিটি আড়াইশ কেজি ওজনের দুটি জিবিইউ-টুয়েলভ লেসার গাইডেড বোমাও বহন করতে পারে এটি। হামলার রেঞ্জ এক হাজার ৯০০ কিলোমিটার।
গ্রাউন্ড স্টেশনে দুই জন ক্রু ড্রোনটিকে অপারেট করে। আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবেও উড়তে পারে এটি। এর দৈর্ঘ্য ৩৬ ফুট ১ ইঞ্চি, উচ্চতা ১২ ফুট ৬ ইঞ্চি। সর্বোচ্চ সাড়ে ১০ হাজার কেজি ওজন নিয়ে উড়তে পারে। এর আছে মাল্টিস্পেকট্রাল টার্গেটিং সিস্টেম ও অত্যাধুনিক লিন্যাক্স টু রাডার। এটিতে আছে পানির নিচে অনুসন্ধানে সক্ষম একটি রাডার সিস্টেমও।
আফগান যুদ্ধে এই ড্রোনটি মার্কিন বাহিনীকে দারুণ সেবা দিয়েছে। অবশ্য ৩৮টি ড্রোন হারাতেও হয়েছে ওই যুদ্ধে। ইরাকের ভূখণ্ডে এয়ার টু সারফেস মিসাইল হামলায় ড্রোনটি ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
বেরাকতার টিবি টু ড্রোন, তুরস্ক
তুরস্কের নিজস্ব উদ্ভাবিত ড্রোন বেরাকতার টিবি টু অপারেশনে এসেই হইচই ফেলে দিয়েছে। লিবিয়ায় খলিফা হাফতারের বাহিনীর বিপক্ষে, ইরাকে কুর্দিপন্থী পিকেকের বিপক্ষে ও সর্বশেষ নাগোরনো কারাবাখের যুদ্ধে আজারবাইজানের হয়ে এই ড্রোন দেখিয়েছে তার ক্ষমতা।

২০১৪ সালে বেরাকতার আকিঞ্চি নামে তুরস্কের একটি সংস্থা এই ড্রোন তৈরি করে। তুর্কি ইঞ্জিনিয়ার সেলচুক বেরাকতার এর নকশা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রর অস্ত্র রফতানি স্থগিত করার পর তুরস্ক টিবি ওয়ান ড্রোনকে আধুনিক ও উন্নত রূপ দিয়ে বানায় টিবি টু। ২০১৪ সাল থেকে এটি মোতায়েন করা হয়েছে তুর্কি সামরিক বাহিনীতে। এছাড়া ইউক্রেন ও কাতারের কাছেও এটি বিক্রি করেছে তুরস্ক। সার্বিয়াও এটি কিনতে চাইছে। এর প্রতিটির দাম পঞ্চাশ লাখ মার্কিন ডলার।
২০২২ সালের যুদ্ধে এই ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়ার অনেক ট্যাকং ও সাজোয়া যান ধ্বংস করেছে ইউক্রেন।
এই ড্রোনটি উদ্ভাবন করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোয়ানের জামাতা সেলচুক বেরাকতার।
বেরাকতার টিবি টু ড্রোনের সফটওয়ার ও কন্ট্রোল সিস্টেম ইসরাইলের হেরন ড্রোনের চেয়েও উন্নত। টার্গেটে হামলা করার ব্যাপারে এটি খুবই নিখুত। রাডারকে ফাঁকি দেয়ার ক্ষমতাও এর অসাধারণ। কানাডার এলথ্রি হ্যারিস টেকনোলজিস নামের একটি কোম্পানির প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে এতে। আছে অনেকগুলো শক্তিশালী ক্যামেরা ও সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম। এই ড্রোনটি বহন করতে পারে দুটি ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী গাইডেড মিসাইল ও একটি রোকেসটান গ্লাইডিং অ্যামিউনিশন রকেট।
সাড়ে ছয় মিটার লম্বা ড্রোনটির পাখাসহ চওড়া ১২ মিটার। ৬৫০ কেজি ওজন নিয়ে উড়তে পারে। ১৫০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত এটি কন্ট্রোল রুমের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে। ২৪ হাজার ফুট উচ্চতায় এটি টানা ২৪ ঘণ্টা উড়তে পারে। সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার। এর আছে অটোমেটিক টেকঅফ ও ল্যান্ডিং দক্ষতা।
এস-৭০ ওখোটনিক, রাশিয়া
২০০৯ সালের আগস্ট মাসের দিকে জানা যায় রাশিয়ার যুদ্ধবিমান প্রস্তুতকারী দুটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান সুখোই ও মিগ যৌথভাবে একটি শক্তিশালী অ্যাটাক ড্রোন নিয়ে কাজ করছে। তিন বছর পর জানা যায় সুখোই এই প্রজেক্টের নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং তারা শীঘ্রই আনতে যাচ্ছে এস-সেভেনটি ওখোটনিক নামের একটি সর্বাধূনিক স্ট্রাইক ড্রোন।

অনেক অপেক্ষার পর ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ড্রোনটির প্রোটোটাইপ বা মডেলের উড্ডয়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। আর পরের বছর সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে ড্রোনটি আকাশে ওড়ে। কিছুদিন পর রাশিয়ার সু-ফিফটি সেভেন ফাইটার জেটের সাথে যৌথভাবে মহড়া চালায় এস-সেভেনটি ওখোটনিক।
তোলপাড়া শুরু হয় বিশ্বের সমরাস্ত্র জগতে। এই ড্রোনটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে এটি আকাশে উড্ডয়নরত সু-ফিফটি সেভেন ফাইটারের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে। ড্রোনটির রাডার ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে ফাইটারটি। যার ফলে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নজর এড়াতে সু-ফিফটি সেভেন ওই এলাকায় না ঢুকে ওখোটনিক ড্রোনকে পাঠাবে। আর ড্রোনের নজরদারির তথ্যের ভিত্তিতে দূর থেকেই হামলা করতে পারবে সু-ফিফটি সেভেন ফাইটার। ফাইটার থেকেই ড্রোনটি নিয়ন্ত্রণও করা যায়।
অপটিক্যাল ইলেকট্রনিক, রেডিও টেকনিক্যালসহ নজরদারির সর্বাধূনিক সব ব্যবস্থা আছে ওখোটনিক ড্রোনে। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে এই ড্রোনটিকে বলা যায় ষষ্ঠ প্রজন্মের ফাইটার জেটের প্রোটোটাইপ।
এক ইঞ্জিন বিশিষ্ট ড্রোনটির পাখার দুই প্রান্তের দূরত্ব ২০ মিটার, সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় এক হাজার কিলোমিটার। রেঞ্জ ছয় হাজার কিলোমিটার। এক্স সেভেনটি ফোর সুপারসনিক মিসাইল ছুড়তে সক্ষম ড্রোনটি দুই হাজার কেজি পর্যন্ত গাইডেড ও আনগাইডেড গোলাবারুদ বহন করতে পারে। এটি ২০২৪ সাল নাগার পূর্ণ মাতায় রুশ বিমান বাহনীতে যুক্ত হবে।


